ঘটের জল

ঘটের জল

গাঁয়ের ছেলে সূর্য্য। ছোট বেলায় সূর্য্যের একটা অভ্যেস ছিল বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো। একদিন বনের মাঝে হাঁটতে গিয়ে এলোমেলো লতাপাতার ভিতর এক কিশোরীকে সাদা রঙের এক পোষা খরগোশের পিছু ছুটাছুটি করতে দেখলো। নাম তার মাধবী। বনের ধার ঘেসেই তার নিবাস। পোষা খরগোশটি একটু ছাড়া পেলেই লতা-পাতা খাওয়ার লোভে বনের মাঝে ঢুকে পড়ে। বন বিড়াল কিংবা শিয়ালের আক্রমন হতে রক্ষা করতেই ওর পিছু মাধবীর এই ছুটে আসা। শত চেষ্টা করেও মাধবী যখন খরগোশটিকে ধরতে পারছিলনা সূর্য্য তখন কাঁটা জাতীয় লতা-পাতার ভিতর থেকে দুষ্ট খরগোশটিকে ধরে আনতে গিয়ে বাহুতে যে কাঁটার আঁচড় খেয়েছিল তা থেকে অবিরাম রক্ত ঝরছিল, তাহাই মাধবীর চোখে পড়ল। মাধবী এক দৌড়ে বাড়ীর আঙ্গিনা হতে কিছু লতা-পাতা এনে সূর্য্যের হাতে দিয়ে বলল, ‘ওখানে লাগিয়ে দিন, রক্ত বন্ধ হয়ে যাবে’। তারপর হতে প্রায়ই সূর্য্য মাধবীকে দেখতে যেত। মাধবীও সূর্য্যর সান্ন্যিধ্য পেতে বড়ই পছন্দ করতো। সূর্য্য একদিন মাধবীকে তার আঙ্গিনায় আসতে নিমন্ত্রন জানালো। মাধবী কহিল, ‘যাব। চৈত্রের এক দুপুরে যাব।’ শ্যামবর্নের কাজল চোখের মাধবী চৈত্রের খাঁ খাঁ দুপুরে তৃষ্ণা মিটাবে এই ভেবে সূর্য্য পাথুরে পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা ধারা হতে একঘট জল এনে রাখল। এতদিনে মাধবী কৈশর পার হয়ে যৌবনে পদার্পণ করেছে। এরই মাঝে হঠাৎ একদিন মাধবী এসে সূর্য্যেরআঙ্গিনায় উপস্থিত হলো। সূর্য্যের আর বুঝতে বাকী রইলোনা- মাধবী তার ঘটের জলের আঁচ পেয়েছে।

অষ্টাদশী মাধবী- ফুল- পাখী- আকাশ তথা প্রকৃতিকে নিয়ে ক্রমাগত স্বপ্ন দেখে যাচ্ছে। কখন যে আকাশপটে একখন্ড কালো মেঘ জমেছিল উহাই তার মন কাড়ল। ঐ দূর আকাশের মেঘের জল; যা সমূদ্র হতে এসেছে তা এই ঘটের জলের চেয়ে অনেক সুস্বাদু হবে এই ভেবে মাধবী সূর্য্যের ঘটের জলকে তুচ্ছ মনে করে শুকনো মাটিতে ঢেলে এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে রংধনু রঙে সেজে খালি ঘট হাতে আকাশের ঐ কালো মেঘের পানে ছুটলো। বিষয়টাকে একটু পরিস্কার করা দরকার- পাশের গায়ের তূর্য্যরে পরিবার হতে মাধবীর জন্য সম্বন্ধের প্রস্তাব আসলো। তূর্য্য শহরে থাকে, ভালো চাকুরী করে। কিন্তু সূর্য্য এখনো বেকার। তাই মাধবীর মন হঠাৎ তূর্য্যরে দিকে হেলে পড়লো। খানিক পরেই যা ঘটবার তাই ঘটল। কালো মেঘ হতে সুস্বাদু জলধারা বর্র্ষিত না হয়ে শিলাখন্ড বর্ষিত হলো। অর্থাৎ তুর্য্যরে পরিবার হতে মাধবী কালো, গেঁয়ো এবং সেকেলে অপবাদে ক্ষত বিক্ষত হয়ে জলশূন্য ঘট হাতে সূর্য্যর আঙ্গিনায় ফিরল। সূর্য্য মাধবীকে জিজ্ঞাস করলো, ‘ইহা তুমি কি করেছো, আমার ঘটের জল?’ মাধবী কৃত্রিম একটা হাসি দিয়ে কহিল, ‘এ সামান্য কিছু জলের জন্য এতো মন খারাপ?’ মাধবী বড়ই সোহাগী, বড্ড সোহাগ করে কথা বলতে জানে। কথাগুলো সে এতই সহজ করে বলতেছিলো যেন সে যা করেছে সম্পূর্ণ বুঝে শুনে স্থির মস্তিস্কেই করেছে। তার দিক হতে হয়তোবা সে ঠিকই করেছে। কেননা যে শুধু অপরের সঞ্চিত জলে তৃষ্ণা মেটাতে আশাবাদী, সে যদি অপরকে তৃষ্ণা মেটাতে এক বিন্দু জলও সঞ্চয় করতো তাহলে সে বুঝতো ঐ ঘটের জল অত সহজে মাটিতে ফেলে দেওয়ার জল ছিলনা।

সূর্য্য মনে মনে কহিল, ‘তুমি বুঝবেনা- যে জল তুমি এক মুহূর্তে মাটিতে ফেলে দিয়েছো, ঐ জল আমি এক মুহূর্তে আনতে পারি নাই। প্রতিটা দিন, প্রতিটা ক্ষণ, বিন্দু বিন্দু করে সহস্র মাইল কন্টাকীর্ন মরূপথ পায়ে হেঁটে এক পাথুরে পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা ধারা হতে ঐ জল আমি এই ঘটে সঞ্চয় করতে ছিলাম। যাহা তুমি এক মুহূর্তেই ফেলে দিয়েছো, একটি বারও কি তোমার ভিতর কেঁপে ওঠে নাই!’ যার উপর পাথরের ন্যায় কঠিনরূপে বিশ্বাস দানা বেধেঁছিল উহা যেন এক নিমিষেই গলে কাদার ন্যায় নরম হয়ে গেল। কষ্টে সূর্য্যের বুক যেন ফেটে যায়-যাকে সে প্রাণের চেয়েও বেশী ভালোবাসে তাকে চৈত্রের খা খা দুপুরে কি দিয়ে তৃষ্ণা মিটাবে? তাকে প্রাণ ভরে তৃষ্ণা মেটাতে না পারলে যে কোনদিন সূর্য্যেরও তৃষ্ণা মিটবে না- এই ভেবে জলশুন্য ঘটখানা হাতে নিয়ে ফের সে পাহাড়ের পানে ছুটলো। পাহাড়ে এসে সে যাহা দেখলো তাহা না বললেই হয়তো ভালো হতো- হৃদয় নামক পাহাড়ের যে ফাটল হতে ভালোবাসা নামের জলধারা বয়ে আসতো তাহা মরে শুকিয়ে গেছে। একদিন যে এই স্থান হতে স্বচ্ছ জলের ধারা বয়ে আসতো তারই এক ক্ষত চিহ্ন বহন করে চলেছে মাত্র। অবশেষে সূর্য্য দিগ্বিদিক জ্ঞানশুন্য হয়ে পাগলের মতো ছটফট করে ফিরে এলো নিজ আঙ্গিনায়। কাল বিলম্ব করলে ঘটে কিছুই তুলতে পারবে না এই ভেবে ঠিক যেখানটায় মাধবী ঘটের জল ফেলে দিয়েছে ঠিক ঐখানটায় মাটির বুক চিরে কিছুটা স্বচ্ছ কিছুটা অস্বচ্ছ এই মিলে খানিকটা জল ঘটে তুললো। বাকীটুকু মাটির কনার ফাঁকেই রয়ে গেল।

মায়াবী চোখের মাধবী এখন দুর হতে শুধু ঘটের বাহিরটাই দেখে যাচ্ছে, ভিতরটা দেখবার চক্ষু তার নাই। আর প্রহর গুনছে কবে চৈত্রের খা খা দুপুরে ঘটের স্বচ্ছ জলে তৃষ্ণা মিটাবে অর্থাৎ লাল বেনারশী পরে সূর্য্যের ঘরে যাবে। কিন্তু সে জানেনা-ঘটের জল যে সেই আদিকার জলের মতো এখন আর স্বচ্ছ নেই-উহা যে তারই অযত্ন অবহেলায় ফেলে দেওয়া মাটির বুক চিরে তুলে আনা ধুলিমাখা ঘোলাটে জলমাত্র। সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো কান্নায় সূর্য্যের বুক ফেটে যায় অথচ পাহাড়ের বুক ফাটেনা। ইহা ছাড়া সূর্য্যের আর কিইবা করবার আছে। সূর্য্য আজও রাতের আঁধারে ঘট হাতে সেই আদিকার জলের সন্ধানে পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়ায়। বোঝা যায় পাহাড়ের খুব গভীরে সেই জল হয়তো আদৌ সঞ্চিত আছে কিন্তুু উহা তুলবার পথ তার জানা নাই।

*রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন*
সম্পর্কিত সংবাদ
Leave a reply
রাফেউল ইসলাম