বহিষ্কার, অবাঞ্ছিত—এসব মোটেও কাম্য নয়: রোজিনা

বহিষ্কার, অবাঞ্ছিত—এসব মোটেও কাম্য নয়: রোজিনা

আশি ও নব্বই দশকে বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় এক অভিনেত্রীর নাম রোজিনা। বহু বছর ধরে যদিও চলচ্চিত্র অভিনয়ে নেই তিনি। তবে যত দিন পর্যন্ত অভিনয় করেছেন, তত দিনে তাঁর সিনেমার সংখ্যা ২৫৫-তে দাঁড়ায়। ১৯৮৬ সালে পাকিস্তানের ‘হাম দো হায়’ সিনেমায় অভিনয় করে সেখানকার ‘নিগার অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করে ভারতীয় উপমহাদেশে চমক সৃষ্টি করেন তিনি। ভারত ও পাকিস্তানের সে সময়ের জনপ্রিয় নায়ক মিঠুন, নাদিমসহ উপমহাদেশের বিখ্যাত বহু অভিনেতার বিপরীতে নায়িকা হিসেবে অভিনয় করেন রোজিনা। অভিনয়ের জন্য তিনি ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ১৫টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেন। এক যুগের বেশি সময় প্রবাস জীবন যাপন করা এই নায়িকা বছরান্তে একবার দেশে আসেন। এবার দেশে আসেন এপ্রিলের শেষ দিকে। অংশ নেন চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচনেও। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত কয়েক মাসে এফডিসিতে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের চাক্ষুষ সাক্ষীও তিনি। চলচ্চিত্র পরিবারের হয়ে তাঁকে দেখা গেছে বিভিন্ন সভা-সমাবেশেও। গতকাল বৃহস্পতিবার চলচ্চিত্রের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মনজুর কাদের

দেশের চলচ্চিত্রের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাইছি।
১৯৯৩ সালে সিনেমায় কাজ করার পর এক যুগের বিরতি। ২০০৫ সালে এসে আবার ‘রাক্ষসী’ সিনেমায় কাজ করি। তখনো এফডিসিতে যাওয়া-আসা হতো। এরপর আর কোনো সিনেমায় কাজ করা হয়নি, তাই এফডিসিতে যাওয়া হয়নি। ২০১৬ সালে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির আয়োজনে একটি ইফতার অনুষ্ঠানে গেলে সিনেমার মানুষদের সঙ্গে দেখা হলো। এরপর যতবারই ঢাকায় আসা হতো, নাটক বা টেলিছবির কাজ করতাম। আমাদের সময়ে সবার মধ্যে একটা অন্য রকম আন্তরিকতা কাজ করত। টি-বয় থেকে শুরু করে সবাই একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান, আদর, স্নেহ, ভালোবাসা—এসব বজায় রাখত। আমাদের পরে এসেছে মৌসুমি, শাবনূর, সালমান শাহ, রিয়াজ, ফেরদৌস। ওদের মধ্যেও কিন্তু সিনিয়রদের প্রতি সম্মানের এই বিষয়গুলো খুব ভালোভাবে কাজ করত। কাজের প্রতি চরম ভালোবাসা ছিল। এখন অনেকেই কাজ করছে, যাদের মধ্যে এসবের অনেক অভাব লক্ষ করি। তবে এটার জন্য ওদেরকে এককভাবে দোষ দেব না। আমি বলব, প্রযোজক-পরিচালকেরা ওদের ঠিকমতো গাইড করতে পারেননি। যদি গাইড করতে পারতেন, তাহলে এমনটা হতো না।

অনেকেই বলছেন, চলচ্চিত্রে এখন শাকিব খান ও শাকিব খানবিরোধী পক্ষ দৃশ্যমান। আপনি নিজে অবশ্য অনেক কিছুর সাক্ষী। এই যে অবস্থা, এটা থেকে বের হওয়ার উপায় কী?
এটা তো স্বীকার করতে হবে, শাকিব বাইরের ছেলে নয়। সে আমাদেরই সন্তান। চলচ্চিত্র পরিবারেরই একজন। নিঃসন্দেহে সে আমাদের এই ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে মূল্যবান তারকা। সবাই তাকে চেনে। তার নামে সিনেমা হলে দর্শকেরা ছোটে। সোজা কথা, সে একজন হিরো। অন্যান্য হিরোর চেয়ে দেশে ও দেশের বাইরে তার অনেক বেশি পরিচিতি। এটাও ঠিক, যে গাছ যত বেশি বড়, তার ওপর দিয়ে ঝড়ঝাপটা একটু বেশি বইবে। আমরা এ-ও দেখি, যে গাছে ফল বেশি ধরবে, সে গাছ সবচেয়ে নুয়ে পড়বে। তাই বলব, শাকিব যেহেতু বড়, তার ওপর দিয়ে অনেক ঝড় বইবেই, কিন্তু তাকে হাল ধরতে হবে। সে যেহেতু বড়, তাকে এই দায়িত্ব নিতেই হবে। আমি যখন সংসারের বড় মেয়ে বা বড় ছেলে, তখন সংসার ও সেই সংসারের ছোটদের প্রতি তো আমার অনেক দায়িত্ব। তারা অনেক কথা হয়তো বলবে, কিন্তু বড়কে ধৈর্য হারিয়ে ফেললে তো চলবে না। আমি যত বড় হব, তত বিনয়ী হতে হবে। বিনয়ী মানে এই নয় যে যখন-তখন পা ছুঁয়ে সালাম করতে হবে। সম্মান-ভালোবাসা-শ্রদ্ধা মনের ভেতর লালন করতে হবে।

চলচ্চিত্র পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শাকিব খানের কিছু কথাবার্তার কারণে চলচ্চিত্রের মানুষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করেছে। তাঁর প্রতি আপনার বিশেষ কোনো পরামর্শ?
শাকিব তুমি অনেক বড় হয়েছে, আরও অনেক বড় হও—এই দোয়া করছি। তবে আমরা চাইব, তুমি ধৈর্য হারিয়ে মাঝেমধ্যে যে এলোমেলো কথা বলে ফেল, সে ব্যাপারে তুমি সংযত হবে। আমরা সবাই কিন্তু শিল্পী। আমাদের মনটা খুবই নরম। আমরা খুবই আবেগপ্রবণ। আমাদের এই আবেগে যেন উগ্রতা প্রকাশ না পায়, সেদিকে খেয়াল রাখবে। তুমি আমাদের অনেক বড় একটা সম্পদ। তোমাকে ধৈর্য ধরতে হবে, সহ্য করতে হবে। আসলে কাজটা হচ্ছে একটা টিমওয়ার্ক। এখানে সবাইকে মিলেমিশে চললে ভালো কিছু হবে, ইনশা আল্লাহ।

রোজিনাবুধবারও খবর পেলাম, চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি একজন পরিচালককে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগে শাকিব খানের অবাঞ্ছিত হওয়ার খবরও শোনা গিয়েছিল। পরে অবশ্য শাকিব ইস্যুতে চলচ্চিত্র পরিবার থেকে বলা হয়, অবাঞ্ছিত নয়, তাঁদের কোনো সদস্য শাকিব খানের সঙ্গে কাজ করবেন না। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?
চলচ্চিত্রের পরিবারের সবার মধ্যে নিজেদের ঐক্যের জায়গাটা শক্ত করতে হবে। বহিষ্কার, অবাঞ্ছিত করা—মোটেও কাম্য নয়। আমাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হতেই পারে। আমাদের ঘরের সমস্যা যদি আমরা নিজেরা বসে সমাধান না করি, তাহলে সেটা তো আমাদেরই ব্যর্থতা। আর নিজেদের ব্যর্থতা যদি বাইরের লোকজনকে জানাতে থাকি, এতে কিন্তু আমাদেরই সম্মান নষ্ট হবে। ঘরের ভেতরের খবর বাইরে যাবে কেন, আমরা চাইলে কিন্তু নিজেরাই সমাধান করতে পারি। কেউ যদি অন্যায় করে, তাহলে ডেকে এনে তাঁকে শাসন করলেই হয়। একটা কথা কি জানেন, ওপরে থুতু ফেললে তা কিন্তু নিজের ওপরই পড়বে। কথার কথা, আমি একটা অন্যায় করেছি, কিন্তু আমি তো চলচ্চিত্রেরই একজন মানুষ। তাই বলে আমাকে কি বাদ দিয়ে দিলে সমাধান হয়ে যাবে! সবাইকে বলব, আমাদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি, মান-অভিমান সবই হবে, কিন্তু এসব নিয়ে কাদা ছোড়াছুড়ি না করে নিজেরা বসে যেন সমাধান করি। আরেকটা কথা, আমাদের কাজে বেশি মনোযোগী হতে হবে। আর ঘরের কথা যেন বাইরে না যায়, সেই চেষ্টা করতে হবে। এখন কিন্তু মিডিয়াও বেড়ে গেছে। আগে যেমন বলতাম দেয়ালেরও কান আছে, এখন বলি বাতাসেরও কান আছে। তাই মিডিয়ার দোষ না দিয়ে বলব, আমরা যাঁরা ঘরের মানুষ, তাঁরা যদি সাবধানে কথা বলি, তাহলে এত কিছু ছড়াবে না। কাজ করব আর ইতিবাচক কথা বলব।

সিনেমা নিয়ে নিজের কোনো পরিকল্পনার কথা যদি বলতেন।
মনে মনে অনেক উদ্যোগ নিচ্ছি। এদিকে চিত্রনাট্যও লেখার কাজও চলছে। আমি চলচ্চিত্রের মানুষ, চলচ্চিত্র ছাড়া কিছু ভাবি না। ইচ্ছে আছে সিনেমা নিয়ে আবার কিছু করার, চূড়ান্ত হলে তখন বলব।

সম্পর্কিত সংবাদ
ডেস্ক রিপোর্ট