ইরাক, আফগানিস্তানের পরেই জঙ্গিদের টার্গেট ভারত, মার্কিন রিপোর্ট

ইরাক, আফগানিস্তানের পরেই জঙ্গিদের টার্গেট ভারত, মার্কিন রিপোর্ট

ইরাক ও আফগানিস্তানের পর ভারতই এখন বিশ্বে সন্ত্রাসবাদীদের সবচেয়ে বড় টার্গেট। গত বছর ভারতে সন্ত্রাসবাদী হামলার ঘটনা তার আগের বছরের চেয়ে অনেকটাই বেড়েছে। শুধু তাই নয়, ইসলামিক স্টেট (আইএস), তালিবান, বোকো হারামের মতো সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলি ভারতে আরও বড় ধরনের হামলার ছক কষছে। মার্কিন বিদেশ দফতরের তত্ত্বাবধানে হওয়া একটি সমীক্ষা-রিপোর্টে এই হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, সন্ত্রাসবাদীদের নাশকতামূলক কাজকর্ম ও হামলায় গত বছর ভারতে যত জনের মৃত্যু হয়েছে, তা পাকিস্তানের চেয়ে অনেকটাই বেশি। ২০১৫ সাল পর্যন্ত এ ব্যাপারে ইরাক ও আফগানিস্তানের পরেই তালিকায় নাম ছিল পাকিস্তানের। ২০১৬-য় পাকিস্তানকে টপকে গিয়েছে ভারত! বার বার সন্ত্রাসবাদী হামলার লক্ষ্য হয়ে।

রিপোর্টে কোনও রাখঢাক না রেখেই জানানো হয়েছে, ইসলামাবাদের আশ্রয় ও মদত পাওয়া বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদী সংগঠন ও জঙ্গিদের জন্যই পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদী হামলার ধকল এত দিন বেশি সইতে হয়েছে। এখনও হচ্ছে। আর ভারতকে সেই খেসারতটা দিতে হচ্ছে অন্য দেশে (পড়ুন, পাকিস্তান, ইরাক, আফগানিস্তানে) ঘাঁটি গাড়া বা অন্য দেশ থেকে মদত পাওয়া সন্ত্রাসবাদীদের হামলা, বিস্ফোরণ সহ বিভিন্ন নাশকতামূলক কাজকর্মের জন্য।

কাশ্মীরে সক্রিয় পাকিস্তানের মদতপুষ্ট হিজবুল মুজাহিদিন জঙ্গিরা। -ফাইল চিত্র।

সেই ছবিটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যখন মার্কিন রিপোর্টে দেওয়া পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, ২০১৫-র তুলনায় জম্মু-কাশ্মীরে গত বছর সন্ত্রাসবাদী হামলার ঘটনা বেড়েছে ৯৩ শতাংশ (যদিও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ২০১৬-’১৭-র রিপোর্ট বলছে সেই বৃদ্ধির হার ৫৪.৮১ শতাংশ)।

ওই রিপোর্টের পরিসংখ্যান, গত বছর বিশ্বে সন্ত্রাসবাদী হামলার ঘটনা ঘটেছে মোট ১১ হাজার ৭২টি। তার মধ্যে ৯২৭টি ঘটনা ঘটেছে ভারতে। যা ২০১৫-র চেয়ে অন্তত ১৬ শতাংশ বেশি। ২০১৫-য় ভারতে সন্ত্রাসবাদী হামলার ঘটনা ঘটেছে ৭৯৮টি। শুধু হামলাই নয়, সেই সব হামলার ঘটনায় ভারতে প্রাণহানির সংখ্যাও গত বছর বেড়েছে, তার আগের বছরের (২০১৫) তুলনায়। সন্ত্রাসবাদী হামলায় ভারতে ২০১৫ সালে প্রাণ হারিয়েছিলেন ২৮৯ জন। গত বছর তা ১৭ শতাংশ বেড়ে ৩৩৭ জন হয়েছে। ওই সব ঘটনায় জখমের সংখ্যাও ২০১৫ সাল (৫০০ জন) থেকে বেড়ে গত বছর হয়েছে ৬৩৬ জন।

মার্কিন বিদেশ দফতরের তত্ত্বাবধানে হওয়া ওই রিপোর্টেরই ইঙ্গিত, ইসলামাবাদের আশ্রয় ও মদত পাওয়া বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদী সংগঠন ও জঙ্গিরা অন্তর্বিরোধকে আপাতত চাপা রেখে বহির্শত্রুকে (ভারতের মতো প্রতিবেশী দেশগুলি) আক্রমণের লক্ষ্যে আগের চেয়ে আরও বেশি সংগঠিত হয়েছে। তাই ২০১৫ সালের তুলনায় গত বছর সন্ত্রাসবাদী হামলা ও নাশকতামূলক কাজকর্মের সংখ্যা পাকিস্তানে প্রায় ২৭ শতাংশ কমেছে। ২০১৫ সালে পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদী হামলা ও নাশকতামূলক কাজকর্মের ঘটনা ঘটেছিল ১ হাজার ১০টি। গত বছর তা কমে হয়েছে ৭৩৪টি।

ওই রিপোর্ট জানাচ্ছে, গত বছর ভারতে সন্ত্রাসবাদী হামলার যতগুলি ঘটনা ঘটেছে, তার অর্ধেকই ঘটেছে চারটি রাজ্য- জম্মু-কাশ্মীর (১৯%), ছত্তীসগঢ় (১৮%), মণিপুর (১২%) ও ঝাড়খণ্ডে (১০%)। আর সন্ত্রাসবাদী হামলায় মৃত্যুর ঘটনা সবচেয়ে বেশি বেড়েছে তুরস্কে (৯৫%) ও ইরাকে (৪০%)। তার পরেই রয়েছে ভারত (১৭%) ও সোমালিয়ার (১২%) নাম।


ভারতে মাওবাদীরা।-ফাইল চিত্র।

যেটা লক্ষ্যণীয়, সন্ত্রাসবাদী হামলা সংগঠনের ‘মূল কারিগর’ হিসেবে আইএস এবং তালিবানের পরেই নকশালপন্থীদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে ওই মার্কিন রিপোর্টে। নকশালপন্থীদের বোকা হারামের চেয়েও ‘ভয়ঙ্কর’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জানানো হয়েছে, ভারতে গত বছর নকশালপন্থীদের হামলার ৩৩৬টি ঘটনায় ১৭৪ জনের মৃত্যু হয়েচে, জখম হয়েছেন ১৪১ জন। ওই সব ঘটনা পূর্ব ভারতেই বেশি ঘটেছে। ভারতে গত বছর নকশালপন্থীদের হামলার সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটেছিল বিহারে। সিআরপিএফ জওয়ানদের ওপর ওই হামলায় মৃতের সংখ্যা ছিল ১৬। ২০১৬-য় ভারতে যত সন্ত্রাসবাদী ঘটনা ঘটেছে, তার দুই-তৃতীয়াংশের জন্যই নকশালপন্থীরা দায়ী বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

মার্কিন রিপোর্ট এও জানিয়েছে, সন্ত্রাসবাদ সংগঠনের ‘কারিগর’ গোষ্ঠীর সংখ্যাও ২০১৫-র তুলনায় গত বছর অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে। ২০১৫ সালে এমন গোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল ২৮৮। গত বছর তা বেড়ে ৩৩৪। ভারতেও এমন সক্রিয় গোষ্ঠীর সংখ্যা ২০১৫ সাল (ছিল ৪৫টি) থেকে বেড়ে গত বছর হয়েছে ৫২টি।

যদিও ওই মার্কিন রিপোর্টের দাবি, আফগানিস্তান, সিরিয়া, নাইজিরিয়া, পাকিস্তান ও ইয়েমেনে আগের চেয়ে সন্ত্রাসবাদী হামলার ঘটনার সংখ্যা কমায় ২০১৫ সালের (ঘটেছিল ১২ হাজার ১২১টি ঘটনা) তুলনায় বিশ্বে সন্ত্রাসবাদী হামলার ঘটনা কমেছে ৯ শতাংশ। নিহতের সংখ্যাও কমেছে ১৩ শতাংশ। (২০১৫ সালে নিহতের সংখ্যা ছিল ২৯ হাজার ৪২৪ জন আর ২০১৬-য় তা ছিল ২৫ হাজার ৬২১ জন)।

সম্পর্কিত সংবাদ
ডেস্ক রিপোর্ট