লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক: পর্ব ১

লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক: পর্ব ১

“চল রে কাবা জিয়ারতে

চল নবীজির দেশ,

দুনিয়াদারির লেবাস ছেড়ে

পররে হাজীর বেশ।”

– কাজী নজরুল ইসলাম

আল্লাহর অশেষ রহমতে হজ্জযাত্রার প্রস্তুতি সম্পন্ন করে আমাদের নির্ধারিত ফ্লাইটের দুদিন আগে যখন হজ্জ ক্যাম্পে গিয়ে উঠলাম, এক অপার্থিব স্বর্গীয় অনুভুতিতে আমাদের মন আচ্ছন্ন হয়ে গেল। সারা পৃথিবীর কোটি কোটি মুসলমান যে ঘরের দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করেন, সেই আল্লাহর ঘর কাবা শরীফ দেখার পরম সৌভাগ্যের অধিকারী হতে যাচ্ছি আমরা। সারা বিশ্বের প্রতিপালকের মেহমান হয়ে মক্কা, মিনা, আরাফাত, মুযদালিফায় হাজির হয়ে বলবো, “লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক”— হাজির হে আল্লাহ, আমি হাজির। আল্লাহর নৈকট্য প্রত্যাশীদের জন্য এ এক অপূর্ব সুযোগ।

হজ্জ ক্যাম্প জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছেই আশকোনায় অবস্থিত। হজ্জ ক্যাম্পের ব্যবস্থাপনা সত্যিই সুন্দর। বিশাল বিল্ডিং এর মধ্যে থাকার ব্যবস্থা, বাথরুম, খাবার হোটেল, ব্যাংক, বিমান অফিস, হজ্জযাত্রীদের জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় জিনিসের বিপুল সমারোহ সমৃদ্ধ মার্কেট এবং একটি সুন্দর মসজিদ। থাকার জন্য বড় বড় বেশ কয়েকটি রুমে ম্যাট বিছানো আছে। বাথরুম ও অজুখানার পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা প্রশংসনীয়। খাবার হোটেলগুলির খাবারের দাম সরকার কর্তৃক নির্ধারিত। হোটেলের সামনে মূল্যতালিকা দেয়া আছে। খাবারের মান খুব ভালো না হলেও গ্রহনযোগ্য। হজ্জ ক্যাম্পে শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করছেন স্কাউট ভাইয়েরা। তারা অত্যন্ত দক্ষতা ও আন্তরিকতার সাথে তাদের দায়িত্ব পালন করছেন। হজ্জযাত্রীদের থাকার ঘরগুলিতে বহিরাগত প্রবেশ নিষেধ। স্কাউটের ছেলেরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে বহিরাগত নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা করছেন। কিন্তু হজ্জযাত্রীদের কিছু কিছু আত্মীয় স্বজন ও বন্ধু বান্ধব জোর করে ভেতরে প্রবেশ করে থাকে। এতে নানা অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে এই সুযোগে কিছু চোর ভেতরে প্রবেশ করে হজ্জযাত্রীদের টাকা পয়সা ও মালামাল চুরি করে থাকে। আমরা যে রুমে ছিলাম সেই রুমেরই এক হজ্জযাত্রীর বাথরুমে যাওয়ার সুযোগে তার ব্যাগ থেকে মোটা অংকের টাকা চুরি হয়ে যায়। এজন্য সব হজ্জযাত্রীর উচিৎ বহিরাগত নিয়ন্ত্রনে স্কাউটদের সহযোগিতা করা যাতে এ ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়। যারা যে ব্যাংকে হজ্জের টাকা জমা দেন সে ব্যাংকের হজ্জ ক্যাম্পের শাখা থেকে একটি গলায় ঝুলানোর উপযোগী ছোট কাপড়ের ব্যাগ দেয়া হয়। হজ্জযাত্রীদের উচিৎ হবে সেই ব্যাগে পাসপোর্ট ও বিমানের টিকিট সহ যাবতীয় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং টাকা পয়সা রাখা। এই ব্যাগটি সবসময় গলায় ঝুলিয়ে রাখা উচিৎ। বাথরুমে যাওয়ার সময়েও ব্যাগটি সাথে নিয়ে যাওয়া উচিৎ। হজ্জ ক্যাম্পে প্রতিটি রুমে স্থাপিত সাউন্ড বক্সের মাধ্যমে এই ধরনের উপদেশ সবসময় দেয়া হচ্ছে। অথচ অনেকেই এ ব্যাপারে উদাসীন থাকেন।

৩১  ডিসেম্বর ২০০৩ সন্ধা ৬ টায় সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে আমাদের ডিসি টেন প্লেন উড়াল দিল জেদ্দার পথে। হজ্জ ক্যাম্পেই জানিয়ে দেয়া হয় জেদ্দায় অবতরন করার পর কোন ফ্লাইটের হজ্জযাত্রী মক্কায় যাবেন আর কারা মদিনায় যাবেন। যেহেতু আমরা মক্কায় যাব তাই বিমানে ওঠার আগে হজ্জ ক্যাম্পেই আমরা ইহরামের কাপড় পড়ে নিলাম। যারা জেদ্দা থেকে মদিনায় যান তারা সাধারন পোশাকেই মদিনায় গমন করেন। মদিনা থেকে মক্কায় ফেরার পথে তারা ইহরামের কাপড় পরিধান করেন।   আমরাই হজ্জযাত্রীদের প্রথম ফ্লাইটের যাত্রী। তাই রওনা হওয়ার আগে বিমানবন্দরে এক ছোট্ট অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখলেন বেসামরিক বিমান চলাচল প্রতিমন্ত্রী এবং ধর্ম প্রতিমন্ত্রী। প্লেনে ওঠার আগে মন্ত্রীর হাত থেকে বাংলাদেশ বিমানের উপহার স্বরুপ বাংলাদেশের পতাকাখচিত একটি ছাতা পেলাম। শুধু এই ছাতা ছাড়া বাংলাদেশ বিমানের সমালোচনা করার মত আমরা আর কিছু খুঁজে পাইনি। দক্ষ ব্যবস্থাপনা, সুন্দর ব্যবহার, পর্যাপ্ত খাবার সরবরাহ করে বাংলাদেশ বিমান সব হজ্জযাত্রীর মন জয় করে নিয়েছে। ঢাকা বিমানবন্দর থেকে সন্ধা ৬ টায় রওনা দিয়ে দীর্ঘ ৭ ঘন্টা পর বিমান যখন জেদ্দা বিমানবন্দরে অবতরন করল তখন জেদ্দার সময় রাত ১০ টা। বাংলাদেশের সাথে সৌদী আরবের সময়ের ৩ ঘন্টা হেরফেরের জন্য বাংলাদেশে যখন রাত ১ টা, সৌদী আরবে তখন রাত ১০ টা।

বিমানবন্দর থেকে নামার পর যে হলরুমে আমরা কিছুক্ষন বিশ্রাম নিলাম, সেখানে সৌদী আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদুত মহোদয় এবং হজ্জ মিশনের অন্যান্য কর্মকর্তাবৃন্দ আমাদের সাথে কথা বললেন এবং মক্কা মদীনায় আমাদের থাকার সুষ্ঠু ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে আশ্বস্ত করলেন। বিমানবন্দরে বিভিন্ন কাউন্টারে কর্মরত সৌদী কর্মচারীদের অনেকেই দেখলাম ধূমপানে অভ্যস্ত। এখন আন্তর্জাতিক ভাবেই ধূমপানকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। ইসলাম ধর্মেও ধূমপানকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। তাই হজ্জযাত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট বিমানবন্দরের কর্মচারীদের ধূমপান নিষিদ্ধ করা উচিৎ। জেদ্দার যে বিমানবন্দরে আমরা নামলাম, সেটি শুধুমাত্র হজ্জযাত্রীদের জন্য ব্যবহৃত হয়। শুধু হজ্জ এর সময় এটি চালু থাকে। বছরের বাকী সময় বন্ধ থাকে। বিশাল বিমানবন্দর। বিমানবন্দর টার্মিনালের চারদিক খোলা। ওপরে আরবের ঐতিহ্যবাহী তাঁবুর ডিজাইনের ছাদ। বিভিন্ন দেশের পতাকাশোভিত ক্যাম্প বিমানবন্দরে ছড়িয়ে আছে। ক্যাম্পের পথ চেনার জন্য নিজ নিজ দেশের পতাকা কিছুদুর পরপর শোভা পাচ্ছে। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে আমাদের লাল সবুজ পতাকা অনুসরন করে আমরা বাংলাদেশের ক্যাম্পে পৌঁছলাম। বাংলাদেশ হজ্জ মিশনের লোকজন আমাদেরকে আন্তরিকভাবে স্বাগতম জানালেন এবং ফাস্টফুডের প্যাকেট দিলেন। দীর্ঘ চারঘন্টার আনুষ্ঠানিকতা শেষে আমাদের বাসবহর পবিত্র মক্কা নগরীর পথে রওনা হলো রাত দু’টায়। ঘন্টা দুয়েক বাসযাত্রার পর আমরা পবিত্র মক্কা নগরীতে পৌঁছলাম। প্রথমে মোয়াল্লেমের অফিসের সামনে গাড়ি থামিয়ে আমাদেরকে নাস্তার প্যাকেট এবং পরিচিতিমূলক কব্জিব্যান্ড দেয়া হলো। তারপর আমাদেরকে থাকার হোটেলে নিয়ে যাওয়া হলো। বিরাট হোটেল। হোটেল আল ওমারা। এগারো তলা হোটেলের ষষ্ঠ তলায় আমার থাকার ব্যবস্থা হলো। এক রুমে ছয়জনের থাকার ব্যবস্থা। ছয়টি খাট একটি মাঝারি সাইজের রুমে প্রায় ঠাসাঠাসি করে পাতা। এরকম চারটি রুমের জন্য দুটি বাথরুম।

অর্থাৎ দুর্বিষহ পরিস্থিতি। দুটি বাথরুমের একটিতে রয়েছে কমোড। বেশীরভাগ হজ্জযাত্রীই কমোড ব্যবহারে অভ্যস্ত না থাকায় সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারন করলো।

মক্কা শরীফে পৌঁছে হজ্জযাত্রীদের প্রথম কাজ হলো ওমরা করা। অর্থাৎ পবিত্র কাবা শরীফ সাতবার তাওয়াফ করে, সাফা মারওয়ায় সাতবার সায়ী করে, মাথামুন্ডন করে এহরাম খুলে ফেলা। আমরা বাথরুম সেরে, হালকা নাস্তা খেয়ে কিছুক্ষন বিশ্রাম নিয়ে মসজিদুল হারামে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলাম। তখন মোয়াল্লেমের পক্ষ থেকে একজন মওলানা এসে আমাদেরকে বললেন,“যেহেতু ফজরের নামাজের সময়ের আর বেশী বাকী নেই, আপনারা আপনাদের রুমেই ফজরের নামাজ পড়ে ফেলুন। যেহেতু সবাই ওমরার নিয়মকানুন সঠিকভাবে জানেন না, তাই সবাইকে সাথে করে ফজরের নামাজের পর ওমরা করতে বের হবো এবং আমার নির্দেশনা মোতাবেক আপনারা সঠিকভাবে ওমরা পালন করবেন।” তার কথামত আমরা হোটেলরুমেই জামাতের সাথে ফজরের নামাজ আদায় করলাম। তারপর সবাই মিলে যখন বের হলাম, তখন দেখা গেল কয়েকশত লোককে গাইড করার জন্য একজন লোক মোটেও যথেষ্ট না। গাইডের কথাও বেশীরভাগ হজ্জযাত্রীর শোনা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা তিনজন গাইড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আলাদাভাবে ওমরার আনুষ্ঠানিকতা শুরু করলাম। মসজিদুল হারামের এক নম্বর গেট দিয়ে ঢুকে একটু অগ্রসর হতেই চোখে পড়লো বিশ্ব মুসলিমের কেবলা, আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত মুসলমানদের প্রথম এবাদতের স্থান পবিত্র কাবা শরীফ। এই মহা পবিত্র মুূহুর্তে কম হজ্জযাত্রীই আনন্দঅশ্রু সংবরন করতে পারেন। কাবা ঘরের দিকে তাকিয়ে আমরা উচ্চারন করলাম — আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ — আল্লাহ শ্রেষ্ঠ, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। ধীরে ধীরে আমরা মাতাফে প্রবেশ করলাম। মাতাফ হলো কাবা শরীফের চারদিকের ছাদবিহীন খোলা চত্বর। এই মাতাফের চারদিকে মসজিদুল হারামের তিন স্তর বিশিষ্ট বিশাল স্থাপনা। এখন অবশ্য বেসমেন্টেও নামাজ পড়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অবশ্য বেসমেন্টে তাওয়াফ করার কোনো বিধান নেই। মাতাফের মেঝেতে বড় বড় সাদা পাথর বসানো। এই পাথরের এমন গুন যে তীব্র রোদেও এই পাথর গরম হয় না। মসজিদুল হারামের বাইরের চত্বর এবং ছাদেও এই পাথর বসানো আছে। ফলে তীব্র রোদের মধ্যেও খালি পায়ে হাঁটতে কোনো অসুবিধা হয় না। ভবিষ্যতের হজ্জযাত্রীদের কাছে আমার অনুরোধ, অনুগ্রহ করে হজ্জে যাওয়ার কয়েকমাস আগে থেকেই মানসিক প্রস্তুতি নিন এবং হজ্জের নিয়মকানুন সংবলিত বই পড়া শুরু করুন। আপনার এলাকায় যদি হজ্জ ট্রেনিং এর ব্যবস্থা থাকে, তবে সেখানে অবশ্যই যাবেন। কেননা গাইডের উপর ভরসা করে হজ্জ করতে গেলে অনেক সমস্যায় পড়বেন। কারন প্রচন্ড ভীড়ের কারনে হয়তো আপনি গাইডকে সঠিকভাবে অনুসরন করতে পারবেন না। রংপুরে শ্রদ্ধেয় নাফিস ভাই প্রতি বছর নি:স্বার্থভাবে বিনামুল্যে হজ্জযাত্রীদের জন্য যে ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করে থাকেন তা হজ্জযাত্রীদের অনেক উপকারে আসে।  কাবা শরীফ তাওয়াফ শুরু করতে হয় পবিত্র পাথর হজরে আসওয়াদ থেকে। হজরে আসওয়াদের স্থান থেকে একটি খয়েরি লাইন মাতাফের উপর টানা আছে। ভীড়ের কারনে হজরে আসওয়াদে স্পর্শ ও চুমু দেয়া সম্ভব না হলে এই লাইনে দাঁড়িয়ে এই পবিত্র পাথরের দিকে মুখ করে ইশারায় চুমু দিয়ে কাবা শরীফ তাওয়াফ শুরু করতে হয়। পাঠক নিশ্চয়ই ছোটবেলায় নবীর জীবনীতে হজরে আসওয়াদের কথা পড়েছেন। হজরত মুহম্মদ(স:) এর নবুওয়ত প্রাপ্তির পাঁচ বছর আগে এক বন্যায় কাবা ঘরের ব্যাপক ক্ষতি হয়। তখন কুরাইশরা এর পুনর্নির্মানের উদ্যোগ নেয়। তারা রোম থেকে একজন স্থপতি এবং মিশর থেকে একজন কাঠমিস্ত্রীকে নিয়ে আসে যাদের তত্বাবধানে কাবাঘর পুনর্নির্মান করা হয়। কিন্তু হজরে আসওয়াদ কাবা ঘরের দেয়ালে পুনস্থাপন করার সময় বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়। প্রত্যেক গোত্রই এই সম্মানজনক কাজটি করতে চাইল। শেষ পর্যন্ত তারা এর মীমাংসা করতে না পেরে মুহম্মদ(স:) এর উপর এর মীমাংসার ভার ছেড়ে দিল। তিনি তখনও নবুওয়ত পাননি। কিন্তু তাঁর গভীর জ্ঞান ও বিচারবুদ্ধির উপর কুরাইশদের পূর্ন আস্থা ছিল। হজরত তাঁর চাদর মাটিতে বিছালেন এবং পাথরটিকে চাদরের উপর রাখলেন। প্রত্যেক গোত্রের লোককে তিনি চাদরের প্রান্ত ধরে তুলতে বললেন। সবাই চাদর ধরে নির্দিষ্ট উচ্চতায় তোলার পর হজরত নিজ হাতে পাথর তুলে কাবাঘরের দেয়ালের নির্ধারিত স্থানে তা সংস্থাপিত করলেন। এভাবে তিনি এই বিতর্কের সুন্দর সমাধান করলেন। হজরে আসওয়াদ পাথরটি কাবাঘরের দক্ষিন পূর্ব কোনে মেঝে থেকে দেড় মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। এর ব্যাস প্রায় তিরিশ সেন্টিমিটার।

কাবাঘরটি নিকটবর্তী পাহাড়গুলি থেকে সংগৃহীত গ্রানাইট পাথর দিয়ে তৈরী। এটির দৈর্ঘ্য ১২ মিটার, প্রস্থ ১০ মিটার এবং উচ্চতা ১৫ মিটার। এর দেয়ালগুলি একটি কালো সিল্কের কাপড় দিয়ে ঢাকা থাকে যা কুরআন শরীফের আয়াত দিয়ে অলঙ্কৃত করা আছে। এটি বছরে একবার পরিবর্তন করা হয়। কাবাঘরের ভেতরের মেঝে মার্বেল পাথর দিয়ে তৈরী। ভেতরের দেয়াল মেঝে থেকে অর্ধেক উচ্চতা পর্যন্ত মার্বেল পাথরে আবৃত যাতে কুরআনের শরীফের আয়াত উৎকীর্ণ করা আছে। দেয়ালের বাকী অর্ধেক কুরআন শরীফের আয়াত উৎকীর্ণ করা সবুজ কাপড়ে ঢাকা। কাবা ঘরের দরজাটি মাতাফ থেকে ৭ ফুট উঁচুতে স্থাপিত। কাবা ঘর পরিস্কার করার জন্য বছরে দুবার এর দরজা খোলা হয়। একবার রমজান মাসের ১৫ দিন আগে এবং দ্বিতীয়বার হজ্জ শুরু হওয়ার ১৫ দিন আগে। মক্কার গভর্নরের নেতৃত্বে এই কাজটি পরিচালিত হয়।

কাবা শরীফকে সাতবার প্রদক্ষিন করার পর মাকামে ইব্রাহীমের পিছনে গিয়ে দুই রাকায়াত ওয়াজিবুত তাওয়াফ নামাজ আদায় করলাম। মাকামে ইব্রাহীম একটি পাথর যার উপরে হজরত ইব্রাহীম(আ:) এর পায়ের ছাপ স্থায়ী ভাবে অঙ্কিত হয়ে আছে। হজরত ইব্রাহীম(আ:) এই পাথরের উপর দাঁড়িয়ে কাবাঘর নির্মান করেন এবং আল্লাহর কুদরতে তাঁর পায়ের ছাপ এই পাথরে স্থায়ী ভাবে পড়ে যায়। এই পাথরটি মাতাফের একস্থানে কাঁচ দিয়ে ঘিরে সংরক্ষন করা হচ্ছে। আমরা হজ্জের প্রায় একমাস আগে মক্কা যাওয়ায় ভীড় অপেক্ষাকৃত কম ছিল। প্রায় পনের মিনিটেই একবার তাওয়াফ হয়ে যেত। নামাজ শেষে আমরা গেলাম জমজম কুপের পানি পান করতে। গত বছরও হাজী সাহেবরা এই কুপ দেখেছেন। কিন্তু এই বছর কুপটি সর্বসাধারনের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কারন অনুসন্ধান করে জানতে পারলাম যে কুপটি মাতাফের এক অংশে অবস্থিত। ফলে মাতাফের উক্ত অংশটি তাওয়াফের জন্য সংকীর্ন ছিল। তাই তাওয়াফকারীদের সুবিধার্থে জমজম কুপের স্থানটি বন্ধ করে দিয়ে তাওয়াফের স্থান সম্প্রসারন করা হয়েছে। তাই আমাদেরকে একটি নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে জমজম কুপের পানি পান করে সন্তুষ্ট থাকতে হল। তবে আমার মত অনেক হজ্জযাত্রীই মনে করেন যে জমজম কুপের প্রবেশদ্বার অন্য দিক দিয়ে খুলে দেয়া যেতে পারে যাতে করে হজ্জযাত্রীরা এই বরকতপূর্ন পানির উৎসস্থলটি দেখতে পান। জমজম আল্লাহর অফুরন্ত কুদরতের অন্যতম। হজরত ইব্রাহীম(আ:) পুত্র ইসমাইল ও তাঁর মাতা বিবি হাজেরাকে আল্লাহপাকের আদেশে ‘ফারান’ নামক স্থানে রেখে আসলেন। পবিত্র কুরআনে এই স্থানকে কৃষির অনুপযোগী প্রান্তর(১৪ঃ৩৭) বলা হয়েছে। হজরত ইব্রাহীম(আ:) নিজ পুত্র ও স্ত্রীকে এই জনমানবশুন্য প্রান্তরে রেখে বিদায় নেবার সময় বিবি হাজেরা স্বামীকে বললেন,“আমাকে কার তত্বাবধানে রেখে যাচ্ছেন?” তিনি বললেন,“আল্লাহর।” সহীহ বুখারীতে পরবর্তী ঘটনা নিম্নোক্তভাবে বর্ণিত আছে — “মশকের সম্পূর্ন পানি শেষ হয়েছে। বিবি হাজেরার পিপাসা লেগেছে এবং শিশু ইসমাইলেরও পিপাসা লেগেছে। হজরত ইসমাইল পিপাসায় কাতর হয়ে মাটিতে গড়াগড়ি দিচ্ছিলেন। মা স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি দৌড়ে গিয়ে সাফা পাহাড়ে উঠলেন এবং চারদিকে লক্ষ্য করলেন। কিন্তু কোনো মানুষ দেখতে পেলেন না। বাধ্য হয়ে তিনি পাহাড় থেকে নেমে উপত্যকায় আসলেন। আবার অন্য দিকে দৌড়ে মারওয়া পাহাড়ে উঠলেন। পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে এদিক সেদিক লক্ষ্য করলেন যে কোনো মানুষ দেখা যায় কি না। কিন্তু কোনো মানুষ দৃষ্টিগোচর হলো না। তিন সাতবার এরূপ করলেন।  আল্লাহর রাসুল বলেছেন যে এই জন্যই হজ্জের সময় সাফা ও মারওয়ার মধ্যে দৌড়াতে হয়। হজরত ইবনে আব্বাস(রা:) বলেন যে অবশেষে বিবি হাজেরা যখন মারওয়া পাহাড়ে পৌঁছলেন, তখন তিনি একটি আওয়াজ শুনতে পেলেন। এ সময় তিনি দেখতে পেলেন যে জমজমের স্থানে একজন ফেরেশতা দাঁড়িয়ে আছেন। ঐ ফেরেশতা মাটির উপর পায়ের গোড়ালি দিয়ে আঘাত করলেন। এর ফলে পানি বের হয়ে এল। বিবি হাজেরা এই পানিকে পাথর দিয়ে চারদিকে বাঁধের মত বাঁধতে লাগলেন।

জমজমের পানির অফুরন্ত সরবরাহ দেখে কোন হজ্জযাত্রীই অবাক না হয়ে পারেন না। মসজিদুল হারামে শত শত ট্যাপযুক্ত কনটেইনারে জমজমের পানি হজ্জযাত্রীদের জন্য সরবরাহ করা হয়। মসজিদের বাইরের চত্বরেও জমজমের পানির বেশ কিছু ট্যাপ রয়েছে। তা ছাড়া মসজিদ থেকে সামান্য দুরে রয়েছে জমজমের পানির ফিলিং ষ্টেশন। এখানে পাইপের মাধ্যমে সরাসরি পানি সরবরাহ করা হয়। তাই বড় পাত্র বা জেরিকেন ভরার জন্য এখানে আসতে হয়। এই ফিলিং ষ্টেশনের সামনেই বিভিন্ন আকারের জেরিকেন কিনতে পাওয়া যায়। হজ্জযাত্রীরা জমজমের পানিভর্তি যেসব জেরিকেন দেশে নিয়ে আসেন সেগুলো সাধারনত এই ফিলিং ষ্টেশন থেকেই ভরে নেন। আমরা প্রতিদিন ছোট জেরিকেন অথবা বোতলে পানি সংগ্রহ করে হোটেলে নিয়ে যেতাম তিন বেলা খাবারের সময় পান করার জন্য।

অবশ্য সৌদী সরকারের একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা জমজমের পানি শীতলিকরন ও জীবানুমুক্তভাবে বোতলজাতকরনের কাজ করে থাকে। এই প্রতিষ্ঠান মক্কা শহরে ঢোকার সময় এবং মক্কা ত্যাগ করার সময় সব হজ্জযাত্রীকেই জমজমের পানির বোতল বিনামূল্যে উপহার দিয়ে থাকে। তাছাড়া এই প্রতিষ্ঠান মক্কায় যেসব হোটেল এবং বাসায় হাজীরা অবস্থান করেন সেসব জায়গায় গাড়ীতে করে হজ্জযাত্রীদের সংখ্যা অনুযায়ী জমজমের পানির কনটেইনার সরবরাহ করে থাকে। এইসব কনটেইনারের আকার আমাদের দেশের এল পি গ্যাস সিলিন্ডারের আকারের সমান। তবে এই পানি হাজীদের সারাদিনের জন্য যথেষ্ট নয়। তবে লক্ষ লক্ষ হাজীর বাসস্থানে জমজমের পানি পৌঁছানোর এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। হজ্জ মৌসুমে হজ্জযাত্রীরা প্রতিদিন ১৯ লাখ লিটার জমজমের  পানি পান করেন।  জমজমের পানি এমনকি মদীনার মসজিদে নববীতেও সরবরাহ করা হয়। জানতে পারলাম যে মক্কা থেকে পানিবাহী গাড়িতে করে মদীনার মসজিদে প্রতিদিন ৪০ টন  জমজমের পানি সরবরাহ করা হয়।

মসজিদুল হারাম এবং মসজিদে নববীর ভেতরে কিছুদুর পরপর ৫-৬ টি জমজমের পানির ট্যাপযুক্ত কনটেইনার রয়েছে। এর মধ্যে একটি কনটেইনারের পানি স্বাভাবিক তাপমাত্রার। আর বাকীগুলোর পানি বরফ ঠান্ডা। আমাদের মক্কা মদীনায় অবস্থানকালীন সময়ে  রাতে ও সকালে আবহাওয়া ছিল বেশ ঠান্ডা। শুধু দুপুরে গরম অনুভুত হত। তাই স্বাভাবিক তাপমাত্রার কনটেইনারের কাছেই বেশী ভীড় লেগে থাকতো। মীনা ও আরাফাতে তো শুধুই ঠান্ডা পানি সরবরাহ করা হয়েছে। একে তো লক্ষ লক্ষ লোকের সমাবেশ। তার ওপর ঠান্ডা পানি। ফলে অনেকেই খুশখুশে কাশি ও গলাব্যথায় আক্রান্ত হন। মীনাতে যখন বড় বড় বরফের টুকরা ভেঙ্গে খাবার পানির কনটেইনারে ঢোকানো হচ্ছিল তখন এক হজ্জযাত্রী বলেই ফেললেন,“ভাই আমাদের তো এখন ঠান্ডা পানির দরকার নেই।” জবাবে ওই কর্মচারী বললেন,“কর্তৃপক্ষ শীতকাল না গ্রীষ্মকাল তা বিবেচনা করেন না। অর্ডার দেয়া আছে ঠান্ডা পানি সরবরাহ কর। আমরা হুকুম তামিল করছি মাত্র।” প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে মক্কা মদীনায় খাবার পানি সরবরাহ এবং ক্লিনারের কাজে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশী নিয়োজিত আছেন। বাংলাদেশের হজ্জযাত্রীদের একটা বড় সুবিধা হল জেদ্দা, মক্কা, মদীনা সর্বত্রই আশেপাশে তাকালেই বাংলাদেশী ক্লিনারদের দেখা পাওয়া যায় যারা হজ্জযাত্রীদের জন্য ভালো গাইড হতে পারেন।

জমজম কুপের পানি খেয়ে আমরা সাফা মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে সায়ী করলাম, অর্থাৎ সাতবার আসা যাওয়া করলাম। দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী এই পথে কিছুটা স্থান দৌড়াতে হয় এবং বাকী পথ হাঁটতে হয়। পাহাড় দুটি এখন মসজিদুল হারামের অন্তর্ভূক্ত হয়ে গেছে এবং পাহাড় দুটির বেশীরভাগ অংশই মেঝের নীচে অদৃশ্য হয়ে গেছে। শুধু চুড়ার কিছু অংশ দেখা যায়। দুই পাহাড়ের মাঝামাঝি যায়গাটা সবচেয়ে নীচু। তারপর পাহাড় দুটির দিকে আস্তে আস্তে উঁচু হয়ে গিয়েছে। তাই সাফা মারওয়া সায়ী করা বেশ কষ্টসাধ্য কাজ। বৃদ্ধ ও অসুস্থ লোকদের জন্য হুইল চেয়ারের আলাদা লেন আছে। মসজিদ কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে বিনামূল্যে হুইল চেয়ার সংগ্রহ করা যায়। হুইল চেয়ার ব্যবহারকারীর আত্মীয়স্বজনও হুইল চেয়ার ঠেলতে পারেন অথবা লোক ভাড়া পাওয়া যায় যারা পয়সার বিনিময়ে হুইল চেয়ারে তাওয়াফ ও সায়ী করিয়ে দেয়। তাওয়াফের জন্যও হুইল চেয়ারের আলাদা লেন আছে। তবে হুইল চেয়ার ব্যবহারকারীর সংখ্যার তুলনায় তাওয়াফ ও সায়ীর লেন একেবারেই অপর্যাপ্ত। তাই অনেক হুইল চেয়ার ব্যবহারকারী হাজার হাজার লোকের ভীড় ঠেলে লেনের বাইরে দিয়েই তাওয়াফ ও সায়ী করে থাকেন, যার ফলে প্রত্যেকেই বেশ অসুবিধার সম্মুখীন হয়ে থাকেন। দ্বিতীয় তলাতেও সায়ীর ব্যবস্থা আছে। সেখানে সায়ীর পথটুকু সমতল হওয়ায় সায়ী করা কম কষ্টসাধ্য।

সায়ী সাফা পাহাড় থেকে শুরু করতে হয় এবং সাতবার আসা যাওয়ার পর মারওয়া পাহাড়ে গিয়ে শেষ হয়। সায়ী শেষ করার পর আমরা মারওয়া গেট দিয়ে বাইরে আসলাম। আমাদের পরবর্তী কাজ মাথা মুন্ডন। বাইরে বের হতেই নরসুন্দরের লোকজনের ডাকাডাকি শুনতে পেলাম। ওখানে বেশ কয়েকটি সেলুন আছে। সেলুনের লোকজন ডাকাডাকি করে খদ্দের ধরার চেষ্টায় ব্যস্ত। বেশীরভাগ সেলুনেই পাকিস্তানী নাপিত। আমরা আগেই শুনেছিলাম যে ওদের সাথে দরদাম করতে হয়। আমরা আমাদের বাঙ্গালী কায়দার উর্দুতে ওদের সাথে দরদাম করে জনপ্রতি চার রিয়ালে রফা করলাম। তারপর সেই লোক আমাদেরকে সেলুনে নিয়ে গেল। সেখানে ন্যাড়া করা হয় বিদ্যুৎগতিতে। গিনিস বুক অফ রেকর্ডস এর লোকেরা ন্যাড়া করার স্বল্পতম সময়ের রেকর্ড জানতে চাইলে এই সেলুনগুলোতে আসতে হবে। যা হোক আমরা মাথা মুন্ডন করে রুমে গিয়ে এহরামের কাপড় খুলে সাধারন কাপড় পরলাম। এরপর মদীনা যাওয়ার আগে আমরা যে দুদিন মক্কায় ছিলাম, পাঁচওয়াক্ত নামাজ মসজিদুল হারামে আদায় করেছি। যেহেতু আমরা হজ্জের একমাস আগে মক্কায় এসেছি তাই বেশ কষ্ট হলেও আল্লাহর অশেষ রহমতে হজরে আসওয়াদে চুমু দিতে পেরেছি। হাতীমেও বেশ কয়েকবার নামাজ পড়ার সৌভাগ্য আমাদের হয়েছে। হাতীম পূর্বে কাবা ঘরের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এখন এই স্থানটুকু দেয়াল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। হাতীমে নামাজ পড়া কাবা ঘরের ভেতরে নামাজ পড়ার সমতুল্য। পবিত্র কাবা ঘরের গিলাফ ও দেয়াল স্পর্শ করার সৌভাগ্য আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন। মদীনায় আটদিন কাটানোর পর আমরা যখন মক্কায় আবার ফিরে আসলাম ততদিনে মসজিদুল হারামে লক্ষ লক্ষ লোকের ভীড়।

আমরা হজ্জের প্রায় একমাস আগে মক্কায় যাওয়ার ফলে ভীড় তুলনামুলকভাবে কম ছিল। তাই সম্পুর্ন মাতাফ জুড়ে তাওয়াফ হতো না। কাবাঘর সংলগ্ন কিছুটা জায়গা তাওয়াফের জন্য বাদ রেখে বাকী জায়গায় কার্পেট বিছিয়ে দেয়া হতো হজ্জযাত্রীদের নামাজ ও কুরআন তেলাওয়াতের জন্য। মক্কায় দুদিন থাকার পর আমরা মদীনা শরীফে চলে যাই আটদিনের জন্য। এই দুদিন আমরা মাতাফের কার্পেটে বসেই পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করেছি। মাতাফসহ মসজিদুল হারামের সর্বত্রই কিছুদুর পরপর ছোট ছোট সেলফে শত শত কুরআন শরীফ রাখা আছে। অবশ্য যখন ভীড় বেড়ে যায় তখন মাতাফ থেকে কার্পেট ও সেলফগুলো উঠিয়ে ফেলা হয়। সেলফ থেকে কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করতে গিয়ে আমরা একটু সমস্যায় পড়লাম। আমরা বাংলাদেশে যে কুুরআন শরীফ পড়ি তার সাথে এই কুরআন শরীফের লিখন পদ্ধতির অনেক পার্থক্য। যেমন একটা উদাহরণ দেই। কুরআন শরীফের বাংলাদেশী প্রিন্টে সুরা হুুমাযাহ পড়ার সময় দেখবেন লেখা আছে ,“ওয়াই লুল্লে কুল্লে হুমাযাতিল্ লুমাযাতে, নেল্লাজি জামাআ মালাও ওয়াদ্দাদা।” সৌদী আরবের প্রিন্টে রয়েছে,“ওয়াই লুল্লে কুল্লে  হুমাযাতিল্ লুমাযাতেন। তারপর নু অনুপস্থিত। আমরা এই বিষয় নিয়ে তিন বন্ধু মাতাফে আলোচনা করছি, এমন সময় আমাদের পাশের এক ভদ্রলোক এগিয়ে এসে আমাদের আলোচনায় যোগ দিলেন। ভদ্রলোক বাংলাদেশী। অনেক দিন থেকে সৌদী আরবের ওয়াটার সাপ্লাই বিভাগে চাকুরি করেন। তিনি বললেন যে যেহেতু সৌদী আরবের লোকের মাতৃভাষা আরবী তাই কিছু অক্ষর এবং চিহ্ন অনুল্লেখ্য থাকলেও তারা কুরআন শরীফ আরবী উচ্চারনরীতির নিয়ম অনুযায়ী সঠিক উচ্চারনে পড়তে পারে। কিন্তু যাদের মাতৃভাষা আরবী নয় তাদের এই প্রিন্টের কুরআন শরীফ পড়তে অসুবিধা হওয়া স্বাভাবিক। এসব কথা চিন্তা করে উপমহাদেশের ধর্ম বিশেষজ্ঞগন অনারবদের উপযোগী একটি নতুন প্রিন্ট উদ্ভাবন করেন যাতে যাদের মাতৃভাষা আরবী নয় তারাও শুদ্ধভাবে কুুরআন শরীফ তেলাওয়াত করতে পারেন। তাঁরা সৌদী সরকারকে প্রভাবিত করে সরকারী ছাপাখানা থেকে ঐ প্রিন্টের কুরআন শরীফ ছাপানোর ব্যবস্থা করেছেন যা মসজিদুল হারামের সেলফগুলিতেও কিছু কিছু রক্ষিত আছে। এই কুরআনশরীফগুলোর মলাট নীল। ভদ্রলোক আমাদের জন্য উপমহাদেশীয় প্রিন্টের একটি কুরআনশরীফ খুঁঁজে আনলেন। আমরাও খুশী মনে এই কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করলাম। মক্কায় দুদিন অবস্থান করার পর আমরা মদীনায় গিয়ে আটদিন অবস্থান করি। তারপর আবার মক্কায় ফিরে এসে মসজিদুল হারামে আর কুরআন শরীফের উপমহাদেশীয় প্রিন্টের কোন কপি খুঁজে পাইনি। অর্থাৎ কর্তৃপক্ষ সৌদী লিখন পদ্ধতির প্রিন্ট ছাড়া অন্য প্রিন্টের কপিগুলো সরিয়ে ফেলেছেন। এরমধ্যে একদিন এক মজার ঘটনা ঘটলো। আমরা তিনবন্ধুর একজনকে মসজিদুল হারামের ভেতরে রেখে দুজন বাথরুমে যাওয়ার জন্য বের হয়েছি। ফিরে এসে শুনলাম এক মজার ঘটনা ঘটেছে। এক ভদ্রলোক কুরআন শরীফের কিছু কপি মসজিদে দান করার জন্য এনে বিভিন্ন সেলফে রেখে যান। তার কয়েক মিনিটের মধ্যেই মসজিদ কর্তৃপক্ষের লোকজন এসে সেই দানকরা কুরআন শরীফের সবগুলো কপিই তুলে বস্তাবন্দী করে নিয়ে গেলেন। পরবর্তীতে আমি নিজেও বস্তাবন্দী বইপুস্তক নিয়ে যেতে দেখেছি। আবার হাজীগন দেশে ফেরার সময়ও প্রত্যেককে সৌদী প্রিন্টের কুরআন শরীফের একটি কপি উপহার দেয়া হয়। পুর্বেল্লিখিত ওয়াটার সাপ্লাই বিভাগের সেই ভদ্রলোকের কাছে আমরা জানতে পারলাম যে সৌদী সরকার চাচ্ছেন যে সারা পৃথিবীতে কুরআন শরীফের একটি প্রিন্ট চালু হোক। কিন্তু তাতে আমাদের মত অনারব মুসলমানদের যে অসুবিধা হবে তা সৌদী ধর্ম মন্ত্রনালয়ের বিবেচনায় আসা উচিৎ। তার কাছ থেকে আমরা আর একটি তথ্য জানতে পারলাম। সৌদী আরবের খাবার পানির মূল সরবরাহ আসে সমুদ্রের পানির লবনাক্ততা দুরীকরন প্ল্যান্ট থেকে। পরে খোঁজ নিয়ে জেনেছি যে সৌদী আরব এখন পৃথিবীর বৃহত্তম লবনাক্ততামুক্ত পানি উৎপাদনকারী দেশ। সারা দেশের খাবার পানির মোট চাহিদার ৭০% এই পানি দিয়ে পূরন করা হয়। লবনাক্ততামুক্ত পানিতে আবার প্রয়োজনীয় খনিজ পদার্থ মিশ্রিত করে পানের উপযোগী করা হয় এবং সারাদেশে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। মক্কা, জেদ্দা এবং তায়েফে শোয়াইবা প্ল্যান্ট থেকে পানি সরবরাহ করা হয়।

..দ্বিতীয় পর্ব আসছে ১৫ই আগষ্ট

সম্পর্কিত সংবাদ
ডা: মো: রাশেদুল মওলা