লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক : শেষ পর্ব

লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক : শেষ পর্ব

লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক : পর্ব ১

লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক : পর্ব ২

লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক : পর্ব ৩

লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক : পর্ব ৪

লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক : পর্ব ৫

পঞ্চম পর্বের পর…

আরাফাত ময়দানটি মীনা হতে প্রায় ১০ কিলোমিটার দুরে অবস্থিত। ৯ই যিলহজ্জ  দ্বিপ্রহরের পর থেকে ১০ই জিলহজ্জ সুবহে সাদিক পর্যন্ত এক মুহূর্তের জন্য হলেও আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা হজ্জের ফরজ। এই ময়দানে অবস্থিত মসজিদটির নাম মসজিদে নামিরা। এই মসজিদের জামাতে অংশগ্রহনকারী হজ্জযাত্রীরা জোহরের ওয়াক্তে এক আজান ও দুই ইকামতের সাথে একই সময়ে পরপর যোহর ও আসরের নামাজ আদায় করে থাকেন। নামাজের আগে ইমাম সাহেব খোতবা প্রদান করে থাকেন। বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আরাফাত ময়দানে অবস্থানের যে দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করা হয় তাতে এই খোতবা এবং নামাজ দেখানো হয়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে আমরা আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করেও খোতবাও শুনতে পেলাম না এবং মসজিদের জামাতেও অংশগ্রহন করতে পারলাম না। কারন আরাফাতের সম্পূর্ন মাঠ জুড়ে খোতবা শোনানোর কোন ব্যবস্থা ছিল না। আর আমাদের তাঁবু যেহেতু মসজিদে নামিরা থেকে অনেক দুরে ছিল তাই মসজিদের জামাতে আমরা সামিল হতে পারি নাই। নিয়ম হচ্ছে কেউ মসজিদের জামাতে সামিল হতে না পারলে নিজ নিজ তাঁবুতেই জামাতের সাথে নামাজ আদায় করবে। তবে সে ক্ষেত্রে জোহর এবং আছরের নামাজ একত্রে না পড়ে জোহর এবং আছরের ওয়াক্তে আলাদা আলাদা ভাবে পড়তে হবে। কর্তৃপক্ষ একটু উদ্যোগ নিলেই কিন্তু সমস্ত আরাফাতের ময়দানে ইমাম সাহেবের খোতবা শোনানো সম্ভব। আর মীনা ও আরাফাত দু’জায়গাতেই যেহেতু বিভিন্ন দেশের হজ্জযাত্রীদের তাঁবু আলাদা আলাদা ভাবে চিহ্নিত করা আছে তাই ইমাম সাহেবের খোতবার ভাষান্তরিত ছাপানো কপি বিভিন্ন দেশের হজ্জযাত্রীদের কাছে আগাম পৌঁছে দেয়া মোটেই কোন অসম্ভব কাজ নয়।

আমাদের পরবর্তী কাজ সুর্যাস্তের পর মুযদালিফার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়া। অনেকেই এ জন্য গাড়ী ভাড়া করলেন। মোমিন সাহেব বললেন যে লক্ষ লক্ষ লোকের ভীড়ে গাড়ী চলবে শম্বুক গতিতে। বরং পায়ে হেঁটে মুযদালিফাতে গেলে অনেক আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন। আমাদের সাথে যেহেতু কোন বৃদ্ধ ও মহিলা ছিল না তাই আমরা তার এই প্রস্তাবে রাজী হলাম। বিকালে আসরের নামাজ পড়ার কিছুক্ষন পর আমরা তাঁবু থেকে বেড়িয়ে পড়লাম। উদ্দেশ্য, সন্ধ্যার আগে মসজিদে নামিরার নিকটবর্তী আরাফাতের সীমানায় গিয়ে অবস্থান করা যাতে করে সুর্যাস্তের সাথে সাথে আমরা আরাফাতের ময়দান ত্যাগ করে মুযদালিফার উদ্দেশ্যে রওনা দিতে পারি। যেহেতু আমরা আরাফাত ময়দানের একপ্রান্তে ছিলাম তাই ময়দানের মুযদালিফার দিকের প্রান্তে পৌঁছতে আমাদের পুরো মাঠ অতিক্রম করতে হল। যতই অগ্রসর হই ততই দেখি আমাদের চলার পথ ফাস্ট ফুডের খালি প্যাকেট এবং সফট ড্রিংকসের ক্যান দিয়ে কার্পেটের মত ঢাকা পড়ে গেছে। এতক্ষনে বুঝতে পারলাম, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যে হাজার হাজার ফাস্টফুড, সফট ড্রিংকস এবং লাবানের প্যাকেট বিতরন করেছেন, আমাদের অবস্থান আরাফাতের শেষ প্রান্তে হওয়ায় তাদের গাড়ীর খুব অল্প সংখ্যকই আমাদের তাঁবুর নিকটবর্তী হতে পেরেছিল।  আরাফাতের সীমানায় গিয়ে যখন পৌঁছলাম তখনও সুর্যাস্ত হতে বেশ কিছুটা সময় বাকী। সুর্যাস্তের আগে যাতে কেউ ভুলক্রমে আরাফাতের ময়দান ত্যাগ না করতে পারে সে জন্য বাউন্ডারী ওয়ালের গেট বন্ধ করা আছে। আমরা সীমানার ভেতরে দাঁড়িয়ে দোআ দরুদ পড়তে থাকলাম। সুর্যাস্তের পর যখন গেট খুলে দেয়া হল তখন রাস্তায় হাজার হাজার মানুষের ঢল নামলো। যেন খরস্রোতা নদীর স্রোত বাঁধ দিয়ে আটকানোর পর হঠাৎ ছেড়ে দেয়া হয়েছে। সেই প্রচন্ড ভীড় এবং মানুষের চাপ সহ্য করে  সামনে অগ্রসর হওয়া যেন যুদ্ধ করার সামিল। একবার তো প্রচন্ড ভীড়ের মধ্যে মানুষের ধাক্কা সামলাতে গিয়ে একেবারে এবাউট টার্ন হয়ে গেলাম, অর্থাৎ উল্টোমুখো হয়ে গেলাম। ফলে তিন সাথীকে হারিয়ে ফেললাম। কিছুদুর একাকী অগ্রসর হয়ে দেখলাম আমার দুই সাথী দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে আমার নাম ধরে ডাকছে। ফলে আল্লাহর রহমতে আমরা আবার একত্র হয়ে সামনে অগ্রসর হলাম। বেশ কিছুটা পথ অতিক্রম করার পর আমরা বেশ চওড়া রাস্তায় এসে পড়লাম। ফলে ভীড়ের চাপটা কিছুটা কমে এল। আশেপাশে তাকিয়ে দেখি হাজার হাজার লোক সামনে অগ্রসর হচ্ছে। যুবক, বৃদ্ধ, পুরুষ, মহিলা, কালো, সাদা হরেক রকমের মানুষ। কিন্তু সবার উদ্দেশ্য এক, গন্তব্য এক। রাস্তার দুধারে উঁচু উঁচু পাহাড় যেন প্রহরীর মত দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তার পাশে কিছুদুর পরপর খাবার পানির ট্যাপ আছে। আমরা বেশ কিছুটা পথ অতিক্রম করে পানির ট্যাপের কাছে একটা জায়গা বেছে নিয়ে হাজী ম্যাট বিছিয়ে হাত মুখ ধুয়ে আরাফাত থেকে আনা খাবার দিয়ে রাতের খাবার সেরে নিলাম। আমাদের খাবার সময় এক দম্পতি (সম্ভবত ভারতীয় অথবা পাকিস্তানী) আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন যে আমরা খাবার কোথা থেকে সংগ্রহ করেছি। তাদের চেহারাই বলে দিচ্ছিল যে তারা বেশ ক্ষুধার্ত। আমরা তাদেরকেও কিছু খাবার দিয়ে দিলাম। খাওয়া শেষ করে আবার হাঁটা শুরু করলাম। মুযদালিফার সীমানায় যখন পৌঁছলাম তখন আর এক সমস্যায় পড়লাম। হাজার হাজার লোক সমস্ত রাস্তা জুড়ে শুয়ে পড়েছে। রাস্তার দুপাশের মাঠ এবং পাহাড়ের গায়েও হাজার হাজার লোক অবস্থান গ্রহন করেছে। সামনে অগ্রসর হওয়া প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। শুয়ে পড়া লোকদের কারো পায়ের উপর দিয়ে, কারো বুকের উপর দিয়ে, কারও মাথার উপর দিয়ে হাঁটতে হচ্ছে আর প্রায়ই সেসব লোকের বাঁধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এভাবে কয়েকশত লোককে অতিকষ্টে ডিঙ্গিয়ে পাশের আর একটা সরু রাস্তায় আমাদের চারজনের শোবার মত একটা ফাঁকা জায়গা পেয়ে গেলাম। তাড়াতাড়ি হাজী ম্যাট বিছিয়ে নিজেদের অবস্থান সংহত করলাম। তখন রাত প্রায় দশটা। মাগরিব ও এশার নামাজ আমরা চারজন একসাথে আদায় করলাম। এখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন। আরাফাতের ময়দানে অথবা আরাফাত থেকে মুযদালিফা যাওয়ার পথে মাগরিবের নামাজের সময় হলেও নামাজ পড়া নিষিদ্ধ। মুযদালিফাতে পৌঁছার পর মাগরিব ও এশার নামাজ একসাথে পড়তে হয়। তারপর মুযদালিফার খোলা প্রান্তরে উন্মুক্ত আকাশের নীচে রাত কাটাতে হয়। এই মাঠেও কিছুদুর পরপর বাথরুম রয়েছে। তবে তা আরাফাতের তুলনায় অনেক কম। ফলে সারা রাতই বাথরুমগুলোর সামনে লম্বা লাইন লেগে থাকে। নামাজ শেষে আমরা আশপাশ থেকে ছোট ছোট পাথর সংগ্রহ করলাম। জামারায় শয়তানের উদ্দেশ্যে পরপর তিনদিন ছোঁড়ার জন্য প্রয়োজনীয় পাথরের টুকরা এখান থেকেই সংগ্রহ করতে হয়। সৌদী আরব তো পাথরেরই দেশ। তাই লক্ষ লক্ষ লোকের প্রয়োজনীয় পাথর সংগ্রহ করতে মোটেই বেগ পেতে হয় না। পাথর সংগ্রহ করার পর আমরা শুয়ে একটু বিশ্রাম নেবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু বাধ সাধলো কনকনে হিমেল হাওয়া। ঠান্ডায় একেবারে জমে যাওয়ার উপক্রম। চাদর গায়ে দিয়ে গুটিশুটি হয়ে শুয়ে থেকেও শীত থেকে রক্ষা পাওয়া যাচ্ছে না। ইহরাম অবস্থায় আবার মুখ ও মাথা ঢাকা নিষেধ। গোলজারের কাছ থেকে ছাতাটা নিয়ে যেদিক থেকে ঠান্ডা বাতাস আসছে সেদিকে ধরে বাতাস আটকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করতে থাকলাম। এভাবে কখনও শুয়ে কখনও বসে সময় কাটাচ্ছি। একবার যখন চাদর গায়ে দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করছি, তখন কানের কাছে হঠাৎ ট্রাকের ঘড়ঘড় শব্দ। চোখ মেলে দেখি আমাদের পাশে যে ট্রাকটা এতক্ষন নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল তার এতক্ষনে আড়মোড়া ভেঙ্গে দিক পরিবর্তনের খায়েশ হয়েছে। তাড়াতাড়ি উঠে বসলাম। শেষে না আবার বিদেশ বিভুঁইয়ে গর্দানটা ট্রাকের নীচে চাপা পড়ে। আমাদের আশেপাশে যারা অবস্থান করছিল তারা কেউই বাংলাভাষী নয়। কিন্তু হঠাৎ একসময় শুয়ে শুয়ে শুনতে পেলাম আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে দুজন লোক বাংলায় কথা বলছে। কৌতুহলী হয়ে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলাম,“ভাই আপনাদের বাড়ি কোথায়?” জানতে পারলাম তাদের একজনের বাড়ি রংপুরের পীরগাছা উপজেলায়। অর্থাৎ আমরা একই জেলার লোক। তিনি একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ এবং আমাকে ভাল করেই চেনেন। সৌদী আরবে চাকুরী করেন। সস্ত্রীক হজ্জ করছেন। দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দুরে মুযদালিফার বিশাল খোলা প্রান্তরে গভীর রাতে পরিচিত একজনের সাথে হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়ার অনুভুতিই আলাদা।

শেষরাতে মোমিন সাহেব বললেন যে এখনই আমাদের রওনা দিয়ে মুযদালিফার শেষ প্রান্তে গিয়ে অবস্থান করা ভাল হবে। আর এই সময় বাথরুমগুলোতেও ভীড় অপেক্ষাকৃত কম হবে। আমরাও উঠে রওনা দিলাম। হাঁটতে হাঁটতে এগোবার সময় দেখলাম একটা বাথরুমে ভীড় বেশ কম। সেখানে আমরা বাথরুম সেরে অজু করে নিলাম। তারপর মীনার কাছাকাছি গিয়ে রাস্তার উপরই একটু খালি জায়গা পেয়ে অবস্থান নিলাম। আমাদের সামনে দেখলাম ইন্দোনেশিয়ার কয়েকজন তরুন অবস্থান নিয়েছেন। আমরা বসে বসে দোআ দরুদ পড়ছি। হঠাৎ দেখি বলা নেই কওয়া নেই সামনের ইন্দোনেশিয়ান ভাইয়েরা আমাদের ম্যাটের উপর ফাস্টফুড, বিস্কুটের প্যাকেট ও সফট ড্রিংকসের একটা ছোট খাট স্তুপ এনে ফেলল। এভাবে আল্লাহ আমাদের সকালের নাস্তার ব্যবস্থা করে দিলেন। আমরা খাবারগুলো খেতে শুরু করেছি , হঠাৎ একই উৎস থেকে খাবারের আর একটি স্তুপ আমাদের ম্যাটে এসে পড়ল। এত খাবার খাওয়া তো সম্ভব নয়। তাই আমরা অতিরিক্ত খাবারগুলো ব্যাগে পুরলাম। পরে চিন্তা করে দেখেছি যে ইন্দোনেশিয়ান ভাইদের খাবার উপহার দেয়ার সদিচ্ছা ছাড়াও আরও একটি কারনে আমাদের ম্যাটের উপর খাবারের স্তুপ জমা হতে পারে। আরাফাতের ময়দানে তারা সম্ভবত এত খাবার উপহার পেয়েছে যে এগুলো বহন করা তাদের পক্ষে কষ্টকর হয়ে পড়ছিল।

মুযদালিফায় সুবহে সাদিক হতে সুর্যোদয়ের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ক্ষনিকের জন্য হলেও অবস্থান করা ওয়াজিব। আমরা ফজরের নামাজ পড়ে দোআ দরুদ পড়তে থাকলাম। সুর্যোদয়ের কিছু আগে মীনার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। তাঁবুতে পৌঁছে বিশ্রাম ও সকালের নাস্তা সেরে নিলাম। আজকের প্রথম কাজ বড় জামারায় গিয়ে শয়তানের উদ্দেশ্যে পাথর নিক্ষেপ করা। জামারা হল মিনা ময়দানে অবস্থিত তিনটি স্তম্ভ। এগুলোর নাম ১. জামারাতুল উলা বা ছোট জামারাহ্, ২. জামারাতুল উসতা বা মধ্যম জামারাহ্ এবং ৩. জামারাতুল কুবরা বা বড় জামারাহ। দেশে থাকতেই শুনেছি জামারাতে পাথর ছোঁড়ার সময় প্রায় প্রতি বছরই ভীড়ের চাপে হতাহতের ঘটনা ঘটে থাকে। কেউ কেউ উপদেশ দিলেন খুব ভোরে রওনা না দিয়ে একটু দেরী করে রওনা দিলে ভীড়ের চাপ একটু কম থাকে। আমরা তাই সকাল দশটার দিকে আল্লাহর নাম নিতে নিতে ধীরে ধীরে জামারার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। মীনার যে প্রান্ত থেকে আমরা রওনা দিলাম সেখান থেকে শুরু করে জামারা পর্যন্ত সম্পূর্ন রাস্তাটির ওপরে সেড দেয়া আছে যাতে সুর্যের প্রখর তাপ থেকে হজ্জযাত্রীরা রক্ষা পান। এ ছাড়াও পুরো রাস্তাটির দুপাশে কিছুদুর পরপর বিশাল বিশাল এয়ার কুলারের মাধ্যমে ঠান্ডা বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে। প্রচন্ড ভীড়ের মধ্যে প্রায় দেড় ঘন্টা হাঁটার পর আমরা জামারাতে উপস্থিত হলাম। এই স্থানটি দুইতলা। আমরা যে রাস্তা দিয়ে এলাম সেটিই ক্রমান্বয়ে উঁচু হয়ে দ্বিতীয় তলায় পৌঁছেছে। নীচতলার পাথর ছোঁড়ার স্থানে যেতে হলে উপরে না উঠে রাস্তার দুই পাশ দিয়ে সামনে অগ্রসর হতে হয়। আমরা নীচতলায় না গিয়ে দ্বিতীয় তলায় উঠলাম। এটি আসলে একটি অত্যন্ত চওড়া রাস্তা। রাস্তার দুই পাশে রেলিং দেয়া আছে। জামারার স্তম্ভ তিনটির ভিত্তি নীচতলায়। এগুলো দ্বিতীয় তলার রাস্তা ফুঁড়ে উপরে উঠেছে। স্তম্ভ তিনটি কয়েক ফুট উচ্চতার পাকা রেলিং দিয়ে ঘেরা আছে। যখন স্তম্ভ তিনটি লক্ষ্য করে পাথর ছোঁড়া হয় তখন পাথরগুলো স্তম্ভ এবং রেলিং এর মাঝখানের ফাঁকা জায়গা দিয়ে নীচতলায় গিয়ে পড়ে। আমরা যখন ধীরে ধীরে দ্বিতীয় তলায় উঠছিলাম তখন আমাদের এক সাথী হজ্জযাত্রী অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন যে তার অজু নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এই অবস্থায় তিনি কি করবেন। জামারাতে পাথর ছোঁড়ার সময় অজু অত্যাবশ্যকীয় কিনা সে সম্বন্ধে আমাদের কোন ধারনা ছিল না। আশে পাশে কোন পানির ব্যবস্থাও চোখে পড়লো না। আমরা তাকে তৈয়ম্মুম করার উপদেশ দিলাম। কিন্তু দ্বিতীয় তলায় ওঠার পর দেখলাম দুই পাশের রেলিং ঘেষে পানির ট্যাপ আছে। সাথী হজ্জযাত্রী সেখানে অজু করে নিলেন। আমরা দ্বিতীয় তলায় ওঠার পর দেখলাম ভীড় মোটেই নেই । চারদিক কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা। দেশে থাকতে যে প্রচন্ড ভীড়ের কথা শুনেছিলাম, তার কোন লক্ষন দেখতে পেলাম না। আমরা বড় জামারায় সুষ্ঠুভাবে পাথর ছোঁড়ার কাজ সম্পন্ন করলাম। এখানে একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। পাথর ছোঁড়ার স্থানটিকে চিহ্নিত করার জন্য স্তম্ভ তিনটি নির্মান করা হয়েছে। অর্থাৎ নিক্ষিপ্ত পাথরগুলি স্তম্ভ তিনটিতে আঘাত করা জরুরী নয় বরং নীচে যেখানে স্তম্ভের চারপাশে পাথরগুলি জমা হচ্ছে সেখানে পড়া জরুরী। তাই অনেক হজ্জযাত্রীই যেমন পিলারগুলিতে নিক্ষিপ্ত পাথর স্পর্শ করাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন তার কোন যুক্তি নেই। পাথর নিক্ষেপের পরবর্তী কাজ হল কোরবানী করা। আমরা যেহেতু আগেই কোরবানীর টাকা নির্ধারিত ব্যাংকে জমা দিয়েছি তাই আমাদেরকে আর কোরবানীর জন্য নির্ধারিত স্থানে যেতে হল না। তাই আমরা জামারাহ থেকে বেড়িয়ে মাথা মুন্ডন করার জন্য নাপিতের দোকানের খোঁজ করলাম। কিন্তু আশেপাশে কোথাও নাপিতের দোকান চোখে পড়লো না। কোন কোন জায়গায় দেখলাম কিছু কিছু হজ্জযাত্রী পয়সার বিনিময়ে অন্য হজ্জযাত্রীদের মাথা মুন্ডন করে দিচ্ছেন। কিন্তু তাদের আনাড়ী হাতের ছোঁয়ায় কাস্টমারদের মাথার যে চেহারা হচ্ছিল তাতে তাদের ক্ষুরের নীচে মাথা পেতে দেয়ার সাহস করতে পারলাম না। দু একজনকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম যে মীনার প্রান্তরে শুধু হজ্জের মওসুমে লোকসমাগম হয়ে থাকে। অন্য সময় এ এলাকাটি জনমানবশুন্য থাকে। সে জন্য এ এলাকার সব দোকানই অস্থায়ী। তাই মক্কার তুলনায় এখানে নাপিতের দোকানের সংখ্যা খুবই কম। শেষ পর্যন্ত ঠিক করলাম দোকান থেকে ব্লেড কিনে নিয়ে তাঁবুতে গিয়ে একে অন্যের মাথা কামিয়ে দেব। এক প্যাকেট ব্লেড রাস্তার পাশের দোকান থেকে কিনে তাঁবুতে ফিরলাম। ডা: মতিয়ার ভাইকে দেখলাম মাথা কামিয়ে দেয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী আত্মবিশ্বাসী। তাই তার ব্লেডের নীচেই মাথা পেতে দেবার সাহস করলাম। কিন্তু মুশকিল হল যে ব্লেড কিনে নিয়ে গিয়েছি সেটা নিয়ে। একজনের মাথার অর্ধেক কামানো হতে না হতেই একটা ব্লেডের ধার শেষ। মনে হল, হায়, দেশ থেকে যদি এক প্যাকেট ভালো ব্লেড নিয়ে আসতাম। যা হোক মতিয়ার ভাই মোটামুটি দক্ষতার সাথে বেশ কয়েকজনের মাথা কামিয়ে দিলেন। এবার ডা: হাই ভাই তার মাথা মসৃন  করার জন্য মতিয়ার ভাইয়ের শরনাপন্ন হলেন। কিন্তু ততক্ষনে মতিয়ার ভাইয়ের ধৈর্য এবং ব্লেডের ধার দুটোই শেষ। ফলাফল মতিয়ার ভাইয়ের ব্লেডের নীচে হাই ভাইয়ের রক্তাক্ত মাথা।

পাথর ছোঁড়া শেষে তাঁবুতে এসে আমরা বিভিন্ন জনের কাছে জানতে পারলাম যে জামারাতে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। প্রচন্ড ভীড়ে পদদলিত হয়ে বহু লোকের মৃত্যু হয়েছে। তখন মনে পড়লো যে আমরা যখন জামারার পথে হাঁটছিলাম তখন কিছুক্ষন পরপর একটা করে এম্বুলেন্স উল্টোদিকে ছুটে যাচ্ছিল আর সেগুলোর  পেছনে পেছনে কিছু লোক উদ্বিগ্ন ভাবে দৌড়ে যাচ্ছিল। এতক্ষনে বুঝলাম যে এম্বুলেন্সগুলো দুর্ঘটনায় নিহত অথবা আহত লোকদের বহন করছিল। আর জামারাতে পাথর ছোঁড়ার সময় যে চারদিক ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল তারও মাজেজা বুঝতে পারলাম। আমরা জামারাতে পৌঁছার কিছুক্ষন আগে সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি ঘটে গিয়েছিল। তাই সেখানে কিছুক্ষনের জন্য পাথর ছোঁড়া বন্ধ ছিল। নিরাপত্তারক্ষীরা জামারার প্রবেশ পথ বন্ধ করে দিয়ে ছোট ছোট দলে লোক ভেতরে প্রবেশ করাচ্ছিল। আমরা সেই সময় পাথর ছুঁড়তে উপস্থিত হওয়ায় ভীড় কম দেখতে পেয়েছিলাম। মীনাতে খবরের কাগজ, রেডিও, টিভি কিছুই নেই। তাই বিস্তারিত জানতে পারলাম পরদিন সকালে মক্কাতে গিয়ে। মক্কাতে রাস্তার ধারে খবরের কাগজ কিনতে পাওয়া যায়। আরবী কাগজ ছাড়া সৌদী গেজেট ও অ্যারাব নিউজ নামে দুটি ইংরেজী খবরের কাগজ পাওয়া যায়। সৌদী গেজেট পড়ে জানতে পারলাম যে ভীড়ের চাপে পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই ২৪০ জন লোকের মৃত্যু হয়েছে। আহতদের মধ্যে আরও কয়েকজনের মৃত্যু হওয়ায় এ সংখ্যা পরদিন ২৫১ তে উন্নীত হয়। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ১০ জন বাংলাদেশীরও মৃত্যু হয়। সৌদী গেজেট প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানায় যে সকাল দশটার দিকে হজ্জযাত্রীদের একটি দল একটি বৃত্ত তৈরী করে বৃত্তের ভেতর মহিলাদেরকে নিয়ে দ্বিতীয় তলায় পাথর ছোঁড়ার স্থানের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। এই দলের পুরুষ সদস্যরা আশেপাশের হজ্জযাত্রীদেরকে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল। এর ফলে বেশ কিছু হজ্জযাত্রী নীচে পড়ে যায় এবং এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার সূত্রপাত হয়। কাবাঘর তাওয়াফ করার সময়ও কোন কোন দেশের হজ্জযাত্রীরা এভাবে বৃত্ত তৈরী করে তাওয়াফ করে থাকেন যা আমি আগেই উল্লেখ করেছি। অ্যারাব নিউজ পত্রিকায় সৌদী ধর্মমন্ত্রী আইয়াদ মাদানীর বক্তব্য পড়ে এত দুঃখেও হাসি পেল। উনি সাংবাদিকদের বলেছেন যে দুর্ঘটনায় মৃত বেশীরভাগ লোকই বেআইনী হজ্জযাত্রী। যখন দুর্ঘটনা ঘটে তখন কি বেছে বেছে অবৈধ হজ্জযাত্রীরা মৃত্যুর শিকার হতে পারে?

এখানে অবৈধ হজ্জযাত্রী সম্বন্ধে কিছু কথা বলা যেতে পারে। সৌদী আরবে গিয়ে জানতে পারলাম যে সৌদী আরবের নাগরিক কেউ একবার হজ্জ করলে ৫ বছরের মধ্যে তাকে আর হজ্জ করার অনুমতি দেয়া হয় না। যদিও সৌদী সরকারের হজ্জ পারমিট ছাড়া কারও হজ্জ করা বেআইনী তবুও এদের মধ্যে কেউ কেউ কর্তৃপক্ষের অগোচরে হজ্জ করে থাকেন। আবার বিভিন্ন দেশের যে সব নাগরিক সৌদী আরবে চাকুরী করছেন তাদের মধ্যে কেউ কেউ হজ্জের মওসুমে ছুটি নিয়ে হজ্জ পারমিট ছাড়াই হজ্জ করে থাকেন। আবার অনেকে অন্যান্য দেশ থেকে ওমরাহ করার করার জন্য এসে বেআইনীভাবে হজ্জের মওসুম পর্যন্ত অবস্থান করেন। এসব কারনে সৌদী সরকারের তালিকাভুক্ত হজ্জযাত্রীর চেয়ে অনেক বেশী লোক হজ্জ করে থাকেন। ফলে বিভিন্ন জায়গায় অব্যবস্থা হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হল এসব অবৈধ হজ্জযাত্রীদেরকে হজ্জ শুরু হওয়ার আগেই সনাক্ত করে ঠেকানো কি খুব কঠিন কাজ?

১০ই যিলহজ্জ রাতে বিশ্রাম নিয়ে পরদিন সকালে তাওয়াফে যিয়ারত করার জন্য মক্কার পথে রওনা হলাম। এটি হজ্জের অন্যতম ফরজ কাজ। তাঁবু থেকে বেড়িয়ে বড় রাস্তায় আসলে মক্কায় যাওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের গাড়ী পাওয়া যায়। আমরা ফজরের নামাজ পড়ে বড় রাস্তায় আসলাম। কিছুক্ষন পর একটি মাইক্রোবাস পেলাম। অধিক যাত্রী নেয়ার জন্য মাইক্রোবাসটির সিট তুলে ফেলা হয়েছে। গাড়ীতে উঠে মাইক্রোর মেঝেতে গাদাগাদি করে বসলাম। গাড়িটির অবস্থা দেখে শুধু এটুকু মন্তব্য করা চলে যে এরকম লক্কর ঝক্কর শকট বহু বছর আগেই বাংলাদেশের শহরগুলোর রাস্তা থেকে উধাও হয়েছে। মাইক্রোবাসটির দু পাশেই দরজা। জামান বসার জায়গা পেল এক পাশের দরজা ঘেঁসে। গাড়ী যখন চলতে শুরু করলো, জামান ভয় পেয়ে গেল। আমাকে বলল,‘ভাই, কোন মুহূর্তে যে দরজা গাড়ী থেকে আলাদা হয়ে যায় আর আমি দরজাশুদ্ধ রাস্তায় পরে যাই কে জানে।’ এ ধরনের গাড়ী সৌদী আরবের মত দেশের রাস্তায় চলার অনুমতি কিভাবে পায় তা ভেবে সত্যিই অবাক হতে হয়। এটা কর্তৃপক্ষের অদক্ষতা নাকি হজ্জযাত্রীদের প্রতি উদাসীনতা কে জানে। যা হোক সকাল সকাল মক্কায় পৌঁছে আমাদের হোটেল রুমে গিয়ে গোসল সেরে একটু বিশ্রাম নিয়ে তাওয়াফে জিয়ারত করতে রওনা হলাম। পথে এক দোকান থেকে নাস্তা খেয়ে নিলাম। সকাল ১১ টার দিকে তাওয়াফ শুরু করলাম। মাতাফে জায়গা না পেয়ে আমরা মসজিদুল হারামের মধ্যে ছাদের নীচে তাওয়াফ শুরু করলাম। প্রচন্ড ভীড়। আমরা তিন বন্ধু যাতে বিচ্ছিন্ন হয়ে না যাই সেজন্য একে অপরের কাঁধ ধরে অগ্রসর হচ্ছিলাম। বিশেষ করে যে রেখা বরাবর থেমে তাওয়াফের নিয়ত করতে হয় সেখানে ভীড়ের চাপ সবচেয়ে বেশী। তিন চক্কর দেয়ার পর প্রচন্ড ভীড়ের চাপে আমি বাকী দুজন থেকে আলাদা হয়ে গেলাম। বাকী চার চক্কর শেষ করে সাফা মারওয়াতে সায়ী করে আবার মীনাতে যেতে হবে পাথর ছোঁড়ার জন্য। সাথী ছাড়া এই কাজগুলো, বিশেষ করে জামারাতে পাথর ছোঁড়ার জন্য যেতে হবে ভেবে একটু মনমরা হয়ে গেলাম। লক্ষ লক্ষ লোকের ভীড়ে দুই বন্ধুর দেখা আবার পাব এটা একটা অসম্ভব কল্পনা ছাড়া কিছু নয়। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে থাকলাম, ‘হে আল্লাহ, তুমি আমার সঙ্গীদের সাথে আমার দেখা করিয়ে দাও।’ একাকী তাওয়াফ করতে করতে একসময় জোহরের নামাজের আজান হল। জোহরের জামাত যখন শুরু হল তখন আমি যে রেখা বরাবর তাওয়াফের নিয়ত করতে হয় তার কাছাকাছি। মানুষের প্রচন্ড চাপে আমি আটকা পরে গেলাম। নামাজের রুকু সেজদা তো দুরের কথা নিয়ত বাঁধার জন্য যে কান পর্যন্ত হাত ওঠাব তারও উপায় নেই। নামাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওভাবেই ফ্রিজ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। এ অবস্থায় কিভাবে জামাতে সামিল হব তা বুঝে উঠতে না পারায় আমার আর জামাতে নামাজ পড়া হল না। যাহোক সাত চক্কর শেষ করে একাকী জোহরের নামাজ পড়ার জন্য এক জায়গায় দাঁড়ালাম। নামাজ শেষ করে বাঁয়ে তাকিয়ে দেখি আমার দুই বন্ধূ কাছেই নামাজ পড়ছে। ওদের কাছে শুনলাম যে ওরাও বারবার প্রার্থনা করছিল যেন আল্লাহ আমাদের তিনজনকে আবার একত্র করে দেন। আমাদের প্রার্থনা কবুল হওয়ায় আমরা পরম করুনাময়ের কাছে কৃতজ্ঞতা জানালাম। তারপর প্রচন্ড ভীড়ের মধ্যে আমরা সাফা মারওয়াতে সায়ী করলাম। হজ্জের একমাস আগে যেখানে আমাদের তাওয়াফ ১৫ মিনিটের মধ্যে হয়ে যেত সেখানে আজ আমাদের তাওয়াফ করতে লাগল ২ ঘন্টা । আর সায়ী করতে লাগল আরও ২ ঘন্টা। অর্থাৎ তাওয়াফ ও সায়ী করতেই বিকাল তিনটা বেজে গেল। এখান থেকে আবার জামারাতে যেতে হবে পাথর ছোঁড়ার জন্য। তাই পথের পাশের এক দোকান থেকে হালকা নাস্তা খেয়ে নিয়ে তাড়াতাড়ি  হেঁটে রওনা হলাম জামারার উদ্দেশ্যে। মসজিদুল হারামের চত্বরের একপ্রান্ত থেকে একটা পায়ে চলা পথ জামারার দিকে চলে গেছে। রাস্তাটির বেশীরভাগ অংশই পাহাড়ের বুক চিরে তৈরী করা টানেল। টানেলের ভেতর পর্যাপ্ত আলো ও বাতাসের ব্যবস্থা আছে। মাথার ওপর বিশাল সাইজের ফ্যানগুলো থেকে বিকট শব্দে বাতাস ছাড়া হচ্ছে। এই টানেল দিয়ে হাঁটার সময় একটু ভয় ভয় লাগা অস্বাভাবিক নয়। কারন যদি অল্প সময়ের জন্যও বিদ্যুত চলে যায় তবে সূচীভেদ্য অন্ধকারে প্রচন্ড ভীড়ের চাপে এবং অক্সিজেনের অভাবে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। ১৯৯০ সালের জুলাই মাসে এমনি এক দুর্ঘটনায় ১৪২৬ জন হজ্জযাত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। অবশ্য আমরা আমাদের সৌদী আরবে অবস্থানকালীন সময় কখনও বিদ্যুত বিভ্রাট হতে দেখিনি। মক্কায় এক বাংলাদেশী ক্লিনারকেও জিজ্ঞাসা করেও জানতে পেরেছি যে সে তার দীর্ঘ চাকুরীকালীন সময়ে কখনও বিদ্যুত চলে যেতে দেখেনি। হাঁটতে হাঁটতে শরীর ক্লান্ত ও পা প্রায় অবশ হয়ে গেল। জামান মজা করে বলল,‘এখন যদি আমার পায়ে কোন অপারেশন করার প্রয়োজন পড়ে তবে এনাসথেসিয়া দেয়ার কোন প্রয়োজন নেই।’

সন্ধার কিছুক্ষন আগে জামারার চত্বরে এসে পৌঁছলাম। প্রচন্ড ভীড়ের মধ্যে দোতলায় উঠে এক এক করে ছোট, মধ্যম এবং বড় জামারায় ৭ টি করে  পাথর নিক্ষেপ করলাম। পাথর নিক্ষেপ শেষ করতেই মাগরিবের নামাজের সময় হয়ে গেল। দোতলাতেই একপাশে দাঁড়িয়ে আমরা তিনজন মাগরিবের নামাজ পড়লাম। তারপর আবার হেঁটে রওনা হলাম আমাদের তাঁবুর উদ্দেশ্যে। সকাল থেকে হাঁটা শুরু করেছি। আর এখন সন্ধ্যা। পা যেন আর চলতে চায় না। সিদ্ধান্ত নিলাম রাত যতই হোক আমরা ধীরে ধীরে বিশ্রাম নিতে নিতে অগ্রসর হব। রাস্তার পাশে হাজার হাজার লোক বিছানা পেতে জায়গা দখল করে বসেছেন। কিছুদুর অগ্রসর হওয়ার পর আমরা এমনি এক বিছানায় বসে পড়লাম বিশ্রাম নেবার জন্য। আলাপ করে জানতে পারলাম ভদ্রলোক বাংলাদেশী। মক্কায় তার দোকান আছে। তার সাথে অল্প কিছুক্ষনের মধ্যেই বেশ অন্তরঙ্গতা হয়ে গেল। তার বিছানায় কয়েকজন মহিলাও বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন। জানতে পারলাম তারা মালয়েশিয়া থেকে হজ্জ করতে এসেছেন। তারা আমাদেরকে বিস্কুট এবং ফ্লাস্ক থেকে ঢেলে গরম গরম চা খাওয়ালেন। এক মহিলা বললেন যে তার ভাই বাংলাদেশী মেয়েকে বিয়ে করেছেন। অবশ্য আমাদের কথাবার্তায় দোভাষী হিসাবে কাজ করলেন সেই দোকানদার ভদ্রলোক। এখান থেকে উঠে আবার হাঁটা শুরু করলাম। কিছুদুর যাওয়ার পর ক্লান্ত হয়ে আবার এক বিছানায় বসে পড়লাম। আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলাম যে ইনিও বাংলাদেশী। সৌদী আরবের এক শহরে চাকুরী করেন। ছুটি নিয়ে হজ্জ করতে এসেছেন। বসে বসে রাস্তায় হাজার হাজার লোকের আসা যাওয়া দেখছি। হঠাৎ দেখি এক তুর্কী হজ্জযাত্রী গোলজারের হাতে এক রিয়ালের একটা নোট গুজে দিল। ঘটনার আকস্মিকতায় আমরা তো হতভম্ব। অবশ্য সাথে সাথেই বুঝতে পারলাম যে সারাদিনের খাটুনির ফলে আমাদের বিধ্বস্ত চেহারা এবং রাস্তার দিকে মুখ করে বসে থাকাতে সেই তুর্কী আমাদেরকে ভিক্ষুক মনে করেছে। সাথে সাথেই আমরা নোটটি ফিরিয়ে দিলাম এবং আকার ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিলাম যে আমরা ভিক্ষুক নই। এভাবে হাঁটতে হাঁটতে আর বসতে বসতে এগুতে থাকলাম। বেশ কিছুটা পথ হাঁটার পর আমরা রাস্তার পাশের এক খাবারের দোকানে গেলাম। সেখানে দেখি লোকজন খাবারের জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। আমরাও লাইনে দাঁড়ালাম। সেখানে এক বিশাল সাইজের প্রেসার কুকারে মুরগী রান্না হচ্ছে। কুকারের সাইজ একটা মাঝারি সাইজের ডিপ ফ্রিজের সমান। এর ভেতরে মশলা মিশ্রিত পানি টগবগ করে ফুটছে। সেই পানিতে দশ বারটা আস্ত মুরগী একসাথে ফেলে দিয়ে কুকারের মুখ বন্ধ করা হচ্ছে আর কয়েক মিনিট পরেই তা বের করে কেটে কেটে বিক্রি করা হচ্ছে। সেই মাংস আর রুটি কিনে আমরা রাতের খাবার সারলাম। তারপর আবার হাঁটতে হাঁটতে রাত প্রায় দশটায় তাঁবুতে পৌঁছলাম।

পরদিন ১২ই জিলহজ্জ। এদিনের কাজ হল আবার জামারাতে গিয়ে তিনটি জামারাতেই সাতটি করে পাথর নিক্ষেপ করা। এখানে উল্লেখযোগ্য যে ১১ ও ১২ই জিলহজ্জ পাথর নিক্ষেপের সময় হল দ্বিপ্রহরের পর থেকে সুর্যাস্ত পর্যন্ত। আর সুর্যাস্ত থেকে সুবহে সাদিক পর্যন্ত মাকরুহ ওয়াক্ত। দ্বিপ্রহরের পূর্বে পাথর নিক্ষেপ জায়েজ নাই। কিন্তু আমরা জানতে পারলাম সৌদী সরকার ঘোষনা করেছেন যে সারাদিনই জামারাতে পাথর নিক্ষেপ করা যাবে। সম্ভবত প্রচন্ড ভীড়ের চাপে সম্ভাব্য দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়াতে এই ঘোষনা। তবে এই ঘোষনার ধর্মীয় ভিত্তি কতটুকু তা জানা না থাকায় আমরা তিন বন্ধু সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমরা দ্বিপ্রহরের পরেই পাথর নিক্ষেপ করব। তবে আমাদের তাঁবুর বেশীরভাগ হজ্জযাত্রীই সকালেই তাঁবু ছেড়ে চলে গেল পাথর ছুঁড়ে মক্কাতে চলে যাওয়ার জন্য। যারা খাবার জন্য মোয়াল্লেমকে টাকা দিয়েছিল তারা অনেকেই যাবার আগে তাদের খাবার কুপন আমাদেরকে দিয়ে গেল। আমরা দুপুরের খাবার খেয়ে জোহরের নামাজ পড়ে রওনা হলাম পাথর ছোঁড়ার জন্য। ১০ই জিলহজ্জ জামারাতে দুর্ঘটনার পর থেকে কয়েকটি হেলিকপ্টারকে সার্বক্ষনিকভাবে আকাশে চক্কর দিতে দেখছি। খবরের কাগজ পড়ে জানতে পারলাম যে হেলিকপ্টার থেকে নীচের নিরাপত্তারক্ষীদেরকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। আর জামারার নিকটবর্তী হতেই কানে আসে মাইক্রোফোনে বিভিন্ন ভাষায় হজ্জযাত্রীদেরকে প্রয়োজনীয়  উপদেশ দেয়া হচ্ছে যাতে তারা সুশৃঙ্খলভাবে পাথর ছুঁড়তে পারেন। এর মধ্যে বাংলা ভাষাও আছে। তবে সেই বাংলা শুনে তো আমার আক্কেল গুরুম। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় সে উপদেশ দেয়া হচ্ছে। চট্টগ্রামবাসীর মাতৃভাষার প্রতি পূর্ন শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেই বলছি যে সে উপদেশের বিন্দু বিসর্গও আমার বোধগম্য হল না। উপদেশ দিতে হলে সবার বোধগম্য বাংলাতেই তা দিতে হবে। বাংলাদেশ হজ্জ মিশনের এদিকে দৃষ্টি দেয়া উচিৎ। যাহোক পাথর ছোঁড়ার কাজ শেষ করে আমরা আবার সেই পূর্বে বর্ণিত পায়ে চলা পথে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। কিছুদুর হাঁটার পর পাহাড়ের টানেলে ঢোকার আগে হঠাৎ ডানে তাকিয়ে আমি তো অবাক। রাস্তার পাশে আকন্দ গাছ। দেশে রাস্তার পাশে, ঝোপঝাড়ে এই গাছ কতই না দেখেছি। কিন্তু কখনও তো আজকের মত এমন অনুভুতি হয়নি। মক্কার কঠিন মাটি ফুঁড়ে মাথা উঁচু করে আছে বাংলাদেশের অতি পরিচিত গাছ। কোথা থেকে এল কে জানে। কিন্তু তাকে দেখেই হাজার হাজার মাইল দুরের মাতৃভুমিকে বেশী করে মনে পড়লো। এর নামই কি দেশপ্রেম? কে জানে। হাটতে হাঁটতে আছরের নামাজের সময় মসজিদুল হারামে গিয়ে পৌঁছলাম।

এখন মক্কা ত্যাগ করার পূর্বে আমাদের যে কাজটি বাকী থাকল তা হল তাওয়াফে বিদা বা বিদায়ী তাওয়াফ(ওয়াজিব)। আমরা মিনা থেকে মক্কায় চলে আসলাম ৩রা ফেব্রুয়ারী। আর আমাদের দেশে ফিরে আসার ফ্লাইট ৬ই ফেব্রুয়ারী। তাওয়াফে বিদা করার কোন নির্দিষ্ট শেষ সময় নাই। মিনা থেকে ফিরে আসার পর যে কোন দিনই তা করা যেতে পারে। তাওয়াফে বিদা সম্পন্ন করার পরও যদি কেউ কোন কারনবশত: কিছুদিন মক্কায় থেকে যান তবুও তার তাওয়াফে বিদার ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। আমরা মক্কা থেকে চলে আসার দুদিন আগে তাওয়াফে বিদা সম্পন্ন করলাম।

এর মধ্যে আমরা একদিন মসজিদুল হারামের নিকটবর্তী ফিলিং স্টেশন থেকে জেরিকেনে জমজমের পানি সংগ্রহ করলাম দেশে নিয়ে আসার জন্য। ফিলিং স্টেশনের কাছেই বিভিন্ন সাইজের প্লাস্টিকের জেরিকেন বিক্রি হচ্ছে। আমি দশ লিটারের একটা জেরিকেন কিনলাম। বিক্রেতার কাছেই সাইন পেন আছে। তা দিয়ে জেরিকেনের গায়ে নিজের নাম পরিচয় লিখলাম। ঢাকা বিমানবন্দরে নেমে শত শত জেরিকেনের মধ্যে নিজের জেরিকেন খুঁজে বের করার জন্য এই লেখাটা খুব জরুরী। জেরিকেন নিয়ে ফিলিং স্টেশনে গেলাম। এখানেও প্রচন্ড ভীড়। তবে ট্যাপগুলো থেকে তীব্র গতিতে পানি বের হওয়ার ফলে জেরিকেন ভরতে বেশী সময় লাগে না।

দেখতে দেখতে দেশে ফেরার সময় ঘনিয়ে এল। হজ্জ শেষ হবার পর যে কয়দিন সময় পেলাম তা মসজিদুল হারামে জামাতের সাথে নামাজ ও ইবাদত বন্দেগী করে কাটালাম। ৫ই ফেব্রুয়ারী রাতে আমরা হোটেল ত্যাগ করে জেদ্দাগামী বাসে উঠলাম। এখানে একটা কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। জেদ্দা, মক্কা, মদিনা সর্বত্রই নিজের মালামাল নিজেকেই বহন করে বাস পর্যন্ত নিয়ে আসতে হয়। আবার জেদ্দা বিমান বন্দরে সব মালামাল নিজেকেই বহন করে বিমানের খাড়া সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠতে হয়। তাই হুজুগে পড়ে এত বেশী কেনাকাটা করা উচিৎ নয় যা পরে বহন করা কষ্টকর হয়ে পড়ে। অনেকে বেশী বেশী জায়নামাজ ও কম্বল কিনে একটা বিরাট লটবহর বানিয়ে ফেলে। অথচ বাংলাদেশেই ভালো ভালো বিদেশী কম্বল পাওয়া যায়। আর মক্কা মদিনায় কেনা জায়নামাজে নামাজ পড়লে অতিরিক্ত সওয়াব হবে এমন কথা কোথাও লেখা নেই। হাজীরা একমাত্র যে বরকতময় জিনিষটি সঙ্গে করে দেশে নিয়ে আসেন তা হল জমজমের পানি। গাড়ী কিছুদুর যাওয়ার পর এক জায়গায় থামলো। সেখানে আমাদেরকে ফাস্টফুডের প্যাকেট, জমজমের পানি এবং মসজিদের সুদৃশ্য পোস্টার উপহার দেয়া হল।

আমাদের বাস গভীর রাতে জেদ্দা বিমানবন্দরে এসে পৌঁছল। বিমান বন্দরের সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে বিমানে উঠলাম সকাল বেলা। লাগেজ বলতে আমাদের প্রায় প্রত্যেকের দড়ি দিয়ে বাঁধা একটি বড় পলিথিনের বস্তা ও জমজমের পানির জেরিকেন। বস্তাটি আমরা মদিনা থেকে কিনেছিলাম। দেশ থেকে নিয়ে যাওয়া দুটি ব্যাগের বড়টি বস্তায় ঢুকিয়ে ফেলেছি। মক্কার হোটেলে বস্তা বাঁধতে গিয়ে আমরা আবিস্কার করলাম যে আমরা অনেক কিছু পারলেও বস্তা ঠিকমত বাঁধতে পারিনা। তখন আমাদের উদ্ধার করতে এগিয়ে এলেন সাথী হজ্জযাত্রী হিরু ভাই। টুকিটাকি অনেক ব্যাপারেই তিনি হজ্জযাত্রীদেরকে নানাভাবে সাহায্য করেছেন। দেশ থেকে নিয়ে যাওয়া একটি কুরআন শরীফ তিনি আমাকে পড়তে দিয়েছিলেন যেটি আমি মক্কা মদিনায় থাকাকালীন প্রতিদিন পড়েছি। সেই হিরু ভাই বিমান বন্দরে লাগেজ চেকিং এর সময় বিপদে পড়ে গেলেন। তার সাথে থাকা ছোট ব্যাগটি নিরাপত্তা কর্মীরা স্ক্যান করার পর আটকে দিলেন। তার ব্যাগ থেকে উদ্ধার হল একটি স্প্রিং নিক্তি। এ জিনিষটি আমরা অনেকেই কিনেছিলাম লাগেজ ওজন করার জন্য যাতে জেদ্দা বিমান বন্দরে অতিরিক্ত ওজনের জন্য সমস্যায় পড়তে না হয়। নিরাপত্তা কর্মীরা নিক্তিটা আর ফেরত দিল না। হিরু ভাই যতই বোঝাবার চেষ্টা করেন এটা নিতান্তই  একটা নিরীহ জিনিষ, কিন্তু নিরাপত্তা কর্মীরা তাকে আকার ইঙ্গিত করে বুঝিয়ে দিল যে এই বস্তু দিয়ে তুমি পাইলটের মাথায় আঘাত করতে পার। এখানে একটা কথা বলে নেয়া ভালো। আপনার কাছ যদি চাকু, ব্লেড বা ধাতব কোন ভারী জিনিষ থাকে তবে বিমান যাত্রার সময় সেগুলি লাগেজে দিয়ে দেবেন। সাথের যে ব্যাগটি নিয়ে আপনি বিমানে উঠবেন তাতে এ ধরনের কোন জিনিষ থাকলে আপনি বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারেন। রানওয়েতে ঢোকার আগে আমাদেরকে একটি করে কুরআন শরীফ এবং বাংলায় ছাপা কিছু ধর্মীয় বই উপহার দেয়া হল। কিন্তু আমাদের সাথের ছোট ব্যাগটির অবস্থা ‘ঠাঁই নেই ঠাঁই নেই ছোট সে তরী’র মত। সেখানে আলপিন ঢোকানোর জায়গা নেই, বই ঢুকবে কিভাবে?

সকাল ১০ টায় আমাদের ডিসি টেন বিমান দেশের পথে রওনা দিল। ঢাকা থেকে আসার দিন এসেছিলাম রাতে আর আজ যাচ্ছি দিনে। প্লেন যত ওপরে উঠছে সমুদ্র আর শহর ক্রমান্বয়ে ছোট হতে থাকল। তারপর এক সময় সাদা মেঘ ফুঁড়ে মেঘেরও অনেক ওপরে। ‘দৃষ্টিপাত’ এ যাযাবর বিমানে ভ্রমন সম্বন্ধে লিখেছেন, ‘আধুনিক বিজ্ঞান মানুষকে দিয়েছে বেগ কিন্তু কেড়ে নিয়েছে আবেগ। এতে উত্তেজনা আছে কিন্তু উপভোগ নেই। কমলালেবুর বদলে ভিটামিন সি ট্যাবলেট খাওয়ার মত।’ কিন্তু তার আমলে তো আর ডিসি ১০ প্লেন ছিল না। প্রায় ৩০০ জন যাত্রী ও তাদের মালামাল এবং প্রায় ১ লক্ষ লিটার জালানী তেল নিয়ে ১৮২.১ ফুট লম্বা প্লেন যখন যখন প্রায় ৩৬ হাজার ফুট উপর দিয়ে ঘন্টায় ৯৬৫ কিলোমিটার বেগে ছুটে চলে তখন কি উপভোগ করার কিছুই নেই? আমাদের উপরে পরিস্কার নীল আকাশে ঝলমলে সূর্য এবং অনেক নীচে সাদা মেঘের ভেলা। মাটি থেকে সাদা মেঘের সৌন্দর্য দেখেছি। কিন্তু মেঘের উপরিভাগে সূর্যের আলো পড়ে যে অপরূপ দৃশ্যের সৃষ্টি হয় তার কোন তুলনা হয় না। যতদুর চোখ যায় রূপালী সাগর আর অসংখ্য রূপালী পাহাড়। তার উপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে আমাদের বিমান। মেঘের এই রূপ দেখেই ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেয়া যায়। তবুও আপনার চোখ ক্লান্ত হবে না, সৌন্দর্যপিপাসু মনের ক্ষুধা মিটবে না। একটানা সাতঘন্টা বিমানযাত্রার পর সন্ধার আগে আগে যখন আমরা ঢাকা এয়ারপোর্টের উপর আসলাম তখন নীচে ঘন কালো মেঘ। বিমান নামতে নামতে কালো মেঘের মধ্যে ঢুকে গেল। তখন চারদিকে শুধুই অন্ধকার। কিছুক্ষন পরই আমরা মেঘের নীচে চলে আসলাম আর চোখ পড়ল বিমানবন্দরের দৃশ্য। কিছুক্ষনের মধ্যেই বিমান জন্মভুমির মাটি স্পর্শ করল। আল্লাহর অসীম অনুগ্রহে আমরা সুষ্ঠুভাবে হজ্জ পালন শেষে দেশের মাটিতে ফিরে আসলাম। প্রার্থনা করি আল্লাহ যেন সবাইকে বাকী জীবন সঠিক পথে চলবার শক্তি দেন।

‘সরল সঠিক পুন্য পন্থা

মোদেরে দাও গো বলি,

চালাও সে পথে, যে পথে তোমার

প্রিয়জন গেছে চলি।

যে পথে তোমার চির অভিশাপ

যে পথে ভ্রান্তি, চির পরিতাপ,

হে মহাচালক মোদেরে কখনও

কোরনা সে পথগামী।’

(সুরা ফাতিহার অংশবিশেষের অনুবাদ। অনুবাদক: কবি গোলাম মোস্তফা)

*রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন*
সম্পর্কিত সংবাদ
Leave a reply
ডা: মো: রাশেদুল মওলা