বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড ঢাকার ফুটপাতে 

বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড ঢাকার ফুটপাতে 

তুলনামূলক কম দামে বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের শার্ট, প্যান্ট, ব্যাগ কিংবা জুতা কিনতে চান? একটু চোখ-কান খোলা রেখে ঢাকার নির্দিষ্ট কিছু ফুটপাতে খোঁজ করলেই পেয়ে যেতে পারেন আপনার কাঙ্ক্ষিত পণ্যটি! কিন্তু কিভাবে এসব শত শত ডলারের পণ্য আসছে ফুটপাতে? আবার এসব দামি ব্র্যান্ডের লেবেলের আড়ালে চলছে নকল পণ্যের রমরমা ব্যবসা! অসচেতন ক্রেতামাত্রই ঠকছেন। কিন্তু এসব নকল পণ্যই বা কোথা থেকে আসছে?

অরিন্দম রায়ের বাড়ি দক্ষিণ কলকাতার যাদবপুরে। ব্যবসায়িক কাজে প্রায়ই ঢাকায় আসেন। ঢাকায় রিকশা তাঁর প্রিয় বাহন। সময় পেলেই রিকশা নিয়ে ঢাকার অলিগলি ঘুরে বেড়ান। একদিন তিনি লক্ষ করেন, যে রিকশায় তিনি চড়েছেন, সেই রিকশাওয়ালার পরনে ইউএস পোলো ব্র্যান্ডের একটি গেঞ্জি। গেঞ্জিটা তিনি কোথায় পেয়েছেন—এ প্রশ্ন করলে রিকশাওয়ালা জবাব দেন, পল্টনের ফুটপাত থেকে ২০০ টাকায় কিনেছেন। কেনার সময় গেঞ্জিতে কোনো বোতাম ছিল না, পরে লাগিয়ে নিয়েছেন।

বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের এমন টুটাফাটা গেঞ্জি, শার্ট, প্যান্ট, ব্যাগ কিংবা জুতা ঢাকার ফুটপাতে অহরহ পাওয়া যায়। পল্টন, মিরপুর রোড, বঙ্গবাজার, মতিঝিল, বায়তুল মোকাররম, গুলিস্তান, মিরপুর, উত্তরার ফুটপাতে চোখ রাখলেই হুগো বস, জি স্টার, সাকুর ব্রাদার্স, গ্যাপ, স্প্রিংফিল্ড, লিবার্টি, ভেনিসন, কাপ্পা, মিলানো, ম্যাঙ্গো, বানানা রিপাবলিক, কেন্ডা, ব্রিক, রুকিজ, এবি ব্রোজ, সেলিও, হলিস্টার, এলসিডাব্লিউ, ইডিসি, পার্ক এভিনিউ, টমি হিলফিগার, বারবারি, এফ অ্যান্ড এফ, জ্যাক অ্যান্ড জনস, ডেনিম হাউস, অ্যাম্বারক্রম্বি অ্যান্ড ফিচ, নিউফিল, জারা, কিয়াবি, আরমানি, পুলিশ, ইউনিকল, পিউমা, লিবাইস, আমেরিকান ইগল, কেলভিন ক্লেইন, বেইয়িং হিউম্যান, এইচ অ্যান্ড এম, নেক্স ও রোনাল্ড জে ট্রাম্পসের বিভিন্ন পোশাক, জুতা, ব্যাগ ও ব্যাকপ্যাক পাওয়া যায়। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, নগরীর ফুটপাত থেকে শুরু করে ছোটখাটো পোশাকের দোকান ও টংঘরে জার্মানির খ্যাতনামা ব্র্যান্ড হুগো বস, ডাজ ভিক্তিক জি স্টার, আমেরিকান কেলভিন ক্লেইন, ফ্রান্সের সেলিওসহ অনেক বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের পোশাক-আশাকের একটি মার্কেট গড়ে উঠেছে ঢাকায়।

ব্যাংক কর্মকর্তা হায়দার রশিদ বলেন, ‘বাংলাদেশের গার্মেন্টে তৈরি বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের পোশাক কেনা আমার নেশা হয়ে গেছে। আমার সংগ্রহে এ ধরনের শতাধিক শার্ট, প্যান্ট, গেঞ্জি, ব্যাকপ্যাক, ব্যাগ ও জুতা রয়েছে। আমি পাঁচ হাজার টাকায় হুগো বসের এক জোড়া জুতা কিনেছি, যা আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি হয় ৫০০ ডলারে। বাংলাদেশে তৈরি না হলে কখনো আমার পক্ষে এত বড় ব্র্যান্ডের জুতা পরার ভাগ্য হতো না। তা ছাড়া ইউরোপের বিখ্যাত ব্র্যান্ড জি স্টারের ১০টি শার্ট আমার সংগ্রহে আছে। প্রতিটি শার্ট ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকায় কিনেছি। অথচ এই ব্র্যান্ডের একটি শার্ট বিদেশের বাজারে ১০০ ডলারের ওপরে বিক্রি হয়। ’

প্রশ্ন উঠতে পারে, এত নামিদামি ব্র্যান্ডের কাপড়চোপড়, জুতাসহ অন্যান্য সামগ্রী কিভাবে ফুটপাত কিংবা স্থানীয় দোকানে চলে আসছে? এ ব্যাপারে অনুসন্ধানে আসল রহস্য বেরিয়ে আসে। গার্মেন্ট মালিক, বায়িং হাউস ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিদেশিদের চাহিদা অনুযায়ী গার্মেন্ট কারখানাগুলো পোশাক বা জুতা তৈরি করে। এর মধ্যে কিছু জিনিস রিজেক্ট হয়ে যায়। সেসব পণ্য ঝুট হিসেবে বাইরে চলে আসে। এসব কাপড়চোপড় রিপেয়ার করে ফুটপাত কিংবা দোকানে বিক্রি করা হচ্ছে।

আবার এমন অনেক কম্পানি রয়েছে, যাদের একটি পণ্যও বাইরে বিক্রি করা যাবে না। কোনো পণ্য রিজেক্ট হলে সেটা আগুনে পুড়িয়ে ফেলতে হয়। তবু নানা ফাঁকফোকর দিয়ে এ ধরনের ব্র্যান্ডের দু-একটি পণ্য বাইরে এসে যাচ্ছে, যা বিভিন্ন হাত ঘুরে সাধারণ মানুষের কাছে চলে আসে। উত্তরা এলাকার একাধিক বিদেশি ব্র্যান্ডের কাপড় বিক্রেতা জানান, বিভিন্ন গার্মেন্ট থেকে নানা ফাঁকফোকর দিয়ে কিছু পণ্য বাইরে চলে আসছে; যেমন—প্রতিটি গার্মেন্ট কারখানায় পণ্যের গুণগত মান, ডিজাইন কিংবা সেলাই নিরীক্ষার জন্য কিউসি (কোয়ালিটি কন্ট্রোলার) থাকেন। তাঁরা এই কাজের জন্য কিছু পণ্য নিজেদের কাছে এনে রাখেন, যা পরে বাইরে কোনো ক্রেতার হাতে চলে আসে। এভাবে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কাপড়, জুতা, জ্যাকেট, ব্যাগ বাইরে চলে আসছে, যার ওপর ভিত্তি করে বিদেশি ব্র্যান্ডের ব্যবসা জমজমাট হয়ে উঠেছে।

একজন গার্মেন্ট মালিক নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘আমরা বিদেশি বায়ারদের কাজ করি, তখন উচ্ছিষ্ট হিসেবে ৫ শতাংশ পণ্য বেশি উত্পাদন করি। এর মধ্যে হয়তো ২ শতাংশ রিজেক্ট হয়, অবশিষ্ট ৩ শতাংশ পণ্য অতিরিক্ত থেকে যায়। সেই অতিরিক্ত পণ্য নানাভাবে লোকাল বাজারে চলে আসে, যা ঢাকার ফুটপাতেও কিনতে পাওয়া স্বাভাবিক ঘটনা। এটা নিয়ে বিদেশি বায়ারদের সবাই মাথা ঘামান না। তাঁরা তাঁদের চাহিদামতো পণ্য পেলেই হলো। হয়তো দু-চারজন বায়ার এসব বিষয় নিয়ে খোঁজখবর করেন। তবে আমরা বিদেশিদের পণ্য তৈরি করার সময় শর্ত মেনে নিই যে এর কোনো একটি পণ্যও তাঁদের বাইরে কাউকে দিতে পারব না। সেটা যদি অন্যত্র এক পিসও পাওয়া যায় তাহলে বিদেশিরা পুরো শিপমেন্ট বাতিল করে দিতে পারেন। অতীতে এ ধরনের অনেক ঘটনা ঘটায় অনেক গার্মেন্ট মালিক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ’

দিনের পর দিন এ ধরনের কাপড় কিংবা জুতার ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। যার কারণে এ ধরনের ব্যবসা বর্তমানে ফুটপাত ছাড়িয়ে অভিজাতপাড়ায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শপেও ঢুকে গেছে। গুলশান, বনানী, ধানমণ্ডি কিংবা উত্তরা মডেল টাউনে বিদেশি ব্র্যান্ডের এ ধরনের পণ্য বেচাকেনার জন্য বেশ কিছু দোকানপাট গড়ে উঠেছে। সেসব সুসজ্জিত দোকানে বাংলাদেশি ক্রেতাদের পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতাদেরও ভিড় লক্ষ করা যায়। উত্তরা রবীন্দ্র সরণিতে অবস্থিত এসটোরিয়া নামের একটি পোশাকের দোকানে গিয়ে বাংলাদেশিদের পাশাপাশি বেশ কিছু বিদেশি ক্রেতার সন্ধান পাওয়া গেল। হাসিমো নামের এক জার্মান ক্রেতা জানালেন, তাঁর দেশের একটি বিখ্যাত ব্র্যান্ড হলো ইউনিকল। কিন্তু অনেক দাম হওয়ায় সেটা জার্মানি থেকে কেনা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু তিনি বাংলাদেশ থেকে অল্প মূল্যে এই ব্র্যান্ডের বেশ কিছু প্যান্ট কিনে নিলেন। ইংল্যান্ডের এনজিওকর্মী ক্রিস্টিনা সেখান থেকে বারবারি ব্র্যান্ডের পাঁচটি গেঞ্জি কিনলেন। তিনি জানালেন, লন্ডনের জনপ্রিয় ব্র্যান্ড এটা।

সেখানকার একটি গেঞ্জির দামে তিনি পাঁচটি গেঞ্জি কিনেছেন।

দেশি গার্মেন্টে তৈরি বিদেশি ব্র্যান্ডের পণ্য ঘিরে বেশ কিছু অসাধু চক্র গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সেসব চক্র খ্যাতনামা ব্র্যান্ডের কাপড় অবিকল নকল করে বাজারজাত করছে। যার কারণে এ ধরনের কাপড় কিনতে গিয়ে অনেকেই প্রতারিত হচ্ছেন। বিশেষ করে বুড়িগঙ্গার দক্ষিণ তীরে কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের ব্র্যান্ড নকলের হিড়িক পড়েছে। সেখানে ছোট-বড় হাজার হাজার কারখানায় এ ধরনের চৌর্যবৃত্তি চলছে। যার কারণে ব্র্যান্ডের শার্ট, প্যান্ট, গেঞ্জি, ব্যাগ কিংবা জুতা কিনতে গিয়ে ক্রেতারা ঠকছেন। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও ভোক্তারা মনে করেন, এ ধরনের অসৎ চর্চা বন্ধের জন্য প্রশাসনের এখনই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

ঐতিহ্যের ব্র্যান্ড

বাংলাদেশে বিদেশি পোশাক ক্রেতা ব্র্যান্ডের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সেলিও, সাকুর ব্রাদার্স, এফ অ্যান্ড এফ, ডেনিম হাউস, অ্যাম্বারক্রম্বি অ্যান্ড ফিচ, জি স্টার, ইউএস পোলো প্রভৃতি। এর মধ্যে অ্যাম্বারক্রম্বি অ্যান্ড ফিচ নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটান সিটিতে ১৮৯২ সালে গড়ে তোলেন ডেভিড টি অ্যাম্বারক্রম্বি ও অ্যাজরা ফিচ। ব্র্যান্ডটি বর্তমানে ১০৪৯টি দোকান পরিচালনা করছে। সাকুর ব্রাদার্স ফ্যাশন ব্র্যান্ডটির জন্ম পর্তুগালের লিসবন শহরে ১৯৮৯ সালে। ১৯৭৮ সালে প্যারিসে সেলিও ব্র্যান্ডের জন্ম। বিশ্বের ৫৬টি দেশে এই ব্র্যান্ডের পোশাক বিক্রি হচ্ছে। এ দেশের গার্মেন্টে তৈরি হচ্ছে এমন পোশাকের আরেকটি জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের নাম জি স্টার। ডাচভিত্তিক তৈরি পোশাকের এ প্রতিষ্ঠানটির জন্ম ১৯৮৯ সালে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সাড়ে ছয় হাজার আউটলেটে এই ব্র্যান্ডের কাপড় বিক্রি হচ্ছে। ইউনাইটেড স্টেট পোলো অ্যাসোসিয়েশন, সংক্ষেপে ইউএস পোলো ব্র্যান্ডের শার্ট, গেঞ্জি, প্যান্ট, জুতা ও ব্যাগ দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের গার্মেন্টে তৈরি হচ্ছে। ঢাকার ফুটপাত থেকে শুরু করে বিভিন্ন ছোটখাটো দোকানেও এ ধরনের পণ্য পাওয়া যায়। তবে ব্র্যান্ডটি খুবই পুরনো। আমেরিকায় এর জন্ম ১৮৯০ সালে। বিশ্বের প্রায় ১৩৫টি দেশে এই ব্র্যান্ডের পণ্য বিক্রি হয়। বিক্রির পরিমাণ প্রতিবছর ১০০ কোটি ডলার। বাংলাদেশি টাকায় সেটা আট হাজার কোটি।

সম্পর্কিত সংবাদ
ডেস্ক রিপোর্ট