৯৪ বছর ধরে বিপ্লবের সাক্ষ্য হয়ে আছে লেনিনের মমি

৯৪ বছর ধরে বিপ্লবের সাক্ষ্য হয়ে আছে লেনিনের মমি

রুশ বিপ্লবী, কমিউনিস্ট রাজনীতির পুরোধা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান ভ্লাদিমির লেনিন এখন থেকে প্রায় ৯৪ বছর আগে মারা যান। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর প্রায় ২৫ বছর কেটে গেছে। মস্কোর রেড স্কয়ারের একটি মুসোলিয়ামে লেনিনের মমি করা মরদেহ আজও প্রদর্শন করা হচ্ছে দর্শনার্থীদের উদ্দেশ্যে। কমিউনিজমে বিশ্বাসী লাখো মানুষ প্রতিবছর লেনিনের মমিতে শ্রদ্ধা জানায়। তিনি তাদের কাছে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের আইকন।

লেনিনের মমি করা মরদেহ সমাধিস্থ করা হবে কিনা সে বিষয়ে রাশিয়ার রাজনীতিকরা আজও একমত হতে পারেননি। প্রদর্শনী থেকে তার মরদেহ সরানোর প্রশ্নে রুশ কর্তৃপক্ষ বরাবর-ই উদাসীনতা দেখিয়ে আসছে। প্রায় ৯৪ বছর ধরে লেনিনের লাশের সংরক্ষণ ছিল রাশিয়ার জন্য একটি বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে দেশটির কয়েক প্রজন্মের গবেষক ও বিজ্ঞানীরা নিয়োজিত রয়েছেন। লাশের সংরক্ষণ প্রক্রিয়ায় রয়েছে মস্কোর ইন্সটিটিউট অব মেডিসিনাল অ্যান্ড অ্যারোমেটিক প্লান্টসের বিজ্ঞানীদের একটি দল।

মমি করার প্রক্রিয়ার বর্ণনা দিতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা বলেন, মমি করার জন্য প্রথমে আমরা লাশের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ফেলে দিই। এরপর এক ধরনের দ্রবণ দিয়ে শিরা-উপশিরাগুলো পূর্ণ করি এবং মাংস থেকে সব রক্ত বের করে ফেলি। তারপর লাশটি সাদা কাপড়ের ফাল দিয়ে জড়িয়ে মলমের মতো দ্রবণপূর্ণ একটি গ্লাসের বাথটাবে রাখা হয়। কক্ষের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও আদ্রতা রক্ষা করা হয়। এরপর শরীরের ভেতরে থাকা পানির জায়গায় ওই দ্রবণ পূর্ণ হয়। এ প্রক্রিয়া চলে ছয় মাস ধরে।

বলশেভিক বিপ্লবের নায়ক ভ্লাদিমির লেনিন ১৯২৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন। মারা যাওয়ার পর সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ চাইল তার জন্য একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করবে। স্মৃতিসৌধ নির্মাণের লক্ষ্যে শিল্পী নিয়োগের জন্য ওপেন টেন্ডার করা হয়। এতে বিজয়ী হন তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের খ্যাতনামা স্থপতি আলেক্সেই শ্যুসেভ। দীর্ঘ ছয় বছরের চেষ্টায় ১৯৩০ সালে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের কাজ শেষ করেন শ্যুসেভ। ঠিক ক্রেমলিন ওয়ালের পাশেই অবস্থিত এই স্মৃতিসৌধটির একটি অংশ ১৯৪৫ সালে পুনরায় নির্মাণ করা হয়। যাতে রেড স্কয়ারের প্যারেডের সময় সোভিয়েত নেতারা সেখানে দাঁড়াতে পারেন।

শ্যুসেভের পরিকল্পনা অনুযায়ী লেনিনের স্মৃতিসৌধ বড় ধরনের মেরামত ছাড়াই গত ৯৪ বছর ধরে টিকে আছে। এটি ইউনেস্কোর তালিকাভুক্ত অন্যতম স্মৃতিসৌধ হিসেবে স্বীকৃত। রেড স্কয়ারের এ সমাধিতে গত শতকের বিশের দশকের মাঝামাঝি থেকে শায়িত অবস্থায় রয়েছে লেনিনের মমি করা মরদেহ।

প্রথমদিকে তার লাশ আসলে অস্থায়ীভাবে প্রদর্শনের কথা ছিল। কারণ মৃত্যুর আগে লেনিন নিজের মরদেহ সমাধিস্থ করার জন্য বলেছিলেন। কিন্তু সোভিয়েত নেতারা তার মরদেহ সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নিলেন এবং তার স্মৃতিসৌধকে একটি বৃহৎ সোভিয়েত প্রতীকে পরিণত করেন।

এই রুশ বিশেষজ্ঞরা বহু দেশের নেতার লাশ মমি করার বিষয়ে সহায়তা করেছেন। যেমন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম ইল সাংয়ের লাশ, ১৯৬৯ সালে ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হো চি মিনের লাশ, ১৯৭৯ সালে অ্যাঙ্গোলার রাষ্ট্রপতি আগোস্তিনো নেটোর লাশ ও আরও অনেকের।

প্রত্যেক সপ্তাহেই বিজ্ঞানীরা লেনিনের মমি পরীক্ষা করে দেখেন। স্মৃতিসৌধের ভেতর একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও আদ্রতায় এটা সংরক্ষণ করা আছে। মমিটি বিশেষ একটি কাচের ঘরে রাখা হয়েছে, যেটা লাশটিকে ব্যাকটেরিয়া ও পচে যাওয়া ও শুকিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে।

লেনিনের মরদেহ মমি করার প্রযুক্তিটি রাশিয়ার একটি রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার বিষয়। কোনো বিজ্ঞানীই এ গোপনীয়তা নিয়ে মুখ খোলেন না। তবে ওই বিজ্ঞানী দলের একজন পাভেল ফোমেঙ্কো ২০১১ সালে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম ইল সাংয়ের মৃত্যুর পর মমি করার প্রক্রিয়া ফাঁস করে দেন।

এদিকে গত শতকের নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই লেনিনের মরদেহ সমাধিস্থ করা নিয়ে বিতর্ক চলতে থাকে। অনেকেই মনে করেন, সোভিয়েত রাষ্ট্রের পতনের পর বলশেভিক নেতার লাশ সংরক্ষণ করা বা শেষকৃত্য না করে জনসমক্ষে প্রদর্শন কোনো কাজের কথা নয়। আবার যারা মুসোলিয়ামের পক্ষে, তারা বলেন, মুসোলিয়ামের যে জায়গায় দেহ রাখা হয়েছে, সেই জায়গাটি মাটির নিচেই। সুতরাং কবরের নিয়ম অনুযায়ী কোনো রকমের নিয়মভঙ্গ করা হয়নি। সমাজের একাংশের মতে, যারা কমিউনিজমের আদর্শে বিশ্বাসী, তাদের কাছে লেনিনকে কবর দেওয়ার প্রশ্ন খুবই বেদনাদায়ক।

সম্পর্কিত সংবাদ
ডেস্ক রিপোর্ট