চৈত্র সংক্রান্তীকে ঘিরে বাঙালী মেতে উঠে উৎসবের আমেজে

চৈত্র সংক্রান্তীকে ঘিরে বাঙালী মেতে উঠে উৎসবের আমেজে

প্রাকৃতিক নিয়মে ঋতুবদল হয়।আর এই ঋতু বদলের পালায় আসে বাংলা সনের শেষ মাস চৈত্র।বাংলা সনের এই মাসের নামকরন করা হয়েছে “চিত্রা”নক্ষত্রের নামানুসারে।বাংলা পঞ্জিকানুযায়ী চৈত্র মাসের শেষ দিনটিতে পালিত হয় “চৈত্র সংক্রান্তি”।

চৈত্র সংক্রান্তি সাধারনত হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি উৎসব।শাস্ত্র ও ধর্মীয় মতে এইদিনে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা পূণ্যস্নান,ব্রত,উপবাস ইত্যাদি ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করে থাকে। তবে আজকাল আর এটা কেবল মাত্র হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই।চিরকালের উৎসব প্রিয় বাঙালী বিভিন্ন দিবসকে ঘিরেই খুঁজে উৎসবের আমেজ।আর সেকারনেই চৈত্র সংক্রান্তি এখন বাঙালীর প্রাণের উৎসবে পরিনত হয়েছে।তাই চৈত্র মাসের এই দিনকে ঘিরে থাকে বর্ষ বিদায়ের নানা আয়োজন।

চৈত্র সংক্রান্তি সাধারনত একটি লোকজ উৎসব।অঞ্চলভেদে এই উৎসবের তারতম্য রয়েছে।

গ্রাম অঞ্চলে এই দিনে থাকে নানা আয়োজন।চৈত্র সংক্রান্তির মেলা তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য।এই মেলা চৈত্র সংক্রান্তির দিন শুরু হয়ে পহেলা বৈশাখ পার করেও আরো দুই/তিন দিন থাকে।মেলায় থাকে নানা বয়সের লোক সমাগম।মাটি,বাঁশ,বেত সহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য মেলায় বিক্রি করা হয়।তাছাড়া বিভিন্ন ধরনের খাবার যেমন-পিঠা,খই,মুড়ি,নিমকি,মোয়া,জিলাপি গ্রামীন ঐতিহ্য বহন করে এমন সব ধরনের খাবার মেলায় পাওয়া যায়।শিশুদের জন্য থাকে চড়কা,নাগরদোলা ইত্যাদি আনন্দদায়ক খেলনার উপকরন।এছাড়া বিশেষ ভাবে আয়োজন করা হয়ে থাকে মোরগ ও ষাড়ের লড়াই,হা-ডু-ডু সহ নানান দেশীয় খেলার।

অঞ্চলভেদে চৈত্র সংক্রান্তি উৎসবের তারতম্য দেখা যায়।বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলে এই দিনে খাওয়া দাওয়ার থাকে বিশাল আয়োজন।চৈত্র সংক্রান্তির জন্য বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই চলে এই অঞ্চলের মানুষের পূর্ব প্রস্তুতি।বিভিন্ন ধরনের পিঠা,মোয়া বানান হয়।আঙিনাতে আঁকা হয় আলপনা।“কাজির ভাত” এই অঞ্চলের চৈত্র সংক্রান্তির বিশেষ খাবার। পাঁচ থেকে সাত দিন ধরে মাটির হাড়িতে চাল ভিজিয়ে রাখে।এরপর সেই চাল ধুয়ে রান্না করা হয় “কাজির ভাত”।আর তার সাথে নানান রকমের ভর্তা,মেথি শাক,উচ্ছে,নিরামিষ,ইলিশ,কৈ আর পুঁটি মাছ ভাঁজা,বেগুন ভাঁজা।আহা!কি যে স্বাদ।যে একবার খেয়েছে,সেই স্বাদ সে কখনো ভুলতে পারবে না।

এই অঞ্চলের শিশুদেরও থাকে আলাদা আয়োজন।খেলার সাথিরা মিলে বাড়ীর উঠোনের কোণে কলার পাতায় তৈরী করে ছোট ঘর।ছোট ছোট হাড়িতে রান্না করে এবং চঁড়ুইভাতির মতোই সবাই মিলে আনন্দ করে খায়।আর সন্ধ্যা হলেই এবাড়ি ওবাড়ির শিশুদের মধ্যে চলে গানের লড়াই।তারা বিভিন্ন দেশীয় গানের মাধ্যমে লড়াই করে।এই লড়াইয়ে বাড়তি আমেজ এনে দেয় তাদের ঘরোয়া বাদ্যযন্ত্র।তারা প্লেট,বাটি,চামচ ইত্যাদি পিটিয়ে বিভিন্ন ধরনের শব্দ তৈরী করে গান গায়।এবং অন্য বাড়ীর শিশুদেরকে পরাজিত করে আনন্দ পায়।

আদীবাসিরাও নিজস্ব কৃষ্টি অনুসারে এই দিনে বর্ষবিদায় বা “বৈসাবী” উৎসব পালন করে থাকে।এবং নানা আয়োজনের মাধ্যমে দিনটি পালন করে।

ইদানিং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের মাধ্যমে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরেও চৈত্র সংক্রান্তি পালন করা হয়। ঢাকার চারুকলাতে বকুল তলায় চৈত্র সংক্রান্তির প্রথম প্রহরে থাকে নানা আয়োজন।

কথায় আছে- “ধর্ম যার যার,উৎসব সবার”।যদিনা তা কারো ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত হানে।যেহেতু এই উৎসব ধর্মীয় অনুভুতির কোন বিঘ্ন ঘটায় না।এবং চৈত্র সংক্রান্তির মাধ্যমে বাঙালী জাতীর ঐতিহ্য ও লোকজ অনুভূতির প্রকাশ ঘটে।সেহেতু ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল বাঙালীর অংশগ্রহনের মাধ্যমে চৈত্র সংক্রান্তি জাতীয় ভাবেও পালন করা যেতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।

সম্পর্কিত সংবাদ
তাহমিনা শিল্পী