বিমান নিয়ে ভয়ঙ্কর হামলার ছক

বিমান নিয়ে ভয়ঙ্কর হামলার ছক

জঙ্গি তৎপরতায় এবার নাম আসছে বিমানের পাইলটদের। উগ্রপন্থিদের এ তালিকায় রয়েছেন অন্তত চারজন।

তাদের নিশানায় রয়েছেন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। গুরুত্বপূর্ণ এসব ব্যক্তির বাসভবনে হামলা চালানো এবং বিমান ছিনতাই, বিমানযাত্রীদের জিম্মি করার ছকও রয়েছে পাইলট নামধারী জঙ্গিদের। আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশকে জঙ্গি রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করতে তারা ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা এঁটেছেন বলে তথ্য এসেছে গোয়েন্দাদের কাছে। পাইলটের বেশির ভাগই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে কর্মরত। আগাম গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সন্দেহভাজন অনেককেই নজরদারিতে রেখেছেন গোয়েন্দারা। তবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কো-পাইলট (ফার্স্ট অফিসার) সাব্বির এনামের ব্যাপারে তথ্য-প্রমাণাদি অনেকটাই মিলে যাওয়ায় তাকেসহ চারজনকে গ্রেফতার করেছে এলিট ফোর্স র‌্যাব। সোমবার বিকাল থেকে গতকাল বেলা ১১টা পর্যন্ত রাজধানীর মিরপুর দারুসসালামের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। তাদের গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করেন গোয়েন্দারা।

কারওয়ান বাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে গতকাল বিকালে এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, গ্রেফতার চারজন দারুসসালামের ‘কমলপ্রভা’ বাড়ির আত্মঘাতী জেএমবি সদস্য আবদুল্লাহর সহযোগী।

এরা হলেন ওই বাড়ির মালিক হাবিবুল্লাহ বাহার আজাদের ছেলে সাব্বির, আজাদের স্ত্রী সুলতানা পারভীন, সুলতানার ভাইয়ের ছেলে আসিফুর রহমান আসিফ এবং নিহত আবদুল্লাহর ঘনিষ্ঠ সহযোগী চা দোকানদার আলম। গত ২৬ অক্টোবর নিহত আবদুল্লাহর সহযোগী বিল্লাল হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পাইলট সাব্বিরসহ চারজনকে গ্রেফতার করা হলো। র‌্যাব বলছে, বিমান নিয়ে ভয়াবহ নাশকতার পরিকল্পনা ছিল তাদের। বিমান থেকে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের বাসভবনে আঘাত করার টার্গেট ছিল। সাব্বির বিমানের ফার্স্ট অফিসার হলেও তিনি সেপ্টেম্বরে দারুসসালাম এলাকায় র?্যাবের অভিযানের সময় নিহত জঙ্গি আবদুল্লাহর ‘সহযোগী’। মুফতি মাহমুদ বলেন, সাব্বির ২০০৯ সালে বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমি থেকে উড়োজাহাজ চালানোর প্রশিক্ষণ নেন। তিনি স্পেন ও তুরস্কেরও বিশেষ প্রশিক্ষণ নেন। ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত রিজেন্ট এয়ারওয়েজে চাকরি করেন সাব্বির। ওই বছরই তিনি বিমানের পাইলটের চাকরি নেন। বিমানের ফার্স্ট অফিসার হিসেবে সাব্বির বোয়িং ৭৩৭ উড়োজাহাজ চালাতেন। ৩০ অক্টোবর তিনি ঢাকা-কলকাতা-ঢাকা রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করেন। তবে জঙ্গি আবদুল্লাহর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। সাব্বির নিহত জঙ্গি সারোয়ার জাহানের কাছ থেকে বায়াত গ্রহণ করেন। গুলশানে হলি আর্টিজানে হামলার আগে ও পরে নাশকতার পরিকল্পনা ছিল তার। এরই অংশ হিসেবে সাব্বির বিমান চালিয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের বাসভবনে আঘাতের পরিকল্পনা করেন বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকারও করেছেন। এ ছাড়া বিমানের যাত্রীদের জিম্মি করে মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাও তার ছিল। এ বিষয়ে বাংলাদেশ বিমানের গণমাধ্যম শাখার একাধিক কর্তাব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তারা কেউ ফোন ধরেননি। গ্রেফতারকৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে র‌্যাব বলেছে, কমলপ্রভার মালিকের স্ত্রী গ্রেফতার সুলতানা পারভীন নিহত আবদুল্লাহর ফ্ল্যাটে গিয়েই জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হন। পরে নিহত জঙ্গি নেতা মানিক ওরফে ফরহাদ ওরফে সারোয়ার জাহানের কাছে বায়াত গ্রহণ করেন। তিনি আবদুল্লাহকে জঙ্গিবাদের জন্য আর্থিক সহায়তা করেছেন। গ্রেফতার আসিফ (২৫) সম্পর্কে সুলতানা পারভীনের ভাতিজা। নিহত আবদুল্লাহর সঙ্গে তার খুব ঘনিষ্ঠতা ছিল। তিনিও সারোয়ার জাহানের হাতে বায়াত গ্রহণ করেন। আসিফ বিস্ফোরক তৈরির জন্য আবদুল্লাহকে বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল সরবরাহ করতেন। আসিফ তার এক বন্ধুর কাছ থেকে একটি ৯এমএম পিস্তল এনে দিতে চাইলেও দাম বেশি হওয়ায় আবদুল্লাহ তা গ্রহণ করেননি। সুলতানা পারভীন ওই পিস্তল কেনার জন্য আবদুল্লাহকে টাকা দিতে চেয়েছিলেন। গ্রেফতার মো. আলম (৩০) পেশায় চায়ের দোকানদার। সংগঠনের কাজে বিভিন্ন সময় আবদুল্লাহকে গাড়ি সরবরাহ করতেন। গত রমজানের আগে আলমের মাধ্যমে ট্রাক সংগ্রহ করেন বিল্লাল। সেই ট্রাক চালিয়ে তাদের নিকটবর্তী পুলিশি স্থাপনায় নাশকতার পরিকল্পনা করেন আবদুল্লাহ। ইউরোপে জঙ্গিদের সাম্প্রতিক গাড়ি হামলা কৌশলে অনুপ্রাণিত হয়ে আলমের সরবরাহকৃত গাড়ি দিয়ে সংগঠনের অন্য সদস্যরা গাড়ি চালানোর অনুশীলন করেন। মুফতি মাহমুদ বলেন, গ্রেফতার সাব্বিরের মতো একজন দুর্ধর্ষ ব্যক্তি বাংলাদেশ বিমানের মতো সংবেদনশীল স্থানে চাকরিরত, যেখানে সর্বদা বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের যাতায়াত। এ ধরনের একজন উগ্রবাদী জঙ্গিকে গ্রেফতার করে র্যাব বাংলাদেশকে নিকট ভবিষ্যতে আরও একটি নতুন অনাকাঙ্ক্ষিত/ভয়াবহ ঘটনা থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে। আগামীতে এ ধরনের সফলতা ধরে রাখতে র্যাব দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ৪ সেপ্টেম্বর রাতে মিরপুর মাজার রোডের বর্ধনবাড়ি এলাকায় ‘কমলপ্রভা’ নামের একটি বাড়িতে অভিযান চালায় র?্যাব। অভিযান চলার সময় ওই বাড়ির পঞ্চম তলায় ‘জঙ্গি আস্তানায়’ ভয়াবহ রাসায়নিক বিস্ফোরণ হয়। অভিযানে জঙ্গি আবদুল্লাহ ও তার পরিবার আত্মসমর্পণের জন্য সময় নেন। কিন্তু পরে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আবদুল্লাহ, তার দুই স্ত্রী, দুই সন্তান ও দুই সহযোগী আত্মহত্যা করেন।

সম্পর্কিত সংবাদ
ডেস্ক রিপোর্ট