যেদিন থেকে আমার মাকে আরও একটুখানি বেশি ভালবাসতে শিখেছিলাম

যেদিন থেকে আমার মাকে আরও একটুখানি বেশি ভালবাসতে শিখেছিলাম

সেদিন ছিল শুক্রবার। ৩১ ডিসেম্বর’২০০৪। ভোর থেকেই উৎকণ্ঠা আর উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করছিল আমার আত্নীয়-স্বজনরা সবাই। বোধকরি আমার আত্নীয়দের যারা ঢাকাতে ছিল তারা প্রত্যেকেই সেদিন হাসপাতালে উপস্থিত হয়েছিল। জীবনে ওদিনই প্রথমবার যথার্থই উপলদ্ধি করতে পেরেছিলাম সবাই আমাকে কতটা ভালবাসে।

শুক্রবার বলে বহিঃর্বিভাগ বন্ধ থাকায় তুলনামূলকভাবে ফাঁকা ছিল হাসপাতাল চত্বর।তাছাড়া হাসপাতালের ব্যাবস্থাপনা পরিচালক আমাদের বিশেষ পরিচিত বলেই বোধহয় বাড়তি সুবিধাও মিলেছিল। তাই আমার বাড়ীর লোকজনের ভীড় বাড়াতে খুব একটা অসুবিধা হয়নি।

যাইহোক আমাকে রাখা হয়েছিল নিবিড় পর্যবেক্ষন কক্ষে। সকলে বাইরে অপেক্ষমান। আর অসহ্য যন্ত্রনা নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে,অন্যরকম এক অনুভুতি নিয়ে আমি সময়ের হিসাব করছি। মাঝে মাঝে রুমের ভিতরে পায়চারি করছি। যন্ত্রনায় কখনো কখনো শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। আমি শুধু বারবার জানতে চাচ্ছিলাম “কয়টা বাজে?”।

কিন্তু সবাই আমার এই প্রশ্নের উত্তর প্রত্যেকবারই কৌশলে এড়িয়ে যাচ্ছিল। ওই কক্ষের দেয়ালে কোন ঘড়ি ছিল না। আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রোদের তীব্রতা বুঝে সময় অনুমান করার চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম।কিছুক্ষন পরপর ডাক্তার এসে আমার রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন দেখে যাচ্ছে।

আপনজন কেউ আমার সাথে নেই। কেমন যেন অসহায় বোধ করছিলাম। ঠিক তখনই আমার মা আর খালা আমাকে দেখতে এল। আমার ধারনা তখন দুপুর হয়ে গেছে। আমি তাদের দেখে প্রথম বারের মত আমার খালাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠেছিলাম। কারন আমার মা চাকরি করতেন বলে সেভাবে আমার যত্ন নেয়া বা তত্বাবধানের কাজটা করতে পারতেন না। তাই এই খালাই ছোট বেলায় আমার দেখা-শুনা করতেন। বলা যায় মায়ের অভাব অনেকটাই সে পুরোন করেছিলেন। আমার মা এবং খালা দোয়া পড়ে আমার মাথায় ফুঁ দিয়ে দিলেন। ভরসা পেলেম অনেকটা। তারা আমার মাথায় হাত রেখে বলেছিল-“মা ভয় পেয়ো না,আল্লাহর উপর ভরসা রাখো”।

আমি মাথা নেড়ে বলেছিলাম-“হুম্মম্মম…”।মনে মনে বললাম-“আমি মোটেও ভয় পাচ্ছিনা।এটা প্রাকৃতিক নিয়ম। তোমরা যখন পেরেছ,তখন আমার ভয় কিসে!তোমাদের সবার দোয়া আমার সাথে আছে।আল্লাহ নিশ্চই সহায় হবেন।”ওরা চলে গেল।

আবার শুরু হল আমার অপেক্ষার পালা।বলে রাখা ভাল যে,এযাবত কালে এটাই আমার প্রথম ও শেষবার হাসপাতাল যাত্রা। তাছাড়া ছোটবেলায় খেলতে গিয়ে সামান্য ব্যথা পাওয়া,টুকটাক কেটে যাওয়া। কিম্বা মৌসুমী জ্বর-ঠান্ডা ছাড়া আমি বড়কোন অসুখেও ভুগি নাই। ধীরে ধীরে যন্ত্রনাটা বেড়েই চলছে। তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।এতটাই তীব্র যে আমার হয়তবা জ্ঞান হারিয়ে ফেলার কথা। কিন্তু তা হয়নি। বরং ব্যথাটা সহ্য করতেই কেন যেন ভাল লাগছে। লক্ষ্য করলাম ব্যথাটার মধ্যে চিকন একটা ভাললাগা আছে।

সময় যেন আর এগুচ্ছেই না। আমি আবার সময় অনুমান করলাম। তখন দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে গেছে সম্ভবত। তখন আমার পায়চারি করার অনুমতিটাও তুলে নিল ডাক্তার। ভাবলাম কাংখিত সময়টা হয়তবা খুব কাছেই। তাই বিনাবাক্যে মেনে নিলাম। কিন্তু একটানা শুয়ে থাকাটা সম্ভব হচ্ছিল না।তাই বারবার উঠে বসছিলাম।এমনিতে বিকাল বেলাটা আমার খুব প্রিয় সময়।কিন্ত শীতের সময় দুপুরের পরপরই কেমন যেন হুস করেই বেলা শেষে সন্ধ্যা হয়ে যায়। “ধুর ছাই শীতের দিনে কোন বিকাল নাই”। এই কথাটা দুষ্টামী করে আমি অনেকবার বলতাম। কিন্তু সেদিন আমি পুরো একটা বিকাল দেখেছিলাম।সেই একটি শীতের বিকাল।অনেক লম্বা সময়ধরে আমার হয়েছিল।

এভাবেই সময় এগুচ্ছিল। তারপর আমাকে অন্য একটি কক্ষে নিয়ে গেল। সেটা আমার জন্য একেবারেই ভিন্নরকম এক অভিজ্ঞতা। অন্যরকম এক অনুভুতি। যাইহোক,শুরু হল কাংখিত সময়ের মুখোমুখি হওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা। এভাবে ঠিক কতটা সময় পার হয়েছে সেটা আমি অনুমান করতে পারি নাই। যদিও এই কক্ষের দেয়ালে আমার ঠিক উল্টো দিকে একটা ঘড়ি টানানো ছিল।

কিন্তু সেই ঘড়ির দিকে তাকানোর সময় তখন আমার হয় নাই। আমি তখন শুধু ভাবছি কখন সময় হবে? হঠ্যাৎ আমার কানে এলো সেই প্রত্যাশিত ধবনি। একটা চিৎকার,একটা কান্না বুঝি এতটা মধুর হয়!সত্যিই আমার ধারনা ছিল না।আমি সামনের দেয়ালের ঘড়ির দিকে তাকালাম।তখন ছয়টা বেজে বিশ মিনিট। ডাক্তার আমাকে বলল “এই যে দেখুন আপনার ছেলে”।

আমি তাকালাম ওর দিকে।মন্ত্রমুগ্ধের মত তাকিয়েই থাকলাম। আমি ঠিক কতক্ষন ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম আজ আর মনে করতে পারছি না। শুধু মনে হয়েছিল-“আরে এতো আমিই”! আমি যেন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমাকেই দেখছি।

যেমন করে কিশোরি মেয়ে প্রথমবার আয়নায় দাঁড়িয়ে নিজের সৌন্দর্য দেখে অবাক হয়ে যায়। আমি কি তেমন করেই অবাক হয়েছিলাম।আমার কি তেমনি ভাল লেগেছিল। না এই অনুভুতি বোধ হয় পৃথীবির আর যে কোন অনুভুতির ঊর্ধ্যে। হয়ত শুধু একজন মা-ই তা বুঝতে পারে।ওকে আমার সামনে থেকে সরিয়ে নিল। ডাক্তার,নার্স সবাই বলছে –“আপনার ছেলে মাশাল্লাহ অনেক সুন্দর হয়েছে।নাকটা কি খাড়া,গায়ের রঙ ফর্সা হবে।দেখতে ঠিক আপনার মতই হবে”। ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক কথা।

শরীর জুড়ে তখন আমার শুধুই অবসাদ। আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম।তাদের সব কথা আমি শুনতে পাচ্ছি। কথাগুলো কান থেকে আমার মন অবধি পৌঁছে যাচ্ছে। কিন্তু লক্ষ্য করলাম মনের ভিতরে আমার আরো একটি ঘর আছে। সেখানে যেতে পারছে না। সেই ঘরের দরজায় আমি স্পষ্টই দেখলাম আমার মায়ের মুখ।

কেন যেন সেই মুহূর্তে আমার মায়ের প্রতি আরও একটুখানি বেশি মমতা অনুভব করলাম। সেদিন থেকেই আমার মাকে আরও একটু বেশী করে ভালবাসতে শিখলাম। । সেদিন বুঝতে পারলাম মা হওয়া কতটা কঠিন।বুঝতে পারলাম মা,কতটা কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে তোমাকে। বোধকরি আমার মত প্রতিটা মেয়েই নিজে মা হওয়ার মুহূর্ত থেকেই মাকে বেশি করে ভালবাসতে শিখে।

আমার ছেলের  বয়স দশ বছর পূর্ণ হল। প্রতিটি দিন পরম মমতায়,আদরে-ভালবাসায়,স্নেহে-যত্নে ওকে আমি একটু একটু করে বড় করছি। আর প্রতিদিন একটু একটু করেই মাগো তোমার প্রতি আমার বাড়ন্ত ভালবাসা অনুভব করছি। সংসার,চাকরি সব সামলে আমাদের দেখাশুনা করা। আহা!কতই না কষ্ট হয়েছে তোমার!

“মা তোমাকে খুব ভালবাসি”।জানি কথাটা তোমায় কখনো বলা হয় নাই।নাইবা মুখে বললাম ভালবাসি। তোমার কি কখনো বুঝতে অসুবিধা হয়েছে? হয়নি বোধহয়। কোন মায়েরই সন্তানের ভালবাসা বুঝতে অসুবিধা হয় না।

বরং সন্তানদের কখনো কখনো অসুবিধা হয়। তা না হলে কি আর মাকে কেউ কখনো অবহেলা করতে পারে? বৃদ্ধাশ্রমে রাখতে পারে? কিন্তু সন্তানের শত অবজ্ঞা,অবহেলা পেয়েও মা কখনো সন্তানকে তাঁর ভালবাসা আর আশীর্বাদ থেকে বঞ্চিত করেন না। তাহলে আমরা কি করে মায়ের প্রতি দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারি!  আজ  “বিশ্ব মা” দিবস। তাতে কি এসে যায়? মায়ের ভালবাসা নিতে তো কোন নির্দিষ্ট দিন লাগে না!মাকে আঁকড়ে বাঁচতে কোন বিশেষ দিবস লাগে না।তাহলে মায়ের জন্য ভাবতে,মাকে নিয়ে কিছু বলতে দিবস কেন লাগবে!

আসুন আজ বিশ্ব মা দিবসে সবাই  প্রতিজ্ঞা করি।নিজের কাছেই প্রতিশ্রতিবদ্ধ হই । মাকে আরো একটু বেশি ভালবাসব। মায়ের প্রতি আরও একটু বেশি যত্নশীল হব। প্রতিদিন অন্তত একবার মাকে না বললেও নিজের মনে মনে বলি “মা তোমায় খুব ভালবাসি”।

সম্পর্কিত সংবাদ
তাহমিনা শিল্পী