আজ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস

আজ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস

‘মা-গো আর কেঁদো না আর কেঁদো না, তোমার বীর শহীদ সন্তানের জন্য…।’-এই গানের কলিটির মতো ৩০ লাখ বীর শহীদের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। আজ আমরা কেউ কাঁদবো না-গর্বভরে পালন করব সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন মহান স্বাধীনতা।

নিত্যদিনের মতো আজও ভোরের সূর্যালোকের বর্ণচ্ছটায় রাঙাবে কৃষ্ণচূড়া, গ্রামীণ পথের শেষে নদীর তীরে অশ্বত্থ শাখা থেকে ভেসে আসবে কোকিলের কুহুতান, শ্যামল প্রান্তরের দূর-দূরান্ত থেকে আজ বাজবে রাখালিয়ার মনকাড়া বাঁশির সুর, নীল আকাশের বুকে ডানা মেলবে উড়ন্ত বলাকার ঝাঁক, কলকাকলিতে মুখরিত হবে জনপদ। তবুও অন্য যে কোন দিনের চেয়ে আজকের দিনটি সম্পূর্ণ আলাদা। ভিন্ন আমেজের, ভিন্ন অনুভূতি ও ভিন্ন স্বাদের আমাদের এই প্রিয় স্বাধীনতা দিবস। জাতীয় জীবনের সবচেয়ে আলোচিত, সবচেয়ে গৌরবের স্মৃতি নিয়ে আবারও ফিরে এসেছে চির অম্লান, আনন্দ-বেদনায় মিশ্রিত দিবসটি।

সত্যিই এসেছে মহার্ঘ্য স্বাধীনতা। কিন্তু বাঙালী জাতিকে এ জন্য দিতে হয়েছে চরম মূল্য। আজ ২৬ মার্চ। রক্ত, অশ্রুস্নাত বিক্ষুব্ধ বিদ্রোহের দিন। বাঙালীর শৃৃঙ্খলমুক্তির দিন। মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। বাঙালীর দীর্ঘ স্বাধিকার আন্দোলনের চূড়ান্ত লড়াইয়ের সূচনা কাল। বিশ্বের বুকে লাল-সবুজের পতাকা ওড়ানোর দিন আজ।

হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙ্গে ১৯৭১ সালের এই দিনে বিশ্বের বুকে স্বাধীন অস্তিত্ব ঘোষণা করেছিল বীর বাঙালী। দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র দেশ হিসেবে স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল এ ব-দ্বীপের মানুষ। ইতিহাসের পৃষ্ঠা রক্তে রাঙিয়ে, আত্মত্যাগের অতুলনীয় দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে একাত্তরের এই দিনে যে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এ দেশের মানুষ, দীর্ঘ ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন তার চূড়ান্ত পরিণতি। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের সূচনার সেই গৌরব ও অহঙ্কারের দিন আজ। প্রতিবছর মহান স্বাধীনতা দিবস জাতির জীবনের প্রেরণায় উজ্জীবিত হওয়ার নতুন বার্তা নিয়ে আসে।

ভয়াল ‘কালরাত্রি’র পোড়া কাঠ, লাশ আর জননীর কান্না নিয়ে রক্তে রাঙা নতুন সূর্য উঠেছিল ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ। ভয়াল কালরাতের ধ্বংসস্তূপ আর লাশের ভেতরে দিয়ে রক্ত রাঙা সেই নতুন সূর্য। ভীতবিহ্বল মানুষ দেখল লাশপোড়া ভোর। সারি সারি স্বজনের মৃতদেহ। আকাশে কুন্ডলী পাঁকিয়ে উঠছে ধোঁয়া। পুড়ছে স্বাধীন বাংলার মানচিত্র আঁকা লালসবুজ পতাকা। জ্বলছে শাড়ি, খুকুর ফ্রক। চোখে জল। বুকে আগুন। জ্বলে উঠল মুক্তিকামী মানুষের চোখ, গড়ল প্রতিরোধ। মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে ‘জয় বাংলা’ তীব্র স্লোগান তুলে ট্যাংকের সামনে এগিয়ে দিল সাহসী বুক।

একাত্তরের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানী হিংস্র শ্বাপদের গণহত্যার বিরুদ্ধে বাঙালী জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। শত্রুসেনাদের বিতাড়িত করতে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করার বঙ্গবন্ধুর ডাকে জীবনপণ সশন্ত্র লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে বীর বাঙালী। দীর্ঘ ন’মাস এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ছিনিয়ে আনে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠতম অর্জন- মহান স্বাধীনতা।

আজ ভোরের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই বাঙালী জাতির জীবনে সূচনা ঘটবে আরও একটি ঝলমল উৎসবের দিনের। রক্ত, অশ্রুস্নাত বিক্ষুব্ধ বিদ্রোহের দিন ২৬ মার্চ। এ ভূ-ভাগের সবচেয়ে বড় অর্জন, বাঙালীর সহস্র বছরের জীবন কাঁপানো ইতিহাস- মহান স্বাধীনতা। অসংখ্য শহীদের রক্তে ভেজা, জাতির বীরসেনানীদের রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধের সূচনা দিন। বাঙালীর স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিন। গৌরব ও স্বজন হারানোর বেদনার এই দিনে বীর বাঙালী সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা করেছিল। তাই আজ গৌরব ও অহঙ্কারের দিন।

স্বাধীনতার ৪৭ বছর পূর্তিতে এবার সত্যিই এক ভিন্ন আবহে, প্রেক্ষাপটে জাতির সামনে এসেছে স্বাধীনতা দিবস। বাঙালী জাতির দীর্ঘ চার দশকের দাবি পূরণ হয়েছে, বড় বড় কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীদের ঝুঁলতে হয়েছে ফাঁসির রজ্জুতে। জেলখানায় মৃত্যুর প্রহর গুনছে মানুষরূপী কয়েকজন নরপশু, যাদের ফাঁসির দন্ড কার্যকরের দৃশ্য দেখার অপেক্ষায় রয়েছে দেশবাসী। যে একটি মাত্র বজ্রকঠিন ভাষণে নিরস্ত্র বাঙালী জাতিকে সশস্ত্র জাতিতে পরিণত করে যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। একইসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে ১৭ মার্চ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে উত্তরণের জাতিসংঘের স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশ। আর তাই দেশবাসী এক ভিন্ন মেজাজে এবার স্বাধীনতা দিবস পালন করবে।

মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ সরকারের নেতৃত্বে দেশ যখন সবদিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে, সব সূচকে পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে দেশটি যখন বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেশকে উন্নয়ন ও অগ্রগতির মহাসড়ক দিয়ে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিরা দেশকে অস্থিতিশীল করতে নানা ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। দেশের এত উন্নয়ন ও অগ্রগতি কোনভাবেই সহ্য করতে পারছে না পরাজিত শত্রুরা। তাই উন্নয়নের চাকাকে স্তব্ধ করে দিতে পরাজিত শত্রুদের গোপন ষড়যন্ত্রেরও কমতি নেই।

স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিরা বুঝতে পেরেছে তাদের অস্তিত্বই এখন সঙ্কটের মুখে। বর্তমান সরকার যেভাবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, যেভাবে শক্তহাতে জঙ্গী-সন্ত্রাস দমন করে যাচ্ছে, এভাবে চললে বাংলাদেশে অপশক্তিদের মূল শেকড় উৎপাটনে আর বেশি দিন লাগবে না। এ কারণেই তারা শেষ কামড় দিতে চাইছে। আর এই কামড় দেয়ার অস্ত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে সন্ত্রাস, জঙ্গীবাদ ও আত্মঘাতী হামলা। শান্ত দেশকে অশান্ত করতে দেশের নানাস্থানেই তারা নানা অঘটন ঘটানোর চেষ্টা করছে। রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ একটি গোষ্ঠী প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে এই অন্ধকারের শক্তিকে মদদ দিয়ে যাচ্ছে। অস্ত্র-অর্থ দিয়ে জঙ্গীবাদকে উস্কে দিচ্ছে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিদের দোসর কয়েকটি রাষ্ট্র।

এ অবস্থায় বসে নেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কোটি কোটি মানুষ। তারাও রাজপথে নেমে এসেছে যে কোন মূল্যে জঙ্গী-সন্ত্রাসীদের মোকাবেলা করে দেশের অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখতে। তাই বাঙালী জাতি নতুন উদ্দীপনায়, মুক্তিযুদ্ধের প্রখর চেতনায় প্রগতিবিরোধী শক্তি জঙ্গীবাদ, মৌলবাদ ও যুদ্ধাপরাধীদের প্রতিহত ও বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকারে প্রাণিত। চারদিকে পরাজিত শত্রুদের দোসরদের পুনর্বার পরাজিত করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রত্যয়ে সোচ্চার দেশের মানুষ। সব যুদ্ধাপরাধীকে ফাঁসির দড়িতে ঝুঁলিয়ে জাতি জানিয়ে দেবে- যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ কখনও তামাদি হয় না।

ফ্লাশব্যাক একাত্তর- কোন হুইসেল বা সৈনিকের ঘোষণায় নয়, এই মহার্ঘ্য স্বাধীনতা অর্জন করতে বাঙালী জাতিকে করতে হয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম, দিতে হয়েছে একসাগর রক্ত। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ধাপে ধাপে পুরো বাঙালী জাতিকে স্বাধীনতার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ করেন। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের অব্যবহিত পরেই ভাষার প্রশ্নে একাত্ম হয় বাঙালী। ১৯৪৮, ’৫২ পেরিয়ে ’৫৪, ’৬২, ’৬৬-এর পথ বেয়ে আসে ১৯৬৯। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে কেঁপে ওঠে জেনারেল আইয়ুবের শাসন। জনতার সাগরে উন্মাতাল স্রোতধারা। ‘জাগো জাগো বাঙালি জাগো’, ‘তোমার আমার ঠিকানা-পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ সেøাগানে সেøাগানে প্রকম্পিত হয় গ্রাম-শহর, জনপদ।

শত ষড়যন্ত্র ও সামরিক জান্তার রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে সত্তরের জাতীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পায় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। কিন্তু বাঙালীর হাতে শাসনভার দেয়ার বদলে শুরু হয় ষড়যন্ত্র। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও পাকিস্তান পিপলস পার্টির জুলফিকার আলী ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার নামে করতে থাকেন কালক্ষেপণ। প্রস্তুত হয় হিংস্র কায়দায় বাঙালী হত্যাযজ্ঞে। তবে ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণেই পাওয়া যায় দিক-নির্দেশনা। আক্ষরিক অর্থেই তখন পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসন চলছিল বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে। সেই প্রবল প্রদীপ্ত আন্দোলনের জোয়ারে ধীরে ধীরে বাঙালীর হৃদয়ে আঁকা হয় একটি লাল-সবুজ পতাকা, একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের ছবি।

কিন্তু বাঙালীর আবেগ, সংগ্রাম ও মুক্তির আকাক্সক্ষাকে নির্মূল করতে অস্ত্র হাতে নামে হানাদার পাকিস্তানী বাহিনী। শোষিত ও নির্যাতিন মানুষের স্বাধীনতার আকাক্সক্ষাকে রক্তের বন্যায় ডুবিয়ে দিতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে শুরু করে নিষ্ঠুর গণহত্যা। সেই কালরাত থেকেই শুরু হয় মৃত্যু, ধ্বংস, আগুন আর আর্তনাদের পৈশাচিক বর্বরতা। কিন্তু ওই ঘোরতর অমানিশা ভেদ করেই দেশের আকাশে উদিত হয় স্বাধীনতার চিরভাস্বর সূর্য।

২৬ মার্চের সূচনালগ্নে গ্রেফতার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ওয়্যারলেসের মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণা করে বলেন, ‘এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী অতর্কিতে পিলখানার ইপিআর ঘাঁটি, রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রমণ করেছে এবং শহরের লোকদের হত্যা করছে। ঢাকা, চট্টগ্রামের রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ চলছে। আমি বিশ্বের জাতিগুলোর কাছে সাহায্যের আবেদন করছি। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা বীরত্বের সঙ্গে মাতৃভূমি মুক্ত করার জন্য শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। সর্বশক্তিমান আল্লাহর নামে আপনাদের কাছে আমার আবেদন ও আদেশ- দেশকে স্বাধীন করার জন্য শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যান। আপনাদের পাশে এসে যুদ্ধ করার জন্য পুলিশ, ইপিআর, বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও আনসারদের সাহায্য চান। কোন আপোষ নাই, জয় আমাদের হবেই। আমাদের পবিত্র মাতৃভূমি থেকে শেষ শত্রুকে বিতাড়িত করুন। সব আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী এবং অন্য দেশপ্রেমিক ও স্বাধীনতাপ্রিয় লোকদের এ সংবাদ পৌঁছে দিন। আল্লাহ আমাদের মঙ্গল করুন। জয় বাংলা।’

বঙ্গবন্ধুর এই স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার হওয়ার পর পাকিস্তানী হানাদারবাহিনীর বর্বর ও নির্বিচারে গণহত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও সর্বব্যাপী পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে বাঙালী জাতি তাদের সর্বশক্তি নিয়ে ইষ্পাতকঠিন প্রত্যয় নিয়ে সশস্ত্র লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সারাদেশে শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ। দেশের অকুতোভয় সূর্যসন্তানরা তুমুল যুদ্ধ করে লাখো প্রাণের বিনিময়ে ছিনিয়ে আনে স্বাধীনতা। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর হানাদার বাহিনী মাথানত করে পরাজয় স্বীকার করে আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। বিশ্বের মানচিত্রে স্থান পায় এক সাগর রক্তের বিনিময়ে একটি স্বাধীন দেশ, স্বাধীন পতাকা- যার নাম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ।

যাঁদের রক্ত ও সম্ভ্রমের মূল্যে আমরা পেয়েছি মহামূল্যবান এই স্বাধীনতা, তাঁদের কাছে মহামূল্য ঋণ গভীর কৃতজ্ঞতা, ভালবাসা ও বিনম্র শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবার দিন আজ। মহান স্বাধীনতা দিবসে জাতি আজ উৎসবের পাশাপাশি গভীর শ্রদ্ধা, ভালবাসা আর বেদনায় স্মরণ করবে মহান মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহীদকে। স্মরণ করবে স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী তাঁর সহকর্মী জাতীয় নেতাদের। জাতি শ্রদ্ধা জানাবে বীরাঙ্গনা আর শহীদমাতাদের। দৃপ্ত শপথ নেবে- জঙ্গী-সন্ত্রাস ও যুদ্ধাপরাধীমুক্ত সোনার বাংলা বিনির্মাণে। স্বাধীনতা বিরোধী শত্রুদের সকল ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এবং বঙ্গবন্ধু স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার।

সরকারী-বেসরকারী পর্যায়ে নানা অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্য দিয়ে মহান এ দিবসটি পালন করা হবে। সব ভবনে ও শহরের প্রধান সড়কগুলোতে উড়বে রক্তস্নাত জাতীয় পতাকা। সকালে ফুলে ফুলে ভরে উঠবে জাতীয় স্মৃতিসৌধ। মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে দলমতনির্বিশেষে সেখানে হাজির হবে লাখো মানুষ। ভোরে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পুষ্পস্তবক অর্পণের পরই সাধারণের জন্য স্মৃতিসৌধ উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আজ সরকারী ছুটির দিন। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধী দলের নেতা বেগম রওশন এরশাদ পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন। এছাড়া দিবসটি উপলক্ষে রেডিও, টেলিভিশন, ইলেকট্টনিক্স মিডিয়া ও সংবাদপত্রে বিশেষ নিবন্ধ ও অনুষ্ঠানমালা প্রচার করা হচ্ছে। পথে পথে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সকল বাঙালীর কণ্ঠে উচ্চারিত হবে- ‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী ভয় নাই ওরে, ভয় নাই। নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই…’।

কর্মসূচি- দিবসটি উপলক্ষে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শোভাযাত্রা, স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচী, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন কর্মসূচী নেয়া হয়েছে। সকল সরকারী-আধাসরকারী, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারী ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনাসমূহ আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হবে। দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে সংবাদপত্রসমূহে বিশেষ নিবন্ধ ও ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হবে, সরকারী ও বেসরকারী বেতার ও টিভি চ্যানেলে প্রচারিত হবে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা।

সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দর এলাকায় ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসের সূচনা হবে। সূর্যোদয়ের সময় সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এরপর সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সুসজ্জিত একটি দল গার্ড অব অনার প্রদান করবেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীর নেতৃত্বে বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধা, বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশী কূটনীতিকগণ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সাধারণ জনগণ জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবে। সকালে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে জাতীয় শিশু-কিশোর সমাবেশ ও কুচকাওয়াজে সালাম গ্রহণ করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বঙ্গভবনে দেশের বিশিষ্টজনদের সংবর্ধনা দেবেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ।

সকালে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে শিশু-কিশোর সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। এবারই প্রথম স্বাধীনতা দিবসের দিন সকাল ৮টায় বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে জাতীয় শিশু কিশোর সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে সারাদেশে ও বিদেশে একযোগে একই সময়ে শুদ্ধসুরে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশিত হবে।

এ উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, শিশু একাডেমিসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। জাতির শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে মসজিদ, মন্দির, গীর্জা, প্যাগোডা ও অন্যান্য উপসনালয়ে বিশেষ মোনাজাত ও প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশ ডাক বিভাগ স্মারক ডাক টিকেট প্রকাশ করবে। হাসপাতাল, জেলখানা, এতিমখানা, বৃদ্ধাশ্রমসহ এ ধরনের বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠানে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হবে। দিবসটি উপলক্ষে রাজধানীর সড়ক ও সড়কদ্বীপ জাতীয় পতাকাসহ নানা রঙের পতাকা দিয়ে সাজানো হয়েছে। দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসেও স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করেছে।

আওয়ামী লীগের দু’দিনব্যাপী কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে- ভোরে বঙ্গবন্ধু ভবন ও দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন, বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি দলের টুঙ্গিপাড়ায় জাতির জনকের মাজারে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন এবং সোমবার কৃষিবিদ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আলোচনা সভা।

এতে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সভাপতিত্ব করবেন। এছাড়া বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, গণফোরাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ, জাতীয় শ্রমিক লীগ, যুব মহিলা লীগ, ছাত্রলীগ, জয়বাংলা সাংস্কৃতিক ঐক্যজোট, ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, ঢাকা প্রেসক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নসহ অজস্র সংগঠন আজ দিনব্যাপী কর্মসূচী

সম্পর্কিত সংবাদ
ডেস্ক রিপোর্ট