লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক : পর্ব ২

লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক : পর্ব ২

লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক : পর্ব ১

প্রথম পর্বের পর…

একদিন আমরা মাতাফে বসে কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করছি। এমন সময় মাতাফে কার্পেট বিছানো শুরু হলো। আমি কৌতুহলবশত: কার্পেটের কোনা উল্টিয়ে দেখলাম লেখা আছে Made in Belgium. দেখে অত্যন্ত আশ্চর্য এবং নিরাশ হলাম। যেখানে একাধিক মুসলিম দেশে পৃথিবীবিখ্যাত কার্পেট তৈরী হয়, সেখানে আল্লাহর ঘরের আঙ্গিনায় বিছানো হচ্ছে খৃষ্টান অধ্যুষিত দেশের কার্পেট?

“কবর জিয়ারতের তরে কে যাও মদীনায়,

আমার সালাম পৌঁছে দিও

নবীজির রওজায়।”

– নজরুল।

যে শহরের মানুষ দুর্দিনে নবীকে আশ্রয় দিয়েছেন, যে শহরের লোক মক্কা থেকে আগত মুহাজিরদেরকে স্বেচ্ছায় নিজ সম্পত্তির অংশ প্রদান করেছেন, যে শহরে আল্লাহর রাসুল শেষ দশটি বছর কাটিয়েছেন, যে শহরে প্রিয়নবী চিরনিদ্রায় শায়িত, সেই শহর আমাদের পরবর্তী গন্তব্যস্থল। পূর্বে এই শহরের নাম ছিল ইয়াসরিব। নবীর আগমনে আনন্দে উদ্বেলিত জনতা নিজ শহরের নাম বদলে ফেলে রাখলো মদীনাতুন নবী অর্থাৎ নবীর শহর। এই শহর মক্কা থেকে প্রায় পাঁচশত কিলোমিটার উত্তরদিকে অবস্থিত। আমাদের বাসবহর মক্কার হোটেল থেকে মদীনার উদ্দেশ্যে রওনা দিলো রাত দশটায়। রাতের বেলা রাস্তার দুদিকে ভালোভাবে দেখা গেল না। তবে মদীনা থেকে মক্কায় ফিরে আসার সময় দিনের বেলা এসেছিলাম। সে বর্ণনা পরে হবে। মধ্যরাতে আমাদের বাস এসে এক রেষ্টুরেন্টে থামলো। যারা বাংলাদেশে দুরপাল্লার বাসে যাতায়াত করেছেন তারা পথিমধ্যের এই ধরনের রেষ্টুরেন্টের সঙ্গে পরিচিত। তবে এই রেষ্টুরেন্ট বাংলাদেশের রেষ্টুরেন্টগুলোর তুলনায় অনেক নিুমানের। সামান্য ফাস্টফুড ও চা যা পাওয়া যায় তার অগ্নিমূল্য। এক কোনায় টেবিলের ওপর কয়েকটি হুঁকা সাজানো আছে। পয়সার বিনিময়ে সুখটান দিতে পারেন। আমরা টয়লেটে লাইন দিয়ে চাপমুক্ত হলাম। পথিমধ্যে এ ধরনের জায়গায় গাড়ী থেকে নামলে গাড়ীর নম্বর টুকে নেয়া খুব জরুরী। হয়তো নামার সময় দেখলেন একটা বা দুটো গাড়ী দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু ২০-২৫ মিনিট পরে গাড়ীতে ওঠার জন্য এসে দেখলেন একই চেহারা এবং রঙ্গের বেশ কয়েকটি গাড়ী দাঁড়িয়ে আছে। এ অবস্থায় গাড়ীর নম্বর জানা না থাকলে নিজের গাড়ী খুঁজে বের করা কষ্টকর। আমাদের গাড়ী ফজরের ওয়াক্তের কিছু আগে পবিত্র মদীনা শরীফে প্রবেশ করলো। শহরের প্রবেশ মুখে বড় সাইনবোর্ডে ইংরেজীতে লেখা আছে,“নবীর শহরে স্বাগতম।” দেখে শরীর রোমাঞ্চিত হলো, মন ভরে গেল অনাবিল আনন্দে। শহরে ঢুকেই আমাদের গাড়ী এসে থামলো সৌদী সরকারের এক অফিস প্রাঙ্গনে। শুনলাম সেখানে আমাদের পাসপোর্ট এবং আনুসঙ্গিক কাগজপত্র পরীক্ষা করা হবে। অনেক দেশের হজ্জযাত্রীকে নিয়ে বহু গাড়ী এখানে এসে থামলো। আমরা গাড়ী থেকে নেমে টয়লেট সেরে, ওজু করে নামাজের নির্ধারিত স্থানে গিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করলাম। তারপর অপেক্ষার পালা। চারিদিকে তাকালাম। দুরে উঁচু উঁচু পাহাড়। কেউ ফাস্টফুড, কেউ চা কিনে খাচ্ছি। কেউ বিদেশীদের সাথে ভাঙ্গা ইংরেজীতে অথবা হাতের ইশারায় কথা বলার চেষ্টা করছি। কিন্তু অপেক্ষার পালা আর শেষ হয় না। দীর্ঘ চারঘন্টা পর আমাদের গাড়ী ছাড়লো। নির্ধারিত হোটেলে গিয়ে উঠলাম। তিনতলা হোটেলের তৃতীয় তলার এক রুমে জায়গা পেলাম। এখানকার থাকার ব্যবস্থা মক্কার চেয়ে করুণ। ছোট একটা রুমে গাদাগাদি করে পাঁচজন থাকলাম। তবে একটা সুবিধা ছিল যে রুমের সাথে এটাচ্ড বাথরুম ছিল। তবে সে বাথরুমের যা সাইজ! দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়ালেও বিপরীত দেয়ালের ছোট বেসিন ভুঁড়িতে লেগে যায় যদিও আমাদের কারো ভুঁড়িই সফদার ডাক্তারের মত না। (সেই যে ছোটবেলায় পড়েছিলাম,‘সফদার ডাক্তার, মাথাভরা টাক তার, শুলে পরে ভুড়ি ঠেকে আকাশে।’)

আমরা চল্লিশ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে নববীতে জামাতের সাথে আদায় করবার জন্য এসেছি। জোহরের নামাজের সময় আমরা মসজিদে নববীতে গেলাম। সুন্দর শহর । মসজিদের নিকটে রাস্তার ধারে বিশাল বিশাল পাঁচতারা হোটেল মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মসজিদ কমপ্লেক্সটিও বিশাল এবং আধুনিক স্থাপত্যরীতিতে তৈরী। অবশ্য অটোমান সাম্রাজ্যের আমলে তৈরী পুরনো মসজিদটি এখনও আছে যা বিশাল মসজিদ কমপ্লেক্স এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। মসজিদের চারিদিকে বিশাল চত্বর। সেই চত্বরে কিছুদুর পরপর ছোট ছোট পাকা ঘর। সেখান থেকে চলন্ত সিঁড়ি নীচে নেমে গেছে। মাটির নীচে আরও চারতলা। তাতে হাজার হাজার টয়লেট এবং গাড়ী পার্কিং এর ব্যবস্থা। প্রতিটি টয়লেটেই গোসল করবার জন্য শাওয়ার রয়েছে। টয়লেটের বাইরে কিছুদুর পর পর রয়েছে অজুখানা। আছে লিকুইড সাবানের সরবরাহ। আরও আছে খাবার পানির ব্যবস্থা। মক্কা ও মদীনা দুই জায়গাতেই পুরুষ ও মহিলাদের টয়লেট আলাদা। তবে মক্কা ও মদীনার টয়লেট ব্যবস্থাপনায় কিছূ পার্থক্য আছে। মক্কার টয়লেটগুলি মদীনার মত মসজিদের চারদিকে সমদুরত্বে অবস্থিত নয়। মসজিদের দুইদিকে টয়লেটগুলি অবস্থিত। একটি টয়লেট কমপ্লেক্স ভূগর্ভে দুইতলা পর্যন্ত। অপরটি ভূগর্ভস্থ নয়। মক্কার টয়লেটগুলিতে সাবানের কোন ব্যবস্থা নাই। মদিনার টয়লেট কমপ্লেক্স এর অজুখানার ট্যাপগুলো হতে ক্ষীন ধারায় পানি বের হয়, যার ফলে অজু সহজেই করা যায় আবার পানির অপচয়ও কম হয়। কিন্তু মক্কার অজুখানার ট্যাপগুলো থেকে তীব্র ধারায় পানি বের হয়। ফলে অনেক পানি অপচয় হয়। অজুখানাগুলোতে দেয়ালে কয়েকটি ভাষায় লেখা আছে যে এই পানি খাবার জন্য নয়। পানি মুখে নিয়েও আমরা দেখলাম যে এই পানি সামান্য লবনাক্ত। আন্দাজ করলাম যে সমুদ্রের পানি খাবার উপযোগী করতে যে ষোলআনা লবনাক্ততা মুক্ত করতে হয় অজুর পানির বেলায় ততখানি করা হয়নি। আর একটা কথা এখানে বলা প্রয়োজন। আমরা মনে করেছিলাম যে টয়লেট কমপ্লেক্সে যে খাবার পানি সরবরাহ করা হয় তাও জমজমের পানি। কিন্তু সেখানে কর্মরত এক বাংলাদেশী ক্লিনার আমাদের জানালো যে এই পানি জমজমের পানি নয়। শুধু মসজিদের অভ্যন্তরে এবং বাইরের চত্বরেই জমজমের পানি সরবরাহ করা হয়।

মসজিদে নববী আধুনিক স্থাপত্যশিল্পের এক অনুপম নিদর্শন। বিশাল আয়তন, অপরূপ কারুকার্য, অসংখ্য সুন্দর ঝাড়বাতি, আধুনিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা, সুন্দর পাথরের মেঝেতে পুরু কার্পেট যে কোনো লোককেই মুগ্ধ করার জন্য যথেষ্ট। বাইরের চত্বর সহ মসজিদটির মোট আয়তন এখন ৪০০৩২৭ বর্গ মিটার। বর্তমানে ১০ লক্ষেরও বেশী লোক এখানে একত্রে নামাজ পড়তে পারে। মসজিদের ১৪.৭ মিটার ব্যাসের ২৭ টি গম্বুজ বিদ্যুতের সাহায্যে স্থানান্তরিত করা যায়। প্রতিটি গম্বুজের ওজন ৮০ টন। মিনার মোট ১০ টি।  প্রতিটির উচ্চতা ১০৭ মিটার। নিচের অংশ গ্রানাইট এবং ওপরের অংশ রঙ্গিন চিত্রাঙ্কিত পাথরের তৈরী। ওজন ৪.৫ টন। মিনারের মাথায় অর্ধচন্দ্র সোনার তৈরী। ভেতরের থামগুলো মার্বেল পাথরের তৈরী। থামের সংখ্যা ২১৭৫ টি। প্রধান প্রবেশ দরজা ৮৫ টি। বাতির সংখ্যা ৬৭০০০। এর মধ্যে সোনার তৈরী বাতি আছে ৬৮ টি। মসজিদের একটি অংশে ছাদ নেই। সেখানে ১২ টি বিদ্যুতচালিত বিশাল আকৃতির ছাতা রয়েছে। এই ছাতাগুলো দিনের বেলা খোলা থাকে। সন্ধায় একসাথে বন্ধ করা হয়। এক সন্ধায় এই জায়গায় বসে ছাতাগুলোর বন্ধ হওয়া দেখলাম। দেখতে সত্যিই সুন্দর লাগে। আরও ভালো লাগে খোলা আকাশের অসংখ্য নক্ষত্ররাজির নীচে বসে আল্লাহর কালাম পাঠ করতে। এখানেও মসজিদুল হারামের মত অসংখ্য সেলফে কুরআন শরীফ রাখা আছে। তবে এই মসজিদে অতিরিক্ত রয়েছে রেহেল(যার ওপর কুরআন শরীফ রেখে পাঠ করা হয়)।

এখানে একটা অসুবিধার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। দুই মসজিদেই অনেক জায়গায় কাতারের কোন দাগ বা চিহ্ন না থাকায় নামাজের সময় মুল কাতারগুলোর মাঝের ফাঁকা স্থানগুলোতে অনেক অসম্পুর্ন কাতার সৃষ্টি হয়। এর ফলে সেজদার সময় সমস্যার সৃষ্টি হয়। দুই মসজিদেই মসজিদের পুরোনো অংশ, যেটি অটোমান সাম্রাজ্যের আমলে তৈরী বলে শুনলাম, এখনও অক্ষত আছে। মসজিদে নববীর এই অংশটিতেই একটি মনোরম সবুজ গম্বুজের নীচে আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহম্মদ(স:) এর রওজা মোবারক অবস্থিত। নবীর রওজা মোবারকের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন হজরত আবুবকর(রা:) এবং হজরত ওমর(রা:)। রওজা মোবারক জিয়ারত করার জন্য একটি নির্দিষ্ট দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে হয়। তারপর লাইনে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে অগ্রসর হতে হয়। কিছুদুর অগ্রসর হয়ে যখন বাঁদিকে নবীর রওজা মোবারক দৃষ্টিগোচর হয় তখন খুব কম লোকের পক্ষেই অশ্র“ সংবরন করা সম্ভব হয়। অশ্র“সিক্ত নয়নে প্রানের সকল আকুতি মিশিয়ে নবীকে সালাম জানালাম। তারপর হজরত আবুবকর(রা:) ও হজরত ওমর(রা:) কে সালাম জানিয়ে বহির্গমন দরজা দিয়ে বাইরে আসলাম। যেহেতু সবসময় শত শত লোক জিয়ারতের উদ্দেশ্যে এই স্থানে প্রবেশ করছেন, সেজন্য রওজা মোবারকের সামনে দাঁড়াবার কোন সুযোগ নেই। হাঁটতে হাঁটতেই সালাম দিতে হয়। জিয়ারতের সময়  উচ্চস্বরে ক্রন্দন করা অথবা রওজা মোবারককে বেষ্টনকারী নেট স্পর্শ বা চুম্বন করা সেখানে কর্তব্যরত মসজিদ কর্তৃপক্ষের লোকেরা নিষেধ করে থাকেন। বহির্গমন দরজা দিয়ে বের হয়ে অনেকে দাঁড়িয়ে জিয়ারতের নিয়তে সুরা ও দোয়া পাঠ করে থাকেন। তবে যে সব হজ্জযাত্রী নবীর রওজা মোবারকের দিকে মুখ করে প্রার্থনা করছেন মসজিদ কর্তৃপক্ষের লোকজন তাদেরকে ঘুরিয়ে কেবলামুখী করে দিচ্ছেন। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমরা চল্লিশ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সাথে মসজিদে নববীতে আদায় করেছি।

একদিন দেখি মসজিদে নববীর এক জায়গায় একজন চেয়ারে বসে আরবীতে বক্তব্য রাখছেন। কিছুক্ষন ওখানে বসে থাকার পর বুঝতে পারলাম তিনি বিভিন্ন ধর্মীয় প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন। কিছুক্ষন পর নামাজের জামাত শুরু হলো। ফরজ নামাজ শেষ হবার সাথে সাথে আবার সেই প্রশ্নোত্তরপর্ব শুরু হলো, যা সাউন্ডবক্সের মাধ্যমে মাধ্যমে উচ্চস্বরে প্রচারিত হচ্ছিল। এতে ফরজ নামাজ পরবর্তী সুন্নত ও নফল নামাজ আদায় করতে বেশ অসুবিধা হলো। ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। সুন্নত ও নফল নামাজ তারা কখন পড়বেন বুঝতে পারলাম না।

দেশ থেকে রওনা দেবার আগে আমার এক পরিচিত ভদ্রলোক আমাকে একটা চিঠি দেন। তিনি বেশ কয়েক বছর মসজিদে নববী কমপ্লেক্সে চাকুরী করেছেন। তিনি তার পূর্বের এক সহকর্মীকে চিঠিটি দিতে বলেছিলেন। খামটি মসজিদ কমপ্লেক্সে কর্মরত কোন লোক অথবা নিরাপত্তারক্ষী যাকেই দেখাই, তাদের সবার একটাই উত্তর,“নো ইংলিশ”। অর্থাৎ তারা ইংরেজী জানেন না। বাংলাদেশী ক্লিনার কয়েকজনকে জিজ্ঞাসা করলাম। খামে লেখা আছে বেসমেন্ট, মসজিদে নববী। দেখলাম বেসমেন্ট কথাটার অর্থই কেউ বুঝতে পারছেন না। বুঝিয়ে বলাতে তারা মাটির নীচের বাথরূমগুলো দেখিয়ে দিল। এভাবে হয়রান হবার পর একদিন এক বাঙ্গালী কর্মচারী খামে উল্লেখিত বিন লাদেন গ্র“পের অফিস দেখিয়ে দিল যা মসজিদের নিকটেই অবস্থিত। সেখানে গিয়ে অবশেষে জানতে পারলাম মসজিদের কত নম্বর গেটের সামনে সেই বেসমেন্টে যাওয়ার সিঁড়ি আছে। গেলাম সেই গেটে। গেটের মুখেই ছোট একটা ঘরে সৌদী নিরাপত্তারক্ষীরা গল্পগুজবরত এবং গাওয়া পানরত। এই ‘গাওয়া’র বর্ণনায় পরে আসছি। কাছে গিয়ে খামটি দেখাতেই সেই একই তোতাপাখি বুলি,“নো ইংলিশ”। হাতের ইশারায় আমাকে তারা চলে যেতে বললো যেন আমার হাতের খামটি কোন বিপজ্জনক বস্তু। শেষে এক ভারতীয় কর্মচারীর কাছে জানতে পারলাম যে চিঠির প্রাপকের ডিউটি এখন নেই। আগামীকাল তার দেখা পাওয়া যাবে। পরবর্তীতে তার সাথে দেখা করার আর সময় করে উঠতে পারিনি। হজ্জ মওসুমে যেখানে লক্ষ লক্ষ লোকের সমাবেশ হয় যাদের বেশীরভাগই আরবীভাষী নয় সেখানে এই “নো ইংলিশ” মার্কা সউদী কর্মচারীরা হজ্জযাত্রীদেরকে কতটুকু সহযোগিতা করতে পারবে তা বলাই বাহুল্য। অবশ্য অনেক হজ্জযাত্রী আরবী, ইংরেজী কোনটাই জানেন না। যেমন তুরস্ক থেকে যে বিপুলসংখ্যক হজ্জযাত্রী এসেছিলেন তাদের বেশীরভাগই মাতৃভাষা ছাড়া কিছু জানেন না। আমার মনে হয় মক্কা মদীনার মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় একাধিক তথ্য কেন্দ্র থাকা দরকার যেখানে বহুভাষী লোকজন কর্মরত থাকবেন। এতে করে লক্ষ লক্ষ অনারব লোকেরা বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য সহযোগিতা পেতে পারেন। খাবার হোটেল, টেলিফোন, মার্কেট, টয়লেট ইত্যাদি নানা ব্যাপারে সহজে জানার জন্য এরকম বহুভাষী তথ্যকেন্দ্র খুবই জরুরী। মক্কা মদিনার মার্কেটে গিয়ে দেখেছি বিভিন্ন দোকানের বাঙ্গালী কর্মচারীরা ছয় সাতটা ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারেন। যখন যে ভাষাভাষী লোক দোকানে প্রবেশ করছেন, তাদের সাথে সেই ভাষায় তারা কথা বলছেন। তাই সরকারের যদি সদিচ্ছা থাকে তাহলে এরকম বহুভাষী তথ্যকেন্দ্র স্থাপন করা কোন কঠিন কাজ নয়।

মসজিদে নববীতে হজরত মুহম্মদ(স:) এর রওজা মোবারক এবং তাঁর যামানার মুল মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থানকে নবীজি বেহেশতের বাগানসমুহের একটি বাগান বলেছেন। এই স্থানকে রিয়াজুল জান্নাত বলা হয়। এই জায়গায় সবুজ-সাদা রঙ্গের কার্পেট বিছানো আছে। এ স্থানে নফল নামাজ পড়া অতি উত্তম। এ স্থানটি অপরিসর এবং এখানে সবসময় প্রচন্ড ভীড় থাকে। অনেক লোককেই দেখা যায় এই স্থানে প্রবেশ করে দীর্ঘক্ষন ধরে নামাজ পড়তে থাকেন অথবা বসে থাকেন। ফলে এখানে প্রবেশ করতে ইচ্ছুক হাজার হাজার হজ্জযাত্রী সমস্যায় পড়েন। প্রত্যেকেরই উচিৎ এখানে নফল নামাজ পড়ে দ্রুত বের হয়ে অন্যান্য সাথী হাজী ভাইদেরকে সুযোগ করে দেয়া। এতে নিশ্চয়ই মহান আল্লাহতাআলাও খুশী হবেন।

রাসুল(স:) এর রওজা শরীফের পেছনে একটি ছোট উঁচু স্থান রয়েছে। বহিরাগত সহায় সম্বলহীন সাহাবাগন এখানে অবস্থান করতেন। এই বরকতপূর্ন স্থানেও অনেকেই নফল নামাজ পড়ে থাকেন।

মসজিদ চত্বরের পাশেই রয়েছে জান্নাতুল বাকী। এটি দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ কবরস্থান। এখানে শুয়ে আছেন হজরত ওসমান(রা:), হজরত মুহম্মদ(স:) এর নয়জন স্ত্রী, প্রিয় নবীর শিশু  সন্তান হজরত ইবরাহীম(রা:), নবীজির চাচা হজরত আব্বাস(রা:), নবীজির নাতি হজরত হাসান(রা:)। নবীজির কন্যা হজরত ফাতেমা(রা:) এর কবরের ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। কারও কারও মতে নবীজির রওজার পেছনে তাঁর কবর অবস্থিত। কেউ কেউ মনে করেন জান্নাতুল বাকীতেই তিনি সমাহিত। এ ছাড়াও দশ হাজারের বেশী সাহাবী এই কবরস্থানে সমাহিত রয়েছেন। এই কবরস্থানে সবসময় জিয়ারতকারীদের ভীড় থাকে। আমরাও এই বরকতময় কবরস্থান জিয়ারত করলাম। অতীতে এই কবরস্থানে নবীজির আত্মীয় ও বিখ্যাত সাহাবীদের কবরের উপর স্থাপনা ছিল এবং কোনটি কার কবর তা চিহ্নিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে কবরগুলোর উপর কোন স্থাপনা নেই। সব কবরই সমতল করে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। কোনটি কার কবর তাও বুঝবার কোন উপায় নেই। এই অবস্থায় কারও কবর আলাদাভাবে জিয়ারত করার কোন উপায় নেই। এটি সঠিক হয়েছে কিনা ধর্মবিশেষজ্ঞগন ভালো বলতে পারবেন। আর একটি বিষয় লক্ষ্য করলাম। কবরস্থানের বাইরে ফেরিওয়ালারা গমের প্যাকেট বিক্রি করছে। অনেকেই তা কিনে নিয়ে কবরস্থানের ভেতরে গিয়ে কবরগুলোর উপর ছিটিয়ে দিচ্ছেন। আর শত শত কবুতর ঝাঁকে ঝাঁকে এসে এই সব গম খাচ্ছে। মক্কার কবরস্থানেও একই বিষয় লক্ষ্য করেছি। এটি কতটুকু ধর্মসম্মত তাও ধর্মবিশেষজ্ঞগন ভালো বলতে পারবেন। আমার কাছে মনে হয়েছে কবুতরগুলোকে তো কবরস্থানের বাইরেও কোন খোলা চত্বরে খাওয়ানো যেতে পারে। খাওয়ানোর জন্য কবরস্থানকে বেছে নেয়া হলো কেন?

মদীনার মসজিদ থেকে হাঁটা দুরত্বে থাকেন বিশিষ্ট চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা: মোফাখখারুল ইসলাম। উনি প্রায় ১৮-১৯ বছর থেকে মদীনার এক হাসপাতালে চাকুরীরত আছেন। তার বাড়ী বাংলাদেশের রংপুর শহরে। প্রতি বছর উনি তার পরিচিত হজ্জযাত্রীদের সাহায্য সহযোগিতা করে থাকেন। আমরাও বঞ্চিত হলাম না। আমাদেরকে এক রাতে উনি দাওয়াত করে খাওয়ালেন। অনেক দিন পর বাংলাদেশী উপাদেয় খাবার খেয়ে হোটেলে তিনবেলা খাওয়ার কষ্ট অনেকটা লাঘব হলো।

মসজিদে নববীর সামনে ও শহরের অন্যান্য রাস্তায় ড্রাইভাররা জিয়ারা জিয়ারা বলে হজ্জযাত্রীদের ডাকাডাকি করে। এইসব গাড়ী কয়েকজন মিলে ভাড়া করে মদীনার দর্শনীয় স্থানগুলো পরিদর্শন করা যায়। মোফাখখারুল ভাইয়ের সহযোগিতায় একদিন মাইক্রোবাস ভাড়া করে আমরা জিয়ারায় বেড়িয়ে পড়লাম। উনি গাইড হিসেবে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বর্ণনা করলেন যা আরবীভাষী ড্রাইভারদের কাছ থেকে পাওয়া সম্ভব নয়। এখানে একটা কথা উল্লেখ করতে হয়। মক্কা মদীনায় শতশত গাড়ীর ড্রাইভার জিয়ারা জিয়ারা বলে ডাকাডাকি করলেও গাইড হিসাবে কাজ করার জন্য আমরা কারও সন্ধান পাইনি। আমার মনে হয় সৌদী সরকারের এদিকটায় নজর দেয়া উচিৎ। জিয়ারাতে আমরা যে সমস্ত স্থান পরিদর্শন করলাম তার একটা সংক্ষিপ্ত বিবরন দিচ্ছি।

১.মসজিদে কুবা: এই মসজিদ মসজিদে নববী থেকে প্রায় দুই মাইল দুরে অবস্থিত। এটি মুসলমানদের সর্বপ্রথম মসজিদ। হজরত মুহম্মদ(স:) যখন মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় আসেন তখন তিনি সাহাবায়ে কেরামদেরকে সঙ্গে নিয়ে নিজের পবিত্র হাতে এই মসজিদ তৈরী করেন।

Masjid ee Qubaa

মসজিদে কুবা

২. মসজিদে কেবলাতাইন: কেবলা পরিবর্তনের ঘটনা এই মসজিদে সংঘটিত হয়েছিল বলে এটা মসজিদে কেবলাতাইন বা দুই কেবলার মসজিদ নামে পরিচিত। নবীজি একদিন যখন এই মসজিদে যোহরের নামাজে মসজিদুল আকসার দিকে মুখ করে ইমামতি করছিলেন তখন নামাজরত অবস্থায় তাঁর উপর কাবা শরীফের দিকে মুখ ফিরিয়ে নামাজ পড়ার জন্য ওহী নাজিল হয়। তখন তিনি নামাজরত অবস্থাতেই ঘুরে কেবলা পরিবর্তন করে কাবা শরীফকে কেবলা করে বাকী নামাজ আদায় করেন। তখন থেকে কাবা শরীফ মুসলমানদের নামাজের কেবলা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

৩. খন্দকের ময়দান: এখানে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। ঠিক কোন জায়গাটিতে পরিখা খনন করা হয়েছিল তা এখন আর বুঝবার কোন উপায় নেই। ডা: মোফাখখারুল ইসলাম আমাদেরকে এ সম্বন্ধে একটা ধারনা দিলেন। ফলে আমরা বুঝতে পারলাম কোথায় পরিখা খনন করা হয়েছিল, মুসলমানেরা পরিখার কোন দিকে ছিলেন এবং মক্কার কাফেররা কোন দিকে অবস্থান নিয়েছিল। এখানে কয়েকটি ছোট ছোট মসজিদ রয়েছে। এর মধ্যে একটি মসজিদ খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের পরিকল্পনাকারী হজরত সালমান ফারসী(রা:) এর নামে। এই এলাকায় আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে একটি বড় মসজিদ নির্মিত হচ্ছে। জানতে পারলাম যে বড় মসজিদটির নির্মান কাজ শেষ হলে ছোট ছোট মসজিদগুলি বন্ধ করে দেয়া হবে। একটি মসজিদ এখনই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আমরা কয়েকটি মসজিদে নফল নামাজ আদায় করলাম। এই ঐতিহাসিক মসজিদগুলি রক্ষনাবেক্ষনে সরকারী উদাসীনতার ছাপ স্পষ্ট। মসজিদগুলি জরাজীর্ন। মসজিদে ঢোকার সাথে সাথে উৎকট দুর্গন্ধ মসজিদের পবিত্র ভাবমূর্তির সাথে একেবারেই বেমানান। ঐতিহাসিক স্থানগুলি রক্ষা করা এবং দেশী বিদেশী লক্ষ লক্ষ হজ্জযাত্রীদেরকে সেগুলোর সাথে পরিচিত করার ব্যাপারে সরকারী উদাসীনতার একটি বড় উদাহরণ এই জায়গাটি।

৪. ওহুদ পাহাড়: মসজিদে নববী থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দুরে ওহুদ পর্বতের পাদদেশে ওহুদ ময়দান। এখানে ওহুদ যুদ্ধে নিহত ৭০ জন সাহাবীর কবর আছে। এঁদের মধ্যে হজরত মুহম্মদ(স:) এর চাচা হজরত আমির হামযা(রা:) অন্যতম। কবরগুলি উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘেরা। ভেতরে প্রবেশ করার অনুমতি নেই। দর্শনার্থীরা দেয়ালের বাইরে থেকেই কবর জিয়ারত করে থাকেন।

uhud hill

ওহুদ পাহাড়

মসজিদে নববীর চত্বরের বাইরেই একটি ছোট ঘর আছে। এখানে বিভিন্ন ভাষাভাষী হজ্জযাত্রীদের জন্য সৌদী সরকারের তরফ থেকে বিনামুল্যে কিছু ধর্মীয় পুস্তিকা বিতরন করা হয়। কিছু কিছু বাংলা পুস্তিকাও এখানে পাওয়া যায়। মদীনার যে সব মসজিদ আমরা দেখতে গিয়েছি সেখানেও কোন কোন মসজিদে বিভিন্ন ভাষার ধর্মীয় পুস্তিকা বিতরন করা হয়। এই ঘরটিতে একজন ধর্মবিশেষজ্ঞ থাকেন যিনি হজ্জযাত্রীদের বিভিন্ন ধর্মবিষয়ক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে থাকেন। এখানে সবুজ মিয়া নামে এক বাংলাদেশীর সাথে পরিচয় হলো। মদীনায় স্বল্পকালীন অবস্থানকালে তার সাথে আমাদের বেশ আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সে আমাদের ও ধর্মীয় আলেমের মধ্যে প্রশ্নোত্তরের সময় দোভাষী হিসাবে কাজ করলো। আমরা মদিনায় কয়েকদিন অবস্থানকালে সেখানে বিভিন্ন প্রশ্ন করে যে সব উত্তর পেয়েছি তা অনেক পাঠকেরই কৌতুহল মেটাবে।

..তৃতীয় পর্ব আসছে ১৯শে আগষ্ট

সম্পর্কিত সংবাদ
ডা: মো: রাশেদুল মওলা