নিউইয়র্ক সিটি মেয়রের ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মামলার হুমকি

নিউইয়র্ক সিটি মেয়রের ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মামলার হুমকি

মুসলিম আমেরিকানদের বিশেষ তালিকাভুক্ত করাসহ অবৈধভাবে বসবাসরত অভিবাসীদের ঢালাওভাবে বহিষ্কারের প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মামলার হুমকি দিলেন নিউইয়র্ক সিটি মেয়র বিল ডি ব্লাসিয়ো।

২১নভেম্বর সোমবার সকালে নিউইয়র্ক সিটির ডাউন টাউনে ঐতিহাসিক কুপার ইউনিয়নের গ্রেট হলে সর্বস্তরের মানুষের এক সমাবেশে বক্তব্যকালে মেয়র ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন গণবিরোধী পদক্ষেপকে রুখে দাঁড়ানোর আহবান জানান।

মেয়র বলেন, ‘সকল ধর্ম, বর্ণ, গোত্র আর জাতিগোষ্ঠির মানুষের মহামিলন কেন্দ্র হচ্ছে এই আমেরিকা। আমেরিকার সংবিধানও সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলেছে। এমন অবস্থায় রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট যদি সংবিধান পরিপন্থিভাবে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সম্প্রীতির বন্ধনকে বিপন্ন করার মত কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তবে তার বিরুদ্ধে আইনগত লড়াইয়ের বিকল্প থাকবে না।

প্রসঙ্গত: উল্লেখ্য যে, ১৮৬০ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি এই মিলনায়তণের সমাবেশেই প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন দাস প্রথার বিরুদ্ধে সর্বসাধারণকে রুখে দাঁড়ানোর আহবান জানিয়েছিলেন।

নির্বাচনী প্রচার সমাবেশে ট্রাম্প এমন সব কথা বলেছেন এবং মন্তব্য করেছেন যার ফলে নির্বাচন শেষ হওয়া সত্ত্বেও ধর্ম-বর্ণ-জাতিগত বিদ্বেষমূলক হামলার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। ‘দ্য সাউথ পভার্টি ল’ সেন্টার’ নামক একটি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনের দিন থেকে রোববার পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্বেষমূলক হামলার ঘটনা ঘটেছে ৭০০। এর অধিকাংশই মুসলমানদের ওপর ঘটেছে এবং নিউইয়র্ক অঙ্গরাজেই ৪ শতাধিক অভিযোগ লিপিবদ্ধ হয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে থাকায় নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের গভর্ণর এন্ড্রু ক্যুমো তার অফিসে

একটি হটলাইন স্থাপন করেছেন। আক্রান্তরা যেন দ্রুত অবহিত করেন। এছাড়া, অভিবাসনের বৈধতা না থাকার কারণেও যদি কেউ ভীতির মধ্যে থাকেন, তারাও ঐ হটলাইনে যোগাযোগ করলে যথাযথ সহায়তার আশ্বাস দেয়া হয়েছে।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে সন্ত্রাসী হামলার পরিপ্রেক্ষিতে তদানিন্তন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের নির্দেশে ২০০২ সালের শেষার্ধে মুসলিম-আমেরিকানদের বিশেষ নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালু হয়। ১৮ বছর থেকে ৪৫ বছর বয়েসী সকলকে তালিকাভুক্ত হতে হয়। বাংলাদেশসহ ২৫টি রাষ্ট্রকে চিহ্নিত করা হয়েছিল বিপজ্জনক হিসেবে। এসব দেশ থেকে ইমিগ্র্যান্ট ও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসায় যারাই যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন তাদেরকেই বিশেষ নিরাপত্তা বেষ্টনী অতিক্রম করতে হয়। নির্দিষ্ট এয়ারপোর্ট দিয়ে তাদেরকে যাতায়াত করতে হয়েছে। বহুল বিতর্কিত এ ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হয়েছে ২০১১ সালে প্রেসিডেন্ট ওবামার নির্দেশে। একই ব্যবস্থা আবারো চালুর কথা বলেছেন ট্রাম্পের উপদেষ্টারা।

অর্থাৎ মুনলিম অভিবাসীদেরকে বিশেষ নজরদারির আওতায় রাখা হবে। সর্বত্র দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হবেন। ফেডারেল সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভবনে প্রবেশাধিকারই শুধু নয়, চাকরির ক্ষেত্রও সংকুচিত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশংকা প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণকারিদের ঘনিষ্ঠজনেরা ইমিগ্র্যান্ট ভিসায় আসার ক্ষেত্রও সংকুচিত হতে পারে। এহেন অবস্থায় মুসলিম-আমেরিকানদের মধ্যে সৃষ্ট সংশয় আর উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে সিটি মেয়র এ সমাবেশের আয়োজন করেন। গত সপ্তাহে ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাত করেও মেয়র তার অবস্থান স্পষ্টভাবে জানিয়ে এসেছেন যে, এই সিটির নাগরিকের কাউকে ইমিগ্রেশনের স্ট্যাটাসের কারণে বহিষ্কার করা যাবে না এবং মুসলমানদেরকেও নজরদারির আওতায় আনা চলবে না। সে সময় ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তিনি আরো জানিয়েছেন যে, নিউইয়র্ক সিটির নাগরিকদের নিরাপত্তা রক্ষায় যারা সবচেয়ে বেশী নিষ্টার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের অন্যতম হলেন মুসলিম-আমেরিকান অফিসারেরা। সে সংখ্যা ৯ শতাধিক।

ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের অবস্থানে অনড় থেকে সে সময় মেয়রকে জানান যে, ফেডারেল প্রশাসনের নির্দেশ যারা কার্যকর করতে টালবাহানা করবে, তাদেরকে অনুদান দেয়া হবে না। এমন হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে ডেমক্র্যাটিক পার্টির এই মেয়র স্পষ্টভাবে ট্রাম্পকে জানিয়েছেন যে, বরাদ্দ বড় কথা নয়, এই সিটিকে শীর্ষে আরোহনে যারা মেধা ও শ্রম দিচ্ছেন, সে সব লোকদের নিরাপত্তায় বদ্ধ পরিকর আমরা। কোন অপরাধে লিপ্ত নেই, এমন অবৈধ অভিবাসীকে বহিষ্কারের পক্ষে নয় এই সিটি। উল্লেখ্য যে, একই অবস্থান গ্রহণ করেছেন শিকাগো, লসএঞ্জেলেসসহ আরো কয়েকটি সিটির মেয়র।

এদিকে, প্রাপ্ত সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের গত ১০ মাসে ধর্ম-বর্ণ ও জাতিগত বিদ্বেষমূলক হামলার ঘটনা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩১% বেড়েছে।

এদিকে গ্যালাপ পরিচালিত এক জরিপে সোমবার জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যবোধের বিপর্যয় ঘটার আশংকা করছেন ৭৭% আমেরিকান। তারা মনে করছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন বক্তব্য/মন্তব্য এবং সর্বশেষে পদক্ষেপ গ্রহণের হুংকারে সামাজিক অস্থিরতা ক্রমান্বয়েন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আমেরিকানদের মধ্যেকার ঐক্যে ভাঙন ধরছে। ৮ নভেম্বরের নির্বাচনের পর এই প্রথম জরিপে অংশগ্রহণকারিদের মাত্র ২১% বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ঐক্যবদ্ধ রয়েছে এবং ঐক্যের এ ধারায় সমাজ আরো এগিয়ে যাবে। জরিপে অংশগ্রহণকারি রিপাবলিকানদের ৬৮%ও মনে করছেন যে আমেরিকায় ভাঙন ধরেছে। অপরদিকে ডেমক্র্যাটদের ৮৩% এর এমন ধারণা। জরিপে অংশ নেয়াদের ৪৫% মনে করছেন যে ট্রাম্প আবারো যুক্তরাষ্ট্রকে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হবেন। অপরদিকে ৪৯% বলেছেন যে, ট্রাম্প আরো বিভক্ত করবেন মার্কিন সমাজ ব্যবস্থাকে। নভেম্বরের ৯ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত এ জরিপ চালানো হয় টেলিফোনে ।

সম্পর্কিত সংবাদ
ডেস্ক রিপোর্ট