তাকিয়ে আছি তাবৎ কবিদের দিকে

তাকিয়ে আছি তাবৎ কবিদের দিকে

আজ কোন কবিতা আসছে না। শব্দ বুনছে না। ছন্দ আজ গোলমেলে। কথা’রা আজ ক্ষিপ্র! কবিতা এমনিই সে তো- কখনোই হুকুমের গোলাম নয়, কবিতা চায় সাবলীল পথ… মুক্ত বাতাসের মত , কবিতা চায় পবিত্রতা, চায় একক সাম্রাজ্য, একক অদিখ্যেতা।

কবিতা কখনো সপত্নীক পছন্দ করেনা। সে চায় কবির সর্বসত্ত্ব, দেহ- মনে – স্পন্দনে

একাকার এক আধিপত্য!

কিন্তু আমি তো জাত কবি নই। আমার দেহে কবিতার ঝড়, মনে কবিতার তৃষা, আমার স্পন্দনে কবিতার সংকীর্তন… তবু আমি কবি নই।

পবিত্র প্রার্থনার মত কবিতার নৈবদ্যে আমি লীন… রাত- দিন; চেতনে-অবচেতনে আমি সমর্পিত কবিতার সাধনে। অথচ আমি কবি নই!

জাত কবি তো দূর…

তথা কথিত সেলফিস কবিদের তালিকায়ও আমার নাম নাই। আমার কোন বাঁধানো ফ্রেম নাই যেখানে আমাকে কবিত্বের মেডেল পরানো হচ্ছে। কোন শো-কেইস নেই যেখানে সাজানো থাকে সারি সারি সোনালি ক্রেস্ট!

আমি পান করিনি পৃথিবীর কোন কবি সভার  সুরা, অথচ কবিতার ঝর্ণা ধারায় প্রবাহিত আমার সমগ্র সত্ত্বা!কবিতার সুরম্য পথে চলতে চলতে বোধ করেছি জীবন, জীবন রহস্যের

অসংখ্য উত্তর… কখনো থমকে দাঁড়িয়েছি, অবগাহন করেছি অমৃতসম ছন্দাণুরননে, কখনো

নির্বোধ চেয়ে থেকেছি, কখনো অন্ধের মতন হাতড়ে গেছি…

আমি বুঝেছি আবার বুঝিনি, কবিতাকে ছুঁয়েছি আবার কবিতা আমাকে গ্রাস করেনিয়ে গেছে অচিন প্রান্তরে…, কখনো খুঁজেছি আপন চিত্তের রঙ… কখনো কবিতার রঙ!

এভাবে কবিতা ভাবিয়েছে আমাকে-

এভাবে কাঁদিয়েছে, আনন্দ অবগাহনে ভাসিয়েছে, মুখ চেপে গুম করে নিয়ে গেছে একাকী সৈকতে, নদীর মোহনায়; এভাবে রহস্যের বেড়াজালে চটপট করেছি, আবার তৃপ্তির সুরায় মত্ত হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি নিগৃহ সুখে! কখনো জয় করেছি কবিতাকে , কখনো কবিতার অনন্ত শক্তির কাছে হার মেনেছি! কিন্তু কবিতা কে আদৌ কখনো হারাতে চাইনি, আপন অনুভবের তর্জমায় মাঝে মধ্যে নির্বাক হয়েছি, বিস্মিত হয়েছি-

যেহেতু সেই ছিলো এক অবর্ণনীয় আলোক রেখা, এক স্ফটিক বিম্ব, এক মহা বেগ…

অথচ আমি তাকে স্বার্থপরের মতন আঁকড়ে রাখিনি, তাকে মুক্তির পথে বাড়িয়ে দিয়েছি, আপন ইচ্ছায় নৃত্য করতে করতে যে হারিয়ে গেছে… আর ফেরেনি!

এভাবে আমি আহত পাখির মত ব্যথিত ডানায় কাতর হয়েছি কবিতার শূন্যতায়…

এভাবে কবিতাকে নতুন করে দেখেছি নিজের চোখে।

যদি কবি হতাম তবে হয়তো পাঠকের মনে সঞ্চার করাতাম অমিয় এক ধারা বহ, অনুপম কোন স্বপ্ন, চেতনা… যা পাঠকের অন্তরকে শাণিত করে জগতের মহৎ কোন ভাস্কর্যের মত ঠায় করে নিতো। কিন্তু আমি তো কবি নই! আমার চার পাশে অজস্র কবির আনাগোনা, অসংখ্য কবিতার সারি…

মলাট বাধা পুস্তকের বাহারে আমি প্রসন্ন হই… রঞ্জিত হই। আর চেনা অচেনা , জানা অজানা নানান কবির নানান ধর্মের আলো উদ্ভাসিত হই।

  আমি এসব সৃষ্টি কে ঐকান্তিক চোখে দেখি, ভাবি পৃথিবীর সমগ্র ভাষা, সমগ্র অক্ষর, শব্দ, ছন্দ নির্ঝর ঝর্নার মতো বেয়ে নামছে আমারই বুকের উপত্যকায়-

আর একিই মোহনায়, একিই রূপে, একিই তরঙ্গে একিই সুরে প্রবাহিত হচ্ছে নিদারুণ এক মহাকাব্যের মতো। এভাবে অনুধাবন করি আমার আমাকে, আমার ঘুম ভাঙ্গা ভোরকে… প্রজ্বলিত দুপুর কে… অনুধাবন করি বাঁধ ভাঙ্গা দীর্ঘশ্বাস… আর একেক টি অর্জন- বিসর্জন কে। প্রাণের অন্দরে…আত্মার নিবিড়ে অনুভব করি কবিতার অসীমা আকুতি! ফুটন্ত জলের মতো টগবগে হৃদয়, যদিও কবিতার জন্যে অবিরাম চলছি আমি নিভৃত চারণে।

 কিন্তু কবিতার দুনিয়ায় , কবিতার রঙ্গমঞ্চে যে নামগুলো উচ্চারিত হয়ে আসছে আমি বার বার  কদম বাড়িয়েছি তাদের দেখানো পথে-

কিন্তু সে পথে অসংখ্য হোঁচট! বাঁকে বাঁকে অদৃশ্য আততায়ীরা ঘাপটি মেরে থাকে। তারা সমীহ চায়, তোষামোদ চায়… দাবিয়ে রাখতে চাইয় অসংখ্য কবির আত্মা!আমি নির্ভীক চোখে তাদের পড়িয়েছি আমার সংকল্পের ভাষা। আমি আহত হয়েছি, মান হারিয়েছি…

ফরে এসেছি। আর একলা পথে চলতে চলতে আজ যে মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছি তাকে কোন গন্তব্য বলা যায়না, গন্তব্য তো দূর- গন্তব্যের পথে সহজিয়া পথও বলা যায় না। কিন্তু একেই আমি তুলে ধরেছি আদর্শের ঝাণ্ডায়। আপন শক্তিতে … কবিতার একান্ত আপন হয়ে বেয়ে উঠছি একা…

 আমি জানি আমি যেখানে উঠে দাঁড়াবো সেটা কোন নির্দিষ্ট প্রান্তিক নয়, কোন শূন্যতা নয়। সে হবে এক কবিতার গ্রহ!

প্রাণের ভাষার মত, মায়ের ভাষার মত, ফুলের ভাষার মত পাখির কিংবা নদীর ভাষার মত প্রকৃতিতে প্রতিদিন কবিতা আসবে নিত্য বসন্তের মত।

যারা কবিতার সংজ্ঞা নির্মাণ করে, যারা কবিতা বিশদ, মহা বিচারক; যারা মলাটের ভেতরকার শব্দের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কবিতার নাড়ি নক্ষত্র খোঁজে- হয়তো তাদের কেউই আমার দিকে ফিরে দেখবে না। হয়তো কোন পাঠক কো পাঠ চক্র ,কোন আবৃত্তি সন্ধ্যার আয়োজন হবেনা। কিন্তু আমি আমার একলা পথে কখনো পিছপা হবো না! কখনো না।

   আমি চাই সমগ্র বিশ্বের কণ্ঠস্বরে কবিতার স্বর ধ্বনিত হোক।সেই ভাষার কবিতাই হোক না কেন- যেই মাত্রার কবিতাই হোক না কেন-

আমি চাই একটি কবিতা সমগ্র পৃথিবীর যোগ সূত্রের দায়িত্ব নিক। চাই একটি কবিতা জন্ম হোক সর্ব সাধারণের জন্য।

আমি কবি হলে সেই কবিতাটিই রচনা করতাম, যে কবিতায় ফুটে উঠতো সত্যের স্বরূপ, শেকড়ের গহীনে শেকড়ের কাহিনী, বেদনার বিবৃতি, প্রেমের নীলিমা , আনন্দের স্ফটিক রেখা ।  অনন্য এক অনুভূতির বৈচিত্র্যে ন পঙক্তির পর পঙক্তি সেজে থাকতো পাঠকের অন্তরঙ্গ আলিঙ্গনে। সত্য অন্বেষণে। শিল্পের মহা জাগরণে ।

 এসব ভেবে ভেবে আমি সঙ্কল্পিত হই। উজ্জীবিত হই। ফুলে কাছে যাই, পাখির চোখে তাকাই, মানুষের গন্ধ শুঁকি… মাটির সোঁদা গন্ধে মিশে যাই, বৃষ্টি হই, শিশির হই , বাঁশরিয়ার সুর হই…

এভাবে আমি পাঠ করি অনন্তের কাব্য, সভ্যতার অক্ষর, নির্লোভ আকাশের মত উদার। নির্বিঘ্নে পাঠ করি মানুষ , পাঠ করি প্রকৃতি, আলো –আঁধার…

 কারণ কবি হবার আগে পাঠক হওয়া আবশ্যক! শিল্পী হবার আগে যেমন মানুষ হওয়া জরুরী! কিন্তু এই তৃষ্ণা কেউ জাগিয়ে দিতে পারেনে না, কারো অন্তরে এই তৃষ্ণা তখনি জেগে উঠবে যখন সে বেরিয়ে আসবে জলাবদ্ধ খাঁড়ি থেকে, যখন যে সাতার জানবে, উড়াল জানবে, যখন ক্ষুধারা পরাজিত হবে, যখন তৃষ্ণারা পরাজিত হবে- তখনিই কেবল জেগে উঠতে পারে এই ধ্রুব তৃষ্ণা… এই অমৃত অমর্ত্য সুধা!

যদিও আমি ভীত!

আমি শঙ্কিত! বিব্রত কবি কূলের জন্য!

আমি নুয়ে পড়ে থাকি, লজ্জায় মাথা তুলিনা যখন কেউ কবিত্ব কে জাহির করতে উঠে পড়ে , যখন কেউ কবিতায় সম্পদের গন্ধ খোঁজে, যখন কেউ আসক্ত হয় মঞ্চায়নের নেশায়, লাল ফিতায়!… !

কারণ কবিরা অত্যন্ত বিব্রত!কারণ কবি জানে বাতাসের ভাষা, নদীর মনোভাব, কবি চেনে বৃক্ষের হতাশা, কবি বুঝে মানুষের পিপাসা…

সুতরাং- আমি তাকিয়ে আছি তাবৎ কবিদের দিকে, দয়া করে কাঙ্ক্ষিত কবিতা টি লিখুন।

সম্পর্কিত সংবাদ
দাউদুল ইসলাম