“ভালবাসার বর্ষা”

“ভালবাসার বর্ষা”

ভোর থেকেই আকাশ ভেঙে অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে।বন্ধ জানালার ঘোলা কাঁচের বাইরে সে বৃষ্টি স্পষ্টভাবে দৃষ্টিগোচর হয়না। তবুও অনুভূতিতে প্রবল বর্ষণ! ভিজছে গাছ,ভিজছে প্রকৃতি,ডুবছে মাঠ।ঝড় জল উপেক্ষা করে ফুটবল নিয়ে মাঠে খেলতে নেমেছে দুরন্ত ছেলের দল।বাড়ির পাশের খালের পানি থেকে আসছে  পচানো পাটের গন্ধ। বাঁশবাগান আর ঢোল কলমিতে ঘেরা পুকুরের পানি ছাপিয়ে লাফিয়ে পাড়ে উঠছে কৈ আর খলিশা।আর আমি খেলার সাথিদের সাথে নিয়ে কাঁদাজল মেখে মাছ ধরে রাখছি বাহাতে ঝুলিয়ে রাখা খালোইতে(বাঁশের তৈরী মাছ রাখার একধরনের ঝুঁড়ি)।

আহা!ঘুম ভাঙতেই শুনি রিমঝিম মাতাল ছন্দ।বাইরে তখনো বিরামহীন ভাবে বৃষ্টি ঝরছে।তাই আধো ঘুমে আধো জাগরনে এরকম স্বপ্ন ভেবেই কাটিয়ে দিলাম আরো কিছুক্ষণ!ভীষনভাবে বৃষ্টি মাতাল আমি।তাই বৃষ্টিবেলা একান্তভাবে আমার। বৃষ্টিবেলায় এমনি ভাবেই নষ্টালজিক হয়ে পড়ি।মনের অলিতে গলিতে এলোমেলো হাঁটাহাঁটি করে অজস্র স্মৃতি।আর তাই বাঁধ ভেঙে দেই সকল নিয়মিত নিয়মগুলোর।

বর্ষা সমাগত।কদম গাছে এসেছে কুঁড়ি।গ্রামের খাল গুলো ইতিমধ্যে পানি জমে ভরে উঠছে একটু একটু করে।জোয়ারে আসা পানি পেয়ে নদীগুলো খলবলিয়ে হাসছে নব যৈবতী কন্যার মত।খেয়া পারাপারের জন্য মাঝি তার এক মল্লাই নৌকায় লাগাচ্ছে  আলকাতরার প্রলেপ।জেলে বুনছে নতুন জাল। গ্রামের ঘরে ঘরে চলছে কলাগাছের ভেলা আর বাঁশের সাঁকো বানানোর প্রস্তুতি।

একসময় বর্ষা মানে অনেকটা এমন হলেও জলবায়ূ পরিবর্তনের কারনে আজ বর্ষা হারিয়েছে তার চিরন্তন রূপ।তবুও শেষ মহূর্তের আয়োজনে তোড়জোর চলছে বর্ষা উদযাপন কমিটির।তারও চেয়ে বেশী আয়োজন বর্ষাপ্রেমীর মনে।

    ষড়ঋতুর মধ্যে অন্যতম এবং বর্নিল বর্ষাকাল।চিরন্তন রূপ হারালেও বর্ষা আজও হারায়নি তার নিজস্ব আবেদন।বছর ঘুরে যখনই আসে রুপসী তার ছোঁয়া লাগে প্রতিটি প্রাণের গভীরে।বর্ষা ঋতুর মনোমুগ্ধতায় তাই ডুবে থাকে সবাই। সেকারনেই এখনও বর্ষাকে ঘিরেই চলে আয়োজন বর্ষামোদীর হৃদয়ে।

    “মন যেন জলে ভাসা বর্ষার কদম ফুল!” কদম ফুল যুগে যুগে প্রেমিকদের কাছে ভালবাসার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।আর কদম বর্ষা ঋতুর বিশেষ আকর্ষন।তাই বর্ষাকে ভালবারাস ঋতু বলেই মনে করা হয়।

“এমন দিনে তারে বলা যায়,এমন ঘন ঘোর বরিষায়।” কিংবা “আজি ঝরঝর বাদল দিনে,জানিনে জানিনে কিছুতে কেন যে মন লাগেনা।”-রবীঠাকুরের এই গানে ভালবাসার যে আকুলতা তার মাঝেও লুকিয়ে আছে বর্ষা।

“হে বর্ষা এত বেশী ঝরোনা যে আমার প্রেয়সী আমার কাছে আসতে না পারে।আবার ও এসে যাওয়ার পর এত মুষল ধারায় ঝরো যে ও যেতেই না পারে!”-(সংগৃহীত)।অথবা “যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো,চলে এসো এক বরষায়!”-হুমায়ূন আহমেদ।বর্ষার কাছেই প্রেমিক হৃদয়ের কতো আকুতি।

কবি মহাদেব সাহা বলেছেন-“কাগজ আবিষ্কারের পুর্বে মানুষ প্রেমের কবিতা লিখে রেখেছে আকাশে।সেই ভালোবাসার কবিতা এই বৃষ্টি,এই ভরা বর্ষা!” আহা!এরপরেও কি বর্ষাকে ভালবাসার ঋতু না বলে পারা যায়!

বর্ষা ভালোবাসার ঋতু হলেও এর রয়েছে নানা রূপ।তাই একে নানা ভাবে নানা নামে ডাকা যায়।বর্ষা মানেই ভালোবাসা,বর্ষা মানেই মন কেমন করা।বর্ষা মানে প্রিয় মানুষটির সাথে বৃষ্টিতে ভেজার আকুলতা।বর্ষা মানে নিয়মিত রান্না বাদ দিয়ে খিচুড়ি-ইলিশ ভাজা খাওয়া।বর্ষা মানে মনের কোনে জমে থাকা হাজারো আবেগী স্মৃতি একে একে মনে মনে পড়ে মন ব্যথাতুর হওয়া।বর্ষা মানেই ভালোবাসা,মান-অভিমান,আনন্দ-বেদনার এক মিশেল অনুভূতি।

*রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন*
সম্পর্কিত সংবাদ