লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক : পর্ব ৩

লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক : পর্ব ৩

লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক : পর্ব ১

লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক : পর্ব ২

দ্বিতীয় পর্বের পর…

একদিন আমরা প্রশ্ন করলাম যে দেশ থেকে আসার সময় অনেকেই আমাদেরকে নবীজির রওজা মোবারকে তাদের সালাম পৌঁছাতে বলেছেন। তাদের সালাম উত্তমরূপে পৌঁছাবার সঠিক পদ্ধতি কি? উত্তরে তিনি বললেন যে কারও মাধ্যমে নবীজির রওজা মোবারকে সালাম পৌঁছানোর ধারনাটিই ভুল। কারন পৃথিবীর যে প্রান্ত থেকেই নবীর উদ্দেশ্যে সালাম জানানো হোক না কেন তা সাথে সাথেই ফেরেশতাদের মাধ্যমে নবীর কাছে পৌঁছানো হয়। মদীনায় অবস্থানকারীর সালাম দ্রুত পৌঁছবে আর বাংলাদেশ বা আমেরিকায় অবস্থানকারীর সালাম দেরীতে পৌঁছবে এই ধারনা সঠিক নয়।

একদিন আমরা প্রশ্ন করলাম যে আমরা আমাদের আত্মীয় স্বজনের নামে আলাদা আলাদা ভাবে ওমরা করতে পারি কি না? উত্তর পেলাম যে আত্মীয় স্বজনের নামে আলাদা আলাদা ওমরা করা সুন্নতের পরিপন্থী। বরং তাঁদের নামে নফল তাওয়াফ করা যেতে পারে। মক্কায় অবস্থানকালে দেখেছি যে অনেকেই আয়েশা মসজিদ নামক মসজিদে বারবার গিয়ে এহরাম বেঁধে এসে একাধিক ওমরা করছেন। অথচ এ ধরনের কাজ কুরআন অথবা হাদিস সমর্থিত নয়। হজরত মুহম্মদ(স:) এর আমলে আয়েশা মসজিদের কোন অস্তিত্ব ছিল না। এটা পরবর্তীতে নির্মিত হয়। আসল ঘটনা হলো মাসিক শুরু হওয়ার কারনে হজরত আয়েশা(রা:) মক্কায় প্রবেশকালে অন্যান্য লোকদের সাথে ওমরা করতে পারেন নাই। ফলে হজ্জের পর পাক সাফ অবস্থায় তিনি হজরত মুহম্মদ(স:) এর কাছে নতুনভাবে ওমরা করার অনুমতি প্রার্থনা করেন। হজরত মুহম্মদ(স:) তাঁকে তানয়ীম নামক স্থানে গিয়ে এহরাম বেঁধে ওমরা করার অনুমতি দেন কারন তানয়ীম হরম সীমানার বাইরে নিকটতম স্থান। পরবর্তীকালে সেখানে আয়েশা মসজিদ নির্মিত হয়। তাই এভাবে ওমরা করার অনুমতি শুধু বিশেষ পরিস্থিতিতে হজরত আয়েশা(রা:) কে দেয়া হয়েছিল যা সব হজ্জযাত্রীর জন্য মোটেই প্রযোজ্য নয়।

আর একদিন আমরা প্রশ্ন করলাম যে সতর্কতার সাথে সঠিকভাবে হজ্জ পালনের চেষ্টা করা সত্বেও অজান্তে কিছু অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি হয়ে যেতে পারে। এ জন্য আমরা হজ্জের কোরবানী ছাড়াও অতিরিক্ত আরও একটি কোরবানী দাম হিসাবে দিতে চাই। এটা দেয়া যাবে কিনা? হুজুর উত্তর দিলেন যে যেহেতু অজান্তে কৃত ত্রুটির জন্য কোন পাপ হয় না, তাই এজন্য দাম দেয়ার কোন প্রয়োজন নাই।

সবুজ মিয়া একদিন আমাদেরকে গাওয়া পান করতে দিল। এটা সৌদি আরবে বহুল প্রচলিত পানীয়। কাপে করে চায়ের মত পান করতে হয় গরম গরম। শুনলাম গরম পানিতে বিভিন্ন ধরনের মশলা দিয়ে এটা তৈরী করা হয়। এটা খেলে নাকি শরীর চাঙ্গা হয় ও কর্মস্পৃহা বাড়ে। মুখে দিয়েই দেখলাম এক বিস্বাদ পানীয়। কোনো চিনি দেয়া নেই। ভদ্রতা রক্ষার্থে আমি ও গোলজার কোনরকমে গলধ:করন করলাম। তবে আর এক বন্ধু জামানের পক্ষে ভদ্রতা রক্ষা করা সম্ভব হলো না। এক চুমুক মুখে দিয়েই সবুজ মিয়াকে বললো,“ভাই কিছু মনে কোরো না, আমার পক্ষে খাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।”

মদীনা ও মক্কায় রাস্তার ধারে ও ফুটপাথে তসবী, টুপি, জায়নামাজ, বিভিন্ন ইমিটেশনের গহনা, ঘড়ি, টেবিল ক্লথের কাপড়, সৌদী পোশাক, মিসওয়াক, মরিয়ম ফুল ও নানা টুকিটাকি জিনিষ বিক্রি হয়। তবে বিশেষ রঙ্গের রুমাল মাথায় দেয়া(সম্ভবত পুলিশ) লোককে দেখলেই নিমেষেই মালপত্র পোটলায় বেঁধে ঘাড়ে নিয়ে দৌড়। কেউ কেউ ছোট ছোট ট্রলিতে মালপত্র  দ্রুত তুলে চম্পট দেয়। কিছুক্ষন পর পুলিশ চলে গেলে আবার সবাই পসরা সাজিয়ে বসে। কর্তৃপক্ষ চাইলে রাস্তা ও ফুটপাথ ফেরিওয়ালা মুক্ত রাখা মোটেই অসম্ভব কাজ না। তাহলে পুলিশ ও ফেরিওয়ালাদের মধ্যে এই ইঁদুর বেড়াল খেলা কেন বোঝা মুশকিল। আর একটা লক্ষনীয় বিষয় হলো রাস্তার পাশে পসরা সাজিয়ে বসা এইসব দোকানদারদের একটা বড় অংশই মহিলা। আপাদমস্তক বোরখায় আবৃত করে তারা দিব্বি দোকানদারি চালিয়ে যাচ্ছেন। এদের বেশীরভাগই আরবীভাষী এবং নিগ্রো। এদের সাথে দরদাম প্রধানত ইশারাতেই সারতে হয়। আমরা এক বাংলাদেশী মহিলার দেখা পেয়েছিলাম যিনি এদের সাথে একই কাতারে রাস্তার পাশে বসে দিব্বি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমরা টুপি, তসবী ও বিভিন্ন গিফট আইটেম রাস্তার পাশের এইসব দোকান থেকে কিছু কিছু কিনেছিলাম। বন্ধুু জামান আবার দরদাম করতে ওস্তাদ। কোন কোন দোকানদার ভাঙ্গা ভাঙ্গা উর্দু জানে। তাদেরকে জামান দরদাম করার সময় দাম কমানোর চেষ্টায় বলতো,“বাংলাদেশ গরীব হ্যায়”। শুনে আমরা বেশ হাসতাম। তাকে বলতাম,“বাংলাদেশ তো গরীব হ্যায়, কিন্তু তুমি কি হ্যায়? তুমি নিজে তো গরীব নেহি হ্যায়।”

আমরা মদীনায় যে হোটেলে খেতাম তার কাছেই একটি ছোট মার্কেট। সেখানে একদিন গেলাম টুপি ও জায়নামাজ কিনতে। যে দোকান থেকে টুপি কিনলাম সেই দোকানদারের বাড়ি তাজিকিস্তান। কথাবার্তা সব ইশারা ইঙ্গিতেই চালাতে হলো। তারপর আমরা গেলাম জায়নামাজের দোকানে। দেশে টোকেন হিসাবে প্রায় সব হজ্জযাত্রীই টুপি, তসবী, জায়নামাজ নিয়ে আসেন আত্মীয় স্বজন ও পরিচিতজনকে উপহার দেয়ার জন্য। তাই এসব জিনিষের বাজার বেশ জমজমাট। জায়নামাজের যে দোকানে গেলাম সেই দোকানদারের বাড়ি আফগানিস্তান। বয়স প্রায় পয়ষট্টি। পাকা দাড়ি। অল্প অল্প উর্দু জানে। হাসিখুশি এবং রসিক। আমাদের সাথে জায়নামাজের দাম ঠিক হলো প্রতিটি ৬ রিয়াল। সেই হিসাবে দেড় ডজন জায়নামাজ নিলাম। কিন্তু দাম পরিশোধ করার ঠিক আগে হঠাৎ সে আমার কান ধরে গায়ের জোরে কানমলা দিতে দিতে বললো,“কম্পিউটার গড়বড় হো গিয়া।” ঘটনার আকস্মিকতায় একটু চমকে গেলাম। তারপর ভাঙ্গা ভাঙ্গা উর্দুতে সে যা বললো তার সারমর্ম হলো যে সে হিসাবে গোলমাল করে ফেলেছে। আসলে সে ৬ রিয়াল করে জায়নামাজ দিতে পারবে না । জায়নামাজের প্রকৃত মূল্য ৭ রিয়াল। তার মস্তিষ্কের কম্পিউটার হিসাব করতে গোলমাল করেছে, সে জন্য নিজের কান না মলে সে আমার কান মলে দিল কেন সেটা বোধগম্য হলো না। তবে কান মলার সময় তার হাসি হাসি মুখ দেখে আন্দাজ করলাম যে এটা হয়তো একধরনের আফগান রসিকতা। শেষ পর্যন্ত তার পুনর্নির্ধারিত মূল্যেই জায়নামাজ কিনতে হলো। তবে কানমলা খেলেও লোকটার রসিক চেহারা ও প্রানখুলে হাসার ক্ষমতা আমাদের আকৃষ্ট করলো। পরবর্তীতে আমরা আরও কয়েকবার তার দোকানে এসেছিলাম বন্ধু হজ্জযাত্রীদের জায়নামাজ কিনতে।

একদিন ডা: মোফাখখারুল ভাই তার প্রাইভেট কারে করে আমাদেরকে নিয়ে গেলেন মদীনার বিখ্যাত ডেট মার্কেটে অর্থাৎ খেজুরের মার্কেটে। আমাদের সাথী হজ্জযাত্রী কয়েকজনও আমাদেরকে খেজুর কেনার দ্বায়িত্ব দিলেন। আমরা এশার নামাজের পর মার্কেটে গেলাম। মার্কেটের কাছে রাস্তার একপাশে মোফাখখারুল ভাই গাড়ী পার্ক করলেন। আমরা গাড়ী থেকে নেমে সামনে এগোবার সময় লক্ষ্য করলাম ড্রাইভিং সিটের পাশের কাঁচটি নামানো। এ ব্যাপারে তার দৃষ্টি আকর্ষন করলাম। উনি বললেন,“অসুবিধা নাই, কিছু হবে না।” দেশের কথা মনে পড়লো। রাস্তার পাশে গাড়ীর জানালা খোলা রেখে মার্কেটে ঢুকছেন, কি হতে পারে পাঠক কল্পনা করুন, অধম লেখকের লেখার প্রয়োজন নেই। বিরাট ডেট মার্কেট। অনেক দোকানেই বাংলাদেশী দোকানদার। এক দোকানে ঢুকলাম। বিভিন্ন ধরনের খেজুর আলাদা আলাদা ভাবে স্তুপাকারে সাজানো আছে। মোফাখখারুল ভাই বললেন,“যত ইচ্ছা চেখে দেখো। খেজুর খেলে এখানকার দোকানদার বরং খুশী হয়।” দোকানদারও তার কথায় সায় দিলেন। আমরাও গ্রীন সিগনাল পেয়ে বিভিন্ন ধরনের খেজুর ইচ্ছামত চাখতে লাগলাম। বিভিন্ন দোকান যাচাই করে শেষে এক দোকান থেকে খেজুর কিনলাম। ৭-৮ জনের খেজুর কিনে হোটেলে ফিরতে ফিরতে রাত সাড়ে বারোটা বেজে গেল।

মসজিদে নববীর কাছে বড় বড় মার্কেট। এসব মার্কেটে রয়েছে অনেক স্বর্নালঙ্কারের দোকান। হজ্জ মওসুমে এই দোকানগুলো সবসময় জমজমাট থাকে। কারন অনেকেই পরিবার পরিজনের জন্য কিছু সোনার গহনা কেনেন। আমরা একদিন এক সোনার দোকানে ঢুকলাম। ঐতিহ্যবাহী সৌদী পোষাক পড়া সেলসম্যানদেরকে দেখে বন্ধু জামান আমাকে বললো,“ভাই এদের সাথে কিভাবে কথা বলবো?” আমি বললাম,“কেন? ইংরেজীতে কথা বলো।” জামান বললো,“ইংরেজীতে দরকষাকষি করা তো একটা মহা সমস্যার ব্যাপার।” এমন সময় সামনে দাঁড়ানো সেলসম্যান বলে উঠলো,“ভাই কি কইবেন কন।” অর্থাৎ সৌদী আলখাল্লা আর পাগড়ীর আড়ালে জলজ্যান্ত বাংলাদেশী সামনে দাঁড়িয়ে। চেহারা দেখে এবং তার মুখে অনর্গল আরবী কথা শুনে বুঝবার কোনো উপায় নেই। মক্কা মদীনার বহু দোকানেই এরকম সেলসম্যান হিসাবে শত শত বাংলাদেশী কর্মরত আছেন।

মদীনায় রান্নার কাজে এল পি গ্যাস ব্যবহৃত হয়। ছোট ছোট পিক আপে গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে ড্রাইভার রাস্তায় রাস্তায় ফেরী করে। ড্রাইভারের এক হাতে ষ্টিয়ারিং, অন্য হাতে একটি লোহার দন্ড। এটি দিয়ে পেছনে রাখা সিলিন্ডারের গায়ে ঘন ঘন আঘাত করছে আর টুংটাং শব্দ হচ্ছে। এই শব্দ শুনে যার দরকার সে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এসে সিলিন্ডার কিনবে। আমাদের দেশে আইসক্রীমওয়ালারা যেমন ঘুন্টি বাজিয়ে বিভিন্ন রাস্তায় ফেরি করে সেই ষ্টাইল আর কি।

মদীনায় আমাদের একটা মজার অভিজ্ঞতা হয়েছে। রাত বারোটার পর প্রায়ই ছোট ছোট বাচ্চাদের চিৎকার চেঁচামেচিতে আমাদের ঘুম ভেঙ্গে যেত। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখতাম যে ছোট ছোট শিশুরা গলির রাস্তায় মনের আনন্দে দৌড়াদৌড়ি ও খেলাধুলা করছে। তাদের কলকাকলিতে চারদিক মুখর হয়ে উঠেছে। মধ্যরাতের পর শিশুরা রাস্তায় খেলছে কেন তা মনে খটকা জাগালেও পরে চিন্তা করে আমরা এর একটা কারন বের করেছি। হজ্জের মওসুমে হাজার হাজার হজ্জযাত্রীর ভীড়ে সারা শহর গমগম করে। তাই শিশুদের খেলাধুলা করার সুযোগ কমে যায়। রাত বারোটার পরে হজ্জযাত্রীদের ঘুমানোর সুযোগে তারা মনের সুখে বাড়ীর সামনের অলিগলিতে নেমে পরে খেলাধুলা করার জন্য।

মদীনায় আমাদের আটদিন অবস্থান শেষ হয়ে এল। আল্লাহর অশেষ রহমতে মসজিদে নববীতে চল্লিশ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সাথে আদায় করেছি। এবার আবার মক্কা শরীফে ফেরার পালা। সকালে আমাদের হোটেলের সামনে বাস এসে দাঁড়ালো। সকাল দশটায় আমরা রওনা দিলাম মক্কার উদ্দেশ্যে। মদীনা থেকে মক্কার পথে প্রায় দশ কিলোমিটার দুরে যুল হোলায়ফা বা বীরে আলী নামক স্থানে একটি বিরাট মসজিদের সামনে এসে আমাদের বাস থামলো। এই স্থান মদীনাবাসী এবং ঐ পথে মক্কা আগমনকারীদের মীকাত। মক্কা শহরের বাইরে বিভিন্ন দিকে পাঁচটি স্থান নির্ধারন করা আছে। এগুলোকে মীকাত বলা হয়। কোনো ব্যক্তি হজ্জ, ওমরা, ব্যবসা বা পর্যটন যে উদ্দেশ্যেই মক্কা শরীফ গমন করুন না কেন, মীকাতে পৌঁছে অথবা তার পূর্বেই ইহরাম বাঁধা ওয়াজিব। ইহরাম অর্থ হারাম বা নিষিদ্ধ করা। কোনো ব্যক্তি যখন হজ্জ বা ওমরা অথবা উভয়টি পালন করার নিয়তে সেলাইবিহীন দুটি সাদা কাপড় পরিধান করে কিছু আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন (নফল নামাজ, নিয়ত, তালবিয়া পাঠ), তখন কিছু হালাল কাজও তার জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যায়। এ কারনেই একে ইহরাম বলা হয়। রূপক অর্থে সেই চাদর দুটিকেও ইহরাম বলা হয় যা ইহরাম অবস্থায় পরিধান করা হয়। ঢাকা থেকে জেদ্দা হয়ে যারা সরাসরি মক্কায় যান, তাদের মীকাতের নাম ইয়ালামলাম। লোহিত সাগরের তীরের অদুরে মক্কা শরীফ থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দক্ষিনে অবস্থিত ইয়ালামলাম পাহাড়। বিমানে থাকাকালীন ঐ সীমানা অতিক্রম করা হয়। তাই সকলে বিমানে ওঠার আগেই ইহরাম বেঁধে নেন। হজ্জের মওসুম না হলেও মক্কা শরীফে যাওয়ার পথে মীকাত বা তার পুর্বেই ইহরাম বেঁধে মক্কা শরীফে প্রবেশ করে ওমরাহ করা বাধ্যতামূলক। ইহরামের সময় বেশ কিছু কাজ করা নিষিদ্ধ। তবে যে কাজটি সম্বন্ধে হজ্জযাত্রীরা খুব বেশী আলোচনা করেন সেটি হচ্ছে শরীর চুলকানো। অনেককেই বলতে শোনা যায় যে ইহরাম পরিহিত অবস্থায় শরীর চুলকানো সম্পূর্ন নিষিদ্ধ। কিন্তু কথাটি আদৌ সত্যি নয়। দাড়ি, মাথা ও সমস্ত দেহ ধীরে ধীরে সহজভাবে চুলকানো জায়েজ। চুলকানোর কারনে মাথা থেকে চুল, খুসকী প্রভৃতি পড়লে কোন দোষ হবে না এবং এর জন্য কোন কাফফারা দিতে হবে না।(সূত্র : কোরআন ও হাদিসের আলোকে হজ্জ উমরাহ ও জিয়ারত। লেখক : শায়খ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায)।

বীরে আলী মসজিদে যখন আমরা পৌঁছলাম তখন টিপটিপ করে বৃষ্টি হচ্ছে। মদীনা থাকাকালীন সময়েও আমরা এরকম অল্প স্বল্প বৃষ্টির দেখা পেয়েছি। এখানেও আমরা বাংলাদেশী ক্লিনারদের দেখা পেলাম যারা মসজিদ চত্বরে জমে থাকা বৃষ্টির পানি সরিয়ে ফেলতে সচেষ্ট। এই মসজিদে অনেক বাথরুম ও ওজুখানা রয়েছে। ওজুখানাগুলো বেশ প্রশস্ত। ফলে ওজু করার পর ওখানেই আমরা ইহরামের কাপড় পরে নিলাম। তারপর মসজিদে দুই রাকায়াত নামাজ পড়ে ইহরামের নিয়ত করলাম। মসজিদের আশেপাশে বেশ কিছু দোকান রয়েছে যেখানে হাল্কা নাস্তা পাওয়া যায়। কিছু কিছু দোকানে ইহরামের কাপড়ও কিনতে পাওয়া যায়। বীরে আলী থেকে ইহরাম পরিহিত অবস্থায় আমরা সবাই আবার মক্কার পথে রওনা হলাম।

এই পাঁচশত কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করা একটা বিরাট অভিজ্ঞতা। পুরোটা পথ জুড়ে রাস্তার দুধারে শুধু পাহাড় আর মরুভুমি। মরুভুমি তো কোনদিন চোখে দেখিনি। আর পাহাড় দেখা বলতে চট্টগ্রাম আর সিলেট ভ্রমনের অভিজ্ঞতা। কবি যে বলেছেন,“আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই” তা বুঝতে এতদিন কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়েছে, এখন বুঝতে পারলাম চাক্ষুস অভিজ্ঞতায়। বাংলাদেশের সবুজ শ্যামলিমায় মোড়া ছোট ছোট মাটির পাহাড় নয়। এ তো আগাগোড়া পাথরে তৈরী আকাশচুম্বী ন্যাড়া পর্বত। তাতে নেই কোনো সবুজের চিহ্ন, নেই কোনো বরফের টুপি(যা হিমালয় পর্বতশ্রেনীর ছবিতে দেখেছি)। কোন কোন পাহাড় রাস্তার একদম পাশে চলে এসে আমাদের ক্ষুদ্রত্বকে আরও ক্ষুদ্র প্রমান করছে, কোন কোনটি আবার অনেক দুরে আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে ঘুমুচ্ছে। এর মধ্যে আমাদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস সেই বিশাল নিস্তব্ধতাকে ভাঙ্গার ব্যর্থ চেষ্টা করে করে এগোচ্ছে। প্রায় পুরো রাস্তার দু ধারেই লোহার নেটের বেড়া। এই জনমানবশুন্য মরুভুমিতে রাস্তার দুধারে বেড়ার মাজেজা বুঝতে পারলাম না। তবে মাঝে মাঝে দুরে কিছু কিছু উটের পাল দেখেছি। সেগুলিই বেরসিকের মত রাস্তায় উঠে এসে এই বিশাল নিস্তব্ধতার মধ্যে ধ্যানমগ্ন পাহাড়গুলির ধ্যান আমরা কেন ভাংতে চাচ্ছি সে কৈফিয়ত যাতে না চাইতে পারে সে জন্যই হয়তো বেড়ার ব্যবস্থা।

ভাবতে আশ্চর্য লাগে যে এই দীর্ঘপথ প্রিয়নবী হিজরতের সময় কিভাবে অতিক্রম করেছিলেন। আমরা তো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ীতে যাচ্ছি। তখন এই মরুভুমির রাস্তায় বাহন বলতে ছিল উট। হজরত মুহম্মদ(স:) নবুওয়তের ত্রয়োদশ বর্ষে ২৭শে সফর জুম্মার দিন মক্কা শরীফ থেকে মদীনার উদ্দেশ্যে হিজরত করেন। চৌদ্দ দিন কুবা নামক স্থানে অবস্থান করার পর ২২শে রবিউল আউয়াল সোমবার তিনি মদীনা শরীফে প্রবেশ করেন।  তবে নি:সন্দেহে তা ছিল একটা দীর্ঘ, বিপদসংকুল ও কষ্টদায়ক যাত্রা।

মদীনার এক দোকান থেকে একটি কেবলা নির্দেশক কম্পাস কিনেছিলাম। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে তা কাজে লাগলো। কেবলা ঠিক করে বাসের মধ্যেই জোহর, আসর ও মাগরিবের নামাজ ইশারায় পড়লাম। অবশ্য মাগরিবের নামাজের সময় বাস এক জায়গায় থেমেছিল। ওখানে দু একটা দোকান এবং অজু নামাজের ব্যবস্থা ছিল। যারা বাসে নামাজ পড়েননি তারা সেখানে নামাজ পড়ে নিলেন। মক্কা শহরে ঢোকার মুখে বাস আবার এক জায়গায় থামলো। এখানে জমজমের পানি শীতলীকরন ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অফিস। এখানে আমাদেরকে জমজমের পানির বোতল উপহার দেয়া হলো। মক্কা শহরে পৌঁছে মোয়াল্লেমের অফিসে এসে গাড়ী থামলো। আমাদের গাড়ীর ড্রাইভার আমাদের হোটেল চেনে না। মোয়াল্লেমের অফিস থেকে একটা ছেলেকে দেয়া হলো হোটেল চিনিয়ে দেয়ার জন্য। কিন্তু দেখা গেল সেও রাস্তা বার বার ভুল করছে। এতে অবশ্য আমাদের একটা লাভ হলো। মক্কা শহরে  পাহাড়ের বুক চিরে যে অজস্র টানেল তৈরী হয়েছে সম্ভবত তার অনেকগুলিই আমাদের দেখা হয়ে গেল। এমনকি একই রাস্তা এবং টানেলে একাধিকবার ঘোরা হলো। কিন্তু হোটেলের আর দেখা পাওয়া যায় না। এবার অনেকেরই ধৈর্যচ্যুতি ঘটলো। একে তো সারাদিন ধরে দীর্ঘ পথ যাত্রার ক্লান্তি, তার উপর রাতের বেলা হোটেল খুঁজে না পাওয়ার বিড়ম্বনা। এরপর ধৈর্যধারন করা সত্যিই কঠিন।  কেউ কেউ ছেলেটার সাথে রাগারাগি শুরু করলো। অথচ  ইহরাম অবস্থায় কারও সাথে ঝগড়া বিবাদ করা সম্পুর্ন নিষিদ্ধ। আসলে এটা অনভ্যাসজনিত ত্রুটি। যেহেতু বেশীরভাগ হজ্জযাত্রীই প্রথমবার হজ্জ করতে এসেছেন, তাই অনেক সময়ই ইহরামের নিষিদ্ধ কাজগুলি খেয়াল হয় না। অথচ পরবর্তীতে আর হজ্জ করার সুযোগ জীবনে নাও আসতে পারে। তাই ইহরাম অবস্থায় প্রতিটি পদক্ষেপই সাবধানে ফেলা উচিৎ যাতে কোন ভুল ত্রুটি না হয়। যা হোক অনেক ঘোরাঘুরি শেষে রাত প্রায় দশটায় আমরা হোটেলে পৌঁছলাম।

হজ্জ শুরু হতে আরও দুই সপ্তাহ বাকী। এ কয়দিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদুল হারামে জামাতের সাথে আদায় করলাম। মসজিদুল হারামে ফজরের নামাজের একঘন্টা আগে তাহাজ্জুদ নামাজের আজান হয়। আমরা মসজিদে গিয়ে একাকী তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে ফজরের জামাতে শরীক হতাম। ফজরের নামাজ সেরে রুমে ফিরে নাস্তা খেয়ে কিছুক্ষন বিশ্রাম নিতাম। তারপর কাপড় কাচা ও গোসল সেরে জোহরের নামাজের জন্য মসজিদে যেতাম। জোহরের নামাজ শেষে রুমে ফিরে দুপুরের খাবার খেয়ে কিছুক্ষন বিশ্রাম নিয়ে আবার মসজিদে গিয়ে আসর থেকে এশার নামাজের শেষ পর্যন্ত অবস্থান করতাম। বেশীরভাগ দিনই আমরা এশার নামাজ শেষে একটি নফল তাওয়াফ করে হোটেলে ফিরতাম। মসজিদের ভেতরে গিয়ে সুষ্ঠুভাবে নামাজ পড়ার জন্য নামাজের ওয়াক্ত হওয়ার অনেক আগেই মসজিদে যেতে হতো। কখনো যেতে দেরী হলে লোকজনকে মসজিদের বাইরের চত্বরে অথবা অথবা তারও বাইরে রাস্তায় নামাজের জন্য দাঁড়াতে হতো। একদিন আমরা একটু দেরীতে মসজিদে গিয়েছি। ভেতরে ঢুকে কোথাও কোন জায়গা পাচ্ছিলাম না। জায়গার খোঁজে ভীড় ঠেলে সামনে এগুচ্ছিলাম। মসজিদুল হারামের ভেতরে ধাপে ধাপে সিঁড়ি নেমে গিয়ে মাতাফে পৌঁছেছে। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় নামাজ শুরু হয়ে গেল। আশেপাশে কোথাও জায়গা না পেয়ে অগত্যা সিঁড়িতে দাঁড়িয়েই নামাজ শুরু করলাম। উপরের ধাপে দাঁড়িয়ে সেজদার সময নীচের ধাপে সেজদা দেয়া যে কি কষ্টকর তা সেদিন টের পেলাম। আবার অনেক হজ্জযাত্রীকে দেখলাম মসজিদে আসার কষ্টটুকু করতে নারাজ। নামাজ শুরু হতে অনেক দেরী। মসজিদের ভেতরেও যথেষ্ট জায়গা আছে। কিন্তু তারা মসজিদে না গিয়ে তাদের হোটেল বা বাড়ী থেকে বেড়িয়ে রাস্তায় নেমে রাস্তাতেই জায়নামাজ পেতে বসে পড়ছেন। ফলে দেখা যায় হাজার হাজার লোক মসজিদ মুখী রাস্তার অর্ধেক দখল করে বসে আছেন। এতে অন্যান্য মুসল্লীদের মসজিদে যেতে বেশ অসুবিধার মধ্যে পড়তে হয়। ভাবতে আশ্চর্য লাগে, যারা হাজার হাজার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে মক্কা শরীফে হজ্জ করতে এসেছেন, তারা ১০-১৫ মিনিট হেঁটে মসজিদে আসার কষ্টটুকু করতে নারাজ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও এ ব্যাপারে নির্বিকার। মসজিদ চত্বরে সবুজ রঙ্গের কার্পেট বিছিয়ে পায়ে চলা পথ নির্দিষ্ট করা আছে, যাতে করে মুসল্লীরা সহজে মসজিদে প্রবেশ করতে পারেন। বাংলা ভাষা সহ বেশ কয়েকটি ভাষায় মাইক্রোফোনে বার বার অনুরোধ করা হচ্ছে হজ্জযাত্রীরা যেন শুধুমাত্র শুধুমাত্র সবুজ কার্পেট বিছানো পথ ব্যবহার করেন। কিন্তু যারা এ অনুরোধ মানছেন না তাদের নিয়ন্ত্রন করার কোন ট্রাফিক ব্যবস্থা নজরে এলো না।

তাওয়াফের সময় আমরা কিছু কিছু অন্ধ লোককে তাওয়াফ করতে দেখেছি। হাতের লাঠি দিয়ে মেঝেতে ঠুক ঠুক শব্দ করে তারা এগিয়ে যাচ্ছেন। কোন কোন হজ্জযাত্রী ছোট ছোট শিশুকে এহরামের কাপড় পড়িয়ে কোলে বা ঘাড়ে নিয়ে তাওয়াফ করছেন। কোন কোন মহিলাকে দেখলাম মাতাফে নামাজ পড়ছেন। আর তাদের শিশু সন্তানের পায়ের সাথে নিজের পা বেঁধে রেখেছেন যাতে নামাজের সময় বাচ্চা হারিয়ে না যায়। আবার কাউকে কাউকে দেখলাম তাওয়াফের গুরুত্বের ব্যাপারে উদাসীন। তাওয়াফের সময় দিব্বি মোবাইল ফোনে কথা চালিয়ে যাচ্ছেন।

মসজিদুল হারামে ঢোকার জন্য বেশ কয়েকটি গেট রয়েছে। আগ্রহী পাঠকের জন্য গেটগুলির নাম উল্লেখ করছি:

  • কিং আবদুল আজিজ গেট (গেট নং ১)
  • আযিয়াদ গেট (গেট নং ৫)
  • বিলাল গেট (গেট নং ৬)
  • হুনাইন গেট (গেট নং ৯)
  • ইসমাইল গেট (গেট নং ১০)
  • আস সাফা গেট (গেট নং ১১)
  • বনি হাশিম গেট (গেট নং ১৭)
  • আলি গেট (গেট নং ১৯)
  • আল আব্বাস গেট (গেট নং ২০)
  • আন নবি গেট (গেট নং ২২)
  • আস সালাম গেট (গেট নং ২৪)
  • বনি সাইবাহ্ গেট (গেট নং ২৬)
  • আল হুযুন গেট (গেট নং ২৭)
  • আল মা’লাহ্ গেট (গেট নং ২৯)
  • আল মাদ’আ গেট (গেট নং ৩০)
  • আল মারওয়াহ্ গেট (গেট নং ৩১)
  • উসমান গেট (গেট নং ৩২)
  • আল মাহ্সাব গেট (গেট নং ৩৭)
  • আরাফাহ্ গেট (গেট নং ৩৮)
  • মিনা গেট (গেট নং ৩৯)
  • কুরাইশ গেট (গেট নং ৪০)
  • আল কারারাহ্ গেট (গেট নং ৪৩)
  • আল ফাত্হ্ গেট (গেট নং ৪৫)
  • উমর আল ফারুক গেট (গেট নং ৪৯)
  • আন নাদওয়াহ্ গেট (গেট নং ৫১)
  • আশ্ শামিয়াহ্ গেট (গেট নং ৫২)
  • আল কুদ্স্ গেট (গেট নং ৫৫)
  • আল মদিনাহ্ আল মুনাওয়ারাহ্ গেট (গেট নং ৫৬)
  • আল হুদাইবিয়াহ্ গেট (গেট নং ৫৮)
  • আল উমরাহ্ গেট (গেট নং ৬২)
  • কিং ফাহাদ গেট (গেট নং ৭৯)

গেটগুলি বিভিন্ন আকারের। কোন কোনটি প্রকান্ড, কোন কোনটি বেশ ছোট। তবে এখানে যে ব্যাপারটায় খটকা লাগে তা হলো সৌদী বাদশাহদের নামের গেটগুলো বিরাট আকারের, আর সাহাবীদের নামের গেটগুলো ছোট সাইজের। যেমন ১ নং গেটের নাম কিং আব্দুল আজিজ গেট। এটি বিশালাকৃতির কারুকার্যখচিত গেট। আর ৬ নং বিলাল গেট তার তুলনায় অতি ক্ষুদ্র।

..চতুর্থ পর্ব আসছে

*রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন*
সম্পর্কিত সংবাদ
Leave a reply
ডা: মো: রাশেদুল মওলা