শরীর-মন সুস্থ রাখে যোগ ব্যায়াম

শরীর-মন সুস্থ রাখে যোগ ব্যায়াম

শরীর ও মনকে সচল রাখার জন্য খাদ্য ও পানীয় গ্রহণে বাছবিচার ছাড়াও দরকার উপযুক্ত ব্যায়াম। ছোটদের বেলায় ব্যায়ামের গুরুত্ব আরও বেশি এ জন্য যে, এর মাধ্যমে তাদের শরীর গঠন ও ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটে। ব্যায়ামের অনেক পদ্ধতি আছে। হাটাঁ, দৌঁড়, ঝাঁপ ও এগুলোর ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন রকম খেলা এবং সাঁতার হচ্ছে এক ধরনের ব্যায়াম।

আবার সাইকেল কিংবা নানা যন্ত্রপাতির সাহায্যে করা হয় আরেক ধরনের ব্যায়াম আরও এক রকম ব্যায়াম আছে যার জন্য দৌড়াদৌড়িও করতে হয় না, যন্ত্রপাতিও লাগে না, অথচ যা খুবই উপকারী। এর নাম যোগ ব্যায়াম। শরীরের বিভিন্ন অংশে চাপ সৃষ্টি ও তা শিথিল করে এ ব্যায়াম করতে হয়। এর নিয়ম-কানুন নিয়ে অনেক বই আছে, কেউ কেউ এ ব্যায়াম শিখিয়েও থাকেন। এর সঙ্গে অন্যান্য ব্যায়াম চালিয়ে গেলে লাভ ছাড়া ক্ষতি নেই। যেমন, হাঁটা। প্রতিদিন কমপক্ষে আধ ঘন্টা জোরে জোরে হাঁটলে শরীর নমনীয় থাকে ও মগজে প্রচুর অক্সিজেন ঢোকে বলে উদ্বেগ বা টেনশন কমে।

যোগ ব্যায়ামের বিভিন্ন দেহভঙ্গিমাকে বলা হয় আসন। এখানে ছয়টি অতি প্রয়োজনীয় আসনের বর্ণনা দেয়া হল যেগুলো সব বয়সের মানুষেরই করা উচিত। তবে অল্প বয়সে শুরু করা সবচেয়ে ভাল ও সহজ। যোগসন সাধারণ খালি পেটে করতে হয়।

প্রথমটি হচ্ছে শবাসন। শব বা লাশের মতো নির্জীব ভঙ্গিতে শুয়ে থাকার জন্য এ নামকরণ। এ আসনে বালিশ ছাড়া চিৎ কিংবা উপুড় হয়ে হাত পা ছাড়িয়ে মনকে চিন্তামুক্ত করে শুয়ে থাকতে হয়। এটি যে কোনো সময়ে করা যায় এবং দৈনিক আধ ঘন্টা করলে মেরুদণ্ড ভাল থাকে। মেরুদণ্ড ও পাঁজরের হাড়ের মজ্জা থাকে বেশির ভাগ রক্ত তৈরী হয়। তা তাছা এ আসনটি করলে অনেক পরিশ্রম ও মানসিক চাপ সহ্য করা যায়, পড়া মনে থাকে এবং শরীরের যে কোনো ব্যথা ও লুকিয়ে থাকা সমস্যা দূর হয়। সকালে লাফ দিয়ে বিছানা ছেড়ে না উঠে কিছুক্ষণ এটি করলে শক্তি ও আত্মবিশ্বাস বাড়ে। তবে বিছানা যেন এত নরম না হয় যে চিৎ হয়ে শুলে মেরুদণ্ড বেঁকে যায়। আরেকটি কথা, অন্য সব আসনের পরই কিছুক্ষণ শবাসনে বিশ্রাম নিতে হয়।

দ্বিতীয় ও তৃতীয় আসন দু’টি হচ্ছে পবনমুক্তাসন ও ভুজঙ্গাসন। এ দুটোও নাস্তার আগে কিংবা সন্ধ্যায় করা যায়। খাবার হজম হওয়ার সময়ে পেটে যে বায়ু জমে তা যাবতীয় রোগের চার ভাগের তিন ভাগের জন্য দায়ী। এ আসন দু’টি করলে পেট বায়ুমুক্ত হয় ও হজমশক্তি বাড়ে। তা ছাড়া পবনমুক্তাসন বহুমূত্র ও হাঁপানী রোগে উপকারী। ভুজঙ্গাসন সব রকম পিঠ ও কোমর ব্যাথা, উচ্চ রক্তচাপ এবং মেয়েলী রোগের উপশম ঘটায়।

চতুর্থ আসনটি পদ্মাসন। যোগশাস্ত্রমতে এ আসনটি করলে সর্বরোগ দূর হয়। বিশেষত হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসের শক্তি বাড়ে, মনের শক্তিও বাড়ে এবং দেহে বাত আক্রমণ করতে পারে না।

পঞ্চম আসনটি বজ্রাসন যা খাওয়ার পরপরই করা যায়। এটি হজমে ও ঘুমে সহায়তা করে এবং মেরুদণ্ড ভাল রাখে। ষষ্ঠ আসনটি সিংহাসন। এটি নিশ্বাসের দুর্গন্ধ, জিভের ময়লা, কথার জড়তা, গলার স্বর বসে যাওয়া ও একটুতেই ঠাণ্ডা লাগায় খুব উপকারী এবং গানের গলা মিষ্টি করতে সাহায্য করে। এরপরও শরীরের বিভিন্ন চাহিদা অনুযায়ী নানারকম যোগাসন বা অন্যান্য ব্যায়াম করা যেতে পারে। শবাসন ছাড়া ওপরের বাকী পাঁচটি আসনের বর্ণনা সংক্ষেপে নিচে দেয়া হল।

পবনমুক্তাসন: চিৎ হয়ে শুয়ে প্রথমে ডান পা হাঁটু থেকে ভাঁজ করে পেট ও বুকের ওপর রেখে দ’হাত দিয়ে চেপে ধর। শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রেখে মনে মনে তিরিশ পর্যন্ত গোন। তারপর ডান পা নামিয়ে বাঁ পা এবং বাঁ পা নামিয়ে শেষে দ’পা চেপে ধরে সংখ্যা গোনা হয়ে গেলে এটাকে বলা হবে একবার। শবাসনে সমান সময় বিশ্রাম নিয়ে পরপর তিনবার এটা করা উচিত।

ভুজঙ্গাসন: পা দু’টি সোজা রেখে সটান উপুড় হয়ে শুয়ে পড়। দ’হাতের তালু উপুড় করে পাঁজরের কাছে দু’পাশে মেঝেতে রাখ। এবার পা থেকে কোমর পর্যন্ত মেঝেতে রেখে হাতের তালুর ওপর ভর দিয়ে মাথা যতদূর সম্ভব ওপরে তোল। এখন মাথা সাধ্যমতো পিছন দিকে বাঁকিয়ে ওপরের দিকে তাকাও। ২৫ থেকে ৩০ সেকেন্ড শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রেখে এ অবস্থায় থাক। তারপর আস্তে আস্তে মাথা ও বুক নামিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে পড় এবং শবাসনে বিশ্রাম নাও। আসনটি দু’বার করলে চলে।

পদ্মাসন: শিরদাঁড়া সোজা করে বসে বাঁ পা হাঁটু থেকে মুড়ে ডান ঊরুর ওপর রাখ। দু’হাঁটুর ওপর রাখ। যতক্ষণ সহজভাবে পারো ঐ অবস্থায় থাক। শ্বাস- প্রশ্বাস স্বাভাবিক থাকবে। তারপর পা বদলে আবারও বস। অস্বস্তি লাগলে শবাসনে বিশ্রাম নাও। এভাবে চারবার কর।

বজ্রাসন: হাঁটু ভাঁজ করে পা দু’টি পিছন দিকে মুড়ে নামাজে বসার মতো ভঙ্গিতে শিরদাঁড় সোজা করে বস। হাতের তালু উপুড় করে দু’হাঁটুর ওপর রাখ। পাছা গোড়ালির ওপর থাকবে। প্রথম ক’দিন একটু অসুবিধা হতে পারে। তাই যতক্ষণ সহজভাবে পারো ঐ অবস্থায় বস। একবারে বেশিক্ষণ না থাকতে পারলে শ্বাস স্বাভাবিক রেখে আসনটি তিনবার কর এবং শবাসনে বিশ্রাম নাও।

সিংহাসন: বজ্রাসনে বসে চিবুক বা থুঁতনি নামিয়ে বুকে ঠেকাও্। তারপর বড় হাঁ করে যতখানি পারো জিভ বার কর। এবার নাক দিয়ে বুক ভরে শ্বাস টেনে মুখ দিয়ে যত জোরে সম্ভব শব্দ করে শ্বাস ছাড়। পরপর ৬ বার এরকম করে শবাসনে বিশ্রাম নাও। ধীরে ধীরে সংখ্যাদি বাড়িয়ে ১২ বার করতে পার।

শরীরের সাথে মনের যোগাযোগ রক্ষা করে স্নায়ু। সমস্ত স্নায়ু মিলে তৈরী হয়েছে স্নায়ুতন্ত্র যার একটা  বড় অংশ শেষ হয়েছে পায়ের তলায়। সেজন্য পায়ের তলা কর্কশ কোনো কিছু, যেমন ধুন্দুলের ছাল বা প্লাস্টিকের ব্রাশ, দিয়ে ঘুরিয়ে অনেক্ষণ ঘষলে শরীর সতেজ থাকে এবং অসুস্থ শরীর ধীরে ধীরে সেরে ওঠে। কাজেই রোজ যখনই সম্ভব একেক পায়ের তলা অন্তত ১০ মিনিট করে ঘষে আঙ্গুলগুলো ওপর-নিচ করে টানবে।

মুখ ধোয়ার সময়ে চোখে অনেকবার পানির ঝাপটা দাও। নাক দিয়ে পানি যতটা সম্ভব টেনে ছেড়ে দিলে সহজে সর্দি-কাশি কিংবা মাথাব্যথা হবে না। রাতে শোয়ার আগে অবশ্যই দাঁত মাজবে, কারণ মুখের অপরিচ্ছন্নতা থেকে অনেক রোগ হয়। তা ছাড়া যখনই কিছু খাবে বা পানি ছাড়া অন্য কিছু পান করবে তার পরই পানি দিয়ে ভাল করে কুলি করলে দাঁত ভাল থাকবে। আর জানো তো, দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বোঝা বুদ্ধিমানের কাজ!

*রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন*
সম্পর্কিত সংবাদ
Leave a reply
ডেস্ক রিপোর্ট