তলস্তয়ের ‘পুনরুজ্জীবন’

তলস্তয়ের ‘পুনরুজ্জীবন’

হামিম কামাল, অতিথি লেখক

।এক।

শিব যখন কৃষকের দেবতা, তখন ধান ভানতে ভানতে তার গান গাইলে ক্ষতি কী। তলস্তয়ের ধ্রুপদী উপন্যাস ‘পুনরুজ্জীবন’ নিয়ে বলতে বসে আমি কোনো বিরস ইতিহাস, কাঠামো, গভীরতা নিয়ে আলাপ করব না। মূলত আলাপ করবো তলস্তয়ের মন নিয়ে। অর্থাৎ আমি মূলত শিবের গানই গাইব। তবে ফাঁকে ফাঁকে চলবে ধান ভানা।

যদি বলি তলস্তয় প্রাজ্ঞ নন, চমকে উঠবেন? শেষাব্দি শুনলে হয়ত চমকাবেন না, বরং এমনও হতে পারে বিচারসীমা আমার মতোই বদলে নেবেন।আমার বিচারে তলস্তয়স্বয়ং প্রজ্ঞা। এই প্রজ্ঞার যে দর্শন, তা প্রাজ্ঞ দর্শন। ‘পুনরুজ্জীবন’ উপন্যাসটি তলস্তয়ের সেই প্রাজ্ঞ দর্শনের প্রায় নিখুঁত প্রক্ষেপণ।

নিজ নিজ দর্শনের বিশেষ এক বা একাধিক তল সাধারণত লেখকরা দেখাতে চান। প্রক্ষেপণে তার পুরোটা দেখানো সম্ভব কী আর হয়? দৃশ্যের অনুবাদে যে আড়ক্ষতি আছে, যেটুকু অংশ হারানো অনিবার্য, মনের অনুবাদক অর্থাৎ লেখকের সাধ্য নেইতা এড়ান। মূল্যবোধ আর বাস্তবতার এক ধরনের মানক্ষয়ী আর মনক্ষয়ী লড়াই আছে। এ লড়াই চলছে প্রতিনিয়ত, প্রতিটি মানুষের ভেতর। ধ্রুবএ লড়াই পুনরুজ্জীবন উপন্যাসটির পাতায় পাতায় এতোটাই উপস্থিত, যখন ওল্টাবেন, দেখবেন আঙুলে ঘামরক্ত লেগে গেছে। কারাগারের গোটা প্রক্রিয়ার সঙ্গে, জারতন্ত্রের অনৈতিকতার এই সুতিকাগারের সঙ্গে কোনো একা লোকের লড়াইয়ের এমন ছবি সাহিত্যে দুর্লভ। তলস্তয়ের সমকালীন আর কারো হাতে কি আঁকা হয়েছে? জানি না। তলস্তয় আঁকার পর হয়ত আর প্রয়োজন হয়নি।
তলস্তয় মনন কল্পনা করতে গিয়ে আমার সামনে আরও কতগুলো নাম বুদবুদের মতো ভেসে উঠছে। বুদবুদের ধর্ম হলো ফেঁপে উঠে গোলাকার তল-বর্ণালীর বাহার দেখিয়ে ফট করে ফেটে যাওয়া। অস্তিত্বটির স্মৃতি এরপর ভাবজগতে গিয়ে জমে। বস্তুজগতে দৃশ্যমান কোনো প্রমাণ থাকে না। ওই স্মৃতির ওপরই মত গড়ে ওঠে। তাই মতের বাস্তব প্রমাণ পরিবেশে সবসময় নাও মিলতে পারে, যেমন বুদবুদ ফেটে যাওয়ার পর মেলে না তার উপস্থিতির প্রমাণ। কিন্তু মেলা আর না-মেলার সম্পর্কটা তাই বলে মিথ্যা হয়ে যায় না। ওই সত্যের সূত্র ধরেই বলছি, তলস্তয়ের লেখায় অতীত ও বর্তমান ইতিহাসের যে মহাকা্ব্যিক গদ্যায়ন ঘটেছে, রাশিয়ায় তার উত্তরসুরী মিখাইল শলোখভ। কিন্তু দুজনের গদ্যায়নের অলৌকিক ঘোড়া আবার এক পথে হাঁটে না।
তলস্তয়ের লেখায় কিন্তু এক ধরনের ভাববাদী বিপ্লব ঘটে। যে বিপ্লব মহাত্মার মতো ব্যক্তিত্বকে আকৃষ্ট করেছিল। অথচ তলস্তয়ের ভাববাদ আর গান্ধীর ভাববাদও এক ছিল না। বিষয়গুলো এমন। সম্পর্কসুতো অদৃশ্য, তবে আছে।
দুজনের ভাব সমান্তরাল ছিল, যারা পাশাপাশি চলবে। কিন্তু কখনো কেউ কারো মুখোমুখি হবে না। তলস্তয়ের ওই ভাববাদের সঙ্গে বরং শলোখভ, গোর্কি, মানিকদের বস্তুবাদময় বক্ররেখার বারবার দেখা হয়ে গেছে। এটা আমার ব্যক্তিগত ধারণা। এর ফল কী দাঁড়িয়েছে তা পরে বলছি।
তলস্তয়ের ভাববাদের সঙ্গে রাবিন্দ্রিক ভাববাদের বাহ্যিক মিল আছে। কিন্তু ভেতরকার মিল অনুপস্থিত। বাহ্যিক মিল এদিক থেকে যে- তাঁরা দুজনই ‘ঈশ্বরের’ স্তব করেছেন। তবে কথা আছে। রাবিন্দ্রিক ভাববাদে স্তব কোনো অধরা বুদ্ধিমত্তার প্রতি উৎসর্গিত হয়েছে। আর তলস্তয় স্তব করেছেন অন্তরের শুভশক্তির। ওই শুভশক্তিকেই তিনি ঈশ্বর জানতেন। কোনো অধরা বুদ্ধিমত্তাকে নয়। পার্থক্যটা এখানে।
আমি একেবারেই ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ থেকে খুব সাবধানী হয়ে বলছি এ কথা। গোর্কির ‘আমার সাহিত্য জীবন’ নামে যে বইটি মেহের কবিরের অনুবাদে বাংলা একাডেমি থেকে বেরিয়েছে, সেটিতে তলস্তয়ের সঙ্গে তার বহু অন্তরঙ্গ মুহূর্তের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে একান্ত কথোপকথনে যুগপৎ শান্ত ও ক্ষ্যাপা এক তলস্তয়কে দেখতে পাওয়া যায়, যাকে আমি আর পাইনি। আরও দেখতে পাওয়া যায় এক অবিশ্বাসী তলস্তয়কে। হ্যাঁ। এটি কিন্তু সাধারণ তলস্তয়-পাঠকের ভাবনারও অতীত। কেন ভাবনার অতীত হতে পারলো? কারণ তলস্তয় প্রচলিত ঈশ্বরের প্রতি অবিশ্বাসকে মানুষের বোধগম্য ঐশ্বরিকতার রূপ দিয়েছেন। ওই যে বললেন- অন্তরের শুভশক্তিই ঈশ্বর। বৈকুণ্ঠ তোমার হৃদয়ে। এ পথেই এটা সম্ভব হয়েছে।
তাই বলতে পারি, তলস্তয়ের যে ভাববাদ, সেটিই শেষপর্যন্ত আমার মনের বিচারে বিজয়ী হয়েছে।
এই যে ছোট ছোট বুদবুদ-ভাবনা, ফেটে গিয়ে স্মৃতিতে জমে যে মত তৈরি করেছে, ওই মতে আসবার পথে তলস্তয়ের পুনরুজ্জীবন উপন্যাসের যেমন ভূমিকা আছে, তেমনই পুনরুজ্জীবনকে বিচারের ক্ষেত্রেও সেই মত ভূমিকা রেখেছে।
পুনরুজ্জীবনের প্রধান চরিত্র নেখলিউদভ সম্পর্কে দু’কথা বলার আগে আরও একটু পথ ঘুরে আসি। মার্কিন প্রযুক্তিগুরু স্টিভ জবসের একটি কথা হচ্ছে এমন- যে ‘পাগলরা’ ভাবে পৃথিবীকে একদিন বদলে দেবে, বদলটা ঘটিয়ে দিতে তারাই কেবল পারে। বাস্তব উদাহরণ হিসেবে আমি মহাত্মার কথা এজন্যে আনতে পারি যে ব্রত ধরে রাখার যে অমিত শক্তি বাস্তবের এই চরিত্রটির মধ্যে আমি পেয়েছি, উপন্যাসের কাল্পনিক চরিত্রকেও মহাশক্তিধর লেখক এমন করে তুলবার আগ্রহ দেখাতে উৎসাহ পান না। কেন উৎসাহ পান না? কারণ, যদি পেতেন, তো মানুষের ভালোর জন্য লেখা লেখাটি পড়ে মানুষ নিজেই ঠাট্টা করে বলতো, ‘ধুর, এমন হয় নাকি! যতো সব গাঁজাখুরি।’
নেখলিউদভও বাধ্য হয়ে তাই দাঁড়িয়েছে ঠিক তেমনই এক চরিত্র হয়ে, একেবারেই সাধারণ বাস্তবতার চরিত্রটি হয়ে, যার ভেতর যেটুকুও বা অসাধারণত্ব, সেটুকুও পরিশীলিত পার্থিব। কোনো বাড়াবাড়ি নেই। এজন্যেই ওই অসাধারণত্বের শুরুও আছে, শেষও আছে। আর আছে বলেই সমাজের ওপর নেখলিউদভের চূড়ান্ত প্রভাবটি শেষমেষ কী দাঁড়াল, মানে নেভলিউদভকে তৈরি করে কী লাভ হলো, এমন প্রশ্নের কোনো সন্তোষজনক উত্তর আমি পাইনি। এক শেষ যেন আরেক শেষকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। তবে পুরোপুরি নিঃশেষ কী আর হয়? দ্বিতীয় অংশে সে আলোচনা করছি।

।দুই।

লেখকরা চায় মানুষ প্রতিনিয়ত আনন্দপাঠের ভেতর দিয়ে যাক। যাপন করুক। কারণ চরিত্র নয়, চরিত্রের সঙ্গে যাপনই মানুষকে বদলায়।
অভিজাত পরিবারের এক ভোগবাদী তরুণ তার জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে কী করে ত্যাগী, মানবিক যুবক হয়ে উঠল, তার সেই ব্যক্তিগত অভিযাত্রার মধ্য দিয়ে পাঠকের অভিযাত্রাটি জরুরি। কাতিউশাকেও নিজের মতো করে ভালোবাসা চাই। গর্ভবতী কাতিউশা প্রতারক নেখলিউদভের ট্রেনের জানালার পাশে দৌড়ুতে দৌড়ুতে একসময় থেমে গিয়ে কী তীব্র ব্যথায় কুঁকড়ে কাঁদতে শুরু করল! মানুষ তা আপন যাপনে অনুধাবন করুক। প্রয়োজন আছে। অতীত প্রেমের যেটুকু শ্রদ্ধার অবশেষ সেটুকুর সঙ্গে করুণা মিশিয়ে এক ধরনের ত্যাগযোগ্য আবেগ নেখলিউদভের জন্য কাতিউশা তৈরি করেছিল। ওই অনুভূতি তৈরির মানবিক প্রক্রিয়াটি কী- সেটিও যাপন করে জানা চাই। তা হলে ব্যক্তিগত সম্পর্কযাপন সংক্রান্ত অনেক ধারাল প্রশ্নের উত্তর মিলতে বাধ্য।
আমার ক্ষেত্রে কী হয়েছে তা বলি। এ উপন্যাসের ভাবজর্জর মূল চরিত্র দুটিকে আমি ভালোও বাসতে পারিনি, আবার ঘৃণাও করতে পারিনি। এর মধ্যবর্তী এক বিপুলা জগতে তাদের রেখেছি আমি। আর এদিকটি থেকে এ উপন্যাস নিরেট বাস্তবতার দিকে মুখ করে আছে। এমন বাস্তব অভিযানের আলো আমাকে আরো অনেক গুরুস্থানীয় লেখক দিয়েছেন। কিন্তু, অভিনব একটি দিকে আলো আমার ফেলতেই হচ্ছে, যে আলোর উৎসটি তলস্তয়ের হাতে।
যখন পুনরুজ্জীবন পড়ছি, চোখ বুজলেই দেখতে পেতাম অগণিত কয়েদির সারি। তাদের দু’পাশে উৎসুক, করুণাকাতর, নিন্দারত জনতা। দু’পাশে সেই জনতাকে রেখে লোকালয়ের ভেতর দিয়ে ওরা হাজারে হাজারে জীবন্মৃতের মতো হেঁটে যাচ্ছে। তাদের হাতের পায়ের শেকলে শব্দ বাজছে ঝন-ঝনাৎ ঝনাৎ-ঝনাৎ ঝন-ঝনাৎ ঝন। পায়ের আঘাতে মাটি থেকে উড়ছে ধুলোর মেঘ, অশেষ শ্রমক্লান্ত একেকজন মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে, বেঘোরে মরছে। টের পেলেই পুলিশ অশেষ ঘৃণায় শেকলছিন্ন করে পথের পাশে ছুড়ে রাখছে তাদের দেহ, মরদেহ। কাঁপছি। সুতরাং অল্পের ওপর বলাই ভালো। বাস্তবতার এমন পরাবাস্তব দৃশ্য পাঠককে স্বপ্নে তাড়া করা চাই।
অনেকেই বলেছেন পুনরুজ্জীবন শেষতক বাইবেলীয় মূল্যবোধের দিকে মোড় নিয়ে, বাইবেলের ছায়ায় আশ্রয় নিয়ে সমাধান খুঁজেছে। আমি বলব, থামুন, দুটো কথা আছে জনাব। তখনকার অর্থোডক্স সমাজের প্রতি তলস্তয় যে দায় অনুভব করেছেন, সে দায় যেমন করে মিটতে পারে বলে তিনি মনে করেছেন, তা আপনি মনে করতে পারছেন না। ফাঁকটুকু ওখানটায়। ওই যে, অবিশ্বাসের ঐশ্বরিক প্রকাশ, ওই কৌশলটিই তিনি প্রয়োগ করেছেন এখানে, বোধ করি। আজ তলস্তয় বেঁচে নেই। থাকলে জানা যেত। গুরু, প্রয়োজনবোধে স্বপ্নে দেখা দিন!
বাইবেলীয় ওই মানবিক মূল্যবোধ মূলত চিরায়ত মানবিক মূল্যবোধেরই উত্তরসুরী। সবক’টি ধর্মের মানবিক মূল্যবোধই তাই। বহুধা বিভক্ত ধর্মমতগুলো যে মানবধর্মের ছায়াতলে এসে আশ্রয় নিয়েছে, পুষ্টি নিয়েছে, এ সত্য আমি আপনি জানি, আর তলস্তয়ের কাছে আড়াল হয়ে ছিল এ কথা আমাকে মানতে বলেন? টলস্টয় এখানে ছদ্মাবরণে মানবধর্মেরই বিজয় ঘোষণা করেছেন। কৌশলে। এই করণকৌশল অবলম্বন না করলে হয়ত বিপদ হতো।
গুরুচিন্তক তলস্তয় উপন্যাসের শেষে নীতিবোধের নতুন সূর্য তুলে দেননি। বরং একজন সাধারণ মানুষ অসাধারণ হয়ে উঠতে গিয়ে যে পথে ভাবতে পারে তার চিন্তাসূত্রগুলো দিয়েছেন। যে কাঁটা তাকে বিঁধতে পারে তার বেদনাটুকু এঁকেছেন, আক্ষেপ তৈরি করেছেন। নমস্কার।
এই উপন্যাসের ব্যাপারে একান্ত ব্যক্তিগত আরো একটি অনুধাবন আছে আমার। আমার অনুধাবন, বিপ্লবের বহু আগে এ উপন্যাস একটি ভাবী সমাজতন্ত্রী রাশিয়ার পথ পরিষ্কার করেছে। বিপ্লবের বন্ধু হিসেবে ওই অর্থে আলোচিত নন তলস্তয়। যে অর্থে গোর্কি, শলোখভ, অস্ত্রোভস্কি, গাইদার আলোচিত। কিন্তু এই উপন্যাসে তলস্তয়কে আমি শুধু বিপ্লবের সরব বড় বন্ধু হিসেবেই শুধু নয়, অন্যতম সেরা উপদেষ্টা হিসেবেও আবিষ্কার করেছি।
এবার দর্শনবন্ধু অন্য আলাপ। ডিটেলের যে জাদু পুনরুজ্জীবনে আমি পেয়েছি তা ভোলার নয়। মেটে পথ দিয়ে চলতে গিয়ে দোক্কাগাড়িটি বার দুই ঝাঁকুনি খেলো, নৌকার পাটাতনের ওপর ক্লান্ত ঘোড়াগুলো দেহের ভার সামলে পা বদল করলো- দৃশ্যের এসব খুঁটিনাটি মুগ্ধই করে না, একটি বড় বিষয় শেখায়ও বটে। তা হলো, দপ্তর যেটিরই বসুক, দালান স্থায়ী করে দাঁড় করাতে চাইলে একটি ইটের ফাঁকিও দেওয়া চলে না। সেই ফাঁকি শুধু পুনরুজ্জীবনে কেন, একশ বইয়ের কোনোটিতেই দেননি তলস্তয়। দেননি বলেই কখনো পুরনো হলেন না। আর উন্নাসিক সমালোচকের উঁচু নাকের ডগায় টলস্টয়ের মেধার তুলনায় সামান্য উপন্যাস পুনরুজ্জীবনও কালে হয়ে উঠল অন্যতম ধ্রুপদী উপন্যাস।
পুনরুজ্জীবন বইটি প্রকাশ করেছিল প্রগতি (রাদুগা) এবং এর অনুবাদক ছিলেন ক্ষিতীশ রায়। বইটি রুশের পরিবর্তে ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছিল। তাই সম্পাদনার রূঢ় ছাঁকনির ভেতর দিয়ে সেটিকে যেতে হয়েছে। ছাঁকনিটি বোধ করি হাসিমুখেই ধরে ছিলেন প্রাজ্ঞ অরুণ সোম।

সম্পর্কিত সংবাদ
  • Sokal Roy

    দারুন তো

হামিম কামাল