গলায় গণ্ডগোল

গলায় গণ্ডগোল

গলা খুশখুশ খুব সাধারণ ঘটনা। বেশিরভাগ সময়েই দেখা যায় যে ভোরে বা সকালের দিকে গলা খুশখুশ বেশি হয় এবং বেলার দিকে তা ধীরে ধীরে কমে আসে। দেখা যায় পরিবেশে তাপমাত্রার তারতম্যে এই ধরনের অস্বস্তি বাড়ে। ভাইরাল ইনফেকশন বা সংক্রমণ ঘটলে এই সমস্যা খানিকটা তীব্র হয়। তবে ভাইরাসে আক্রান্ত হলে বা ঐ জাতীয় কোনো সংক্রমণ হলে অ্যান্টি-বায়োটিক ওষুধে খুব একটা সাড়া পাওয়া যায় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সর্দি-কাশি’র আগে গলা খুশখুশ খুব সাধারণ একটা বিষয়। যখন নাকে সংক্রমণ হয় বা সাইনাসের সমস্যা দেখা দেয় তখন জলীয় অংশের খানিকটা নাসারন্ধ্র দিয়ে গলা বেয়ে নিচের দিকে নেমে আসে। সেক্ষেত্রেও গলায় অস্বস্তি হয়, রাতের দিকেই এই ধরনের সমস্যা বেশি দেখা যায়।

কয়েকটি ভাইরাস আছে যা শুধুমাত্র গলাকেই অসুস্থ করে তোলে। যার ফলে সারাদিনই গলায় খুশখুশ করে। এমনকি গলার ভেতর ফুসকুড়ির মতোও হয়। কিছু ভাইরাস আছে যা থেকে জ্বর হয়, যাকে আমরা ভাইরাল ফিভার বলি। তার থেকেও অনেক সময় গলা খুশখুশ করতে পারে।

স্ট্রেপটোকক্কাল ইনফেকশন হয় ব‌্যাকটেরিয়ার আক্রমণে। ফ‌্যারিঞ্জাইটিস, টনসিলাইটিস এই ধরনের রোগ। বারেবারে এই ধরনের রোগে আক্রান্ত হলে পরবর্তীকালে রিউম‌্যাটিক ফিভার হতে পারে। এই ক্ষেত্রে রোগীকে অবশ্যই অ্যান্টি-বায়োটিক দিতে হবে। স্ট্রেপটোকক্কাল ইনফেকশন হলে সাধারণত রোগীর ১০১ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি জ্বর থাকবে। গলার ভেতর সাদা সাদা দাগ দেখা দিতে পারে বা লালচে হতে পারে। গলা ফুলতে পারে, ঢোঁক গিলতে গেলে ব্যথা হতে পারে। ঘাড়ের দিকে বা গলার লাগোয়া লিম্ফ গ্ল‌্যান্ডে বা লসিকা গ্রন্থিগুলিতে ব্যথা ও ফোলা ফোলা ভাব দেখা দিতে পারে। বাচ্চাদের এক্ষেত্রে মাথাব্যথা ও পেটে ব্যথাও হতে পারে।

স্ট্রেপটোকক্কাল ইনফেকশন ও ভাইরাল ইনফেকশন-র মধ্যে ফারাক রয়েছে। তবে প্রাথমিকভাবে উভয় রোগের লক্ষণই প্রায় সমান (নাক দিয়ে কাঁচা জল গড়ানো, হাঁচি, কাশি, কান ভোঁ ভোঁ করা ইত‌্যাদি)। শুধু গলার ভেতরের অংশ পরীক্ষা করে স্ট্রেপটোকক্কাল ইনফেকশনের চিকিৎসা করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। সেক্ষেত্রে কিছু প‌্যাথলজিক‌্যাল পরীক্ষা জরুরী।

অনেক সময় দেখা যায় শরীরে কোথাও কোনো সংক্রমণ নেই। তাসত্ত্বেও গলা খুশখুশ করছে, খুক-খুক কাশি হচ্ছে। কেন হচ্ছে তা নিয়ে অনেকেই চিন্তায় পড়েন। দেখা যায়, নাক বন্ধ থাকায় অনেকেই মুখ দিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস নেন। সেক্ষেত্রে গলা খুশখুশ করাটাই স্বাভাবিক। শীতকালে শুকনো ঠাণ্ডার সময় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় ঘুম থেকে ওঠার পর গলায় বেশি অস্বস্তি হচ্ছে, কাশি হচ্ছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গরম পানীয় খেলে তা অবশ্য আস্তে আস্তে দূর হয়ে যায়। এছাড়া অ্যালার্জি থেকেও অনেক সময় গলায় অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। সেই সব পরিস্থিতিতে অনেকটা একই ধরনের লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়। যেমন, কাশি, গলা খুশখুশ, গলায় জ্বালা জ্বালা ভাব, ঢোঁক গিলতে গেলে ব্যথা ইত‌্যাদি।

কারণ

১. মুখ দিয়ে নিঃশ্বাস নেয়া (গলা শুকিয়ে আসে এবং গলার ভেতরে খুশখুশ শুরু হয়), ২. সাধারণ সর্দি, ৩. এন্ডোট্রাকিয়াল ইনটিউবেশন, ৪. ফ্লু বা জ্বর, ৫. মনোনিউক্লিওসিসের সংক্রমণ, ৬. স্ট্রেপটোকক্কাল ইনফেকশন, ৭. টনসিল বা অন্য কোনো গ্রন্থিতে অপারেশন করা হলে, ৮. ভাইরাল ফ্যারিঞ্জাইটিসঠ। গলায় সংক্রমণ বেশিদিন অবশ্য স্থায়ী থাকে না। এই সময় বাড়িতে বিশ্রাম নেয়াই বাঞ্ছনীয়।

এই পর্যায়ে কী করা দরকার

– উষ্ণ গরম পানীয় পান করলে ভালো। মধু ও লেবু-চা খেলে আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া যায়, তবে তা সময় সাপেক্ষ।

-গরম জলে নুন মিশিয়ে বারে বারে গারগল করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।

-কিছু লজেন্স রয়েছে, যা গলার পক্ষে উপকারী। ওই ধরনের লজেন্স চুষে খেলে লালার নিঃসরণ হয়, যা গলার অস্বস্তিকে কিছুটা স্তিমিত করতে সাহায্য করে। তবে বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি ব্যবহার না করাই ভালো। এতে গলা বসে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

-গলায় ব্যথা থাকলে একইসঙ্গে ভেপার নেওয়া যেতে পারে।

-বেশি ব্যথা বা কাশি থাকলে অবশ্য অ্যাসিটামিনোফেন গ্রুপের ওষুধ ভালো কাজ দেয়। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে অ্যাসপিরিন গ্রুপের ওষুধ ব্যবহার করা উচিত নয়।

কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন?

-বাচ্চাদের অত্যধিক কাশি ও গলা ব্যথা হলে বা খুব বেশি অস্বস্তি হলে,

-জ্বর ১০১ডিগ্রি ফারেনহাইটের ওপরে উঠলে,

-গলার ভেতরের দেওয়ালে সাদা সাদা দাগ দেখলে,

-গলার ভেতরের দু’পাশ ও পিছনের দেওয়ালে লাল রঙের ফুসকুড়ির মতো দেখা দিলে,

-শ্বাস-প্রশ্বাসে অসুবিধা হলে, গলায় ফোলা ফোলা ভাব থাকলে কিংবা খুব অস্বস্তি থাকলে ও

-লিম্ফ গ্ল্যান্ড বা লসিকা গ্রন্থিতে ব্যথা ও ফোলা অনুভব করলে

ডাক্তার বা বিশেষজ্ঞদের কাছে গেলে প্রাথমিক কিছু পরীক্ষা করা হয়।

আপনার অসুখ সম্পর্কে তিনি আপনাকে বেশ কয়েকটি প্রশ্নও করবেন।

কতদিন ধরে এই অসুখে ভুগছেন?

আপনার পরিবারের কেউ কি এই ধরনের অসুখে আক্রান্ত?

ব্যথা ক্রমশ বাড়ছে, নাকি একই রকম আছে?

শক্ত বা নরম খাবার গিলতে গেলে অসুবিধা হচ্ছে?

বাচ্চাদের ক্ষেত্রে কতদিন ধরে কাশি চলছে? খুব বেশি কাশি হচ্ছে?

সন্ধ্যার পর কি এই সমস্যা বাড়ে? রাতে কি ঘুমোতে পারছেন? মুখ দিয়ে কি শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে হচ্ছে?

ভেপার বা গারগল করলে ভালো লাগে? ওষুধে খেলে কি ভালো বোধ করেন?

জ্বর আছে কিনা? নিঃশ্বাসের সঙ্গে ঘড়ঘড় আওয়াজ হচ্ছে কিনা? অ্যালার্জি আছে কিনা?

গলার কাছে থাকা লসিকা গ্রন্থিগুলিতে ফোলাভাব বা ব্যথা আছে কিনা?

আপনি কোনো ওষুধ খাচ্ছেন কিনা?

যে পরীক্ষাগুলি করা প্রয়োজন

রক্তের কিছু পরীক্ষা এক্ষেত্রে জরুরী। যেমন কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট (CBC), মনোস্পট টেস্ট, থ্রোট কালচার ও র‌্যাপিড স্ট্রেপ টেস্ট।

চিকিৎসা

পরীক্ষার রিপোর্ট না পাওয়া অবধি সেভাবে চিকিৎসা শুরু করা যায় না। তবে সংশ্লিষ্ট রোগীর পরিবারে কারোর যদি এই ধরনের রোগ হয়ে থাকে বা রিউম‌্যাটিক ফিভারে আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তাহলে চিকিৎসক সঙ্গে সঙ্গেই চিকিৎসা শুরু করে দিতে পারেন। থ্রোট কালচার ও স্ট্রেপ টেস্ট-র রিপোর্ট যদি নেগেটিভ থাকে তাহলে অ্যান্টি-বায়োটিক ওষুধ প্রয়োগ না করাই ভালো। প্রতিটি অ্যান্টি-বায়োটিক ওষুধেরই পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া থাকে। যদি অ্যান্টি-বায়োটিক ওষুধ শুরু করা হয় তাহলে ওষুধের নির্ধারিত কোর্স শেষ করা উচিত, মাঝপথে ওষুধ বন্ধ না করাই ভালো। অ্যান্টি-বায়োটিক ওষুধ শুরু করার ২৪ঘন্টা বাদে বাচ্চাদের কিন্তু স্কুলে পাঠানো যেতে পারে। যদি দেখা যায়, মনোনিউক্লিওসিসের সংক্রমণ হয়েছে, সেক্ষেত্রে বাড়িতে থেকে বিশ্রাম নেওয়াই বাঞ্ছনীয়।

ব্যাকটিরিয়ার সংক্রমণে যদি টনসিলাইটিস হয়ে থাকে তাহলে অ্যান্টি-বায়োটিক ওষুধ প্রয়োগ করতেই হবে। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় ভাইরাসের আক্রমণেও টনসিলাইটিস হয়েছে। সেক্ষেত্রে অ্যান্টি-বায়োটিক ওষুধের প্রয়োজন নেই। যদি দেখা যায়, বারে বারে এই সমস্যা হচ্ছে, অথচ তা ব্যাকটিরিয়া ঘটিত সংক্রমণ নয়, তাহলে অ্যান্টি-অ্যালার্জি’র ওষুধ খেলে ভালো ফল পাওয়া যায়।

রোগ প্রতিরোধ

খাওয়ার আগে ভালো করে হাত ধুয়ে নিন। গলার যে কোনো সমস্যা প্রতিরোধ করার এটাই প্রাথমিক শর্ত। কারণ হাতে জীবাণু থাকলে তা সরাসরি শরীরে প্রবেশ করতে পারে। যাদের গলায় সংক্রমণ রয়েছে, এমন মানুষের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে কথাবার্তা বলুন। মাঝে মধ্যে ভেপার বা গারগল করতে পারলে ভালো, এতে গলার জড়তাও অনেক সময় কমে যায়।

সম্পর্কিত সংবাদ
ডেস্ক রিপোর্ট