পিতা-মাতার অভ্যাসে শিশুরা সফল হয়

পিতা-মাতার অভ্যাসে শিশুরা সফল হয়

বেশিরভাগ পিতামাতা শিশুদেরকে সফলভাবে গড়ে তুলতে অন্য পিতামাতাদের পেরেন্টিং স্কিলের খোঁজ করেন। এটা ঠিক যে সফল শিশুদের পিতামাতাদের এমন কিছু অভ্যাস রয়েছে, যা তাদের সন্তানদেরকে সফলতার চূড়ায় তুলতে সাহায্য করে। আপনিও নিশ্চয়ই আপনার বাচ্চাকে সফল হিসেবে দেখতে চান? তাহলে তাকে অল্প বয়স থেকেই কিছু ভালো অভ্যাসে সম্পৃক্ত করুন, যা সফলতার সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে। এখানে পিতামাতার যে ১০ অভ্যাসে শিশুরা সফল হতে পারে তা আলোচনা করা হলো।

* ঘরের কাজ করতে দেন
ছেলেমেয়েদেরকে ঘরের কাজ করতে দিলে শৈশব থেকেই তারা কর্মঠ হয়ে গড়ে ওঠে এবং যেকোনো কাজকে মূল্যায়ন করতে শিখে। গৃহস্থালি কাজ সম্পন্ন করার মাধ্যমে তারা পরিবারে অবদান রাখতে পারে এবং তারা বুঝতে পারে যে পরিবারের দৈনন্দিন কার্যক্রমের সফলতায় তাদেরও অবিচ্ছেদ্য ভূমিকা রয়েছে। ছেলেমেয়েদেরকে গৃহস্থালির কাজে নিযুক্ত করলে তাদের মধ্যে পরিবারের সদস্যদের কষ্ট লাঘবের চেতনা সৃষ্টি হয়, যার ফলে তারা ছোটবেলা থেকেই পরিবারে অবদান রাখার তাড়না অনুভব করে। গৃহস্থালি কাজ ছেলেমেয়েদেরকে এসব কাজে দক্ষ করে তোলে, যা ছাত্রাবাস বা মেসের জীবনে কাজে আসে।

* বড় স্বপ্ন দেখান
সফল ছেলেমেয়েদের পিতামাতারা তাদের বাচ্চাদেরকে বড় বড় স্বপ্ন দেখান এবং তারা নিজেরাও উচ্চ আশা মানসিকতার। এটি ছেলেমেয়েদেরকে সফল হতে উৎসাহিত করে। উদাহরণস্বরূপ, যদি আপনার সন্তানকে দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য স্বপ্ন দেখান, তাহলে তার উত্তীর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। এর কারণ হলো, কোনো লক্ষ্য সেট করা থাকলে তা পূরণের জন্য তাড়না সৃষ্টি হয়, ফলে কাজে মনোনিবেশ ও পরিশ্রম করার প্রবণতা বেড়ে যায়। এছাড়া পিতামাতারা নিজেরাই উচ্চাশা বা বড় স্বপ্নের মডেল হয়ে এবং লক্ষ্য অর্জনের জন্য কঠোর পরিশ্রম করে সন্তানদেরকে সফল হতে সাহায্য করতে পারে। এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে উচ্চাশা যেন বাস্তবসম্মত হয়। অলিম্পিকের জন্য উত্তীর্ণ হতেই হবে, অমুকের মতো রেজাল্ট করতেই হবে অথবা রুমকে ২৪ ঘণ্টা পরিচ্ছন্ন রাখতেই হবে প্রকৃতির কথা তাদেরকে বলবেন না, কারণ এ ধরনের চাপ উদ্বেগের কারণ হতে পারে, যার ফলে তাদের পারফরম্যান্স ভালোর পরিবর্তে খারাপের দিকে যেতে পারে।

* নিজেকে শিক্ষিত করেন
পরিসংখ্যান বলছে, যেসব পিতামাতা উচ্চ মাধ্যমিক বা কলেজ অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সমাপ্ত করেছেন, তাদের সন্তানদের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে, অনেক ক্ষেত্রে সন্তানেরা পিতামাতাকে ছাড়িয়ে গেছেন। যেসব পিতামাতা উচ্চ শিক্ষা অর্জন করেননি তারা পুনরায় পড়াশোনা শুরু করতে পারেন, যা সন্তানদেরকে শিক্ষার্জনের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে সাহায্য করবে। এ বয়সে এসে শিক্ষার্জনে কোনো লজ্জা নেই। জানেন তো শিক্ষার কোনো বয়স নেই।

* নিজেদেরকে ভালো হিসেবে উপস্থাপন করেন
যদি আপনি চান যে আপনার সন্তানেরা আপনার পদাঙ্ক অনুসরণ করবে, তাহলে কোনো কাজে লেগে থাকুন। এর মানে এই নয় যে তাদের কাছ থেকে জীবনের বাস্তবতা লুকাবেন। সন্তানেরা পিতামাতাকে মডেল বা আদর্শ মনে করলে তাদেরকে অনুসরণ করতে শুরু করে। ছেলেমেয়েদের সঙ্গে জীবনযুদ্ধের গল্প করার সময় মানুষের প্রতি বিষ ছড়াবেন না, তাদেরকে বোঝান যে উত্থান-পতন জীবনের স্বাভাবিক অংশ। যদি তারা দেখেন যে আপনার জীবনসংগ্রাম বা পরিশ্রম পরিবারকে সচ্ছল রেখেছে বা জীবনকে অর্থবহ করেছে, তাহলে তারা নিজেদের ভবিষ্যত গড়ার জন্য অনুপ্রাণিত হবে। যদি আপনি ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই সন্তানের জনক হয়ে যান, তাহলে আপনার হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। আপনিও জীবনসংগ্রামে ইতিবাচক থেকে সন্তানের মডেল হতে পারবেন।

* অল্প বয়স থেকেই অংকে উৎসাহিত করেন
সন্তানকে অল্প বয়স থেকেই অংক শেখালে বা গাণিতিক ধারণা দিলে পরবর্তীতে গণিতশাস্ত্রে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। শিশুদেরকে অংকে আকৃষ্ট করতে পারলে আন্তর্জাতিক গাণিতিক প্রতিযোগিতায় সফল হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। আপনি খেলনার মাধ্যমে অথবা বিভিন্ন মজার উপায়ে বাচ্চাদেরকে গণিতে শেখাতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, কোনো দড়িতে কতটি কাক বসেছে তা গুণে দেখাতে পারেন অথবা তিনটি লাঠির সাহায্য ত্রিভুজ বানিয়ে তিনটি কোণ বা তিনটি বাহুর ধারণা দিতে পারেন।

* দৃঢ় বন্ধন গড়তে সন্তানকে সময় দেন
পিতামাতার সঙ্গে যেসব সন্তানের মজবুত ভিত্তি রয়েছে তারা পিতামাতার সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক নেই এমন সন্তানদের তুলনায় বেশি সফল হতে পারে। এর মানে এই নয় যে আপনি প্রতিসপ্তাহে বাচ্চাকে নিয়ে শিশুপার্কে যাবেন অথবা মুভি থিয়েটারে যাবেন। আপনি যা করতে পারেন তা হলো: ঘুমাতে যাওয়ার পূর্বে একসঙ্গে বই পড়া, যখনই সম্ভব খাবার শেয়ার করা এবং সন্তানের প্রয়োজনে নিজেকে হাজির করা। বাচ্চা জন্মানোর পর থেকেই শক্তিশালী বন্ধনের প্রক্রিয়া শুরু করুন, এতে সন্তান আপনার ওপর ভরসা করতে পারবে ও আপনাকে নিরাপদ মনে করবে।

* সমস্যা সমাধান করতে শেখান
সফল ছেলেমেয়েদের পিতামাতারা তাদের সন্তানদের সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করেন। তারা কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা সমাধানের সম্ভাব্য উপায়গুলো সাজেস্ট করেন। তারা সমস্যার প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে সমাধানের পরামর্শ দেন। এসবকিছু সমস্যা মোকাবেলায় ছেলেমেয়েদরকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে এবং তাদের মধ্যে সমস্যা সমাধানে প্রচেষ্টা চালানোর অভ্যাস বিকশিত হয়। এ অভ্যাস তাদেরকে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে সাহসের সঞ্চার করে। এসবকিছু হলো প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের জন্য অমূল্য দক্ষতা।

* আবেগকে গুরুত্ব দেন
আবেগ বা অনুভূতি প্রকাশ করা অনেকের পক্ষে কঠিন, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে। তাই শিশুদেরকে আবেগ বা অনুভূতি শনাক্তকরণের উপায় ও তা কিভাবে মুখের ভাষায় প্রকাশ করতে হয় সে সম্পর্কে অবহিত করুন। তাদেরকে অল্প বয়স থেকেই অনুভূতির নামের সঙ্গে পরিচিত করুন। উদাহরণস্বরূপ আপনি বলতে পারেন, ‘আমি দেখতে পাচ্ছি যে তুমি খুব হতাশ’ অথবা ‘আমি জানি যে বন্ধুর পার্টিতে যেতে না পেরে তুমি খুব হতাশ হয়েছ।’ তাদের আবেগকে অবহেলা করবেন না, মূল্যায়ন করুন এবং আবেগের ধরনের ওপর ভিত্তি করে কিভাবে আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় তা শেখান।

* নিজেদের মানসিক চাপ দূর করেন
মানসিক চাপপূর্ণ পিতামাতাদের সন্তানেরা মানসিক চাপে আক্রান্ত হয়ে থাকে। সন্তানদের জন্য উদ্বেগমুক্ত ঘরোয়া পরিবেশ বজায় রাখতে আপনার মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য মানসিক চাপ হ্রাসের উপায় মেনে চলুন, যেমন- প্রার্থনা করতে পারেন অথবা যোগব্যায়াম করতে পারেন অথবা ধ্যান করতে পারেন। মানসিক চাপ হলো সংক্রামক- এটি অন্যদের মধ্যে ছড়াবেন না।

* পড়ে শোনান
সন্তানদেরকে অল্প বয়স থেকে পড়ে শোনালে তাদের মধ্যে বাচন দক্ষতা, যোগাযোগ দক্ষতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। এ পাঠাভ্যাসে শিশুদের মধ্যে সহানুভূতি সৃষ্টি হয়। এছাড়া শিশুরা পিতামাতার সান্নিধ্যে থাকে বলে উভয়ের মধ্যে মজবুত বন্ধন বিকশিত হয়, যা সন্তানদের সফলতার প্রধান খুঁটি হতে পারে।

*রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন*
সম্পর্কিত সংবাদ