ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে কতটা প্রভাব পড়বে?

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে কতটা প্রভাব পড়বে?

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ শাসক হিসেবে ছিলেন দুর্বল। তাই দেশটির সেনাবাহিনী সহজেই তাঁর কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলতে পারত। এরপরও সম্ভাবনা ছিল, নওয়াজ পূর্ণ মেয়াদ পার করতে পারবেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানে স্থিতিশীল গণতন্ত্র আসবে।

পানামা পেপারস কেলেঙ্কারি মামলার রায়ে সর্বোচ্চ আদালত নওয়াজ শরিফকে অযোগ্য ঘোষণা করেন। নওয়াজের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

পাকিস্তানে সরকারের এই বদল ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে? সোজা কথায় বলা যায়, পাকিস্তানে সরকারের ওপর সেনাবাহিনীর প্রভাব বা কর্তৃত্ব বরাবরই প্রবল। স্বল্প মেয়াদে সরকারের পরিবর্তন ভারতের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কে খুব বেশি প্রভাব নাও ফেলতে পারে। তবে পানামা পেপারস কেলেঙ্কারির রায়ে এটা স্পষ্ট যে বেসামরিক সরকারের ওপর সেনাবাহিনীর আধিপত্য বাড়ছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে সেনাবাহিনী বেশি তৎপর হয়ে উঠলে দীর্ঘ মেয়াদে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কে উত্তেজনা বাড়তে পারে।

মেয়াদ পূরণ হওয়ার আগেই নওয়াজের সরে যাওয়ায় পাকিস্তানে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আসবে। আর সন্দেহ নেই এই সুযোগে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আরও আত্মবিশ্বাসী হবে। পাকিস্তানের নতুন সেনাপ্রধান কামার জাভেদ বাজওয়া এর মধ্যেই রাজনৈতিক শ্রেণির বিরুদ্ধে আত্মপ্রচার শুরু করেছেন। সেনাবাহিনী ক্ষমতার জোরে কত-কী করতে পারে, তার অন্যতম উদাহরণ ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ না করে গুপ্তচরবৃত্তি ও অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে পাকিস্তানের সামরিক আদালতে ভারতের নাগরিক কুলভূষণ যাদবের ফাঁসি। এটিকে ভিয়েনা কনভেনশনের লঙ্ঘন হিসেবেও গণ্য করা হয়।

এটা ঠিক যে নওয়াজ শরিফ কখনোই সেনাবাহিনীকে চ্যালেঞ্জ করেননি। তবে তাঁর সময়ে পাকিস্তানের রাজনৈতিক শক্তি চাঙা হওয়ার চেষ্টা করছিল—এমন আভাস মিলেছে।

এর প্রমাণ মেলে গত বছরের অক্টোবর মাসে। সে সময় পাকিস্তানের গণমাধ্যমের খবরে পাকিস্তান সরকার এবং সেনাবাহিনীর মধ্যেকার রুদ্ধদ্বার বৈঠকের গোপন খবর প্রকাশ হয়। পাকিস্তানের একটি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের ভাই ও পাঞ্জাবের প্রাদেশিক মন্ত্রী শাহবাজ শরিফ দেশটির সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের প্রধান রিজওয়ান আখতারের দিকে অভিযোগের তির ছোড়েন। শাহবাজ অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সময়ে সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের কারামুক্ত করতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছে আইএসআই। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডার চলে।

পাকিস্তানের একটি গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়, বেসামরিক সরকার ওই বৈঠকে চাঁছাছোলা, খোলাখুলি এবং নজিরবিহীনভাবে পাকিস্তানের সেনাপ্রধানকে সতর্ক করেছিল। পাকিস্তান যে আন্তর্জাতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়তে পারে, সেই ইঙ্গিত দেওয়া হয় সেনাবাহিনীকে।

পাকিস্তান সরকারের ভারতনীতিতে সব সময়ই সেনাবাহিনীর প্রভাব ছিল। বলা যায়, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ভারতের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কে সব সময়ই ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। গত বছর উরিতে ভারতীয় সেনাঘাঁটিতে হামলার পর থেকে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কে টান টান উত্তেজনা তৈরি হয়। ভারতীয় নাগরিক কুলভূষণ যাদবের মৃত্যুদণ্ডে দুই দেশের সম্পর্কে আরও অবনতি হয়। সেনাবাহিনীর প্রভাব ভারতে ততটা নেই। তাই শরিফের পক্ষে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের খুব বেশি সুযোগ ছিল না।

ভারতীয় বিশ্লেষকেরা বলছেন, সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভারতের বড় চ্যালেঞ্জ হলো পাকিস্তান সরকারকে সেনা প্রভাবমুক্ত করা। এটি করতে পারলে ভারতীয় অঞ্চলে জঙ্গি তৎপরতা থেকে পাকিস্তানকে নিবৃত্ত করা সম্ভব ছিল। তবে পাকিস্তানে দীর্ঘ মেয়াদে সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব ভারতের জন্য ইতিবাচক হবে না।

এমন আশা ছিল, সময়ের ধারাবাহিকতায় পাকিস্তানে এমন নির্বাচিত সরকার আসবে, যারা সেনাবাহিনীর পাশাপাশি নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান সুদৃঢ় করতে পারবে। তবে শরিফ সরে যাওয়ায় ভবিষ্যতে পাকিস্তানে শক্ত অবস্থানে থাকতে পারে—এমন কোনো রাজনৈতিক নেতা আসার সুযোগ কম।

নওয়াজ শরিফ ভারতের সঙ্গে আলোচনার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। হিন্দুধর্মাবলম্বীদের হোলি উৎসবে তাঁর ভাষণও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। তবে এসব উদ্যোগ ভেস্তে যায় জম্মু-কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণরেখা (এলওসি) ইস্যুতে ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান কামার জাভেদ বাজওয়ার আক্রমণাত্মক আচরণে।

সেনাপ্রধানের সঙ্গে শাহবাজ শরিফের বৈঠকে অন্তর্দ্বন্দ্বের খবর গণমাধ্যমে ফাঁস হয়ে যাওয়ায় নওয়াজ শরিফ চাপের মুখে পড়েন। সেনাবাহিনীর চাপে শীর্ষ দুই সরকারি কর্মকর্তাকে অপসারণ করতে বাধ্য হন নওয়াজ শরিফ।

সরকারের বদল পাকিস্তানের ভারতনীতিতে খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না। কারণ, সব সময়ই দেশটির সরকারের ওপর সেনাবাহিনীর আধিপত্য ছিল। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে সেনাবাহিনীর বেশি তৎপরতা ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্কে উত্তেজনা বাড়াবে।

আর এক বছর পার করতে পারলেই মেয়াদ পূর্ণ করতে পারত নওয়াজ শরিফ সরকার। এমন আশা ছিল যে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানে গণতন্ত্র স্থিতিশীল হবে। তবে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে নওয়াজ শরিফকে অযোগ্য ঘোষণা এবং তাঁর পদত্যাগ সেই আশায় পানি ঢেলে দিয়েছে।

সম্পর্কিত সংবাদ
ডেস্ক রিপোর্ট