বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্বের ঐতিহাসিক তথ্যচিত্রের অংশ: ইউনেস্কো

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্বের ঐতিহাসিক তথ্যচিত্রের অংশ: ইউনেস্কো

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণকে বিশ্বের ঐতিহাসিক তথ্যচিত্রের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো।

৭ মার্চের ভাষণের জন্য বঙ্গবন্ধু যেভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন

৪৬ বছর আগে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ এসেছিল এক ধারাবাহিক রাজনৈতিক আন্দোলনের পটভূমিতে।

আন্দোলনের একপর্যায়ে মার্চের প্রথমদিন থেকেই উত্তাল হয়ে উঠেছিল ঢাকার রাজপথ।

এর মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা উড়ানো হয়েছে।

পাঠ করা হয়েছে স্বাধীনতার ইশতেহার এবং নির্বাচন করা হয়েছে জাতীয় সঙ্গীত।

কিন্তু স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার প্রশ্নে বা আন্দোলনের ব্যাপারে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত কবে দেবেন, সেজন্যই ছিল মানুষের অধীর অপেক্ষা।

আওয়ামী লীগের প্র্রেসিডিয়াম সদস্য তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবের ঘনিষ্ট ছিলেন।

তিনি বলছিলেন, আন্দোলন এবং মানুষের আকাংখা বিবেচনায় নিয়েই শেখ মুজিব ৩রা মার্চ পল্টনে ছাত্র সমাবেশে ৭ই মার্চ ভাষণ দেয়ার ঘোষণা করেছিলেন।

একদিকে আন্দোলনের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়ার ব্যাপারে চাপ ছিল।

সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণার দাবিতে ছাত্র নেতাদের একটা অংশ চাপ তৈরি করছিল।

অন্যদিকে আলোচনার পথ খোলা রাখা হয়েছিল।

ফলে শেখ মুজিব ছাত্র নেতা থেকে শুরু করে জাতীয় নেতা পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলেন।

৬ মার্চ রাতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং তাজউদ্দিন আহমেদসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ কয়েকজন নেতার সাথে আলোচনা করেছিলেন।

তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, ‘সামরিক শাসন তুলে নেয়া এবং সৈন্যদের ব্যারাকে ফেরত নেয়াসহ পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতি চারটি শর্তের ব্যাপারেই শুধু বঙ্গবন্ধু তার সহকর্মীদের সাথে আলোচনা করেছিলেন। ভাষণ দিতে বাসা থেকে বেরোনোর সময় শেখ মুজিবকে তার স্ত্রী শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব বলেছিলেন, ‘তুমি যা বিশ্বাস করো, তাই বলবে।’ ৭ই মার্চের সেই ভাষণ তিনি নিজের চিন্তা থেকেই দিয়েছিলেন। ভাষণটি লিখিত ছিলনা।’

৭ মার্চ সকাল থেকেই ঢাকায় ধানমন্ডীর ৩২ নম্বর বাড়িতে ছিল আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা এবং ছাত্র নেতাদের ভিড়।

দুপুর দু’টার দিকে আব্দুর রাজ্জাক এবং তোফায়েল আহমেদসহ তরুণ নেতাকর্মিদের সাথে নিয়ে শেখ মুজিব তাঁর বাড়ি থেকে রওনা হয়েছিলেন জনসভার উদ্দেশ্যে।

এদিকে সকাল থেকেই রাজধানী ঢাকা পরিণত হয়েছিল মিছিলের নগরীতে। সোহরাওয়ার্দ্দী উদ্যান সে সময় রেসকোর্স ময়দান নামে পরিচিত ছিল।

সেই রেসকোর্স ময়দানে লাখ লাখ মানুষের অপেক্ষার পালা শেষ করে সাদা পাজামা পাঞ্জাবী এবং হাতাকাটা কালো কোট পড়ে শেখ মুজিব উপস্থিত হয়েছিলেন।

আহমেদ বলেছেন, আগের নির্ধারিত রাস্তা বাদ দিয়ে ভিন্নপথে তাকে সেখানে নেয়া হয়েছিল।

মঞ্চে সকাল থেকেই গণসঙ্গীত চলছিল। সেদিন শেখ মুজিব সেই মঞ্চে একাই ভাষণ দিয়েছিলেন।

৭ মার্চ সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা আসতে পারে । মানূষের মধ্যে এ ধরণের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল।

তোফায়েল আহমেদ মনে করেন, প্রায় ১৮ মিনিটের এই ভাষণে সবদিকই উঠে এসেছিল।

‘যাতে বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করা না হয়, সেজন্য তিনি চারটি শর্ত দিয়ে পাকিস্তান ভাঙ্গার দায় নেননি। অন্যদিকে, এই একটি ভাষণের মাধ্যমে তিনি একটি জাতিকে সশস্ত্র বাঙ্গালী জাতিতে রূপান্তর করেছিলেন। স্বাধীনতার বীজ তিনি বপন করেছিলেন।’

তিনি আরো বলেছেন, ‘এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম। ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকো। এই বক্তব্যের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু একটা গেরিলা মুক্তিযুদ্ধের দিক নির্দেশনাো দিয়েছিলেন।’

জনসভায় ছিলেন এমন অনেকে বলেছেন, লাঠি, ফেস্টুন হাতে লাখ লাখ মানুষ উত্তপ্ত শ্লোগানে মুখরিত থাকলেও শেখ মুজিবের ভাষণের সময় সেখানে ছিল পিনপতন নিরবতা।

ভাষণ শেষে আবার স্বাধীনতার পক্ষে শ্লোগান মুখর হয়ে উঠেছিল ঢাকার রাস্তাগুলো।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বাঙ্গালির মুক্তির সনদ: রাষ্ট্রপতি

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ছিল বাঙ্গালির মুক্তির সনদ।

তিনি বলেন, ৭ মার্চের ভাষণ আমাদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রেরণার চিরন্তন উৎস হয়ে থাকবে। আমাদের স্বাধীনতা অর্জনে তাই ৭ মার্চের ভাষণের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম।

রাষ্ট্রপতি বলেন, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে অসীম সাহসিকতার সাথে রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার উদ্দেশে বজ্রকণ্ঠে যে ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেছিলেন তা ছিল মূলত বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ।

তিনি বলেন, ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের সেই ধারাবাহিকতায় ২৬ মার্চ ১৯৭১ বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন বাঙালি জাতির বহুকাঙ্খিত স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দীর্ঘ ন’মাস সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা অর্জন করি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। আমাদের স্বাধীনতা অর্জনে তাই ৭ মার্চের ভাষণের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম।

রাষ্ট্রপতি ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষে সোমবার এক বাণীতে এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম-আয়ের এবং ২০৪১ সালে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘রূপকল্প-২০২১’ ও ‘রূপকল্প-২০৪১’ ঘোষণা করেছেন। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে দলমত নির্বিশেষে সকলকে একযোগে কাজ করার আহবান জানান রাষ্ট্রপতি।

রাষ্ট্রপতি বলেন, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশকে একটি সুখী-সমৃদ্ধ ‘সোনার বাংলা’য় পরিণত করাই ছিল বঙ্গবন্ধুর আজীবনের লালিত স্বপ্ন। আমাদের মহান নেতার সে স্বপ্ন পূরণে আমাদের অব্যাহত প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে সকল রাজনৈতিক দলসহ সর্বস্তরের জনগণের অব্যাহত প্রচেষ্টা থাকতে হবে।

তিনি দিবসটি স্মরণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, ঐতিহাসিক ৭ মার্চ বাঙ্গালি জাতির ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৭১ সালের এ দিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বজ্রকণ্ঠে যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন তার মধ্যে নিহিত ছিল বাঙ্গালির মুক্তির ডাক। তার অনন্যসাধারণ নেতৃত্বে বাঙালি জাতি ১৯৭১ সালে পায় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।

রাষ্ট্রপতি বলেন, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের পরতে পরতে মিশে আছে জাতির পিতার অসামান্য অবদান। মহান ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জনের এই দীর্ঘ বন্ধুর পথে বঙ্গবন্ধুর অপরিসীম সাহস, সীমাহীন ত্যাগ-তিতিক্ষা, বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং সঠিক দিকনির্দেশনা জাতিকে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে অসীম সাহসিকতার সাথে রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার উদ্দেশে বজ্রকণ্ঠে যে ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন তা ছিল মূলত বাঙ্গালি জাতির মুক্তির সনদ।

সম্পর্কিত সংবাদ
ডেস্ক রিপোর্ট