আজ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়

আজ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে ১৪ বছর আগে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ, বর্বরোচিত এবং নৃশংস সেই গ্রেনেড হামলা মামলার রায় হতে যাচ্ছে আজ বুধবার।

দীর্ঘ ১৪ বছর পর দুটি মামলার (হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য) বিচার কাজ শেষে ১৮ সেপ্টেম্বর পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডে কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে স্থাপিত এক নম্বর দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন এ দিন নির্ধারণ করেছেন। রায়কে ঘিরে আদালত থেকে শুরু করে এর আশপাশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। ভয়াবহ এই গ্রেনেড হামলার বিচারের জন্য দেশবাসীর প্রতীক্ষার অবসান হবে এই রায় ঘোষণার মাধ্যমে। ওই ঘৃণ্য হামলার পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেলেও মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও সাবেক রাষ্ট্রপতি মোঃ জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নেতাকর্মী নিহত হন। আহত হন ৫ শতাধিক। এ মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, বিএনপি নেতা সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা হারিছ চৌধুরী, এনএসআইর সাবেক মহাপরিচালক রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরীসহ ৪৯ জন আসামি রয়েছে। মোট ৫২ জনের মধ্যে ৩ আসামির জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, জঙ্গী নেতা মুফতি হান্নান ও তার সহযোগী শরীফ সাহেদুল আলম বিপুল অন্য মামলায় মৃত্যুদ- কার্যকর হওয়ায় তাদের মামলা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। তারেক রহমানসহ এখনও ১৮ জন আসামি পলাতক রয়েছেন। একই সঙ্গে জামিনে থাকা সাবেক ৩ আইজিপিসহ ৮ জনের জামিন বাতিল করে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

গ্রেনেড হামলা মামলার চীফ প্রসিকিউটর সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেছেন, সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সন্দেহের উর্ধে থেকে আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে পেরেছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার জন্য ২১ আগস্ট হামলা ইতিহাসের সবচাইতে নৃশংস, জঘন্যতম ও বর্বরোচিত হামলা। নিরস্ত্র মানুষের ওপর আর্জেস গ্রেনেডের মতো সমরাস্ত্র ব্যবহার এ উপমহাদেশে আর নেই। তারা এ হামলার সাফল্যের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল। ‘আমাদের প্রত্যাশা আইনানুযায়ী আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদ- হবে। আমরা ন্যায় বিচারের প্রত্যাশী। রায় কি হবে বিচারক বলতে পারেন। আমরা ধৈর্য ধরেছি, ন্যায় বিচার প্রত্যাশা করছি। আমরা আশা করছি ন্যায় বিচার পাব। রাষ্ট্রপক্ষের আরেক আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, আজ বুধবার রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য রয়েছে। আমরা প্রত্যাশা করি ওই দিনই এ মামলার বিচারের প্রতীক্ষার অবসান হবে। ক্ষমতার ছত্রছায়ায় হাওয়া ভবনে জননেত্রী শেখ হাসিনার ওপর হামলার ষড়যন্ত্র হয়। চালান হয় নারকীয় হামলা। এমন নারকীয় ঘটনা বিশ্বের কোথাও ঘটেনি। ক্ষমতায় থেকে বিরোধীদলীয় নেতাকে হত্যার পরিকল্পনা কেউ ভাবতেও পারে না। অপরদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাদের মক্কেলগণ খালাস পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন।

গ্রেনেড হামলা মামলা দুটিতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ৩৮ আসামির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ দ-বিধির ১২০-এর বি, ৩২৪, ৩২৬, ৩০৭, ৩০২, ১০৯ ও ৩৪ এবং বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের ৩, ৪ ও ৬ ধারায় চার্জগঠন হয়। অন্যদিকে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের ৩ ধারায় বিস্ফোরক দ্রব্য দিয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে প্রাণহানির অভিযোগে এবং ৬ ধারায় অর্থ, পরামর্শ ও বিস্ফোরক দিয়ে সহায়তার অভিযোগে একই দ-ের বিধান রয়েছে।

প্রথম যুক্তিতর্ক শুরু- ২০১৭ সালের ২৩ অক্টোবর এ মামলায় যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু হয়। প্রথমে রাষ্ট্রপক্ষ এরপর আসামিপক্ষ যুক্তিতর্ক করে। ১১৯ কার্যদিবসে উভয়পক্ষ যুক্তিতর্ক করেছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষ ৩০ কার্যদিবস আর আসামিপক্ষ ৯০ কার্যদিবস যুক্তিতর্ক করে। সবশেষে উভয়পক্ষ জবাব ও পাল্টা জবাব দেয়। এর আগে রাষ্ট্রপক্ষে ২২৫ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় শুরু থেকেই নানা চেষ্টা করা হয়েছিল নৃশংস ওই হত্যাযজ্ঞের তদন্ত ভিন্ন খাতে নিতে। সাজানো হয়েছিল জজ মিয়া নাটক। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এলে নতুন করে শুরু করা হয় তদন্ত। তাতে বেরিয়ে আসে অনেক অজানা তথ্য। ২০০৮ সালের জুনে বিএনপি-জামায়াত জোট আমলের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, তার ভাই তাইজউদ্দিন, হুজি-বি নেতা মুফতি হান্নানসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে চার্জশীট (অভিযোগপত্র) দেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তদন্তে বেরিয়ে আসে, তখনকার বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ওই হামলা চালানো হয়েছিল। হামলায় ব্যবহৃত আর্জেস গ্রেনেড এসেছিল পাকিস্তান থেকে।

মোট আসামি ৪৯ জন- গ্রেনেড হামলা মামলা দুটিতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানসহ মোট আসামির সংখ্যা ৪৯। এর মধ্যে ৩১ জন আসামি কারাগারে আটক রয়েছেন। অন্যদিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানসহ ১৮ জন এখনও পলাতক রয়েছেন। জামিনে থাকা ৮ আসামিকে জামিন বাতিল করে ১৮ সেপ্টেম্বর তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়। এরা হলেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার ভাগ্নে লেফটেন্যান্ট কমান্ডার (অব) সাইফুল ইসলাম ডিউক, সাবেক আইজিপি মোঃ আশরাফুল হুদা, শহিদুল হক ও খোদা বক্স চৌধুরী এবং মামলাটির তিন তদন্ত কর্মকর্তা সাবেক বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, সিআইডির সিনিয়র এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান, এএসপি আব্দুর রশীদ ও সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার আরিকুল ইসলাম। আর আগে থেকেই ২৩ জন আসামি কারাগারে আটক রয়েছেন। তারা হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু, মুফতি হান্নানের ভাই মুহিবুল্লাহ মফিজুর রহমান ওরফে অভি, মাওলানা আবু সাইদ ওরফে ডাক্তার জাফর, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, শাহাদত উল্যাহ ওরফে জুয়েল, হোসাইন আহমেদ তামিম, মইনুদ্দিন শেখ ওরফে আবু জান্দাল, আরিফ হাসান সুমন, মোঃ রফিকুল ইসলাম সবুজ, মোঃ উজ্জল ওরফে রতন, হরকাতুল জিহাদ নেতা আব্দুল মালেক ওরফে গোলাম মোহাম্মাদ ওরফে জিএম, শেখ আব্দুস সালাম, কাশ্মিরী নাগরিক আব্দুল মাজেদ ভাট, আব্দুল হান্নান ওরফে সাব্বির, মাওলানা আব্দুর রউফ ওরফে পীর সাহেব, মাওলানা শাওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআইর সাবেক মহাপরিচালক আবদুর রহিম ও রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী

যারা পলাতক- শুরু থেকেই ১৮ আসামি পলাতক রয়েছেন। তারা হলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, বর্তমান বিএনপির এমপি কাজী শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন কায়কোবাদ, সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাইজউদ্দিন, মহিবুল মুত্তাকিন ওরফে মুত্তকিন, আনিসুল মুরছালিন ওরফে মুরছালিন, মোঃ খলিল, জাহাঙ্গীর আলম বদর, মোঃ ইকবাল, লিটন ওরফে মাওলানা লিটন, পুলিশের সাবেক ডিসি পূর্ব মোঃ ওবায়দুর রহমান, সাবেক ডিসি দক্ষিণ খান সাইদ হাসান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ারদার, মেজর (অব.) এটিএম আমিন, হানিফ এন্টারপ্রাইজের মালিক মোঃ হানিফ, শফিকুর রহমান, আব্দুল হাই ও বাবু ওরফে বাতুল বাবু।

অন্য মামলায় ফাঁসির কারণে তিনজনকে অব্যাহতি- অন্য মামলায় তিন আসামিকে মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়েছে। ফলে তাদের এ মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। তারা হলেন, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মোজাহিদ (মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদ- কার্যকর) মুফতি আব্দুল হান্নান মুন্সী (ব্রিটিশ হাইকমিশনারের ওপর গ্রেনেড হামলায় মৃত্যুদ- কার্যকর), শরীফ শাহেদুল আলম বিপুল।

কি ঘটেছিল সে দিন?

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শনিবার এই ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। বিকেল ৫টা ২২ মিনিটে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলে বক্তৃতা শেষ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা তাঁর হাতে থাকা একটি কাগজ ভাঁজ করতে করতে এগুতে থাকলেন ট্রাক থেকে নামার সিঁড়ির কাছে। তখনই বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হতে লাগল একের পর এক গ্রেনেড। ১২-১৩টি গ্রেনেড হামলার বীভৎসতায় মুহূর্তেই রক্ত-মাংসের স্তূপে পরিণত হয় সমাবেশস্থল। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নির্মমভাবে নিহত হন। বিএনপি জামায়াত ঐক্যজোট আর্থিক ও প্রশাসনিক সহায়তায় যুদ্ধে ব্যাবহৃত আর্জেস গ্রেনেড নিক্ষেপ করে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার লক্ষ্যে এই অপরাধ সংঘটিত করেছিল বলে রাষ্ট্রপক্ষের চীফ প্রসিকিউটর সৈয়দ রেজাউর রহমান দাবি করেন। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনায় শুরু থেকেই হোতাদের আড়াল করতে তদন্তের গতি ভিন্নখাতে নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তদন্তের নামে বিভিন্ন সময় নানা ‘আষাঢ়ের গল্প’ হাজির করে প্রথম থেকে বিষয়টিকে বিতর্কিত করার কাজ শুরু হয় সিআইডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও একটি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে। প্রথমে এক ই-মেইলকে কেন্দ্র করে শৈবাল সাহা পার্থ নামের এক যুবককে ধরে এনে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। এরপর ঢাকার মগবাজার এলাকা থেকে সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মোখলেছুর রহমানকে গ্রেফতার করে শুরু হয় আরেক নাটক। পার্থ ও মোখলেছুর রহমানকে ধরেও হামলাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর দৃশ্যপটে হাজির করা হয় জজ মিয়া উপাখ্যান। অবশেষে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির পর পুরো পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার তদন্ত শুরু করলে থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়ে। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের উচ্চপর্যায়ের পরামর্শেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা, সিআইডি ও পুলিশের তখনকার উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ব্যাপারে অবহিত ছিল এবং অনেকেই প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িতও ছিলেন।

আসামিদের বিরুদ্ধে কি অভিযোগ- আদালত ৪৯ জন আসামির বিরুদ্ধে ভিন্ন ভিন্ন অভিযোগ এনেছেন। ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা অনুমোদনে যাদের মধ্যে অভিযোগ রয়েছে তারা হলেন, তারেক রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবর, আবদুস সালাম পিন্টু, হারিস চৌধুরী, কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, এনএসআইর সাবেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, এনএস আইয়ের সাবেক ডিজি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) আবদুর রহিম, হানিফ পরিবহনের মালিক মোহাম্মদ হানিফ, বিএনপি নেতা আরিফুল হক আরিফ।

গুরুতর জখম হত্যার চেষ্টা, হত্যা, উস্কানি দেয়ার অভিযোগ যাদের রয়েছে তারা হলেন, হুজির প্রতিষ্ঠাতা আবদুস সালাম, হুজি নেতা মাওলানা শেখ ফরিদ, মাওলানা আবদুর রউফ, মাওলানা আবদুল হান্নান সাব্বির, কাশ্মীরে অবস্থিত লস্কর-ই-তৈয়রা (এলইটি) নেতা আব্দুল মালেক ওরফে গোলাম মোহাম্মদ, পাকিস্তান ভিত্তিক এলইটি নেতা ইউসুফ ভাট ওরফে মজিদ ভাট, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আব্দুল হাই, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, বাবু ওরফে রতুল বাবু, মহিবুল্লাহ ওরফে মাফিজুর রহমান ওরফে ওভি, মাওলানা আবু সাঈদ ওরফে আবু জাফর, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, জাহাঙ্গীর আলম, মাওলানা আবু তাহের, শাহাদাতুল্লাহ জহল, হোসেন আহমেদ তামিম, মুফতি মঈনউদ্দিন শেখ ওরফে আবু জান্ডাল ওরফে মাসুম বিল্লাহ, আরিফ হাসান সুমন, রফিকুল ইসলাম সবুজ, উজ্জল ওরফে রতন, মাওলানা তাইজউদ্দিন, মাওলানা লিটন, আনিসুল মুরসালিন ও তার ভাই মাহিবুল মুত্তাকিন, মোঃ ইকবাল, মাওলানা আবু বকর ওরফে সেলিম হাওলাদার, জাহাঙ্গীর আলম বদর ও খলিলুর রহমান। আর্থিক ও প্রশাসনিক সহায়তা অভিযোগ রয়েছে যাদের তারা হলেন, সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা ও শহিদুল হককে হত্যার জন্য আর্থিক ও প্রশাসনিকভাবে হত্যাকারীদের সহায়তা করার অভিযোগ আনা হয়েছে। আলামত ধ্বংস করার অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে আনা হয় তারা হলেন ডিএমপি সাবেক ডিসি (পূর্ব) ওবায়দুর রহমান ও সাবেক ডিসি (দক্ষিণ) সাঈদ হাসান খান।

গ্রেনেড সরবরাহকারীকে পাকিস্তানে পালাতে সহায়তা করার অভিযোগ যাদের রয়েছে তারা হলেন খালেদা জিয়ার ভাগ্নে লেফটেন্যান্ট কমান্ডার (অব:) সাইফুল ইসলাম ডিইক, সাবেক ডিজি এফ আইয়ের কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (বহিষ্কৃত) সাইফুল ইসলাম জোয়াদ্দার এবং মেজর জেনারেল (অব) এটিএম আমিন। এদের বিরুদ্ধে গ্রেনেড সরবরাহ ও সরবরাহকারীকে পাকিস্তানে পালাতে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে। তথ্য বিকৃতি করা ও জজমিয়া নাটক করার অভিযোগ যাদের রয়েছে তারা হলেন সিআইডির সাবেক এসপি রুহুল আমিন, সিআইডি এ এসপি আতিকুর রহমান সাবেক আইজিপি খোদা বকস চৌধুরী ও আব্দুর রশিদ। এরা তথ্য বিকৃতি করে ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করে। পাশাপাশি জজ মিয়া নাটকের অবতারণা করে।

২২ আগস্ট মামলা দায়ের করা হয়- ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের জনসভায় সন্ত্রাসীরা ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালায়। হামলায় আওয়ামী লীগের তৎকালীন মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নির্মমভাবে নিহত হন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। এ ঘটনায় মতিঝিল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ফারুক হোসেন, আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল জলিল ও সাবের হোসেন চৌধুরী বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় পৃথক তিনটি এজাহার দায়ের করেন। মামলাটিতে ২০০৮ সালের ১১ জুন ২২ জনের বিরুদ্ধে আদালতে প্রথম চার্জশীট দাখিল করে সিআইডি। ওই বছরের ২৯ অক্টোবর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ (চার্জ) গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু করেন ট্রাইব্যুনাল। ২০০৯ সালের ৯ জুন পর্যন্ত ৬১ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়।

২০০৯ সালের ৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। ২০১১ সালের ৩ জুলাই অধিকতর তদন্ত শেষে তারেক রহমাসসহ আরও ৩০ জনের বিরুদ্ধে সম্পূরক চার্জশীট দাখিল করে সিআইডি। ফলে মোট আসামি দাঁড়ায় ৫২ জনে। ২০১২ সালের ১৮ মার্চ সম্পূরক চার্জশীটের ৩০ আসামির বিরুদ্ধ অভিযোগ গঠনের করার পর ফের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। সব মিলিয়ে মামলার রাষ্ট্রপক্ষের মোট ৫১১ জনের মধ্যে সাক্ষ্য দিয়েছেন ২২৫ জন সাক্ষী। গত ৩০ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আব্দুল কাহার আকন্দকে আসামিপক্ষের জেরার মধ্য দিয়ে এ সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। গত ১২ জুন থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত কারাগারে ও জামিনে থাকা ৩১ অসামির পরীক্ষা শেষে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আত্মপক্ষ সমর্থন করেন তারা। গত ১২ জুলাই থেকে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত ওই ৩১ আসামির পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেন ৩১ সাক্ষী।

রায়কে ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা: রায়কে ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মেট্রোপলিটন পুলিশ, রেঞ্জ পুলিশ, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব), গোয়েন্দা সংস্থা (ডিবি) ছাড়াও সাদা পোশাকের অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে সারা দেশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। তবে বিশেষ করে রাজধানীতে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, সুনির্দিষ্ট কোনো হুমকি না থাকলেও সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রায়কে ঘিরে নাজিম উদ্দিন রোডে সর্বোচ্চ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নাজিম উদ্দিন রোডের পুরনো কারাগারের পাশে অবস্থিত বিশেষ আদালত, আশেপাশের এলাকার সড়ক ও বিভিন্ন ভবন থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন।

পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব, গোয়েন্দা ও সাদা পোশাকের পুলিশও কাজ করবে। সকাল থেকেই নাজিম উদ্দিন সড়কে যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে। র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান মানবজমিনকে বলেছেন, রায়কে ঘিরে জনসাধারণের নিরাপত্তার জন্য সারা দেশে অসংখ্য র‌্যাব সদস্য কাজ করবেন। যাতে করে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয়। রায় ঘিরে কোনো ধরনের হুমকি আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনো ধরনের হুমকি নাই। তবে সারা দেশেই র‌্যাবের বিভিন্ন ব্যাটালিয়নকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য্য করার পর থেকেই গোয়েন্দারা কাজ শুরু করেছেন। রায়কে ঘিরে বিশৃঙ্খলার পরিকল্পনা করতে পারে এমন সন্দেহভাজনদের গতিবিধি নজরদারিতে রাখা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তাদের কার্যক্রম মনিটরিং করছে সাইবার ক্রাইম ইউনিট। তবে গোয়েন্দাদের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, গোয়েন্দা তথ্য এখন পর্যন্ত বিশৃঙ্খলা হতে পারে এমন কোনো আলামত পায়নি। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সবসময়ই সজাগ থাকে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার বিষয়টি মাথায় রাখতে হয়। এদিকে ২১শে গ্রেনেড হামলায় গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের গাজীপুরের হাই সিকিউরিটি ও কাশিমপুরের কারাগারে রাখা হয়েছে। রায়কে সামনে রেখে এসব কারাগারে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। কারা সূত্র জানিয়েছে, আজ তাদেরকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আদালতে হাজির করা হবে। ডিএমপি’র অতিরিক্ত কমিশনার কৃষ্ণ পদ রায় মানবজমিনকে বলেন, কোনো হুমকি নেই। তবে অন্যান্য সময়ের চেয়ে একটু বাড়তি নিরাপত্তা থাকবে। আমরা কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা হতে দেব না।

এদিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া গতকাল বলেছেন, ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার রায়কে ঘিরে কোনো ধরনের নৈরাজ্য বরদাশত করা হবে না। পুলিশের কঠোর নজরদারি রয়েছে। আমরা সতর্ক রয়েছি। প্রস্তুত আছি যাতে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল জনগণের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে না পারে বা কোনো রকম অপচেষ্টা চালাতে না পারে। তিনি বলেন, এটি আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রমের একটি অংশ। তবে এখন পর্যন্ত এ রায়কে ঘিরে কোনো নিরাপত্তা হুমকি নেই।

সম্পর্কিত সংবাদ
ডেস্ক রিপোর্ট