ফ্রেমে বাঁধাই করা পুরনো ঢাকার দুর্লভ ছবি

ফ্রেমে বাঁধাই করা পুরনো ঢাকার দুর্লভ ছবি

ঢাকা শহর আজ থেকে একশো-দেড়শ বছর পূর্বে কেমন ছিল। বিশেষত এই প্রিয় ঢাকা মহানগরীর চারপাশটা কি এমন আকাশচুম্বী দালানকোঠা আর ধূলিমলিন বিষণ্ণ ডিজেলের গন্ধেভরা ছিল? তখনকার দিনে ঢাকা শহর কেমন ছিল ছবি দেখে কিছুটা হলেও আঁচ করা যায়।

তাই আমরা ঢাকার যে ছবিগুলো দেখব সেই ছবিগুলোর কিছু চার্লস ডয়েলের আঁকা ১৮০৮-১৮১১ সালের দিকে। পরবর্তীতে ১৮১৪ এবং ১৮২৭ সালে “The Antiquities of Dacca” নামে চারটি ভলিউম আকারে প্রকাশ পায় ছবিগুলো। ১৯০৪ সালে ভাইসরয় লর্ড কার্জনের এক ফটোগ্রাফার, ফ্রিটজ ক্যাপ ঢাকার আরো কিছু অতি মুল্যবান ছবি তোলেন। কিছু আবার ব্রিটিশ লাইব্রেরির সত্তাধীন।

ফ্রেমে বাঁধাই করা পুরনো ঢাকার দুর্লভ ছবিগুলো নিয়ে ডাকপিয়ন২৪ পাঠকদের জন্য রইলও কিছু অজানা তথ্য-

লালবাগ কেল্লা

লালবাগ কেল্লা মোঘল সাম্রাজ্যের অন্যতম নিদর্শন। এটা যতটা না সামরিক কাজে ব্যবহৃত হত তার চেয়ে বেশি ব্যবহৃত হত মোঘল নবাবদের বাগানবাড়ি বা অবকাশযাপনকেন্দ্র হিসেবে। ১৬৭৮ সালে সুলতান মোহাম্মদ আজমের শাসনামলে সুবেদার শায়েস্তা খাঁর তত্ত্বাবধানে লালবাগ কেল্লার নির্মাণ কাজ শুরু হয়। কথিত আছে যে, ১৬৮৪ সালে সুবেদার শায়েস্তা খাঁর আদরের কন্যা ইরান-দুখত (পরীবিবি) এর মৃত্যুতে খাঁ প্রচন্ড কষ্ট পান এবং অবিলম্বে এই দুর্গের নির্মাণ বন্ধ করে দেন এবং এর অভ্যন্তরে তিনি পরীবিবির কবর স্থাপন করেন যা পরীবিবির মাজার নামে পরিচিত।

1

চার্লস ডয়েলের পেইন্টিং। লালবাগ কেল্লার পাশ দিয়ে বুড়িগঙ্গা নদী প্রবাহমান। এবং ছবিটিতে ১৮৭০ সালে কেল্লার দক্ষিণাংশের একটি ফটক দেখানো হয়েছে।

2

অতঃপর ১৯০৪ সালে ফ্রিটজ ক্যাপের ধারণকৃত ছবি

3

পরীবিবির মাজার

4

বর্তমানের লালবাগ কেল্লা

5

মার্বেল পাথরে তৈরি পরীবিবির মাজার

6

ঢাকার লালবাগ কেল্লার এই ছবিটি ১৮৮০ সালে তোলা । এই ছবিটিও নেয়া হয়েছে আর্কিটেক্চারাল ভিউ অব ঢাকা থেকে। এখানে পরীবিবির সমাধি সৌধ দেখা যাচ্ছে।

রমনা পার্ক

পহেলা বৈশাখ মানেই পান্তা ইলিশ আর রমনার বটমূলে বসে বৈশাখী গান শোনা, মাটির পুতুল, কাঁচের চুডির রুমুঝুম। আবার বই মেলা হলে রমনার প্রাঙ্গণ সারা দেশের মানুষের বই তৃষ্ণা মেটায়। কেমন ছিল এখনকার এই সুশোভিত আনন্দউদ্যানটি?

8

রমনা গেইট থেকে রেসকোর্স শিরোনামের ছবিটি তোলা হয়েছিল ১৮৭০ সালে। এর চিত্রগ্রাহক সম্পর্কে জানা যায় নি। ছবিটিতে কয়েকটি হাতি দেখা যাচ্ছে।

চক বাজার

পুরান ঢাকার ইফতারি মানে চক বাজারের ইফতারি। পুরো রমজানে একবার হলেও চক বাজারে ঢুঁ মেরে আসতে হয় নগরবাসীর। হরেক রকমের লোভনীয় খাবারের আখড়া এই চক বাজার। কিন্তু এই চক বাজারেই এক সময় ক্রীতদাস কেনা বেচা হত। মোঘল আমলে এটা ছিল দাস ব্যবসা এবং লোকজনের আড্ডার কেন্দবিন্দু।

10

১৯০৪ সালে চক বাজার মোড়, বর্তমান নাজিমুদ্দিন সড়ক

9

ঢাকার চক বাজারের এই ছবিটি ১৮৮০ সালে তোল এবং এই ছবিটিও নেয়া হয়েছে আর্কিটেক্চারাল ভিউ অব ঢাকা গ্রন্থ থেকে। এই ছবিটি ব্রিটিশ ঢাকার বাজার এলাকার চিত্রকে প্রতিনিধিত্ব করে।

ঢাকা কলেজ

অনেক ইতিহাসে সাক্ষী এই ঢাকা কলেজ। ১৮৪১ সালে উপমহাদেশের প্রথম আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এই ঢাকা কলেজ। হিন্দু কলেজের শিক্ষক এবং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জে. আয়ারল্যান্ড ঢাকা কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ। বর্তমানে ঢাকা কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পাঠ্যক্রমের সঙ্গে সঙ্গে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ১৯টি বিষয়ে শিক্ষাদান কার্যক্রম চালু রয়েছে। ছাত্রদের জন্য ঢাকা কলেজে সাতটি ছাত্রাবাস আছে।

11

১৯০৪ সালে ঢাকা কলেজ

12

ছবিটির বাম পাশের ভবন টি ঢাকা কলেজের (পুরাতন) এবং ডান পাশের ভবন টি কোর্ট ভবন (পুরাতন) । ছবিটি ১৮৭০ সালে তোলা। এই দুইটি ভবনই ১৯৮৫ সালে ভেঙ্গে ফেলা হয়।

ঢাকেশ্বরী মন্দির

ঢাকেশ্বরী মন্দিরের নির্মাণশৈলী দেখে ধারণা করা হয় যে এটা পূর্বে একটি বৌদ্ধ মন্দির ছিল। পরবর্তীতে যা রুপান্তরিত হয় হিন্দু মন্দিরে। উনিশ শতকের শেষের দিকে মন্দিরটি সম্পূর্ণ জঙ্গলাকীর্ণ ছিল এবং রক্ষণবেক্ষন ও উপাসনার জন্য কোন পুরোহিত ছিল না।

13

১৯০৪ সালে ঢাকেশ্বরী মন্দির

মিটফোর্ড হসপিটাল (সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ)

১৮২০ সালে ঢাকা কালেক্টর স্যার রবার্ট মিটফোর্ড বুড়িগঙ্গার তীরে এই হাসপাতালটি তৈরির উদ্যোগ নেন। ঢাকায় কলেরার ব্যাপক মহামারী দেখে তিনি অত্যন্ত ব্যাথিত হন এবং এই মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। মুলত ১৯৬২ সালে এটি মেডিকেল কলেজের রুপ নেয় এবং ঢাকার নবাবদের দানশীলতার প্রতি সম্মান জানিয়ে পরবর্তীতে এর নাম “স্যার সলিমুল্লাহ মেডকেল কলেজ” রাখা হয়।

14

15

16

তেজগাঁও এলাকা, ১৮৮০

17

সাসপেন্সন ব্রিজের এই ছবিটিও নেয়া হয়েছে আর্কিটেক্চারাল ভিউ অব ঢাকা গ্রন্থ থেকে । এই ব্রিজটি নির্মিত হয়েছিল ১৮৩০ সালে এবং এই ছবিটি তোলা হয় ১৮৮০ সালে।

সেইন্ট থমাস চার্চ

প্রায় ২০০ বছর আগের পুরোন এই চার্চ পুরান ঢাকার অন্যতম নিদর্শন। ১৮৬৩ সালে বিখ্যাত ঘড়ি নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান “বিগ বেন” এর একটি ঘড়ি এই চার্চের চূড়ায় স্থাপন করা হয় যাতে পুরান ঢাকাবাসী এই ঘড়ি দেখতে পায়। এরকম ঘড়ি এই মুহূর্তে পৃথিবীতে মাত্র দুটি আছে। অপরটি লন্ডনের হাউস অব পার্লামেন্ট এর চুড়ায় অবস্থিত।

 

18

সেইন্ট থমাস চার্চ, ঢাকা, ১৮৭২

নারিন্দা খ্রিষ্টীয় কবরস্থান

সম্ভবত সতেরো শতকের প্রথম দিকে এই কবরস্থানটি গড়ে উঠে। এর সবচেয়ে পুরাতন এপিটাফটি ১৭২৫ সালের। কারণ তখন থেকেই ঢাকায় পর্তুগিজদের আগমন ঘটেছিল। এখানে খ্রিষ্ট সম্প্রদায়ের জন্য এই সমাধিভূমির পাশেই ঢাকার প্রথম গির্জা প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর অবস্থান ওয়ারীতে বলধা গার্ডেনের বিপরীতে রাস্তার ওপারে।

19

নারিন্দার খ্রিষ্টান সিমেট্রির এই ছবিটি তোলা হয়েছে ১৮৭০ সালে। এর চিত্র গ্রাহক কে, তা জানা যায় নি। এখানে সমাধি সৌধের নাম ফলকের পাথর দেখানো হয়েছে।

20

নারিন্দা খ্রিষ্টীয় কবরস্থান, ১৮৭৫

21

টঙ্গীর লোহার পুলের এই ছবিটি নেয়া হয়েছে Johnston ও Hoffman এর আর্কিটেক্চারাল ভিউ অব ঢাকা নামক একটি বই থেকে। এই ছবিটি ১৮৮০ সালে তোলা।

22

এটি একটি ব্রিজের ধ্বংসাবশেষ। এটি টঙ্গীর লোহার পুলের পাশে অবস্থিত ছিল। ছবিতে লোহার পুলও দেখা যাচ্ছে। এই ছবিটি একটি ব্রিজের কয়েকটি ভাঙ্গা পিলার দেখা যাচ্ছে। ছবিটি আর্কিটেক্চারাল ভিউ অব ঢাকা থেকে নেয়া হয়েছে। ছবিটি ১৮৮০ সালে তোলা হয়েছে।

23

পিলখানা এলাকায় হাতির পালের দৌড়, ১৮৯৫-১৯০০

24

ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদী । ছবিটি ১৮৮০ সালে তোলা, আর্কিটেক্চারাল ভিউ অব ঢাকা থেকে নেয়া হয়েছে। ছবিতে নদী তীরবর্তী একটি হিন্দু মন্দির দেখা যাচ্ছে।

25

আর্কিটেক্চারাল ভিউ অব ঢাকা গ্রন্থের ১৩ তম সংষ্করণ থেকে এই ছবিটি নেয়া হয়েছে। ছবিটি ১৮৮০ সালে তোলা।

26

হিন্দু মন্দির, ১৮৮০

27

সোনারগাঁয়ের ময়ূরপঙ্খী খালের উপর নির্মিত একটি ব্রিজের এই ছিবিটি ১৮৭০ সালে তোলা। এর চিত্রগ্রাহক সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় নি। এই ব্রিজের অবস্থান সম্পর্কে বিতর্ক রয়েছে। অনেকে মনে করেন এটি ঢাকার কোন এক খালের উপর নির্মিত ছিল, আবার অনেকে মনে করেন এটি সোনারগাঁয়ে নির্মিত ছিল। তবে অধিকাংই মনে করেন এটি সোনারগাঁয়ের ময়ূর পঙ্খী খালের উপর নির্মিত । তবে এই ব্রিজটির অবস্থান কোথায় তা এখনো সনাক্ত করা যায় নি।

28

গেন্ডারিয়ার মিল বিল্ডিং এর এই ছবিটি ১৮৭০ সালে তোলা হয়েছে। এর চিত্র গ্রাহক সম্পর্কেও জানা যায় নি।

29

এই ছবিটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর কুটি’র একটি ছবি। এই কুটিটি সোনারগাঁও এর পানামে অবস্থিত। ছবিটি ১৮৭২ সালে তোলা হয়েছে। এর চিত্রগ্রাহক W. Brennand ছবিটি বর্তমানে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে । সোনারগাঁও একসময় মসলিনের জন্য বিখ্যাত ছিল, এই কারণে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী এখানে একটি কুটি স্থাপন করেন। জেমস্ ওয়াইজের বর্ণনায়ও এই কুটি’র কথা উল্লেখ রয়েছে।

30

এই ছবিটি তোলা হয়েছিল ১৮৭০ সালে, এর চিত্রগ্রাহক সম্পর্কেও জানা যায় নি। ১৬০৮ সাল পর্যন্ত সোনারগাঁও পূর্ব বাংলার রাজধানী ছিল। মোঘল সুবাদার ইসলাম খান ১৬১০ সালে সোনারগাঁও হতে রাজধানী ঢাকাতে স্থানান্তরিত করেন।

31

এটি ঢাকা হতে ৫ মাই দুরে অবস্থিত। ছবিটি ১৮৭০ সালে তোলা হয়েছিল তবে এর ফটোগ্রাফারের নাম জানা যায় নি। এটি নির্মিত হয়েছিল ১৭ শতকে, যখন ঢাকা মোঘলদের অধীনে ছিল। মোঘল শাসকগণ ঢাকায় অনেক পুল (ব্রীজ) নির্মান করেছিল, এটি ছিল সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। আবহাওয়া বা পরিবেশ গত কারণে এই ব্রীজের গুলোর অধিকাংশই ধ্বংস হয়ে যায়।

32

মাহামুদ মসজিদ, ১৮৮০ সালের তোলা একটি ছবি। এই ছবিটি সংগ্রহ করা হয়েছে আর্কিটেক্চারাল ভিউ অব ঢাকা ১৩ তম সংস্করণ থেকে।

33

পুরানা পল্টন, ১৮৭৫

34

ঢাকার অজানা কোন গলি, ১৮৭২

35

ঢাকার কাছাকাছি কোন এক স্থানের ছবি, ১৮৮০

36

চাঁদনী চক (জুম্মা মসজিদ থেকে তোলা), ১৮৭০

সম্পর্কিত সংবাদ
মোঃ রায়হানুল হক (রুবেল)