শেষ মুহূর্তে বেচাকেনা জমজমাট

শেষ মুহূর্তে বেচাকেনা জমজমাট

রাত পোহালেই পবিত্র ঈদ। এই ঈদের বড় আকর্ষণ গরু।

সাধ ও সাধ্যের মধ্যে কোরবানির গরু কিনতে পারলে যে কেউ থাকেন মহাখুশি। তাই গরুর সঙ্গে ছাগল, মহিষ, উটসহ বিভিন্ন পশুর ভিড়ে জমে উঠেছে শেষ মুহূর্তের পশুর হাটগুলো।

রাজধানীর পশুর হাটগুলোতে বিরাজ করছে ঈদের আনন্দ। কয়েকদিনে ক্রেতারা শুধু দরদাম করলেও গতকাল থেকে গরু কিনতে শুরু করেছেন। সব হাটেই ক্রেতাদের ভিড় ছিল লক্ষণীয়। প্রথম দিকে বিক্রেতারা গরুর দাম বেশি হাঁকলেও তা নামিয়ে এনেছেন সহনীয় পর্যায়ে। ফলে ক্রেতারা দারুণ খুশি। সাধ আর সাধ্যের মধ্যে তারা গরু কিনছেন। বিক্রেতারাও খুশি দেদার বিক্রি করতে পারায়।

সরেজমিন খোঁজ নিতে গিয়ে জানা গেছে, গতকাল দুই ঘণ্টার টানা বৃষ্টির কারণে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়কে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। অনেক হাটে কাদাও জমে যায়। মূলত ওই সময়ে গরু বেচাকেনা হয়নি। তবে বৃষ্টি থামার সঙ্গে সঙ্গে গরু বিক্রির হিড়িক পড়ে যায়। বিক্রেতারা জানান, আজ আরও বেশি গরু বিক্রি হবে। দামও বেশি হবে। তবে ক্রেতারা বলছেন, গরুর দাম আরও কমবে।

পুরান ঢাকার ফরিদাবাদ থেকে কমলাপুর গরুর হাটে আসেন জামাল উদ্দিন। ৭২ হাজার টাকা দিয়ে তিনি মাঝারি সাইজের লাল রঙ্গের একটি গরু কিনেছেন। তিনি বলেন, ‘গেন্ডারিয়া, শ্যামপুরসহ বেশ কয়েকটি গরুর হাট ঘুরেছি। তবে এই হাটে গরুর দাম কিছুটা কম। তাই পছন্দ মতো একটা কিনে ফেললাম। ’ একই হাটে খিলগাঁও থেকে গরু কিনতে আসেন সালাউদ্দিন। তিনি ৬৫ হাজার টাকা দিয়ে মাঝারি সাইজের কালো গরু কিনেছেন। বলেন, ‘গরু হিসেবে দাম বেশ কিছুটা কম। ’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ১৭টি গরু এনেছেন আলম ফকির। তিনি বলেন, ‘গত কয়েকদিন গরুর দাম বেশি থাকলেও গতকাল প্রত্যেক গরুতে ১০-২০ হাজার টাকা কমে এসেছে। ’ গতকাল তিনি পাঁচটি গরু বিক্রি করেছেন। এর আগে, মাত্র একটি গরু বিক্রি হয়েছে। আশা করছেন, আজ তার সব গরু কাঙ্ক্ষিত মূল্যে বিক্রি হয়ে যাবে। কমলাপুর গরুর হাটের ইজারাদারের সহযোগী আবদুল হক জানান, টুকটাক বেচাবিক্রি হচ্ছে।

রূপনগর ইস্টার্ন হাউজিংয়ের বকুল তলায় প্রতিবারের মতো এবারও বিশাল গরুর হাট বসেছে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকার ও কৃষকরা গরু নিয়ে এসেছেন এই হাটে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এই হাটে ৫-৬ হাজার গরু রয়েছে। প্রায় সবই দেশি গরু। ফাঁকে ফাঁকে দু-চারটা ভারতীয় গরুও চোখে পড়েছে। তবে ক্রেতাদের দৃষ্টি ছিল দেশি গরুতেই। মানিকগঞ্জ থেকে ১৩টি গরু নিয়ে এসেছেন আবদুর রহমান। এবারের বাজার নিয়ে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করে জানান, যে প্রত্যাশা নিয়ে তিনি গরু নিয়ে এসেছেন তা পূরণ হয়নি। গত তিন দিনে মাত্র ৩টি গরু বিক্রি করতে পেরেছেন। ক্রেতারা এখনো দরদামের ব্যাপারে খুব একটা মুখ খুলছেন না।চুয়াডাঙ্গা থেকে এক পাইকার ১৮টি গরু নিয়ে এসেছেন। গতকাল দুপুর পর্যন্ত তিনি মাত্র একটি গরু বিক্রি করতে পেরেছেন। তবে বাজার নিয়ে হতাশ নন তিনি। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে ওই পাইকার জানান, রাজধানীর ক্রেতারা ঈদের আগের দিন গরু কিনতে পছন্দ করেন। ফলে আজ কাঙ্ক্ষিত মূল্যে সবগুলো গরু বিক্রি করতে পারবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

বিক্রেতাদের মধ্যে আশা-নিরাশা থাকলেও গতকাল পর্যন্ত যারা গরু কিনেছেন, তাদের বেশিরভাগই দাম নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ক্রেতারা জানান, ছোট আকারের গরুর দাম ৫০-৬০ হাজার টাকা এবং মাঝারি আকারের দেশি গরু ৬০-৮০ হাজার টাকার মধ্যে মিলছে। বড় গরুর দাম লাখ টাকার উপরে।

মেরুল বাড্ডার আফতাবনগর পশুর হাট পুরোটাই কোরবানির পশুতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গতকাল সকালে বৃষ্টির সে াতে খুব বেশি ক্রেতার দেখা না মিললেও বিকালে চোখে পড়েছে উপচে পড়া ভিড়। সকাল থেকে বিক্রি শুরু হলেও হঠাৎ বৃষ্টিতে থমকে যায় বিক্রি। তবে দুপুর পর থেকে তা বাড়তে থাকে। ইজারাদার ও বেপারিরা বলছেন, অনেক পশুই বিক্রি হয়েছে। যা বাকি আছে আজ বিক্রি হয়ে যাবে।

ক্রেতাদের অভিযোগ, প্রতিবারের মতো এবারও ইচ্ছা মতো দাম হাঁকাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। অনেকে শেষ দিনে বেশি দামে বিক্রির আশায় ন্যায্য দামে গরু বিক্রি করছেন না। গরুর সরবরাহ বেশি থাকায় এবং এখনো ট্রাকভর্তি গরু আসতে থাকায় শেষ দিন হিসেবে আজ গরুর দাম কমতে পারে বলে আশা করছেন ক্রেতারা। আমিনুর রহমান নামে এক ক্রেতা জানান, গরুর আকার অনুযায়ী ১০-২০ হাজার টাকা বেশি চাইছেন বিক্রেতারা। তেমন দরদাম করা লাগছে না। ফলে অনেকটা নির্ধারিত দামেই সবাই গরু কিনতে পারা যাচ্ছে।

সরেজমিন আফতাবনগর হাটে গিয়ে দেখা যায়, পাবনা, যশোর, কুষ্টিয়া, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার খামারিরা নিজেদের খামারের সাইনবোর্ড লাগিয়ে গরু বিক্রি করছেন। এ ছাড়া এ হাটে নেপাল, ভুটান, মিয়ানমারের গরুও পাওয়া যাচ্ছে। তবে দেশি গরুর সংখ্যাই বেশি। বিদেশি গরু কম থাকায় দেশি গরুর খামারিরা বেশ খুশি। হাটে ৬০-৮০ হাজার টাকার মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি ছিল। মেহেরপুর থেকে ২১টি গরু নিয়ে এসেছেন হাবিবুর রহমান। প্রতিটি গরু এক থেকে দেড় লাখ টাকা হাঁকাচ্ছেন তিনি। তবে ৭০-৮০ হাজারের উপরে গরুর দাম উঠছে না। এবার গরুর পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় দাম কম। বগুড়ার ব্যবসায়ী চঞ্চল হোসেন ৯টি গরু এনেছেন। গরু প্রতি সর্বনিম্ন ৩ লাখ সর্বোচ্চ ১০ লাখ দাম হাঁকাচ্ছেন। দুই গরু বিক্রি করেছেন। দামও ভালো পেয়েছেন। তবে কাঙ্ক্ষিত দামের চেয়ে কম।

হাটের ইজারাদার আবদুর রহমান রুবেল বলেন, বৃষ্টির কারণে হাট পুরোপুরি জমে উঠেনি। আমরা আশা করছি আজকের মধ্যে সব গরু বিক্রি হয়ে যাবে। হাটের অব্যবস্থাপনার কথা অস্বীকার করে তিনি বলেন, আমাদের ১৮টি বুথেই জাল টাকা শনাক্তকারী মেশিন আছে। পাশাপাশি ১২ জন পশুর ডাক্তার সার্বক্ষণিক নিয়োজিত রয়েছেন। এর বাইরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি আমাদের নিজস্ব ২ হাজার ভলেন্টিয়ার কাজ করছে।তুলনামূলক ছোট ও মাঝারি আকারের দেশি গরু বেশি উঠেছে শ্যামপুর বালুরমাঠ হাটে। শরীয়তপুরের পদ্মাচরের বেশিরভাগ খামারের গরু এ হাটে উঠেছে। কিছুটা সুলভ মূল্য থাকায় বুধবার থেকে ক্রেতাদের ভিড় ছিল সেখানে। এখানকার বেপারিরা বলছেন, আমরা প্রত্যেক ক্রেতাকে ফ্রি হোম ডেলিভারি দিচ্ছি। বিক্রির পরই আমরা বিনা খরচে ক্রেতার বাসায় সুন্দরভাবে পৌঁছে দিয়ে আসছি। তবে ইজারাদারের সহযোগীরা আরেকটু যোগ করে জানান, হাটে কয়েকটি তাঁবুর নিচে গরু রাখা আছে। যেগুলোর ব্যবসায়ীরা গরু ছবিসহ ফেসবুকে দিয়েছেন। যদি কেউ ফেসবুকে অর্ডার করে তাদেরটাও ঠিকানা অনুযায়ী পৌঁছে দেওয়া হয়।

মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের ঢাল থেকে কিছু দূরেই শুরু হয়েছে রায়েরবাগ গরুর হাট। এ হাটের ভিড় বেশি শনির আখড়ার পরই। চট্টগ্রাম, চাঁদাপুর ও কুমিল্লা থেকে বেশি পরিমাণ গরু-ছাগল এসেছে সেখানে। মহাসড়কের দুপাশে ট্রাক আর শত শত গরু সারিবদ্ধ হয়ে আছে। কথা হয় নারায়ণগঞ্জের হেদায়েত উল্লাহর সঙ্গে। তিনি মাঝারি থেকে খানিকটা বড় আকারের ১২টি গরু নিয়ে এই হাটে পৌঁছেছেন মঙ্গলবার রাতে। তখন পর্যন্ত তার একটি গরুও বিক্রি হয়নি। প্রায় একই আকারের প্রতিটি গরুর দাম চাইছেন লাখের ওপরে।

 

সম্পর্কিত সংবাদ
ডেস্ক রিপোর্ট