প্রাচুর্য হারিয়ে লোকসানে ডেসকো

প্রাচুর্য হারিয়ে লোকসানে ডেসকো

বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য বেড়ে যাওয়ায় মুনাফার সে প্রাচুর্য হারিয়ে টানাটানির মধ্যে পড়েছে ডেসকো। সুদের আয় বাদ দিলে লোকসানে কোম্পানিটি।

সংস্কারের মধ্য দিয়ে গঠিত ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো) শুরুতে ভালো কোম্পানি হিসেবেই ছিল। শেয়ারবাজারেও ভালো করছিল কোম্পানিটি। বড় অংকের মুনাফা হচ্ছিল।

ডেসকো সূত্রে জানা গেছে, ২০১০-১১ হিসাব বছরেও ২০০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফায় ছিল কোম্পানিটি। ছয় বছরের ব্যবধানে সর্বশেষ ২০১৬-১৭ হিসাব বছরে মুনাফার পরিবর্তে পরিচালন লোকসানে পড়েছে। কমেছে নিট মুনাফাও। ২০১০-১১ হিসাব বছরের ১৪৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা থেকে কমে গত হিসাব বছরে কোম্পানির নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে সাড়ে ১৭ কোটি টাকা। বিদ্যুতের মূল্যহার পুনর্নির্ধারণসহ কোম্পানির ক্ষেত্রে সরকারের নীতি পরিবর্তন না হলে চলতি হিসাব বছর শেষে লোকসানে পড়তে হবে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি।

ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. শাহিদ সারওয়ার এ প্রসঙ্গে বলেন, বিভিন্ন কারণে কোম্পানির পরিচালন ব্যয় ক্রমে বাড়ছে। সম্ভাব্য ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ব্যয় কমিয়ে আনার চেষ্টা করছি। তবে বিদ্যুৎ ক্রয়সহ কোনো কোনো ব্যয় ডেসকোর পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর সুদহার কমে আসায় এফডিআর থেকে আয়ও কমছে। আয়ের তুলনায় ব্যয়ের ব্যবধান বাড়লে তা স্বাভাবিকভাবেই প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খুচরা মূল্যের তুলনায় পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য বৃদ্ধির হার বেশি হওয়ায় মূলত চাপের মুখে পড়েছে ডেসকো। পাশাপাশি হুইলিং (সঞ্চালন) চার্জ বৃদ্ধি, ব্যাংকে স্থায়ী আমানতে সুদ বাবদ আয় কমে যাওয়া ও প্রশাসনিক ব্যয় বাড়ার কারণেও মুনাফা কমছে। যদিও গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ায় ব্যবসার আকার বেড়েছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিটির।

কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ হিসাব বছরে ডেসকোর নিট মুনাফা ছিল ১৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। পরের বছরে তা ৭০ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৪৪ কোটি ৬০ লাখ টাকায়। আর সর্বশেষ ২০১৬-১৭ হিসাব বছরে ডেসকোর নিট মুনাফা আরো কমে দাঁড়িয়েছে ১৭ কোটি ৪৯ লাখ টাকায়। ব্যাংকের স্থায়ী আমানতের (এফডিআর) সুদের আয়সহ অপরিচালন আয়ের ওপর ভর করে সর্বশেষ অর্থবছরে কর-পরবর্তী এ মুনাফা করেছে ডেসকো। এ সময়ে ৯৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা অপরিচালন মুনাফা করেছে কোম্পানিটি। এর মধ্যে সুদ বাবদ আয় ৭০ কোটি টাকা। তবে স্থায়ী আমানতের সুদহার কমে যাওয়ায় এ বাবদ আয়ও কমে আসছে কোম্পানিটির। সব মিলিয়ে চলতি বছর ৫৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা নিট লোকসান প্রাক্কলন করেছে ডেসকো।

তবে লোকসান যাতে না হয়, সেজন্য গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ২০ পয়সা বা ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে ডেসকো। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে অংশ নিয়ে কোম্পানিটি জানায়, জনবল, অবকাঠামোগত, উন্নয়ন প্রকল্প, পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় বেড়েছে। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যয় হয় ইউনিটপ্রতি ৭ টাকা ৭২ পয়সা। অন্যদিকে ডেসকোর ইউনিটপ্রতি বর্তমান আয় ৭ টাকা ৫২ পয়সা, যার মধ্যে ৭ টাকা ২০ পয়সা বিদ্যুৎ বিক্রি বাবদ ও বাকি ৩২ পয়সা অন্যান্য আয়। ফলে প্রতি ইউনিটে ঘাটতি থাকছে ২০ পয়সা।

এজন্য ঘাটতি পূরণে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ২০ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব দেয় প্রতিষ্ঠানটি। পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়লে তা সমন্বয়ের আবেদনও জানিয়েছে কোম্পানিটি। পাশাপাশি কৃষি ছাড়া সব ধরনের গ্রাহকের বিদ্যুেসবার জন্য সার্ভিস ও ডিমান্ড চার্জ বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে ডেসকো।

ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই অথরিটি (ডেসা) ভেঙে ১৯৯৬ সালের ৩ নভেম্বর গঠন করা হয় ডেসকো। ২০০৬ সালে শেয়ারবাজারে ডেসকোর ২৫ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে ডেসা। এরপর ২০০৮ সালের ১ জুলাই ডেসা বিলুপ্ত হয়। এ সময় সরকার ডেসার সমুদয় সম্পত্তি ডিপিডিসি নামে নতুন কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করে। আর ডেসকোর বিতরণ এলাকার মধ্যে রয়েছে রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা, উত্তরা ও মিরপুর। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকসংখ্যা ৮ লাখ ৩৪ হাজারের বেশি।

সর্বশেষ ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর পাইকারি ও গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ায় সরকার। এ সময় ডেসকোর ক্ষেত্রে পাইকারিতে বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য বাড়ানো হয় ৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ। অন্যদিকে গ্রাহক পর্যায়ে ডেসকোর বিদ্যুতের বিক্রয়মূল্য বেড়েছে ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এ সময় বিদ্যুতের সঞ্চালন চার্জও আগের চেয়ে বাড়ানো হয়। বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনার কারণে নিট মুনাফা কমছে কোম্পানিটির।

যদিও ডেসকোর মোট আয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১০-১১ সালে ডেসকোর আয় ছিল ১ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। সর্বশেষ হিসাব বছরে তা ৩ হাজার ৪৭০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এর আগে ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ২০১১-১২ হিসাব বছরে ১ হাজার ৬২৫ কোটি, ২০১২-১৩ হিসাব বছরে ২ হাজার ২২৪ কোটি, ২০১৩-১৪ হিসাব বছরে ২ হাজার ৪৭২ কোটি, ২০১৪-১৫ হিসাব বছরে ২ হাজার ৭৯৬ কোটি ও ২০১৫-১৬ হিসাব বছরে ৩ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা আয় হয়েছে ডেসকোর।

২০০৬ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া ডেসকোর অনুমোদিত মূলধন ৫০০ কোটি ও পরিশোধিত মূলধন ৩৯৭ কোটি টাকা। রিজার্ভ রয়েছে ৮৮৮ কোটি ২৩ লাখ টাকা। কোম্পানিটির মোট শেয়ারসংখ্যা ৩৯ কোটি ৭৫ লাখ ৬৯ হাজার ৮০৪। এর মধ্যে সরকারের কাছে রয়েছে ৭৫ শতাংশ শেয়ার। বাকি শেয়ারের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ১৭ দশমিক ৬৯, বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছে দশমিক ৫৭ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

সম্পর্কিত সংবাদ
ডেস্ক রিপোর্ট