অনলাইনে কোরবানির পশুর ক্রয়-বিক্রয় নিয়ে যা বললেন মাওলানা

অনলাইনে কোরবানির পশুর ক্রয়-বিক্রয় নিয়ে যা বললেন মাওলানা

বিশ্বায়নের এই যুগে প্রযুক্তির সংস্পর্শে সবকিছুই আধুনিক হয়ে উঠেছে। আর প্রযুক্তির ছোয়ায় ঐতিহ্য কোরবানীর পশুর হাটে লেগেও তা হয়ে গেছে ডিজিটাল। নিজস্ব বা বানিজ্যিক ওয়েবসাইট ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুক পেইজে চলছে কোরবানীর পশুর জমজমাট হাট।

আসন্ন ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে কোরবানির হাটগুলোতে এখনো পুরোদমে পশু কেনাবেচা শুরু না হলেও ইতোমধ্যে জমে উঠেছে অনলাইন কোরবানির হাট। বিক্রয়.কম, আমারদেশ ই-শপ, বাংলামিট.কম, ক্লিকবিডি.কম, বাগডুম ডটকম ছাড়াও বিভিন্ন ওয়েবসাইটে কোরবানির পশু বিক্রির বিজ্ঞাপন পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি এদের মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠানতো কোরবানী দিয়ে গোশত বাসায় ডেলিভারি করার দায়িত্বও নিচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, যেসব ক্রেতারা পশুর হাটে গিয়ে দরদাম করে কেনা-কাটার ঝক্কিঝামেলা পোহাতে চান না তারাই মুলত অনলাইন হাটের গ্রাহক। এছাড়াও প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটা অংশও এখন অনলাইনে পশু হাটের ক্রেতা বলে জানান তারা।

তবে কোরবানী বিষয়টি যেহেতু ইসলাম ধর্মালম্বীদের কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ ও ভাবগাম্ভীর্যের বিষয়। তাই এই অনলাইনে পশুর হাট নিয়েও নানারকম আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে সাধারণ মানুষের মনে। তাই সেই সংশয় দূর করতেই প্রসঙ্গটি নিয়ে কথা বলেন মাওলানা মিরাজ রহমান।

তিনি বলেন, ‘কোরবানি একটি ওয়াজিব বিধান। ইসলামে এই বিধানের গুরুত্ব অপরীসীম। সুতরাং বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনার তালিকাতে রাখতে হবে। আর এই গুরুত্বপূর্ণ বিধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ক্রটিমুক্ত পথ ও পদ্ধতিতে ত্রুটিমুক্ত পশু ক্রয় করা এবং সঠিক নিয়মে জবাই করা। প্রযুক্তির এই যুগে অনলাইনে কোরবানির পশু বিক্রি করা বা ক্রয় করার বিষয়টিকে সরাসরি বা ঢালাওভাবে জায়েজও (বৈধ) বলা যাবে না আবার সম্পূর্ণ না জায়েজও (অবৈধ) বলার সুযোগ নেই। বিষয়টি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত বা অনুষঙ্গের সাথে সম্পর্কিত। মানে হলো- ক্রটিমুক্ত পথ ও পদ্ধতিতে ক্রটিমুক্ত কোরবানির পশু ক্রয়-বিক্রয় সঠিক হওয়ার জন্য ইসলাম কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত প্রদান করেছে। সেসব শর্ত যদি ঠিক বা বজায় থাকে তাহলে অনলাইন বা অফলাইন সব স্থানে কোরবানির পশু ক্রয় বা বিক্রয় করা বৈধ বা জায়েজ হবে। আর ক্রয়-বিক্রয় সঠিক হওয়ার জন্য ইসলাম যেসব শর্ত প্রদান করেছে, সেগুলো যদি মান্য করা না হয় তাহলে অনলাইন বা অফলাইন সব স্থানেই কোরবানির পশু ক্রয়-বিক্রয় না জায়েজ বা অবৈধ বলে বিবেচিত হবে।

ক্রটিমুক্ত পথ ও পদ্ধতিতে ক্রটিমুক্ত কোরবানির পশুর ক্রয়-বিক্রয় সঠিক হওয়ার শর্ত বা বিধানগুলো হলো- 

১. ইজাব-কবুল বা ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য এক পক্ষের প্রস্তাব ও অপর পক্ষের সম্মতির ব্যবস্থা থাকা। কেনা-বেচার প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো ইজাব ও কবুল। ইমাম নববি (রহ.) এ মর্মে বলেন, ‘ইজাব ও কবুল (প্রস্তাব ও সম্মতি) ছাড়া বেচাকেনা শুদ্ধ হয় না।’ (আল ফিকহুল মাক্বারিন, মুখতাসারুল কুদুরি ও শরহে হেদায়া)

২. বিক্রিত পশুটি বা পণ্যটি বিক্রেতার মালিকানাধীন থাকতে হবে। মানে হলো- যিনি বিক্রি করবেন বা তৃতীয় পক্ষ হয়ে যিনি পশু বা পণ্যের বিক্রি পরিচালনা করবেন, পণ্য বা পশুটিকে প্রথমে তার মালিকানায় নিয়ে আসতে হবে। (হিদায়া, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫১)

৩. কোরবানির পশুর যথার্থ (ফটোশপে কোনো প্রকারের এডিট না করা) ছবির সাথে সকল প্রকার বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করতে হবে। সম্ভব হলে ভিডিও যুক্ত করা। কারণ ইসলামের দৃষ্টিতে পণ্য বা পশুর বিক্রি সঠিক হওয়ার জন্য পণ্যের উপস্থিতি শর্ত। (হেদায়া, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫১)

৪. ডেলিভারি চার্জ/সার্ভিস চার্জ/পরিবহনখরচসহ আরো যেসব বাড়তি খরচ রয়েছে, সেগুলো কে বহন করবে তা সঠিকভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।

৫. কোরবানির পশুটিকে চাক্ষুষ বা সামনাসামনি দেখার পর তা গ্রহণ করা অথবা ফেরত দেওয়ার শর্ত/সুযোগ থাকতে হবে। কারণ অনলাইনে দেখার সাথে বাস্তব দেখার মিল নাও থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে গ্রাহককে বিক্রেতার যাতায়াত ও আনুষঙ্গিক খরচ বহন করতে হবে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যখন দুই ব্যক্তি ক্রয়-বিক্রয় করবে, তখন প্রত্যেকের খিয়ার তথা পছন্দ মাফিক গ্রহণ করা না করার স্বাধীনতা থাকবে।’ (বোখারি : ২০০৬, মুসলিম : ২৮২১, মুসনাদে আহমাদ : ৩৯৫)।

৬. লেনদেনে সুদের সংশ্লিষ্টতা না থাকা। কারণ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন, আর সুদকে করেছেন। (সুরা বাকারাহ, আয়াত-২৭৫)

৭. কোনো প্রকার প্রতারণা, মিথ্যাচার ও অস্পষ্টতা না থাকা। (হিদায়া, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫২) রাসূল (সা.) একদিন মদিনার বাজারে আটার ঝুড়ির ভেতরে হাত দিয়ে দেখতে পেলেন বাইরে শুকনো আটা থাকলেও ভিতরে ভেজা রয়েছে। তখন তিনি বলেছিলেন, যে আমাদের সাথে প্রতারণা করল, সে আমাদের (উম্মতের) অর্ন্তভূক্ত না। (বুখারি)

৮. ন্যায্য মূল্যে পশু বা পণ্য বিক্রি করা। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রা.) বলেন, কোনো ব্যক্তি যখন ত্যাগ স্বীকার করে সওয়াবের আশায় মুসলিম জনপদে কোনো প্রয়োজনীয় দ্রব্য আমদানী করে এবং ন্যায্য মূল্যে তা বিক্রয় করে, আল্লাহর নিকট তিনি শহীদের মর্যাদা লাভ করেন। (কুরতুবী, আল-জামি লিআহকামিল কুরআন; কায়রো: দারুশ শাব, ১৯৭২) উনিশতম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫৬।)

৯. পশু বা পণ্যের মূল্য নির্ধারিত হতে হবে। মূল্য অস্পষ্ট থাকলে বেচা-কেনা বৈধ হবে না। (হিদায়া, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫৪)

উল্লেখ, ব্যবসা-বাণিজ্যর করার নিমিত্ত ক্রয়-বিক্রয় সঠিক বা শুদ্ধ হওয়ার জন্য আরো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে। প্রাসঙ্গিক হিসেবে এখানে শুধু অনলাইনে পণ্য বা পশু বিক্রির ক্ষেত্রে যেসব শর্ত প্রয়োজনীয় বলে মনে হয়েছে সেগুলো উল্লেখ করা হয়েছে।

মাওলানা মিরাজ বলেন, যে সব ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান কোরবানি উপলক্ষ্যে অনলাইনে পশু বিক্রির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, তাদের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে আমি বলতে চাই- বৈধভাবে সুষ্পষ্ট নিয়ম-নীতির আলোকে ব্যবসা করা ও লাভ করাকে ইসলাম শুধু স্বীকৃতি প্রদানই করেনি বরং এ ব্যাপারে উৎসাহ প্রদান করেছে। সুতরাং প্রযুক্তিরময়তাকে ব্যবহার করে আপনার ব্যবসার যে নবআয়োজন আবিস্কার করেছেন সেটা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। অসম্ভব কোনো বিষয় নেই। ইচ্ছা ও মানসিকতা থাকলে সব শর্তই মান্য করা সম্ভব।

বৈধভাবে সঠিক নিয়মে ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য আপনারা প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠান শরিয়াহ স্কলারদের বিশেষজ্ঞ প্যানেল তৈরি করুন এবং ইসলামের দৃষ্টিতে ক্রয়-বিক্রয় বৈধ হওয়ার যাতবীয় শর্তগুলোকে মেনে নিয়ে ব্যবসা পরিচালনার প্রতিশ্রুতির ঘোষণা প্রদান করুন। কারণ কোরবানি একটি ধর্মীয় বিধান। এটিকে ধর্মীয় বিধান হিসেবেই মান্য করতে হবে।

ব্যক্তিগতভাবে আমি অনেকগুলো ই-কমার্স ওয়েবসাইটের কোরবানির আয়োজন গেটে দেখেছি। কেবল কোরবানির পশুর মূল্য ও ছবি এবং বিভিন্ন অফার ছাড়া অন্য কোনো শর্ত বা তারা কোন প্রতিষ্ঠান কি সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছেন তা পাওয়া যায়নি। ক্রটিমুক্ত পথ ও পদ্ধতিতে ক্রটিমুক্ত কোরবানির পশুর ক্রয়-বিক্রয় সঠিক হওয়ার জন্য ইসলাম প্রদত্ত শর্তগুলোকে তারা মেনে নিবেন না কি নিবেন না -এমন কোনো কথাও কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। এমন অষ্পেষ্টভাবে অন্তত কোরবানির জন্য পশু ক্রয় বা বিক্রয় করা উচিত হবে না বলে আমি মনে করি।

সম্পর্কিত সংবাদ
ডেস্ক রিপোর্ট