ইউরো চ্যাম্পিয়নশীপের রোমাঞ্চকর ফাইনাল আজ

ইউরো চ্যাম্পিয়নশীপের রোমাঞ্চকর ফাইনাল আজ

চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসি টানা তিনটি বড় টুর্নামেন্টের আসরে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেও শিরোপা জেতাতে পারেননি। ফুটবল জাদুকরের কান্নায় বিদায়ের সেই ক্ষণগুলো নাড়া দিয়েছিল ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে। বলেছিলেন, মেসির কান্না দেখতে তার একদমই ভালো লাগে না। প্রতিদ্বন্দ্বী মেসির কান্না তাকে উদাস করে দিলেও এবার নিজেই হয়তো পড়ে যেতে পারেন তেমন পরিস্থিতির সামনে! রোনালদো জাতীয় দলকে শিরোপা জেতাতে না পারলে হয়তো মেসির মতই কান্নায় ভেঙে পড়বেন। এক যুগ আগেও একই যন্ত্রণা যে আঘাত করেছিল তাকে। সেদিনের কান্না জড়ানো সিআর সেভেনকে ফুটবলপ্রেমীরা আজো ভোলেননি।

সেবার ঘরের মাঠে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে উঠেও গোল্ডেন গোলে গ্রিসের বিপক্ষে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল পর্তুগালের। রোনালদো এরপর আর পারেননি। মেসিও পারেননি। তবে রোনালদোর না পারাটা আরো করুণ। সেই আসরের পর রোনালদো পর্তুগালের হয়ে ফাইনাল খেলছেন যে এবারই প্রথম। ক্যারিয়ারের অর্জনের হিসেবে তাই নিজেকে আরেকটি উচ্চতায় তুলে নেওয়ার সুযোগ তার।

যে পথে ইউরোর শিরোপা লড়াইয়ে রোববার রাতে স্বাগতিক ফ্রান্সের মুখোমুখি হবে পর্তুগাল। বাংলাদেশ সময় রাত একটায় স্তাদ দো ফ্রান্সে জিতলেই পর্তুগিজ ফুটবলের শিরোপা খরা ঘুচিয়ে দিতে পারবেন রোনালদো। তবে ইউরোর ফাইনালে টুর্নামেন্ট জুড়ে ধারাবাহিক ফ্রান্সই ফেভারিট, অন্যদিকে সেমির আগ পর্যন্ত খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগিয়েছে পর্তুগাল।

চ্যাম্পিয়নশিপ শুরুর আগে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালকে নিয়ে বাজি ধরার লোক খুব কমই ছিল। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য দুর্দান্ত খেলে ওয়েলেসকে হারিয়ে তারাই এখন শিরোপার দাবিদার। ইউরোপের কুলিন দল না হলেও ইউরোর গত তিনটি আসরে পর্তুগালের পারফরম্যান্স কিন্তু দারুণই ছিল। ২০০৮ সালে কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে (৩-২) হেরে গেলেও ২০০৪ সালে ঘরের মাঠে ফাইনাল খেলেছিল দলটি। সেবার গ্রিসের কাছে হেরে চোখের জলে মাঠ ছাড়েন রোনালদোরা।

চার বছর আগে ২০১২ সালের ইউরোতেও সেমিফাইনালে উঠেছিল পর্তুগাল। তবে স্পেনের কাছে টাইব্রেকারে হেরে স্বপ্নযাত্রা থেমে যায় রোনালদোর দলের। চার বছর পর আর কাঁদতে চান না পর্তুগিজরা। সেই পথে বড় ভরসা রোনালদো। পর্তুগিজ তারকা অবশ্য পাঁচ ম্যাচের চারটিতেই গোলের দেখা পাননি। তবে রিয়াল মাদ্রিদ সুপারস্টার গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে হাঙ্গেরির বিপক্ষে জোড়া গোল করার পর সেমিতেও জ্বলে ওঠেন। ফাইনালে সিআর সেভেনকে তাই আরেকবার নিজের জাত চেনাতে হবে।

তবে খুঁড়িয়ে এগোলেও পর্তুগালের জন্য শাপে-বর হয়েছে গ্রুপ পর্বের বাজে ফর্ম। গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচের তিনটিতে ড্র করে শেষ ষোলোতে জায়গা করে নেয় তারা। এতে শক্ত প্রতিপক্ষ এড়িয়ে তারা এখন ফাইনালে। শেষ ষোলোতে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে আত্মঘাতী গোলে জয় দিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পা রাখে পর্তুগিজরা। এরপর কোয়ার্টারের লড়াইয়ে টাইব্রেকারে পোল্যান্ডকে ৫-৩ গোলে হারিয়ে সেমিতে উন্নীত হয়। অবশ্য এরপর যেনো নিজেদের খুঁজে পেয়েছে দলটি। ফ্রান্সের ভয়ের কারণ হতে পারে সেটিই।

অন্যদিকে, ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে আসতে সেমিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে হারিয়েছে ফ্রান্স। ঘরের মাঠে চেনা দর্শক, ফাইনালে তাই কিছুটা এগিয়েই থাকবে স্বাগতিকরা। এর আগে ১৯৮৪ সালে ঘরের মাঠে ইউরোর শিরোপা জিতেছিল ফ্রান্স। এরপর ১৯৯৮ সালে নিজেদের মাটিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের শিরোপাও ঘরে তোলে ফরাসিরা। এবারও ঘরের মাঠে ইউরোপিয়ান ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের স্বপ্ন দেখছে দিদিয়ের দেশমের দল।

নকআউট পর্বে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স উপহার দিয়ে সেমিতে এসেছিল ফ্রান্স। শেষ ষোলোতে আয়ারল্যান্ডকে ৩-১ ব্যবধানে পরাজিত করে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল তারা। এরপর কোয়ার্টারে আইসল্যান্ডকে ৫-২ গোলে গুঁড়িয়ে দিয়ে সেমিতে জায়গা করে নেয় স্বাগতিকরা। সেই ফর্মটাই ফাইনালে ধরে রাখতে চায় দলটি।

তাতে ফ্রান্সকে ভরসা যোগাচ্ছে মেজর টুর্নামেন্টে ঘরের মাঠের পারফরম্যান্স। ঘরের মাঠে মেজর টুর্নামেন্টের সর্বশেষ ১৭টি ম্যাচেই অপরাজিত রয়েছে জিনেদিন জিদানের দেশ। এই ১৭ ম্যাচের ১৫টিতে জয় পায় ফ্রান্স এবং অপর দুটি ম্যাচ ড্র হয়। ১৯৬০ সালে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম আসরে চেকোস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে ২-০ গোলে পরাজিত হওয়ার পর মেজর টুর্নামেন্টে ঘরের মাঠে আর হারের মুখ দেখেনি ১৯৮৪ ও ২০০০ সালের চ্যাম্পিয়নরা।

টুর্নামেন্ট জুড়ে স্বাগতিকদের ভরসার নাম অ্যান্টনে গ্রিজমান। ফ্রান্সকে যারা ফেভারিট হিসেবের খাতায় নেননি, তাদের মুখ বন্ধ করে ঘরের মাটিতে টানা শিরোপার হ্যাটট্রিক করার অপেক্ষায় থাকা দেশটিকে এতদূর আনতে তার অবদানই বেশি। ফ্রান্সের আশার পালে তাই বেশি করে হাওয়া দিচ্ছেন গ্রিজমানই। অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের এই তারকা গত বৃহস্পতিবার মার্শেইতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানির বিপক্ষে জোড়া গোল করে ইউরোর ফাইনালে নিয়েছেন ফ্রান্সকে। এবার ক্যানভাসে শেষ আঁচরের পালা।

গ্রিজমান সেটি পারলে ভালোই। সঙ্গে দারুণ এক রেকর্ডের হাতছানিও অপেক্ষা করছে তার জন্য। সেজন্য অবশ্য ফাইনালে তিনটি গোল করতে হবে তাকে। তাহলে ইউরোর এক আসরে মিশেল প্লাতিনির সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড ছুঁতে পারবেন। ১৯৮৪ ইউরো আসরে ফ্রান্স মিশেল প্লাতিনিতে ভর করেই জিতেছিল। যেটি ছিল আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে ফ্রান্সের প্রথম সাফল্য। সেবার টুর্নামেন্টে দেশটির ১৪ গোলের ৯টিই করেছিলের প্লাতিনি। এরইমধ্যে টুর্নামেন্টে ৬ গোল করেছেন গ্রিজমান। পেরিয়ে গেছেন জিনেদিন জিদান ৫ গোলকে, পাশে বসেছেন থিয়েরি অঁরির ৬ গোলের। যেটি টুর্নামেন্টের গোল্ডেন বুট পাওয়ার ক্ষেত্রে বেশ এগিয়ে নিয়েছে তাকে।

ফাইনালে হ্যাটট্রিক করে শেষ পর্যন্ত প্লাতিনিকে ছুঁতে না পারলেও কেবল শিরোপা উঁচিয়ে ধরলেই প্লাতিনি-জিদানের সঙ্গেই উচ্চারিত হবে গ্রিজমানের নাম। দেশকে দুটি বড় শিরোপা জিতিয়ে সাবেক দুই কিংবদন্তি যেমন সেরার কাতারে গেছেন, সেই অপেক্ষা এখন ২৫ বছর বয়সী গ্রিজমানের। এখন মাঠের লড়াইয়ে দেখার অপেক্ষা তার সৌজন্যে ফরাসি সৌরভ মেলে, নাকি রোনালদোর পায়ে পর্তুগিজদের স্বপ্নপূরণ হয়।

যদিও ফ্রান্সের বিপক্ষে মুখোমুখি লড়াইয়ের ইতিহাস আর পরিসংখ্যান পর্তুগালের পক্ষে কথা বলছে না। বড় কোনো টুর্নামেন্টে চতুর্থবারের মতো দেখা হতে যাচ্ছে দুদলের। আগের তিনটি ম্যাচই ছিল সেমিফাইনালে ১৯৮৪ ও ২০০০ সালের ইউরো এবং ২০০৬ সালের বিশ্বকাপে। তিনটি ম্যাচেই হেরেছিল পর্তুগাল। সবশেষ ১০টি লড়াইয়ের সবকটি ম্যাচেই পর্তুগালের বিপক্ষে জয় পেয়েছে ফ্রান্স। তবে অতীত ফেলে এখনকার হিসেব আলাদা! যখন দুদলই ফর্মে আছে, তখন রোববার রাতে রোমাঞ্চকর এক প্রদর্শনীর পসরার অপেক্ষায় থাকতে পারেন ফুটবলপ্রেমীরা।

সম্পর্কিত সংবাদ
ডেস্ক রিপোর্ট