মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নয়া ইতিহাস গড়ার হাতছানি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নয়া ইতিহাস গড়ার হাতছানি

বিশ্ব কাঁপায় আমেরিকা। আজ ৮ নভেম্বর কাঁপছে বিশ্বমোড়ল এই দেশ। কিতাবি নাম যুক্তরাষ্ট্র, উত্তর আমেরিকা মহাদেশের একটি দেশ। ২০১৬ সাল আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বছর। চার বছর অন্তর নভেম্বর মাসের প্রথম সোমবারের অব্যবহিত পরের মঙ্গলবার নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান (‘It occurs on the Tuesday immediately after the first Monday in November’)|  সেই মতে, এবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ৮ নভেম্বর মঙ্গলবার। সব বিচারেই আমেরিকায় এবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নতুন ইতিহাস রচিত হবে। এ দেশে প্রার্থী যতই থাক, মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা সব সময়ই হয়ে থাকে প্রধান দুই দল রিপাবলিকান পার্টি (জিওপি) ও ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থীর মধ্যে। এবার রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প। একজন আপদমস্তক ব্যবসায়ী। বিলিয়নিয়ার। সম্পদের পরিমাণ প্রায় চার বিলিয়ন ডলার। অন্যজন ডেমোক্র্যাট পার্টির প্রার্থী হিলারি  রডহ্যাম ক্লিনটন। মূল পরিচয় একজন রাজনীতিবিদ। সাবেক ফার্স্টলেডি, প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের স্ত্রী। সাবেক সেক্রেটারি অব স্টেট (বাংলাদেশে যাকে বলা হয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী) ও সাবেক সিনেটর।

আমেরিকার এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নয়া ইতিহাস নির্মাণের নির্বাচন। নির্বাচনের ফল যাই হোক, আমেরিকার ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়ে যিনিই হোয়াইট হাউসে চার বছরের জন্য বসবাসের সুযোগ পাবেন, যুক্তরাষ্ট্রের ২৪০ বছরের ইতিহাসে তিনিই নতুন ইতিহাস নির্মাণ করবেন। যদি রিপাবলিকান প্রার্থী হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচিত হন, সেটিও হবে নতুন ইতিহাস। আপাদমস্তক একজন ব্যবসায়ী আমেরিকায় এর আগে কখনই প্রেসিডেন্ট হননি। তিনি শুধু ব্যবসায়ী নন, মুনাফার জন্য অনৈতিক পথে পা বাড়াতেও দ্বিধা করেননি। ছয়বার নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করেছেন। ট্যাক্স ফাঁকি দেয়ার চেষ্টা করেছেন। মেয়েদের প্রতি অশোভন, নোংরা মন্তব্য করতে মজা পান। মুসলমান ও  অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়িয়েছেন, যা আগে কোনো প্রেসিডেন্ট প্রার্থীই করেননি। তিনি মার্কিন সমাজে বিভেদের বিষবৃক্ষ রোপণ করেছেন। এখন ক্ষমা চেয়েও পার পাচ্ছেন না। অন্যদিকে হিলারি ক্লিনটন নির্বাচিত হলে ইতিবাচক অর্থে আরো বড় ইতিহাস নির্মিত হবে আমেরিকার জন্য। স্বাধীনতা প্রাপ্তির ২৪০ বছরের মধ্যে তিনিই হবেন আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম একজন নারী প্রেসিডেন্ট। সেই কবে ১৮৭২ সালে একজন মহিলা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হয়েছিলেন। তার নাম ভিক্টোরিয়া ক্ল্যাফিন উডহাল। তার জন্ম ১৮৩৮ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর। বিয়ের পর তিনি হন মার্টিন। তিনি প্রার্থী হয়েছিলেন ইকুয়াল রাইটস পার্টির হয়ে। তিনি ছিলেন নারী ভোটাধিকার আন্দোলনের নেত্রী। তখন মেয়েদের ভোটাধিকার ছিল না। তাই তিনি নিজেকে ভোট দিতে পারেননি।

ক্ল্যাফিন মার্টিন মৃত্যুবরণ করেন ১৯২৭ সালের ৯ জুন, নারীদের ভোটাধিকার প্রাপ্তির মাত্র সাত বছর পর। আমেরিকায় মেয়েরা ভোটাধিকারের অধিকারপ্রাপ্ত হন ১৯২০ সালে, সংবিধানের ১৯তম সংশোধনীর বলে। তিনি মৃত্যুর আগে জেনে যান মেয়েদের ভোটাধিকার লাভের কথা-  এটিই তার জন্য সুখের সংবাদ। ১৯২০ সালের ১৮ আগস্ট নারী ভোটাধিকারসংক্রান্ত বিলটি মার্কিন কংগ্রেস রেটিফাই করলে নারীরা ভোটদানের অধিকার পান। এর পর ২০১৬। ভিক্টোরিয়া ক্ল্যাফিন মার্টিন থেকে হিলারি রডহ্যাম ক্লিনটন। কেটে যায় ১৪৪ বছর। প্রধান দুই দল রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট কোনো দলেরই মনোনয়ন লাভের সুযোগ হয় না কোনো মেয়ে প্রার্থীর। ২০০৮-এ হিলারি ক্লিনটন শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন লড়াই চালিয়ে গিয়েও পারেননি বারাক ওবামার সঙ্গে। ওবামাও আমেরিকায় ২৩২ বছরের ইতিহাস পাল্টে দিয়ে প্রথম একজন কালো হিসেবে আমেরিকার শ্বেত প্রাসাদ বা হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট হয়ে প্রবেশ করেন। ২০১৬ সালে এসে হিলারি ক্লিনটন প্রথম নারী হিসেবে সব রেকর্ড ভেঙে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকার পান। অথচ ডেনমার্কে মেয়েরা ভোটের অধিকার পেয়েছেন ১৯১৫ সালে। আমেরিকারও পাঁচ বছর আগে। মিউনিসিপ্যাল পর্যায়ে সৌদি আরবের মেয়েরাও আমেরিকার চেয়ে পাঁচ বছর আগে ১৯১৫ সালে ভোটের অধিকার অর্জন করেন। দেশটি যদিও রাজতন্ত্র।

এ দেশে মেয়েদের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য ভিক্টোরিয়া ক্ল্যাফিন উডহালের নেতৃত্বে আন্দোলন শুরু হয় ১৮৪০-এর দিকে। অবশেষে সেই অধিকার প্রতিষ্ঠা পায় ৮০ বছর পর ১৯২০ সালে। আর তারও ৯৬ বছর পর একজন নারীর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে দেখা দিয়েছে এই ২০১৬-তে এসে। এই হচ্ছে পৃথিবীতে গণতন্ত্রের মহান আদর্শের দেশ, নারী-পুরুষে সমঅধিকারে বিশ্বাসী আমেরিকার ইতিহাস। নারীরা রাষ্ট্রক্ষমতায় এলেও নারী জাতির প্রতিনিধিত্ব করে না। তবুও এসব ক্ষেত্রে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দৃষ্টান্ত উজ্জ্বল। সর্বোচ্চ পদে নারীর অবস্থান বহু আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা ও বাংলাদেশে। এর মধ্যে বাংলাদেশ নারী নেতৃত্বদানের ক্ষেত্রে আরো বেশি অগ্রসরমান। এবারই প্রথম আমেরিকার প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল রিপাবলিকান পার্টির বিলিয়নিয়ার ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্প যেমন একজন ব্যতিক্রমী প্রার্থী, তেমনি ডেমোক্র্যাট দলেরও হিলারি রডহ্যাম ক্লিনটন প্রথম মহিলা প্রার্থী হিসেবে ব্যতিক্রমী। নির্বাচনী প্রচারণাতেও ব্যতিক্রম দেখা গেছে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে এত নোংরামি, কাদা ছোড়াছড়ি এবারের মতো আমেরিকার ইতিহাসে আগে আর কখনই দেখা যায়নি। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দিক থেকে নোংরামি, যৌনতা, বিদ্বেষ আর ঘৃণার বিষ ছড়ানো ছাড়া আর কিছু নেই। মুসলমান এবং ইমিগ্র্যান্টদের বিরুদ্ধে যেন তার যুদ্ধ চলছে। মহিলাদের প্রতি এত অসম্মান অতীতে আর কোনো প্রেসিডেন্ট প্রার্থী দেখাননি। এত নোংরা কথাও মেয়েদের সম্পর্কে আগে আর কেউ কখনো বলেননি। এ কারণে অনেক রিপাবলিকান নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতাও ট্রাম্পের প্রতি তাদের সমর্থন প্রত্যাখ্যান করেছেন। কেউ বলছেন- তিনি বিশ্ব শান্তি ও সভ্যতার জন্য ভয়ঙ্কর। কেউ বলছেন- হোয়াইট হাউসের জন্য তিনি সম্পূর্ণই বিপজ্জনক। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অনেকে অসভ্যতার ‘গোলাঘর’ পর্যন্ত বলতে ছাড়েননি।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ইতিহাসে কোনো প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচারে এমন খিস্তিখেউর কেউ দেখেনি। হিলারি ক্লিনটনকেও অনেকে প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য খুব যোগ্য প্রার্থী মনে করেন না। তবে সেই বাংলা প্রবাদের মতো মনে করেন- অশিক্ষিত মিত্রর চেয়ে শিক্ষিত শত্র“ ভালো। সেই বিচারে হিলারি ক্লিনটন ভোটারদের বিচারে কিছুটা এগিয়ে রয়েছেন। এ ছাড়া দুই প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর মধ্যে টেলিভিশন বিতর্কেও ভালো ব্যবধানে হিলারির কাছে ট্রাম্প পরাজিত হয়েছেন। হিলারি ডাবল ডিজিট অর্থাৎ প্রায় ১১ শতাংশ ভোটে এগিয়ে আছেন। এ ব্যবধান শেষ পর্যন্ত অব্যাহত থাকলে ৮ নভেম্বর ২০১৬ নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটনই প্রথম একজন নারী হিসেবে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন। চার বছর অন্তর অন্তর নভেম্বর মাসের প্রথম মঙ্গলবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, এটি সংবিধানে নির্ধারিত। আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পদ্ধতিটা একটু ভিন্ন রকমের-  না প্রত্যক্ষ, না পরোক্ষ। দেশের ভোটাধিকারপ্রাপ্ত সব নাগরিক যেমন প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের ভোট দেন। যাকে বলা হয় পপুলার ভোট। তেমনই  রয়েছে ৫৩৮ সদস্যের একটি নির্বাচকমণ্ডলী বা ইলেকটোরাল কলেজ। ৫৩৮ সদস্যের মধ্যে আছেন ১০০ সিনেটর, ৪৩৫ কংগ্রেসম্যান আর ওয়াশিংটন ডিসির তিনজন প্রতিনিধি। প্যাঁচটা হচ্ছে- জনগণ যে ভোট দেন সরাসরি সেই ভোটে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন না। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন মেজরিটি ইলেকটোরাল ভোটে। এ জন্য দরকার হয় ২৭০টি ইলেকটোরাল ভোট। জনগণের ভোটে যে স্টেটে যে প্রার্থী বিজয়ী হন, ধরে নেয়া হয় তিনি ওই স্টেটের সব ইলেকটোরাল ভোট পেয়ে গেছেন। নির্বাচনের আগে প্রধান দুই প্রার্থীর মধ্যে টেলিভিশন বিতর্ক হয়। সেই বিতর্ক হয়ে আসছে ১৯৬০ সাল থেকে।

এবার তিনটি বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর একটি হয়েছে ২৬ সেপ্টেম্বর, আরেকটি ৯ অক্টোবর। এবং শেষটি হয় ১৯ অক্টোবর। সর্বশেষ জনমত জরিপে দেখা যায়, পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ২৭০টি ইলেকটোরাল ভোট পেয়ে যাবেন হিলারি ক্লিনটন। তিনি তিনটি বিতর্কেই জয়ী হয়েছেন। জনমত জরিপেও তিনি সব সময়ই সামান্য হলেও এগিয়ে। মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসার আগে প্রার্থীদের দলের চূড়ান্ত মনোনয়ন পেতে প্রাইমারির মতো কঠিন এক স্তর পার হয়ে আসতে হয়। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দলের তৃণমূলের ভোটারদের সমর্থন মেলে। প্রকৃত অর্থে তাদের অনুমোদিত প্রার্থীই শেষ পর্যন্ত দলের চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বাংলাদেশে যা একান্তই অনুপস্থিত। প্রায় এক বছর ধরে সব রাজ্যে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে। ভোটের মাধ্যমে ডেলিগেট নির্ধারিত হয়। ডেলিগেটও কয়েক প্রকারের। অঙ্গীকারবদ্ধ ডেলিগেট, মুক্ত ডেলিগেট, সুপার ডেলিগেট। ডেমোক্র্যাট দলের সব ডেলিগেট মিলে সংখ্যা চার হাজার ৭৬৩ জন। চূড়ান্ত মনোনয়ন পেতে প্রয়োজন দুই হাজার ৩৮২ জন। দলের জাতীয় কনভেনশনে হিলারি  ক্লিনটন পেয়েছেন দুই হাজার ৮৪২ ডেলিগেটের সমর্থন। অন্যদিকে রিপাবলিকান পার্টির ডেলিগেট দুই হাজার ৪৭২ জন। মনোনয়ন চূড়ান্ত করতে প্রয়োজন হয় এক হাজার ২৩৭ জনের সমর্থন। ডোনাল্ড ট্রাম্প পেয়েছেন এক হাজার ৪৪১ জনের সমর্থন। এখন তারা দুজনই দুই দলের চূড়ান্ত প্রার্থী হয়ে লড়ছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদের জন্য। যাকে বলা হয়, বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি।

এবার আমেরিকার এই ৪৫তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ফল যাই হোক, বিজয়ী হিলারি অথবা ট্রাম্প যিনিই হন, রচিত হবে নতুন ইতিহাস। এবারই প্রথম একজন নারী হবেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। নতুবা এমন একজন পুরুষ প্রেসিডেন্ট হবেন, যিনি নিজেও হবেন একেবারেই এক ব্যতিক্রমী মানুষ। বাণিজ্য, মুনাফা, যৌনতা, স্থুলতা আর মেয়েদের প্রতি নোংরা মন্তব্য করাই তার মানসিক বৈশিষ্ট্য। হিলারির বিরুদ্ধে অবশ্য ইমেইল বিতর্ক রয়েছে। তবে তিনি তা ভালোভাবেই মোকাবিলা করছেন বলে রাজনৈতিক বোদ্ধারা মনে করছেন। রাজনীতির পণ্ডিত এবং পর্যবেক্ষকদের বিবেচনায় এবার রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে বিশ্বব্যাপী আমেরিকার ভাবমূর্তি যেমন ক্ষুণ্ণন হবে, তেমনই আমেরিকার গ্রহণযোগ্যতা অনেক কমে যাবে। পররাষ্ট্রনীতিতে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। আর অভ্যন্তরীণ নীতিতে মুসলমান হোক আর ইমিগ্র্যান্ট হোক, তাদের ওপর আঘাত এলে শুধু তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, আমেরিকার উন্নয়ন ও অর্থনীতিও আঘাতপ্রাপ্ত হবে নিশ্চিত। অষ্ট্রপ্রহর জাগ্রত ম্যানহাটনের চোখ নিদ্রাতুর হয়ে উঠতে পারে। অনেকের আশঙ্কা- আগে যেখানে রাজনীতিই নিয়ন্ত্রণ করত অর্থনীতি, বিদেশনীতি সবকিছু; ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হলে অর্থনীতি, কূটনীতি, ও রাজনীতি- সবই নিয়ন্ত্রণে যাবে ট্রাম্পের মতো বেনিয়াগোষ্ঠীর কবলে। যার কুফল ভোগ করতে হবে আমেরিকানদের। এসব বিবেচনা করেই হয়তো প্রেসিডেন্ট ওবামা ট্রাম্পকে প্রত্যাহার করে নিতে রিপাবলিকান নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন।

বাঙালিদের অবস্থানও ভালো এ নির্বাচনে। এখন আমেরিকার যে কোনো নির্বাচনেই বাঙালিরা দৃশ্যমান ভূমিকা রাখেন। এখন বাংলাদেশি-আমেরিকান ভোট সংখ্যাও অনেক। তারা ভোটকেন্দ্রেও যান। বহু বাঙালি নির্বাচনে ভলানটিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। স্থানীয় পর্যায়ে অনেক বাঙালির ভূমিকা স্বীকৃতিও পায়। তারা বাঙালিদের গণ্য করেন। বিশেষ করে যেসব স্টেটে বাঙালির আধিক্য রয়েছে, যেমন- নিউইয়র্ক, নিউজার্সি, ভার্জিনিয়া, ওয়াশিংটন, বস্টন, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া, মিশিগান, ক্যালিফোর্নিয়া, আরিজোনা, কানেকটিকাট ও মেরিল্যান্ড স্টেটগুলোতে। এসব অঞ্চলে মূলধারার অনেক রাজনীতিবিদ, বিশেষ করে সিটি কাউন্সিলম্যান, স্টেট এসেম্বলিম্যান, বরো প্রেসিডেন্টের মতো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি কিংবা ভবিষ্যতে যারা ওসব হওয়ার স্বপ্ন দেখেন, তারা সুযোগ পেলেই বাঙালিদের নানা সমাবেশে গিয়ে উপস্থিত হন। এবং ‘সালামালেকুম’, কেমন আছেন, ভালো আছেন বলে বক্তৃতা শুরু করেন। আয়োজকদের রাজনৈতিক পরিচয় বুঝে অনেক সময় ‘জয়বাংলা’ বলে বক্তৃতা শেষ করেন। এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বাঙালিদের অনেক বেশি সোচ্চার ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে। দুই-চারজন বাঙালি এবার ডেমোক্র্যাটিক ও রিপাবলিকান- দুই দলের জাতীয় কনভেনশনে ডেলিগেটও নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই কনভেনশনেই দলের প্রার্থী মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হয়। নির্বাচনী প্রচারণা, আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্কে সরব এখন বাঙালি কমিউনিটি। অনেকে নির্বাচনী প্রচারকেন্দ্রও পরিচালনা করছেন। অনেকে নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে হিলারি ক্লিনটনের পক্ষে বাংলাভাষী পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে ভোট দেয়ার আবেদনও জানিয়েছেন। নির্বাচনী খবরে ভরে উঠছে মূলধারার পাশাপাশি বাংলাভাষার পত্রপত্রিকাও। কোনো কোনো পত্রিকা সম্পাদকীয় লিখছেন নির্বাচন নিয়ে, কেউবা বিশেষ প্রতিবেদনে নানা মন্তব্য তুলে ধরছেন। সমর্থনের ক্ষেত্রে বাঙালিদের অধিকাংশই ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের পক্ষে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুসলিম এবং ইমিগ্র্যান্ট-বিদ্বেষী মনোভাবের কারণে হিলারির প্রতি সমর্থন আরো জোরালো হয়েছে।

সম্পর্কিত সংবাদ
ডেস্ক রিপোর্ট