মেয়েরা ওয়েট ট্রেনিং না করলে ঘোর বিপদ

মেয়েরা ওয়েট ট্রেনিং না করলে ঘোর বিপদ

২০ বছর বয়স থেকে ওয়েট ট্রেনিং করলে সবচেয়ে ভাল৷ না হলে শুরু করুন ৩০ পেরোলে৷ কারণ এই সময় থেকেই ফিটনেস হরমোন বা হিউম্যান গ্রোথ হরমোন হু হু করে কমে৷ পেশীর ক্ষয় শুরু হয়৷ কমতে শুরু করে তার জোর৷ আমেরিকান কলেজ অফ স্পোর্টস মেডিসিনের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ৩০–৫০ বছর বয়সের মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ পেশী ক্ষয়ে যায়৷ তার পর তা আরও বাড়ে৷ ৬০–৭০ বছর বয়সের মধ্যে পেশীর জোর কমে প্রায় ১৫ শতাংশ৷ পরের ১০ বছরে কমে ৩০ শতাংশ৷ এমনিতেই মেয়েদের শরীরে পেশীর তুলনায় ফ্যাট বেশি থাকে৷ সেই পেশীও যদি ক্ষইতে শুরু করে, ক্যালোরি খরচের হার কমে যায়৷ টানটান ভাব কমে শরীরের৷ চর্বি জমে থলথলে হতে শুরু করে৷ পেটে–কোমরে জমে বেশি৷ জমে শরীরের ভিতরের প্রত্যঙ্গে৷ তার হাত ধরে বাড়ে ডায়াবেটিস, হাই কোলেস্টেরল, হৃদরোগ, ফ্যাটি লিভার, অস্টিওপোরোসিস ইত্যাদি লাইফস্টাইল ডিজিজের আশঙ্কা। হাত–পায়ের পেশীর জোর কমতে থাকায় কথায় কথায় পড়ে যাওয়া, হাড়গোড় ভাঙা, এমনকী দৈনন্দিন কাজকর্ম করতেও অসুবিধা হয়৷ বাড়ে ডিপ্রেশনের প্রকোপ৷

সমাধান

সমাধান ওয়েট ট্রেনিং এবং প্রোটিন সমৃদ্ধ সুষম খাবার৷ আজ থেকেই শুরু করুন, সে আপনার বয়স ৫০ হোক কি ৬০৷ আরও বেশি হলেও ক্ষতি নেই৷ কারণ আমেরিকান কলেজ অফ স্পোর্টস মেডিসিনের স্টাডি অনুযায়ী, নিতান্ত বৃদ্ধও যদি সঠিক ভাবে ওয়েট ট্রেনিং করেন, ৩–৪ মাসের মধ্যে পেশীর শক্তি ২–৩ গুণ হয়ে যায়৷ কিছু ক্ষেত্রে মাসল মাসও বাড়ে৷ তার হাত ধরে বাড়ে রেস্টিং ক্যালোরি লস, কমে ফ্যাট ও লাইফস্টাইল ডিজিজের আশঙ্কা৷ ভাল ঘুম হয়৷ সহজ হয় স্ট্রেস সামলানো৷ নার্সিংহোমে ভর্তি ৯০ বছর বয়স্ক কিছু মানুষকে আট সপ্তাহ ধরে ট্রেনিং দিয়েও দেখা গিয়েছে তাঁদের শারীরিক সক্ষমতা ১৬৭–১৮০ শতাংশের মতো বেড়েছে৷ অর্থাৎ, যে কোনও বয়সে শরীরে–মনে সুস্থ ও সুন্দর হতে চাইলে ওয়েট ট্রেনিংয়ের বিকল্প নেই৷

কিন্তু…

হ্যাঁ, ‘কিন্তু’-ও আছে৷ কারণ, প্রচলিত ধারণা মেয়েরা ওয়েট ট্রেনিং করলে চেহারা পুরুষালী ও পেশীবহুল হয়ে যায়৷ অর্থোপেডিক ও স্পোর্টস মেডিসিন বিশেষজ্ঞ দেবব্রত কুমার জানিয়েছেন, মাসল ফোলার মূল কারিগর টেস্টোস্টেরন৷ মেয়েদের শরীরে এর পরিমাণ থাকে ছেলেদের তুলনায় ১০ ভাগের এক ভাগ৷ তার পাশাপাশি কম থাকে আপার বডি মাসল ফাইবারের মাপ ও তাদের ডিস্ট্রিবিউশনও৷ কাজেই মেয়েদের পেশী সে ভাবে ফোলে না৷ ওজন একটু বাড়তে পারে, কারণ পেশীর ওজন ফ্যাটের চেয়ে বেশি৷ তবে সম ওজনের ফ্যাট যতটা জায়গা জুড়ে থাকে, পেশীর তার চেয়ে কম জায়গা লাগে৷ ফলে ইঞ্চি কমে শরীর হয়ে ওঠে টাইট ও কার্ভি৷ উপরি পাওনা দুরন্ত ফিটনেস৷

জিমে যাওয়ার সময় নেই

যাবেন না৷ বডি ওয়েট ট্রেনিং করুন৷ শরীরের ওজনকে ব্যবহার করতে শিখলে স্ট্রেন্থ ট্রেনিংয়ের পুরো সুবিধে পাবেন৷ ধরুন, ৫ মিনিট স্পট জগিং, স্টেপ জাম্প বা স্কিপিং করলেন কি নাচলেন, স্কোয়াট, পুশআপ, প্লাঙ্ক করলেন বা হিপ ব্রিজ, ক্রাঞ্চেস তো কখনও বেঞ্চ ডিপ, ওয়াকিং লাঞ্জেস, জাম্পিং জ্যাক, বক্স জাম্পিং৷ বাচ্চাকে কোলে নিয়ে হাঁটলে, দু’–হাতে ভারী ব্যাগ বইলে, সিঁড়ি ওঠানামা করলে, এমনকী জোরে হাঁটলেও কার্ডিও–র পাশাপাশি স্ট্রেচিং ও পেশীর ওয়ার্কআউট হয়৷ তবে ঘরে ব্যায়াম করুন কি জিমে, শুরু করার আগে যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে নেবেন৷

ওয়ার্কআউটের প্রস্তুতি

  • ডাক্তারের কাছে জেনে নিন কোন ব্যায়াম করতে পারবেন আর কোনটা নয়৷ বিশেষ করে বয়স বেশি হলে, কোনও ওষুধ খেলে, অসুখ–বিসুখ বা চোটের ইতিহাস থাকলে৷
  • পর্যাপ্ত জল খেতে হবে, সেই মানসিক প্রস্তুতি নিন৷
  • নো পেইন নো গেইন–এর থিওরি চলবে না৷ যন্ত্রণা হলে থেমে যেতে হবে৷
  • ভাল করে ওয়ার্মআপ করতে হবে৷ যত বয়স বেশি, তত বেশি সময় লাগবে৷
  • পার্সোনাল ট্রেনার রাখতে না চাইলে, ভাল করে শিখে তবে নামতে হবে কাজে৷

জিমে

কার্ডিও, স্ট্রেচিং ও স্ট্রেন্থ ট্রেনিংয়ের মিশ্রণে সাজাতে হবে ওয়ার্কআউট রুটিন৷ কারেন্ট ন্যাশনাল গাইডলাইন ফর ফিজিক্যাল অ্যাক্টিভিটির সুপারিশ অনুযায়ী শরীরের প্রতিটি মেজর মাসল গ্রুপ, যেমন, পা, হিপ, পিঠ–কোমর, বুক, পেট, কাঁধ ও হাতের স্ট্রেন্থ ট্রেনিং করা উচিত সপ্তাহে অন্তত দু’বার৷ এক এক ট্রেনার এক এক ভাবে সে রুটিন সাজান৷ কেউ সপ্তাহে তিন দিন ফুল বডি ওয়ার্কআউটের পরের তিন দিন যোগা এবং কার্ডিও করতে বলেন৷ কেউ এক দিনের ব্যবধানে আপার বডি ও লোয়ার বডি ওয়ার্ক আউট করান৷ কেউ আবার এক একটা বডি পার্টের ট্রেনিং করেন এক এক দিন৷ নিয়ম হল, যে বডি পার্টের স্ট্রেন্থ ট্রেনিং হবে, তাকে তার পর বিশ্রাম নেওয়ার জন্য ৪৮ ঘণ্টা সময় দিতে হবে৷ কারণ, ওজন নিয়ে ব্যায়াম করলে পেশীতে যে চাপ পড়ে তাতে সূক্ষ্ম ভাবে টিস্যু ছিঁড়ে যায়৷ রিকভারি ফেজে সে সব জোড়ার ফলেই এক দিকে নতুন পেশী তৈরি হয়, অন্য দিকে প্রচুর ক্যালোরি খরচ হয়ে চর্বি গলতে শুরু করে৷ এ কাজে ৪৮ ঘণ্ঢার মতো সময় লাগে৷ ব্যতিক্রম হল কোর এক্সারসাইজ, অর্থাৎ, যে ব্যায়ামে শরীরের অভ্যন্তরীণ পেশী শক্তপোক্ত হয়, যেমন প্লাঙ্ক, পিলাটেজ, পেলভিক ফ্লোর এক্সারসাইজ, পুশ আউট, সুইস বল ক্রাঞ্চেস, ব্রিজ ইত্যাদি৷ এই সব ব্যায়াম রোজই করা ভাল৷

কী ভাবে ওয়ার্ক আউট করলে সব চেয়ে ভাল ফল পাবেন সে ব্যাপারে কিছু টিপস দিয়েছেন পার্ক হোটেলের জিম ট্রেনার স্নেহাশিস চক্রবর্তী৷ আসুন দেখে নেওয়া যাক৷

  • ৫–১০ মিনিট জোরকদমে হেঁটে ওয়ার্ম আপ করুন৷ কুল ডাউন করুন স্ট্রেচিং করে৷
  • সঠিক পদ্ধতিতে ব্যায়াম করুন৷ না হলে চোট যেমন লাগতে পারে, ফলও অত ভাল পাবেন না৷ প্রথম দিকে কম ওজন নিয়ে আস্তে আস্তে করুন৷
  • এক একটি বডি পার্টের জন্য ২–৩টি ওয়েট ট্রেনিংই যথেষ্ট৷ খেয়াল রাখবেন যাতে এক ঘণ্টা বা বড়জোর দেড় ঘণ্টা মধ্যে ওয়ার্কআউট শেষ হয়৷
  • ওজন তোলা–নামানোয় তাড়াহুড়ো করবেন না৷ ৩ কাউন্ট করে তুলুন, একটু হোল্ড করে, ৩ কাউন্ট করে নামান৷ এক একটি ব্যায়াম ৮–১২ বার করে মোটামুটি ২–৩টি সেট করুন৷
  • এমন ওজন তুলুন যাতে লাস্ট দুটো রিপিটেশনের সময় পেশী ক্লান্ত হয়, কিন্তু তাও ওজনটা তোলা যায়৷ এতে অভ্যাস হয়ে গেলে হাতের ক্ষেত্রে এক–দু’পাউন্ডের মতো ওজন বাড়ান৷ পায়ের ক্ষেত্রে বাড়াবেন দু’পাউন্ডের মতো৷
  • শ্বাস–প্রশ্বাসের দিকে নজর দিন৷ রেজিস্ট্যান্সের এগেনস্টে ওয়ার্কআউটের সময়, যেমন ওজন তোলা, ঠেলা বা টানার সময় শ্বাস ছাড়তে হবে৷

খাওয়া–দাওয়া

  • বায়ামের আগে চিনি ছাড়া কালো কফি খান৷ ওয়ার্কআউটের ক্ষমতা প্রায় ৩০ শতাংশ বাড়বে৷
  • হেভি ওয়ার্কআউটের ৩০–৪৫ মিনিট আগে অল্প করে কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেটজাতীয় খাবার ও প্রোটিন খেতে হবে৷
  • ব্যায়াম শেষ করার পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গ্লুকোজ, কলা বা টাটকা ফলের রস খান৷ এর ১০–২০ মিনিট পর প্রোটিন ও কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার খাবেন৷ সবচেয়ে ভাল হয় ব্যায়াম শেষ করার ৪৫–৬০ মিনিটের মধ্যে খেয়ে নিলে৷
  • দিনে বার ছয়েক খাবেন৷ প্রোটিনসমৃদ্ধ সুষম খাবার৷ ডিনার করবেন আর্লি৷

ছবি: শাটারস্টকের সৌজন্যে।

*রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন*
সম্পর্কিত সংবাদ
Leave a reply
ডেস্ক রিপোর্ট