মায়ের সম্মান ও মর্যাদা প্রদানে ইসলাম

মায়ের সম্মান ও মর্যাদা প্রদানে ইসলাম

আমাদের সবার কাছে সবচেয়ে মধুর প্রিয় যে শব্দটি সেটি হলো ‘মা’। সাময়িক মোহ, সাময়িক দামি বা অন্য কিছু হয়তো এ শব্দটির চেয়েও অন্য কোনো শব্দকে খানিকটা প্রিয় করে তোলে, কিন্তু খুব অচিরেই তা বড় ‘ভুল’ হিসেবে চিহ্নিত হয়। মা, মা, এবং মা। প্রিয় এবং মূল্যবান শব্দ একটিই, এবং একটিই মাত্র। শুধু প্রিয় শব্দই নয়, প্রিয় বচন -মা। প্রিয় অনুভূতি -মা। প্রিয় ব্যক্তি –মা। প্রিয় দেখাশুনা –মা। প্রিয় রান্না -মা। প্রিয় আদর -মা। সব ‘প্রিয়’ গুলোই শুধুমাত্র মাকে কেন্দ্র করেই সব প্রিয় স্মৃতি। কারণ মা-ই পৃথিবীতে একমাত্র ব্যক্তি যে কিনা নিঃশর্ত ভালোবাসা দিয়েই যায় তার সন্তানকে কোনো কিছুর বিনিময় ছাড়া, অথচ আমরাই সেই প্রিয় মা-কে সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে নিজের বিবেকের সাথে হার মেনে ভুলে যাই, যে মা আমাকে সেই ছোটবেলা থেকে আদর-যত্ন করে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ হয়ে মাথা উঁচু করে সমাজের মানুষের সামনে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছেন সেই মা অনেক সময় কত অবহেলার পাত্র হয়ে দাঁড়ান!

মাকে নিয়ে ইসলাম যত কথা বলেছে, অন্য কোনো ধর্ম তত কথা বলেছে কি না জানি না। মাকে নিয়ে বলতে বলতে শেষ পর্যন্ত মাকেই জান্নাত, মাকেই জাহান্নাম বলেছে ইসলাম। মাকে খুশি করলে জান্নাত, কষ্ট দিলে জাহান্নাম। এত সম্মান যে মানুষের, সেই মানুষের প্রতি আমাদের কত না অবহেলা!আল কুরআনে বলা হয়েছে:

আমি মানুষকে তাদের পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার জোর নির্দেশ দিয়েছি। যদি তারা তোমাকে আমার সাথে এমন কিছু শরিক করার জোর প্রচেষ্টা চালায়, যার সম্পর্কে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তবে তাদের আনুগত্য করো না। আমারই দিকে তোমাদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর আমি তোমাদেরকে বলে দেব যা কিছু তোমরা করতে। (আনকাবুত:আয়াত- ৮)।

আপনি বলুন: এসো, আমি তোমাদেরকে ওইসব বিষয় পাঠ করে শুনাই, যেগুলো তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্যে হারাম করেছেন।  তা এই যে, আল্লাহর সাথে কোনো কিছুকে অংশীদার করো না, পিতা-মাতার সাথে সদয় ব্যবহার করো, স্বীয় সন্তানদেরকে দারিদ্রের কারণে হত্যা করো না, আমি তোমাদের ও তাদের আহার দেই, নির্লজ্জতার কাছেও যেয়ো না, প্রকাশ্য হোক কিংবা অপ্রকাশ্য, যাকে হত্যা করা আল্লাহ হারাম করেছেন, তাকে হত্যা করো না; কিন্তু ন্যায়ভাবে। তোমাদেরকে এ নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা বুঝ। (আনআম: ১৫১)

তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাকে ছাড়া অন্য কারও এবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হযন; তবে তাদের ‘উহ’ শব্দটিও বলো না এবং তাদের ধমক দিও না এবং বল তাদেরকে শিষ্ঠাচারপূর্ণ কথা। (বনি ইসরাইল: ২৩)

আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মাতা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে। তার দুধ ছাড়ানো দু বছরে হয়। নির্দেশ দিয়েছি যে, আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। অবশেষে আমারই কাছে ফিরে আসতে হবে। (লোকমান: ১৪)

আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের আদেশ দিয়েছি। তার জননী তাকে কষ্টসহকারে গর্ভে ধারণ করেছে এবং কষ্টসহকারে প্রসব করেছে। তাকে গর্ভে ধারণ করতে ও তার স্তন্য ছাড়তে লেগেছে ত্রিশ মাস। অবশেষে সে যখন শক্তি-সামর্থে, বয়সে ও চল্লিশ বছরে পৌছেছে, তখন বলতে লাগল, হে আমার পালনকর্তা, আমাকে এরূপ ভাগ্য দান করো যাতে আমি তোমার নেয়ামতের শোকর করি, যা তুমি দান করেছ আমাকে ও আমার পিতা-মাতাকে এবং যাতে আমি তোমার পছন্দনীয় সৎকাজ করি। আমার সন্তানদেরকে সৎকর্মপরায়ণ করো, আমি তোমার প্রতি তওবা করলাম এবং আমি আজ্ঞাবহদের অন্যতম। (আল আহক্বাফ: ১৫)

আর উপাসনা করো আল্লাহর, শরিক করো না তার সাথে অপর কাউকে। পিতা-মাতার সাথে সৎ ও সদয় ব্যবহার করো এবং নিকটাত্নীয়, এতিম-মিসকিন, প্রতিবেশী, অসহায় মুসাফির এবং নিজের দাস-দাসির প্রতিও। নিশ্চয়ই আল্লাহ পছন্দ করেন না দাম্ভিক-গর্বিতজনকে। (আননিসা :৩৬)

হাদিস (সিহাহ সিত্তাহ)

এক ব্যক্তি নবীজীর স. কাছে এসে বলল, সদ্ব্যবহার পাওয়ার অধিকার বেশি কোন মানুষের? তিনি বললেন, তোমার মা। লোকটা বলল, এরপর কে? তিনি বললেন, এরপরও তোমার মা। লোকটা বলল, এরপর কে? তিনি বললেন, এরপরও তোমার মা। লোকটা বলল, এরপর কে? তিনি বললেন, এরপর তোমার বাবা। -বুখারি, মুসলিম, তিরমিযি।

এক ব্যক্তি নবীজীর স. কাছে এসে জিহাদের জন্য অনুমতি চাইল। নবীজী স. বললেন, তোমার পিতা-মাতা জীবিত? লোকটা বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তাহলে তাদের জন্যই পরিশ্রম করো (এতেই তুমি জিহাদের সওয়াব পাবে)। -বুখারি, মুসলিম।

এক ব্যক্তি নবীজীর স. কাছে এসে বলল, আমি আল্লাহর কাছে সওয়াবের আশায় আপনার হাতে হিজরত ও জিহাদের ব্যাপারে শপথ করছি। রাসুল স. বললেন, তোমার পিতা-মাতার কোনো একজন জীবিত? লোকটা বলল, হ্যাঁ, উভয়ই। তিনি বললেন, তুমি তো আল্লাহর কাছে সওয়াব আশা করো। লোকটা বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তাহলে তোমার পিতা-মাতার কাছে ফিরে যাও এবং তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করো। – মুসলিম।

একদা রাসুল স. বললেন, ধ্বংস হোক। ধ্বংস হোক। পুনরায় ধ্বংস হোক। বলা হলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কার কথা বলছেন? তিনি বললেন, যে তার পিতা-মাতা উভয়কে বা কোনো একজনকে বৃদ্ধাবস্থায় পেয়েছে, অথচ এরপরও সে (তাদের খিদমত করে) জান্নাতে যেতে পারে নি। -মুসলিম।

নবী স. বলেছেন, পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন, আর পিতা-মাতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন। -তিরমিযি

আবু দারদা রা. বলেন, আমি নবীকে স. বলতে শুনেছি, পিতা-মাতা জান্নাতের মাঝের দরজা। যদি চাও, দরজাটি নষ্ট করে ফেলতে পারো, নতুবা তা সংরক্ষণও করতে পারো। – তিরমিযী।

রাসূলুল্লাহ স. বলেন, আমি কি তোমাদের সবচেয়ে বড় কবিরা গোনাহ কোনগুলো তা বলব না? সাহাবাগণ বললেন, অবশ্যই ইয়া রাসূলাল্লাহ। তিনি বললেন, আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া। বর্ণনাকারী বলেন, এতটুকু বলে নবীজী স. বসে পড়লেন, এতক্ষণ তিনি হেলান দিয়ে ছিলেন। অতঃপর নবী স. বললেন, মিথা সাক্ষ্য দেয়া। এ কথাটি তিনি এতবার বলতে থাকলেন যে আমরা মনে মনে বললাম, আর যদি না বলতেন! -তিরমিযী।

রাসূলুল্লাহ স. বলেন, অন্যতম কবীরা গোনাহ হলো, ব্যক্তি তার পিতা-মাতাকে গালমন্দ করা। সাহাবাগণ বললেন, পিতা-মাতাকেও কি কেউ গালমন্দ করে? নবী স. বললেন, হ্যাঁ। কেউ কারো পিতাকে গালি দিলে সেও তার পিতাকে গালি দেয়। আবার কেউ কারো মাকে গালি দিলে, সেও তার মাকে গালি দিলে। (এভাবে অন্যের পিতা-মাতাকে গালমন্দ করলে প্রকারান্তরে নিজের পিতা-মাতাকেই গালমন্দ করা হয়।) -তিরমিযী।

রাসূলুল্লাহ (স.) বলেন, তিন রকম দোয়া নিঃসন্দেহে আল্লাহ্র কাছে কবুল হয়। মজলুমের দোয়া, মুসাফিরের দোয়া আর সন্তানের জন্য পিতা-মাতার দোয়া।-তিরমিযি।

*রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন*
সম্পর্কিত সংবাদ