লেটস টক ফিল্মমেকিং: ভিকি জাহেদ

লেটস টক ফিল্মমেকিং: ভিকি জাহেদ

এ সময়ের সম্ভাবনাময় তরুন নির্মাতা ভিকি জাহেদ। মায়া, মোমেন্টস এর মত শর্টফিল্ম বানিয়ে তিনি কাঁপিয়েছেন অনলাইন দুনিয়া। ডাকপিয়ন২৪ ও সিনেমাপিপলস এর যৌথ উদ্দ্যোগের ইন্টারভিউ সিরিজ ‘লেটস টক ফিল্মমেকিং’ এর প্রথম পর্বের অতিথি ভিকির সাথে আলোচনায় জানা গেলো চলচ্চিত্র নিয়ে তার ভাবনা, স্বপ্ন ও নানা গল্প।

ডাকপিয়ন২৪: কেমন আছেন আপনি?

ভিকি জাহেদ: ভালো আছি।

ডাকপিয়ন২৪: প্রথমে আসি আপনার সর্বশেষ কাজ মায়া নিয়ে? এক মাসেই ইউটিউবে প্রায় নয় লক্ষ ভিউ। কেমন লাগে দর্শকের এমন সাড়া পেতে?

ভিকি জাহেদ: জ্বি! ভালতো অবশ্যই লাগে, একটা কাজ যখন করা হয় তখন সেটা দর্শকের কথা মাথায় রেখেই করি। আর আমি কাজ করি অডিয়েন্স এর জন্য। এমন কিছু কন্টেন্ট আমার কাজগুলোতে দেওয়ার চেষ্টা করি, যেটা অডিয়েন্স এর ভাল লাগবে। সেক্ষেত্রে মায়া সাকসেস হয়েছে আল্লাহ’র রহমতে। আমার ভাল লাগছে যেখানে মায়াতে সবকিছু রয়েছে। মোমেন্টন্স তো একটু রোমান্টিক ধাঁচের শর্টফিল্ম ছিলো এবং অনলাইন অফলাইনে এটা দিয়ে দারুন একটা সাড়া পেয়েছি। এরপর আবারও একটা রোমান্টিক কাজ করে সেটা আরো দর্শকপ্রিয় বানানোটা চ্যালেঞ্জ ছিলো বেশ। সে ক্ষেত্রে ভাল লাগছে, সফল হয়ে।

ডাকপিয়ন২৪: আপনার কাছে সিনেমার সংজ্ঞা কি?

ভিকি জাহেদ: ‘Cinema is the greatest reflection of life’.. আমার কাছে মনে হয় জীবনের একটা প্রতিবিম্ব হচ্ছে সিনেমা। অনেকেই বলে সিনেমা রিয়েল না, ট্রু না। কিন্তু আমার মতে সিনেমটা বাস্তব জীবনের সবকিছুর সাথে সম্পর্কিত। একটা ফিল্মমেকার সিনেমায় যা দেখাবে, সেটা বাস্তব জীবনে প্রতিচ্ছবিই হওয়া উচিত। যখন কেউ একটা সিনেমা দেখতে গিয়ে সিনেমাটা তার বাস্তব জীবনের সাথে মিলে যায়, সেই দর্শক সিনেমাটি অনেকদিন মনে রাখে। এমনিতে ধরেন কমেডি ধাঁচের ছবি, এগুলা মানুষ একদিন দেখবে, দুদিন দেখবে, এরপর ভুলে যাবে। কেবলমাত্র সেই ছবিগুলোই মানুষের মাথায় থাকে বা মনে গেঁথে যায়, যে ছবিটা তার রিয়েল লাইফের সাথে মিলে যায়। আমি আমার ছবি বানানোর সময় এই জিনিসটা অলওয়েজ মাথায় রাখি। এমন একটা গল্প আমার ছবিতে দেই যে গল্পটা দেখার পর মানুষ ফিল করবে এ গল্পটা আমার লাইফ এওতো হতে পারতো, এই গল্পটাতো আমারই! মায়া দেখে অনেকে বলেছে তার লাইফের সাথে গল্প বা স্টোরিটা মিলে গেছে। মোমেন্টস এর ক্ষেত্রেও একই কথা ছিল। এই জিনিসটা আমি ট্রাই করি, বাস্তব জীবনের মাথে একটা প্রতিচ্ছবি হয় সিনেমাটা।

ডাকপিয়ন২৪: মোমেন্টস, অবিশ্বাস, মায়া … এগুলো ছাড়াও এ পর্যন্ত কয়টা কাজ করা হয়েছে?

ভিকি জাহেদ: আমি বেসিক্যালি ২০১৬ তে শর্টফিল্ম বেশি করেছি। এর আগে আমি টিভিসি করেছি। ডকুমেন্টরি, অনলাইন প্রমোশনাল দিয়ে কেটেছে ২০১৪-২০১৫ সাল। ২০১৩ তে যখন কাজ শুরু করি তখন শর্টফিল্ম দিয়েই কাজ শুরু করেছিলাম এর পর একটা গ্যাপ পড়ে গেছিল এক দেড় বছরের। আবার ২০১৬ তে শুরু করলাম এবং এইবছরে ৩টা কাজ হলো আর কি? মোশন ভাস্কর নিয়ে আমাদের একটা নির্মান প্রতিষ্ঠান আছে সেখান থেকে আমরা নিয়মিতভাবে ডকুমেন্টারী, সিএসআর, অনলাইন প্রমোশনাল ধরনের কাজ করে থাকি।

ডাকপিয়ন২৪: এ পর্যন্ত নিজের করা সবচেয়ে পছন্দের কাজ কোনটি?

ভিকি জাহেদ: নিজের সবগুলা কাজইতো ভাল লাগে। নিজের কাজের উপর ওরকম র‌্যাংকিং করা সম্ভব না, তবে যেটা বলা যেতে পারে মায়া করে আমি একজন মেকার হিসাবে শান্তি পেয়েছি। আমার কাছে মনে হয় মায়া কমপ্লিট একটা প্যাকেজ হয়েছে, কমপ্লিট একটা ফিল্ম হয়েছে। কালার, মিউজিক, লোকেশন, অ্যাকটিং সবদিকদিয়ে আমার মনে হয়েছে এটা আমার সবচেয়ে ভালো প্রডাকশন।

nadiajovanvicky

মায়া’র সেটে প্রধান দুই চরিত্র নাদিয়া ও জোভানের সঙ্গে ভিকি

ডাকপিয়ন২৪: আপনার ছবিতে নিজের ছবির পল্প/স্ক্রিপ্ট নিজেকেই লেখতে দেখা যায়। গল্পের এলিমেন্ট কিংবা ইন্সপিরেশন কোথা থেকে পান?

ভিকি জাহেদ: বেসিক্যালি আমি খুব কমফোর্টেবল থাকি যখন নিজের স্ক্রিপ্ট নিয়ে কাজ করি। নিজের স্ক্রিপ্ট নিয়ে কাজ করার সময় আমি ওই গল্পটা ভেতর থেকে ফিল করি, সেই গল্পটা আমি ধারণ করতে পারি। আমার নিজের গল্প যেহেতু তাই ওটা ধারন করাও সহজ হয়। আমি যখন গল্পটা সহজে ভেতরে ধারন করতে পারি তখন আমার কাছে ওটা নিয়ে কাজ করতেও সহজ হয়। তবে আরেকজনের গল্পটা নিয়ে কাজ করার সময়, সে একরকম ভেবে গল্পটা লিখেছিল আমি সেটা ধারন করার পর গল্পটা অন্যরকম হয়ে যাবে। আমার কাছে কেনজানি মনে হয় এতে কোথাওজানি কিছু একটা মিসিং কয়ে যায়। এটা আমার কাছে পার্সোনাল অবজার্ভেসন। অনেকেই অন্য গল্প নিয়ে বেশ ভালো-ভালো সব কাজ করেছেন। কিন্তু আমি খুব কম্ফোর্ট ফিল করি নিজের স্ক্রিপ্ট নিয়ে কাজ করতে। খুব কম্পেলেক্স কিছু না একদম সিম্পল একটা স্টোরিলাইন থাকবে আমার নিজের গল্পে। প্রেজেনটেশনটা এমনভাবে হবে যাতে দর্শক ডিফারেন্ট কিছু পায়। মোমেন্ট, মায়া এমন কিছু কাজ যার গল্প ছিলো খুব সাধারন ছিল কিন্তু প্রেজেনটেশনটা এমনভাবে করা হয়েছে যাতে দর্শকদের কাছে ভাল লাগে। যদি অডিয়েন্সকেই ভালোলাগাতে না পারি তবে মেকার হিসেবে আমি ব্যর্থ। ফিল্মটা বানাচ্ছি কার জন্য, অবশ্যই দর্শকের জন্য। ফিল্মটা আমার মত করে বানালাম কিন্তু অডিয়েন্স দেখলোই না তাতে লাভ কি হলো। আমি ফিল করি ফিল্ম সর্বপ্রথম দর্শকের জন্য বানানো উচিৎ হবে।

ডাকপিয়ন২৪: বাংলাদেশের মিডিয়া তরুন নির্মাতাদের জন্য কতটুকু স্পেস দেয়। চ্যালেঞ্জের গল্পগুলো শুনতে চাই।

ভিকি জাহেদ: বাংলাদেশের মিডিয়ায় যে জিনিসটা হয়েছে, সব জায়গাতেই দেখি সিন্ডিকেট। এ জিনিসটা দুঃখজনক হলেও সত্যি। সিনেমার ক্ষেত্রেও আছে এবং টেলিভিশন মিডিয়ার ক্ষেত্রেও আছে। আমাদের নাটকেও আগে একটা ভাল ইন্ডাষ্ট্রি ছিল সেটা কিন্তু অলমোস্ট ধ্বংসের পথে। টিভিতে নাটক এখন কেউ দেখেনা। আগে কিন্তু সবাই নাটক দেখতো, ব্যবসায়ীরা তাদের দোকানপাট বন্ধ করে নাটক দেখতে বসে যেতো। এখন নতুন করে যেটা দেখা শুরু হচ্ছে সেটা হলো শর্টফিল্ম। ফিউচারে দুইটা জিনিস থাকবে সেটা হলো একটা সিনেমা হল, আরেকটা মোবাইল স্ক্রিন, মোবাইল, ল্যাপটপ, কম্পিউটার ইত্যাদি এগুলো আরকি। নাটক বা টেলিভিশন আমার মনেহয় বাদ হয়ে যাবে। সেই ক্ষেত্রে আরেকটা চ্যালেঞ্জ বেড়ে গেলো। ডিজিটালের ব্যাপ্তিটাই এখন বড়, সারাদিন আমরা ফেসবুকে থাকি কিংবা ইউটিউবে থাকি। সারাদিনই কিছুনা কিছু ভিডিও আমরা দেখি এইসব মাধ্যম দিয়ে। সেক্ষেত্রে আপনি যদি একটা ভাল কাজ করেন আর সেটা যদি মানুষের নজরে পড়ে তাহলে মানুষই আপনাকে পরিচিত করে দেবে।

ডাকপিয়ন২৪: নতুন ফিল্মমেকারদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ কোনটি?

ভিকি জাহেদ: আমরা ‘সময়’ কে কেউ সিরিয়াস নেই না। ফিল্মমেকিংকে অনেকেই মনে করে মজার একটা কাজ, এন্টারটেইনমেন্টের একটা কাজ, সিরিয়াস কিছু না। এটা কিন্তু ঠিক না। আপনি যেমন ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্য পড়াশোনা করেন, পরিশ্রম করেন। তেমনি ফিল্ম মিডিয়াতে ওরকম পরিশ্রম করতে হবে। টোটাল বিষয়টাকেই সিরিয়াসলি নিতে হবে। ফিল্মমেকারের জন্য ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার লেভেলের পরিশ্রম করতে হবে। আমাদের ইয়ং জেনারেশন ডিরেক্টর হতে চায়, নায়ক হতে চায়। এগুলো হলে তাদের অনেক ফলোয়ার থাকবে। আসল বিষয়টা কি সেটাই তারা ভুলে বসে থাকে। এই লাইনে থাকতে হলে এই বিদ্যাটা প্রথমে ভালভাবে আয়ত্বে আনতে হবে। আপনি যদি ভালমত ডাক্তারি না পড়েন তাহলে ভাল ডাক্তার হবেননা, ঠিক তেমনভাবেই ভাল মানের ফিল্মমেকার হওয়ার জন্য বেশ প্রস্তুতি প্রয়োজন। পড়াশোনা করতে হবে, ফিল্ম দেখতে হবে, নিজেকে ভেতর থেকে রেডি করতে হবে। এই প্রিপারেশন এর উপর ইয়াং যারা আছে তাদের অনেক বেশি জোর দেওয়া উচিত। শিক্ষার কোন শেষ নাই, যত বেশি শেখা যাবে, তত বেশী ভাল।

10

নতুন নির্মাতা উৎসবে বক্তব্যরত ভিকি

ডাকপিয়ন২৪: বাংলাদেশের সিনেমা নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী?

ভিকি জাহেদ: ২০১৫-১৬ এই দুইটা বছর আমাকে নতুন করে আশা দিচ্ছে। ভাল অনেক ছবি হয়েছে এই সময়টাতে। আয়নাবাজী তো একেবারে প্রুভেন একটা ছবি। আমি অনেক হ্যাপি। যেমনটা আমি বলছিলাম যদি কন্টেন্ট ভাল হয় এবং একটা ক্লিয়ার পিকচার যদি আপনি দিতে পারেন যেটা মানুষের জীবনের সাথে মিলে যাবে তবে সেই ছবি মানুষ দেখবেই। আয়নাবাজি দেখে আমারও মনে হয়েছে আমাদের পুরান ঢাকা এলাকায় এমন ছেলে আছে। এ দিয়ে আবারও অমিতাভ রেজা প্রমান করলেন যদি আপনার গল্পটা রিলেট করতে পারেন মানুষের জীবনের সাথে, নায়ক নায়িকা ফ্যাক্ট না, বাজেট ফ্যাক্টনা। আপনি ইজিলি সুপারহিট একটা সিনেমা বানাইতে পারবেন। আমি সবসময় একটা কথা বলি, ‘কন্টেন্ট ইজ দ্য কিং!

ডাকপিয়ন২৪: নতুন যারা নির্মানে আগ্রহী, তাদের প্রতি আপনার টিপসগুলো কি কি থাকবে?

ভিকি জাহেদ: নিজেকে রেডি করতে হবে। একটা ফিল্ম বানানোর আগে শর্টফিল্ম বা যেটাই হোক নিজেকে সেসব দিয়ে প্রস্তুত করতে হবে। আর নিজের সাথে নিজে ধোকাবাজি করা যাবেনা। নিজের কাছে নিজে অনেস্ট থাকতে হবে। পড়াশোনা করতে হবে ফিল্ম নিয়ে, প্রচুর পরিমানে মুভি দেখতে হবে। আর ওই, ‘কন্টেন্ট’ নিয়ে কাজ করতে হবে। কেউ যদি মনে করে জোয়ারে গা ভাসিয়ে যাবে হিরো আলম টাইপ কিছু করে, তবে সেটা কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে। মানুষ কিন্তু আর তাকে মনে রাখবেনা। শর্ট টাইমের টেন্ডেসি ছেড়ে লং টাইমের কথা চিন্তা করতে হবে। ওই অনুয়ায়ী নিজেকে প্রিপিয়ার করতে হবে। ইউটিউবে অনেক ভিডিও আছে, টিউটেরিয়াল আছে সেগুলো দেখুন, বই পড়ার অভ্যাস করুন আর ভাল সিনেমা দেখুন, বাংলা সিনেমা দেখুন।

ডাকপিয়ন২৪: সামনে আর কি কাজ আসছে?

ভিকি জাহেদ: সামনে ডিসেম্বরে ইনশাআল্লাহ আমার নতুন একটা স্বল্পদৈর্ঘ্য আসবে যেটার প্রি-প্রডাকশন চলছে এখন। ডিসেম্বর যে কাজটা আসবে, এ বছরে এটাই শেষ কাজ। সবার দোয়া চাইছি।

সম্পর্কিত সংবাদ
মোঃ রায়হানুল হক (রুবেল)