আজ পর্যন্ত কোনও পাক প্রধানমন্ত্রী পুরো মেয়াদ থাকেননি

আজ পর্যন্ত কোনও পাক প্রধানমন্ত্রী পুরো মেয়াদ থাকেননি

শুধু নওয়াজ শরিফই নন। তথ্য-পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, স্বাধীনতার ৭০ বছর পরেও পাকিস্তান এমন কোনও প্রধানমন্ত্রী পায়নি, যিনি তাঁর পুরো মেয়াদটা ছিলেন ক্ষমতায়।

এক রাজা যান। অন্য রাজা আসেন। কোনও রাজাই থাকতে পারেন না পুরোটা মেয়াদ। রাজাদের চলে যেতে বাধ্য করা হয়। কখনও সেনা অভ্যুত্থান, কখনও বাধ্যতামূলক ইস্তফা, কখনও আদালতের রায়, কখনও গৃহবন্দি, কখনও বা খুন অথবা দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়ে মেয়াদ ফুরনোর আগেই চেলে যেতে হয়েছে পাক প্রধানমন্ত্রীদের। একের পর এক। লিয়াকৎ আলি খান দিয়ে শুরু। এখন নওয়াজও আর ‘শরিফ’ নন! শীর্ষ পদগুলির অস্থিরতা, অস্থায়ী সরকারই যেন পাকিস্তানের ললাটলিখন! যাঁরা পাকিস্তান রাজনীতির ওপর নজর রাখেন, সেই বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন, সেই দিন হয়তো বা এ বার বদলাতে চলেছে পাকিস্তানে। পাক গণতন্ত্র হয়তো এ বার সাবালক হয়ে উঠতে চলেছে।

 স্বাধীনতার ৭০ বছর পর কি পাকিস্তান এ বার সত্যি সত্যিই পেতে চলেছে একটা স্থায়ী সরকার? প্রতিবেশী দেশটির গণতন্ত্র কি একটা সুযোগ পেতে চলেছে নিজেকে জোরদার করে তোলার? ইসলামাবাদ বেরিয়ে আসতে চলেছে ‘আমেরিকা, আর্মি (সেনাবাহিনী), আল্লা (মোল্লাতন্ত্র)’-র ‘পূর্ণগ্রাস’ থেকে?

তেমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের ধারণা, চিন তার অর্থনৈতিক স্বার্থে চায় বলেই হয়তো এ বার একটা স্থায়ী সরকার পেতে চলেছে পাকিস্তান। পাক গণতন্ত্রে সুস্থিরতা আসতে চলেছে। ভারত ‘মূল শত্রু’ বলে, আমেরিকা আর ততটা ‘হাত বাড়ালেই বন্ধু’ নয় বলে চিনের ইচ্ছায় নিজেদের গণতন্ত্রকে এ বার সাবালক করার চেষ্টা করতে পারে ইসলামাবাদ।


পাকিস্তানের সেনাবাহিনী।- ফাইল চিত্র

রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরী ও বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শিবাজীপ্রতিম বসুর বক্তব্য, গত ৬০ বছর ধরে যাকে ‘হাত বাড়ালেই বন্ধু’ বলে মনে করতো ইসলামাবাদ, সেই আমেরিকা তার রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থেই এত দিন ইসলামাবাদের গণতন্ত্রকে গড়ে ও বেড়ে উঠতে দেয়নি। পাক গণতন্ত্রের ‘বন্ধু’ হয়নি আমেরিকা, অস্ত্র বেচবে বলে। লাগাতার অস্থিরতা থাকলে, সন্ত্রাসের বাতাবরণ থাকলে, সংসদীয় গণতন্ত্রের ওপর সেনাবাহিনীর মাতব্বরি বজায় থাকলে, অস্ত্র বেচতে সুবিধা হয়। অস্ত্রের বড় বাজার তৈরি হয়। পাকিস্তানের ঘাড়ে বন্দুক রেখে ভারতীয় উপমহাদেশে কর্তৃত্ব বজায় রাখাটা সহজতর হয়। তাই পাক গণতন্ত্রের ‘বন্ধু’ হতে পারেনি আমেরিকা। চায়ওনি। তাই পাকিস্তান বার বার অস্থায়ী সরকার দেখেছে। মেয়াদ ফুরনোর আগেই প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীদের গদিচ্যুত হতে দেখেছে, ইস্তফা দিতে দেখেছে, খুন হতে দেখেছে, সেনা অভ্যুত্থানের শিকার হতে দেখেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ৬০ বছর ধরে ‘খারাপ বন্ধু’তে (পড়ুন, আমেরিকা) ভরসা রাখার পর পাকিস্তানের গণতন্ত্র বোধহয় এ বার ‘ভাল বন্ধু’ পেতে চলেছে। সেই বন্ধুটির নাম চিন। শিবাজীপ্রতিমবাবুর কথায়, ‘‘আমেরিকার স্বার্থ ছিল। চিনেরও আছে। আমেরিকা অস্ত্র বাজারের জন্য অস্থিরতা টিঁকিয়ে রাখতে চেয়েছিল। আর চিন তার অর্থনীতির স্বার্থেই সমুদ্রপথে বাণিজ্য বাড়াতে নতুন নতুন বন্দর গড়ে তুলতে পাকিস্তানের বন্ধু হয়ে উঠেছে। বাণিজ্য করতে আর তা বাড়াতে হলে সুস্থিরতার প্রয়োজন সবার আগে। অস্থিরতা যে একেবারেই না-পসন্দ ‘লক্ষ্মী’র! তাই বেজিংয়ের ‘লক্ষ্মীলাভ’-এর বাসনা পাকিস্তানের গণতন্ত্রের পক্ষে সম্ভবত লাভজনক হয়ে উঠতে চলেছে। এই প্রথম। স্বাধীনতার ৭০ বছর পর। এর ফলে দু’টি ঘটনা ঘটতে পারে। মোল্লাতন্ত্র সঙ্ঘাতে যেতে পারে চিনের সঙ্গে। বা নিজেকে আরও সংহত করতে পারে, মানিয়ে নিতে পারে নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে।’’ তাতে আগামী দিনে চিন টার্গেট হয়ে যেতে পারে মুসলিম সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলির, এমনও আশঙ্কা রয়েছে বিশেষজ্ঞদের।


পাকিস্তানের পার্লামেন্ট ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি

ভারত, পাকিস্তান দু’টি দেশই স্বাধীন হয়েছিল ’৪৭ সালের অগস্টে। তার আড়াই বছরের মধ্যেই ভারতের সংবিধান প্রণয়ন হয়ে গিয়েছিল। আর পাকিস্তানে প্রথম সংবিধান প্রণয়ন হয় স্বাধীনতা প্রাপ্তির ১৫ বছর পর। ’৬২তে। প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের জমানায়। ভারতে প্রথম সংসদীয় নির্বাচন হয় স্বাধীনতার ৫ বছর পর, ’৫২-য়। আর পাকিস্তানে প্রথম সাধারণ নির্বাচন হয় ’৭০ সালের ডিসেম্বের। স্বাধীন হওয়ার ২৩ বছর পর! ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের ১৮ বছর পর! তার আগে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানে গঠিত হয়েছিল প্রথম সাংবিধানিক গণপরিষদ। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, সেই গণপরিষদ চলতো ব্রিটিশদের বানানো ১৯৩৫ সালের ‘ভারত শাসন আইন’ মোতাবেক!

কেন পাকিস্তানে গণতন্ত্রের ভিত স্বাধীনতার ৭০ বছর পরেও মজবুত হয়নি, তার কারণ লুকিয়ে রয়েছে প্রতিবেশী দেশের জন্মের উপর্যুপরি পরের ঘটনাবলীতেই।

সব্যসাচীবাবু বলছেন, ‘‘পাকিস্তানের জনক মহম্মদ আলি জিন্না হঠাৎ মারা গেলেন। তার পর আচমকা খুন হলেন প্রথম পাক প্রধানমন্ত্রী লিয়াকৎ আলি খান। ওই দু’টি ঘটনাই পাকিস্তানের কপাল পুড়িয়ে দিল। অঙ্কুরেই বিনষ্ট হল গণতন্ত্রের বীজ রোপণের সম্ভাবনা। সেই সময় জিন্নার দল পাকিস্তান মুসলিম লিগ (পিএমএল)-এর সামনের সারির প্রধান দুই নেতা ছিলেন খোজা নিজামুদ্দিন ও মৌলানা ভাসানি। তাঁদেরই মুখ হয়ে ওঠা উচিত ছিল পাক রাজনীতির। করা হল না, তাঁরা বাঙালি বলে। বাঙালিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, অথচ ২ শতাংশেরও কম মানুষ যে ভাষায় কথা বলেন, সেই উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা হল। বাংলার জন্য শুরু হল ভাষা আন্দোলন। সেনাবাহিনী দিয়ে সেই আন্দোলনকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা হল। সেই শুরু।’’


পাক-আফগান সীমান্তে ঘাঁটি গাড়া সন্ত্রাসবাদীরা

সেনাবাহিনী প্রধান প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠল পাকিস্তানে। নির্বাচন নেই, নির্বাচিত পার্লামেন্ট নেই। সেনাবাহিনীর হাতে রয়েছে অস্ত্র। তাই সেনাই হয়ে উঠল রাজনৈতিক ক্ষমতার চালিকাশক্তি। নিয়ন্ত্রকও। স্বাধীনতার ১১ বছরের মধ্যেই ’৫৮-য় প্রথম সামরিক শাসন জারি হল পাকিস্তানে, জেনারেল আয়ুব খানের হাত ধরে। ভারতের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ যুদ্ধ’ আবহ জিইয়ে রেখে মোটামুটি তেমন বিরোধীতার মুখে না পড়েই ’৬৯ সাল পর্যন্ত ভালয় ভালয় চালিয়ে গেলেন প্রেসিডেন্ট আয়ুব খান। তাঁর মন্ত্রিসভায় ছিলেন জুলফিকার আলি ভুট্টোও। ওই সময় সাবেক সোভিয়েতের দিকে ঝুঁকে পড়েছে ভারত। ভারতে গণতন্ত্র কায়েম হয়ে গিয়েছে। নিয়মিত নির্বাচন হয়। সোভিয়েত আর তার বন্ধু ভারতকে ‘সমঝে রাখতে’ পাকিস্তানকে বন্ধু বানানোর খুব দরকার হয়ে পড়ল আমেরিকার। সেই মুলুকে সেনা শাসন আছে। অস্থিরতা আছে। আমেরিকা বুঝতে পারল, পাকিস্তানই অস্ত্র বেচার ভাল বাজার। এর পর আয়ুব খানই ক্ষমতায় বসিয়ে গেলেন তাঁর ‘ভক্ত’ জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে। ’৭১-এ আলাদা হয়ে গেল বাঙালি প্রধান পূর্ব পাকিস্তান। জন্ম হল স্বাধীন বাংলাদেশের। আর তার পরেই ‘বাই বাই ইয়াহিয়া’র হাওয়া বইতে শুরু করল। পশ্চিম পাকিস্তানে নিজের দল পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) ভিত মজবুত করে ফেললেন জুলফিকার আলি ভুট্টো। ’৭২-এ ‘গায়ের জোরে’ প্রধানমন্ত্রী হলেন জুলফিকার। মেয়াদ শেষও করেছিলেন, ‘গায়ের জোরে’ই। কারণ ওই সময় পাক পার্লামেন্ট ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল বাংলাভাষীর দল আওয়ামি লিগেরই। ’৭৩-এ নতুন করে সংবিধানও বানিয়েছিলেন ভুট্টো। রিগিং করে ’৭৭-এর ভোটে জিতে পের প্রধানমন্ত্রী হলেন বটে ভুট্টো, কিন্তু থাকতে পারলেন না বেশি দিন। ওই বছরই তাঁকে গদিচ্যুত করে জেলে পাঠালেন জেনারেল জিয়াউল হক। ক্ষমতা থাকল সেনার হাতেই।

’৭৯-তেই ফাঁসি হল ভুট্টোর। আর তাঁর কন্যা বেনজির ভুট্টোর হাত ধরে পাকিস্তানে প্রথম শুরু হল সেনা-বিরোধী আন্দোলন। ’৭৯-র ২৭ ডিসেম্বর আফগানিস্তানে ঢুকল সোভিয়েত সেনা। আমেরিকা আরও বেশি করে পাশে এসে দাঁড়ালো জেলারেল জিয়াউল হকের। কিন্তু আফগানিস্তানে সোভিয়েত মদতে টিঁকে থাকা সরকারকে নাজেহাল করতে ‘মুজাহিদিন’রা তৈরি হল জেনারেল জিয়াউল হকের জমানায়। মার্কিন মদতে। মোল্লাতন্ত্রের দিকে ঝুঁকতে শুরু করলেন জেনারেল জিয়াউল হক। আমেরিকা, আর্মির সঙ্গে ‘আল্লা’ (মোল্লাতন্ত্র)-র মেলবন্ধনের সেই সূত্রপাত! তাঁর আমলেই চালু হল শরিয়ত আইন। ’৮৫-তে ভোট হল। অনুগত মহম্মদ খান জুনেজোকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে প্রেসিডেন্ট হয়ে গেলেন জেনারেল জিয়াউল হক। থাকতে পারলেন না। বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু হল। ফের ভোট ’৮৮-তে। প্রধানমন্ত্রী হলেন ভুট্টো-কন্যা, পিপিপি নেত্রী বেনজির ভুট্টো। কিন্তু স্বামী আসিফ আলি জারদারির দুর্নীতির অভিযোগের তিরে বিদ্ধ বেনজির সরকার টিঁকল না বেশি দিন। ’৯০-এ অন্তর্বর্তী ভোটে ক্ষমতায় এলেন পিএমএল নেতা নওয়াজ শরিফ। ’৯৩ সালে তাঁকেও চলে যেতে হল দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে। ’৯৩-এই ফের ভোট। ফিরলেন বেনজির। আবার চলে যেতে হল তাঁকে, ’৯৬-এ। ফের এলেন শরিফ। ’৯৯-এ তাঁকে গদিচ্যুত করে ক্ষমতাসীন হলেন জেনারেল পারভেজ মুশারফ। ফের লাগাম গেল সেনাবাহিনীর হাতে। ২০০৭ পর্যন্ত। ২০০৮-এ ক্ষমতায় এলেন বেনজিরের স্বামী আসিফ আলি জারদারি, স্ত্রীর খুন হওয়ার জেরে সহানুভূতির জোয়ারে। থাকতে পারলেন না, ২০১০-এ ফের শরিফ। টিঁকতে পারলেন না। তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হল সৌদি আরবে। ২০১৩-য় ভোটে জিতে ফের ক্ষমতাসীন হন শরিফ।

সম্পর্কিত সংবাদ
ডেস্ক রিপোর্ট