যেভাবে ঘুমানো সুন্নাত

যেভাবে ঘুমানো সুন্নাত

ঘুম আল্লাহ তাআলার একটি বিশাল নিয়ামত, এর মাধ্যমে তিনি নিজ বান্দাদের উপর বিরাট অনুগ্রহ করেছেন এবং তাদের জন্য সহজ করে দিয়েছেন। আর নেয়ামতের দাবি হল শুকরিয়া আদায় করা তথা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। আল্লাহ তাআলা বলেন-

তিনিই স্বীয় রহমতে তোমাদের জন্যে রাত ও দিন করেছেন যাতে তোমরা রাত্রে বিশ্রাম গ্রহণ কর ও তার অনুগ্রহ অন্বেষণ কর এবং যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।

রাসুল (সা.) সব সময় ডান পাশ হয়ে ডান হাতের তালুর ওপর মুখমণ্ডলের অংশ বিশেষ (গাল) রেখে কিবলামুখী হয়ে শয়ন করতেন। এর কারণ অজানা নয়। বুকের বাম পাশে হৃৎপিণ্ডের অবস্থান। চিকিৎসকরা সব সময় হৃৎপিণ্ডের ওপর চাপ প্রয়োগে নিষেধ করেছেন। সুতরাং কেউ বাম পাশ হয়ে শয়ন করলে স্বাভাবিকভাবেই তার হৃৎপিণ্ডের ওপর চাপ পড়বে। রসুল (সা.) ঘুমানোর আগে এক খণ্ড বস্ত্র দিয়ে তিনবার তার বিছানা পরিষ্কার করে নিতেন যাতে কোনো বিষাক্ত পোকামাকড় তাকে কামড়ানোর সুযোগ না পায়। আমাদের আজ ভাবতে অবাক লাগে ১৪০০ বছর আগে যখন আধুনিক কোনো চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল না তখনকার সময়ে উম্মি নবী (সা.) আমাদের ঘুমানোর আদর্শ পদ্ধতি বাতলে গেছেন। তাঁর উপদেশ ছিল প্রজ্ঞাময় ও রহমতস্বরূপ। রসুল (সা.) এশার নামাজের পর তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যেতেন এবং রাতের শেষভাগে উঠে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করতেন। আবু হুরায়রা (রা)-এর মতে, তাই আসুন আমরা ইসলামী বিধানের আলোকে ঘুমানোর অভ্যাস করি।

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:তোমাদের নিদ্রাকে করেছি ক্লান্তি দূরকারী।

দিনের ক্লান্তিকর চলাফেরার পর রাত্রে শরীরের প্রশান্তি শরীর সুস্থ থাকাকে সাহায্য করে।অনুরূপ ভাবে শরীরের বর্ধন এবং কর্ম চাঞ্চল্যতেও সাহায্য করে। যাতে করে ঐ দায়িত্ব পালন করতে পারে যার জন্য আল্লাহ তাআলা তাকে সৃষ্টি করেছেন।

মানুষের বেঁচে থাকার জন্যে যা কিছু অতি জরুরী ঘুম তার অন্যতম। মুমিন বান্দা যদি ঘুমের মাধ্যমে দেহ ও মনকে আরাম দেওয়ার নিয়ত করে , যাতে করে সে আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের বিষয়ে আরো দৃঢ় হতে পারে। অতঃপর ঘুমের সমস্ত সুন্নত ও শরয়ী আদব পরিপূর্ণ রূপে পালন করার চেষ্টা করে , তবে তার ঘুম এবাদত হিসাবে পরিগণিত হবে এবং সে পুণ্য লাভ করবে।

১. ইশার নামাযের পর যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি ঘুমাতে চেষ্টা করা, যাতে তাহাজ্জুদের জন্য উঠা সহজ হয়।

(বুখারী, হাঃ নং ৫৪৭)

বি.দ্র. নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যমীন, চৌকি, কাপড়ের বিছানা, চাটাই, চামড়ার বিছানা ইত্যাদির উপর শয়ন করেছেন বলে হাদীসে বর্ণিত আছে।

(বুখারী শরীফ, হাঃ নং ২০৬৯/ শামায়িলে তিরমিযী, পৃ. ২২)

২. উযু করে শয়ন করা।

(বুখারী শরীফ, হাঃ নং ৬৩১১)

৩. শোয়ার পূর্বে বিছানা ভালভাবে ঝেড়ে নেয়া।

(বুখারী শরীফ, হাঃ নং ৬৩২০)

৪. শয়নের পূর্বে পরিহিত কাপড় পরিবর্তন করে ঘুমের কাপড় পরিধান করা।

(আল মাদখাল, ৩ : ১৬২)

৫. শয়নের পূর্বে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে নিম্নে বর্ণিত কাজগুলো করা : ১. দরজা বন্ধ করা। ২. মশক বা পানির পাত্র এবং খাদ্য দ্রব্যের পাত্র ও অন্যান্য পাত্রসমূহ ঢেকে রাখা। যদি ঢাকার জন্য কোন বস্তু না পাওয়া যায়, তাহলে ‘বিসমিল্লাহ’ পড়ে তার মুখে একটি লাটি বা ছড়ি রেখ দেয়া, ৩. বাতি নিভানো।

(বুখারী শরীফ, হাঃ নং ৫৬২৩-২৪)

৬. ঘুমানোর পূর্বে উভয় চোখে তিনবার করে সুরমা লাগানা।

(মুস্তাদরাক, হাঃ নং ৮২৪৯)

৭. ঘুমানোর পূর্বে কিছু পরিমাণ কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করা। যথা : আলহামদু শরীফ, সূরা কাফিরূন, আয়াতুল কুরসী, আমানার রসূল থেকে সূরা বাক্বারার শেষ পর্যন্ত, সূরা মুলক, আলিফ লাম মীম সিজদাহ ইত্যাদি তিলাওয়াত করা বেশি পড়া সম্ভব না হলে কমপক্ষে ছোট ২/ ৩ টি সূরা পড়ে নেয়া।

(তাবারানী কাবীর হাঃ নং-২১৯৫) (আল আদাবুল মুফরাদ, হাঃ নং ১২০৯/ বুখারী শরীফ, হাঃ নং ৩২৭৫)

৮. ঘুমানোর পূর্বে কয়েকবার দরূদ শরীফ পাঠ করা এবং তাসবীহে ফাতেমী অর্থাত ৩৩ বার সূবাহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ৩৪ বার আল্লাহু আকবার পড়া।

(বুখারী শরীফ, হাঃ নং ৩১১৩)

৯. সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক্ব ও সূরা নাস প্রত্যেকটা তিনবার করে পড়ে হাতে দম করে যতটুকু সম্ভব মাথা হতে পা পর্যন্ত সমস্ত শরীরে হাত মুছে দেয়া। তিনবার এরূপ করা।

(বুখারী শরীফ, হাঃ নং ৫০১৭)

১০. ঘুমানোর সময় ডান কাতে কিবলামুখী হয়ে শোয়া সুন্নাত। উপুড় হয়ে শয়ন করতে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ এভাবে শয়ন করাকে আল্লাহ তা‘আলা পছন্দ করেন না।

(বুখারী শরীফ, হাঃ নং ৬৩১৪/ সহীহ ইবনে হিব্বান হাঃ নং ৫৫৪৯)

১১. শয়ন করে এ দু‘আ পড়া :

باسمك ربى وضعت جنبى وبك ارفعه، ان امسكت نفسى فارحمها وان ارسلتها فاحفظها بما تحفظ به عبادك الصالحين

(বুখারী শরীপ, হাঃ নং ৬৩২০)

১২. ঘুমানোর পূর্বে তিনবার এই ইস্তিগফার পড়া :

استغفر الله الذى لا اله الا هو الحى القيوم واتوب اليه

(তিরমিযী, হাঃ নং ৩৩৯৭)

১৩. এই দু‘আটিও পড়া :

اللهم باسمك اموت واحيى

(বুখারী শরীফ, হাঃ নং ৬৩১৪)

১৪. সর্বশেষে এ দু‘আটি পড়া :

اللهم اسلمت وجهى اليك وفوضت امرى اليك والجأت ظهرى اليك رغبة ورهبة اليك لاملجأ ولا منجا منك الا اليك- اللهم امنت بكتابك الذى انزلت وبنبيك الذى ارسلت-

(বুখারী, হাঃ নং- ২৪৭)

১৫. শয়ন করার পর ভয়ে ঘুম না আসলে এই দু‘আ পড়া :

اعوذ بكلمات الله التامة من غضبه وعقابه وشرعباده ومن همزات الشياطين وان يحضرون-

(তিরমিযী, হাঃ নং ৩৫২৮)

১৬. স্বপ্নে ভয়ংকর কিছু দেখে চক্ষু খুলে গেলে তিনবার

اعوذ بالله من الشيطان الرجيم

পড়ে বাঁ দিকে থু-থু ফেলে পার্শ্ব পরিবর্তন করে শোয়া। তাতে ক্ষতির আর কোন আশংকা থাকে না এবং এ দু‘আটি পড়া :

اللهم انى اعوذبك من شر هذه الرؤيا-

(মুসলিম, হাঃ নং ২২৬২)

১৭. সুযোগ হলে দুপুরে খানার পর কিছুক্ষণ কাইলূল্লাহ করা অর্থাত শয়ন করা। চাই ঘুম আসুক বা না আসুক।

(বুখারী শরীফ, হাঃ নং ৯৩৯)

সম্পর্কিত সংবাদ
ডেস্ক রিপোর্ট