আগামী জাতীয় নির্বাচন অবাধ-সুষ্ঠু হবে, সংসদে শেখ হাসিনা

আগামী জাতীয় নির্বাচন অবাধ-সুষ্ঠু হবে, সংসদে শেখ হাসিনা

আগামী জাতীয় নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে— সেইসঙ্গে সরকারের ধারাবাহিকতাও বজায় থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগামীতে ক্ষমতায় এসে আরো একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা হবে বলেও জানান তিনি।

বুধবার বিকালে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এ কথা বলেন।

খালেদা জিয়া রাজনৈতিকভাবে গ্রেপ্তার হননি— আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তার সাজা হয়েছে বলেও এ সময় মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।

দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় খালেদা জিয়া কারাগারে—এ মন্তব্য করে তিনি বলেন, সরকার চাইলে ২০১৪-১৫ সালে তাকে গ্রেপ্তার করতে পারতো।

নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা থাকায় দেশের নারীর উন্নয়ন হচ্ছে।

নারীর ক্ষমতায়নে বর্তমান সরকার সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে—উল্লেখ করে তিনি বলেন, অসহায় নারীদের জন্য পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পাশাপাশি নারীদের প্রশিক্ষণের জন্য জেলাভিত্তিক কম্পিউটার কোর্স চালু করা হয়েছে। উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত কর্মজীবী নারীর জন্য হোস্টেল নির্মাণ করা হবে।

বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে নারীদের ওপর ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনা বেশি হতো বলে এ সময় মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, দেশে যখন একটা সুন্দর সুষ্ঠু পরিবেশ থাকে এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকে তখন খুব স্বাভাবিকভাবে সর্বস্তরের মানুষই তাদের কর্মক্ষেত্রে স্ব স্ব জায়গায় পারদর্শিতা দেখাতে পারে এবং কাজ করতে পারে। তার ফলে দেশের উন্নতি ত্বরান্বিত হয়।

টানা মেয়াদে সরকারের ধারাবাহিকতার বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরা ২০০৮ সালের নির্বাচনের জয়ী হয়ে ২০০৯ সালে সরকার গঠন করি। সরকারের আসার পর ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত যে কাজগুলো করেছিলাম। এরপর ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পেরেছি বলেই বাংলাদেশ এতো উন্নতি করেছে এবং আমাদের নারীরা সমাজের সর্বক্ষেত্রে সুযোগ পেয়েছে। তাদের দক্ষতার পরিচয় দিতে পেরেছে।’

‘এই ধারাবাহিকতা বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা বজায় না থাকত তাহলে নারীরা নির্যাতনের শিকার হতো’ দাবি করে তার কারণ উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘২০০১ সালে আমরা দেখেছি, কিভাবে আমাদের দেশের মেয়েরা নির্যাতনের শিকার হয়েছিল? ঠিক ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যেভাবে আমাদের মেয়েদের উপর পাশবিক নির্যাতন-অত্যাচার করেছিল, ঠিক একই কায়দায় ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন সময় মেয়েদের উপর পাশবিক অত্যাচার হয়েছিল।

২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোটের শাসনামলে সারাদেশে নারীদের উপর সংঘটিত ঘটনাগুলোর উদাহরণ দিয়ে সংসদ নেতা বলেন, ‘আমি মনে করি নারীর ক্ষমতায়ন তখনই সম্ভব যখন দেশে একটা গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। একজন নারী হওয়া সত্ত্বেও এতিমের অর্থ আত্মসাৎ করা, এটা তো কখনো চিন্তা করা যায় না। সামান্য কয়টা টাকা এতিমরা পাবে? সেই টাকা নিয়ে দশ বছর মামলা চালিয়ে দুর্নীতির দায়ে এবং এতিমের টাকা আত্মসাৎতের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে কারাগারে বন্দী আছে। সেটাও তো কোর্টের রায়। আমরা তো রাজনৈতিকভাবে অ্যারেস্ট করিনি। তাহলে তো ২০১৫ সালে করতে পারতাম। ২০১৪ সালে করতে পারতাম, তা তো করিনি।’

এ বিষয়ে শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘সেই দশ বছর মামলা চালালো। বিএনপির এতো জাঁদরেল জাঁদরেল আইনজীবী, ব্যারিসটার সাহেবরা কেউ প্রমাণ করতে পারলো যে তিনি (খালেদা জিয়া) নির্দোষ। উল্টো তারা তদের দলের গঠনন্ত্রের ৭ ধারা সংশোধন করলো, ঠিক রায় বেরোনোর পূর্বে। তারা ৭ ধারা কেন সংশোধন করলো? তার মানে তারাও জানে তিনি অপরাধী এবং সেটাই তারা করেছে।

‘এটা তো সমগ্র নারী জাতির জন্য একটা কলঙ্ক। একজন নারী মানে একজন মা। একজন মা হয়ে এতিমের টাকা কিভাবে চুরি করলো বা সেটার অপব্যবহার করলো। এটা তো আমাদের নারীর জাতির জন্য লজ্জাকর।’

আমরা সব সময় চাই, দেশে গণতান্ত্রিক ধারাটা অব্যাহত থাকুক দাবি করে সংসদ নেতা বলেন, দেশটা সুষ্ঠুভাবে যেভাবে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাক তাতে আমাদের মেয়েরাই লাভবান হবে বলেও আশাবাদ করেন তিনি।

এর কারণ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘একটা সমাজে নারী-পুরুষ সকলে মিলে যদি তাদের জীবনমান উন্নত না হয়, তাহলে সেই উন্নতিটা হয় না। উন্নত হতে হলেই নারী-পুরুষ সকলেরই উন্নতি করা দরকার। তাহলেই আমাদের সমাজটা উন্নত হবে।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে বাংলাদেশের মহাকাশ জয় সম্ভব হয়েছে। মহাকাশে আজ বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে। এ গৌরব বর্তমান সরকারের, এ গৌরব দেশের ১৬ কোটি মানুষের।’ নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে সরকারি দলের সদস্য বেগম নাসিমা ফেরদৌসীর এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সজীব ওয়াজেদ জয়ের নেতৃত্বে এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের তত্ত্বাবধানে বিটিআরসি’র কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দীর্ঘ ৬ বছরের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে চলতি বছর ১২ মে ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে এ সাফল্য অর্জিত হয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহান মুক্তিযুদ্ধের পর থেকেই বাংলাদেশকে আত্মমর্যাদাশীল, স্বনির্ভর দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালে বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্যাটেলাইট যোগাযোগের সূচনা করেন।

তিনি বলেন, ‘সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রক্রিয়ায় তথ্য প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের উদ্যোগে মহাশূন্যে বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের পদক্ষেপ গ্রহণ করে। স্বপ্নের স্যাটেলাইট নির্মাণ ও এর সফল উৎক্ষেপণে আমি গর্বিত এবং আনন্দিত।’

শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ আওয়ামী লীগ সরকারের গতিশীল উন্নয়নের ধারাবাহিকতার একটি অংশ। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটটি সফল উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে জাতির পিতার আরেকটি স্বপ্ন পূরণ হলো। যারা বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের জন্য সরাসরি সম্পৃক্ত থেকে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছেন তাদের প্রতি ধন্যবাদ জানান।

তিনি বলেন, এ প্রকল্পটি একটি জাতীয় স্বপ্ন। তাই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর সফল উৎক্ষেপণের জন্য দেশের আপামর জনগণ মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডা ও চার্চসহ সকল উপাসনালয়ে মোনাজাত ও প্রার্থনা করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণকারী সংস্থা স্পেস-এক্স মহাকাশ বিজ্ঞানের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করায় (ফ্যালকন-৯ এবং ব্লক-৫) সারাবিশ্বের প্রায় সকল দেশ ও মিডিয়া এ উৎক্ষেপণের সম্প্রচার করেছে।

শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের সফল উৎক্ষেপণের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রবেশ করলো এক ‘এলিট ক্লাবে’। নিজস্ব স্যাটেলাইটের মালিক দেশগুলোর এই ক্লাবে বাংলাদেশ ৫৭তম সদস্য। আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, জাপান, ভারত, থাইল্যান্ড, কানাডা, ফ্রান্স, শ্রীলংকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নিজস্ব স্যাটেলাইট রয়েছে। স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পর সম্প্রতি ভারত সফরকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, স্থল ও জলসীমা জয়ের পর মহাকাশ জয় ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি দীর্ঘ যাত্রা। ২০১২ সালে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের লক্ষ্যে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এ প্রকল্পের আওতায় ফিজিবিলিটি স্টাডিসহ সকল প্রস্তুতিমূলক কাজ সম্পন্ন করা হয়। পরে গত ২০১৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বরে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ প্রকল্পটি একনেক সভায় অনুমোদিত হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিভিন্ন সুবিধা পাবে।

শেখ হাসিনা বলেন, স্যাটেলাইট টেকনোলজি ও সেবার প্রসারের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে টেলিযোগাযোগ ও সম্প্রচার সেবার পাশাপাশি টেলিমেডিসিন, ই-লার্নিং, ই-এডুকেশন, ডিটিএইচ, ভিস্যাট প্রভৃতি সেবা প্রদান সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্থল ও জলসীমায় নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ ও সম্প্রচার নিশ্চিত ও নির্বিঘ্ন করা সম্ভব হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এ মোট ৪০টি ট্রান্সপন্ডার থাকবে তার মধ্যে ২০টি বাংলাদেশের জন্য এবং ২০টি দেশের বাইরের জন্য ব্যবহার করা হবে। ২০টি ট্রান্সপন্ডার লিজের মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় হবে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বার্ষিক ১৪ মিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ সফলভাবে উৎক্ষেপণের পর মহাকাশে নিজেদের অবস্থানকে সমুন্নত রাখতে এর ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর আয়ুষ্কাল শেষ হওয়ার আগেই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ মহাকাশে প্রেরণ করার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।

সম্পর্কিত সংবাদ
ডেস্ক রিপোর্ট