নব্য জেএমবির নেতৃত্বে শিবিরের সাবেকরা: পুলিশ

নব্য জেএমবির নেতৃত্বে শিবিরের সাবেকরা: পুলিশ

ইসলামী ছাত্র শিবির থেকে আসা সদস্যরা এখন নব্য জেএমবির নেতৃত্বে বলে দাবি করেছেন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম।

গুলশান হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী রাশেদুল ইসলাম র‌্যাশকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এই তথ্য মিলেছে বলে শনিবার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন তিনি।

আইএস দ্বারা উদ্বুদ্ধ নব্য জেএমবির মধ্যে নেতৃত্বের কোন্দলের খবরও দিয়েছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তা মনিরুল।

নাটোর থেকে রাশেদুলকে গ্রেপ্তারের পরদিন মনিরুল পুলিশের গণমাধ্যম কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, “ইসলামী ছাত্র শিবির থেকে আসা সদস্যরা নব্য জেএমবিকে এখন সরাসরি নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

“রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) অধ্যাপক ড. এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে কুপিয়ে হত্যায় জড়িত ইসলামী ছাত্র শিবিরের নেতা শরিফুল ইসলাম খালেদের হাত ধরে রাশেদ নব্য জেএমবিতে যোগ দেয়।”

জঙ্গি তৎপরতায় জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠনটি জড়িত বলে এর আগেও পুলিশ বলেছিল। তবে শিবির নেতারা তা প্রত্যাখ্যান করে বলে আসছে, এটা তাদের বিরুদ্ধে সরকারি অপপ্রচার।

জঙ্গিদের মধ্যে নেতৃত্বের কোন্দলের বিষয়ে মনিরুল বলেন, “বর্তমানে নব্য জেএমবির একটি অংশের নেতা আইয়ুব বাচ্চু ও অন্য অংশের নেতা হাদিসুর ইসলাম সাগর। দুই অংশের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাসও তৈরি হয়েছে।”

তামিম চৌধুরী নিহত হওয়ার পর রাশেদুল দলে গুরুত্বপূর্ণ পদ প্রত্যাশী ছিলেন বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।

“হলি আর্টিজান হামলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় রাশেদের ধারণা ছিল তাকে সংগঠনের বড় পদে দেওয়া হবে। কিন্তু তামিম চৌধুরীর মৃত্যুর পর মইনুল ইসলাম মুসা নব্য জেএমবির আমির হলে তার ভেতর কিছুটা অভিমান কাজ করে।

“এই গ্রুপটার সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়। পরে জঙ্গি নেতা নুরুল ইসলাম মারজানের ভগ্নিপতি হাদিসুল ইসলাম সাগরের সঙ্গে তার যোগাযোগ গড়ে উঠে।”

গুলশান হামলার পরিকল্পনা এবং অস্ত্র-বিস্ফোরক সরবরাহকারী হিসেবে যাদের চিহ্নিত করেছে পুলিশ, তাদের মধ্যে এখন সাগরই পলাতক রয়েছেন। অন্যরা কেউ মারা পড়েছেন, কেউবা ধরা পড়েছেন।

সাগর এখন বাংলাদেশেই রয়েছেন বলে তথ্য রয়েছে পুলিশের কাছে। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানান মনিরুল।

রাশেদকে শুক্রবার ভোরে নাটোরের সিংড়া থেকে গ্রেপ্তারের পর শনিবার তাকে ঢাকার আদালতে হাজির করা হয়। গুলশান হামলার ঘটনায় করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ছয় দিনের হেফাজতে নেওয়ার অনুমতি দেন ঢাকার মহানগর হাকিম নুর নাহার ইয়াসমিন।

উপ-মহা পুলিশ পরিদর্শক মনিরুল নব্য জেএমবি অন্যতম শীর্ষ নেতা তামিম চৌধুরীর সঙ্গে রাশেদের সখ্য, হলি আর্টিজান হামলায় অংশ নেওয়া জঙ্গিদের দেখভাল এবং বিভিন্ন জঙ্গি নেতার জন্য বাসা ভাড়া করে দেওয়ার তথ্য তুলে ধরেন।

নওগাঁর মান্দা উপজেলার তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের কাঞ্চনপুর গ্রামের আব্দুস সালামের দুই ছেলে-মেয়ের মধ্যে ছোট রাশেদ রাজশাহী মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভর্তি হয়ে শহরের একটি ছাত্রাবাসে থাকতেন বলে তার স্বজনরা জানান।

মনিরুল বলেন, রাশেদ গত বছর রাজশাহী থেকে ঢাকায় চলে আসেন। ওই সময় তামিম চৌধুরীর সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল। খালেদ তাকে তামিম চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। তামিম তাকে বড় কোনো পদ না দিলেও বিশ্বস্ত হিসেবে কাছে রাখেন।

রাশেদের মধ্যে ‘জিহাদি জোশ’ দেখে তামিম তাকে গুরুত্বপূর্ণ কাজে লাগান জানিয়ে মনিরুল বলেন, গুলশান হামলায় নিহত সামেহ মোবাশ্বের ও রোহান ইমতিয়াজ ঘর ছাড়ার পর রাশেদ তাদেরকে মিরপুরের একটি বাসায় নিয়ে যান। সেখানে তাদের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দিয়ে বিভিন্ন কাজে নিয়োগ করা হয়।

হলি আর্টিজানে হামলার সময় পাল্টা অভিযানে নিহত রোহান ইমতিয়াজসহ তিন জনকে বুড়িগঙ্গায় নিয়ে গিয়ে রাশেদ গ্রেনেড ছোড়ার ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।

“হলি আর্টিজান হামলায় তারই অংশগ্রহণের কথা ছিল। পরে তাকে বাদ দিয়ে বাকি পাঁচজনকে সিলেক্ট করা হয়। তখন তামিম চৌধুরী বলেছিল, ‘তাকে আরেকটি অপারেশনে পাঠানো হবে’।”

হলি আর্টিজানে হামলার জন্য সোহেল মাহফুজের (সম্প্রতি গ্রেপ্তার) তত্ত্বাবধানে অস্ত্র সংগ্রহকারী দলে রাশেদও ছিল জানিয়ে মনিরুল বলেন, ঢাকার বাইরের একটি জায়গা থেকে চারটি নাইন এমএম পিস্তল, আটটি ম্যাগাজিন ও ৩০ রাউন্ডের মতো গুলি নিয়ে রাশেদ কল্যাণপুরের আস্তানায় যায়। বাশারুজ্জামান চকলেট নামের আরেক জঙ্গি সেগুলো বসুন্ধরার আস্তানায় পৌঁছে দেয়।

“তাকে আরেকটু বড় পদে তামিম চৌধুরী দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তামিমের মৃত্যুর পর তার আর পদোন্নতি হয়নি। সেক্ষেত্রে মাইনুল ইসলাম মুসাসহ অন্যরা তার থেকে সাংগঠনিকভাবে এগিয়ে যায়।”

হলি আর্টিজান হামলার ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃতদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও জঙ্গি নেতা তানভীর কাদেরীর ছেলে তাহরীম কাদেরীর সাক্ষ্যে রাশেদের ভূমিকার কথা উঠে এসেছে। সে ‘পুরনো জেএমবির’ সদস্যদের জড়ো করে নব্য জেএমবির সাংগঠনিক কাজ চালানোর চেষ্টা করে আসছিল বলে মনিরুল জানান।

“আজিমপুরে যে আস্তানায় তানভীর কাদেরী মারা যায়, সেই বাসাটি রাশেদ ঠিক করে দিয়েছিল। বসুন্ধরার বাসাটি যখন তানভীর কাদেরীর নামে ঠিক করা হয় তখন সেই বাসায় কী কী আসবাবপত্র লাগবে তা রাশেদ ও আরেক জঙ্গি মোনায়েম খানের নাতি আকিবউজ্জামান ঠিক করে শেওড়াপাড়ার এক ফার্নিচারের দোকান থেকে কিনে দেন ও বসুন্ধরায় পৌঁছে দেন।”

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মনিরুল বলেন, গত বছর ২৬ জুলাই কল্যাণপুরে পুলিশের অভিযানের পর তামিম চৌধুরী ও রাশেদ বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। পুলিশের অভিযান দেখে তারা অনেকটাই ভীত হয়ে পড়ে নারায়ণগঞ্জে দুটো বাসা ভাড়া নেন। সেখানে রাশেদের যাতায়াত থাকলেও বসবাস করতো না।

“রাশেদ জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, বিভিন্ন সময়ে সে উত্তরবঙ্গে কাটিয়েছে। মাঝখানে সে গাজীপুরে ছিল। সেখানে একদিনে দুটো অভিযান পরিচালিত হলে ও তানভীর কাদেরীর ছেলেকে জিজ্ঞাসাবাদে তার নাম আসায় ও পত্রপত্রিকায় তা প্রকাশ পাওয়ায় রাশেদ সতর্ক হয়ে গিয়েছিল। এরপর সে উত্তরবঙ্গে আত্নগোপনে চলে যায়।”

গত বছর ১ জুলাই রাতে গুলশানের হলি আর্টিজান ক্যাফেতে হামলা চালায় পাঁচ জঙ্গি। তাদের রুখতে গিয়ে নিহত হন দুই পুলিশ কর্মকর্তা। পরদিন সেনা কমান্ডো অভিযানে জঙ্গিরা নিহত হওয়ার পর সেখান থেকে ১৭ বিদেশিসহ ২০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়।

কানাডাপ্রবাসী তামিম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ‘নব্য জেএমবি’ এই হামলা চালায় বলে পুলিশি তদন্তে উঠে আসে। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে তামিমসহ এই জঙ্গি গোষ্ঠীর শীর্ষ পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নিহত হন; গ্রেপ্তার করা হয় পাঁচজনকে।

তাদের মধ্যে সর্বশেষ ৭ জুলাই গ্রেপ্তার সোহেল মাহফুজের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাশেদকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সম্পর্কিত সংবাদ
ডেস্ক রিপোর্ট