অবসরে ঘুরে আসুন চোখ জুড়ানো সুন্দরবন

অবসরে ঘুরে আসুন চোখ জুড়ানো সুন্দরবন

একঘেয়েমী জীবনের ক্লান্ত কর্মময় জীবন থেকে ছুটি নিয়ে দেখতে গিয়েছিলাম গাঢ় সবুজের সমারোহ। শুধু সবুজ আর সবুজের মেলা। দেখতে গিয়েছিলাম হরেক রকমের জীব-জন্তু, পাখ-পাখালি, আর কীটপতঙ্গ। উপভোগ করতে গিয়েছিলাম বঙ্গোপসাগর থেকে ছুটে আসা জলভেজা লবণাক্ত বাতাস। আমি সুন্দরবন এর কথা বলছি। যে বন আমাদের প্রাণে আনন্দের খোরাক যোগায়, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করে। অনেক ব্যস্ততাকে দূরে সরিয়ে রেখে এই বনের সাবুজিক দৃশ্য উপভোগ করার জন্য বেড়িয়ে এলাম আমরা কয়েক জন।

Sundorbon_Featured3

রাজশাহী শহর থেকে বাস যোগে রওনা দিলাম সুন্দরবনের উদ্দেশ্যে। অবশেষে কয়েক ঘণ্টা ভ্রমণের পর বাস থেকে নামতেই মালঞ্চ নদীর ওপারে দেখতে পেলাম আকাক্ষিত সুন্দরবন। এখান থেকে ইঞ্জিন ভ্যানে চড়ে চুনা নদীর ব্রীজ পেরিয়ে পৌছালাম বুড়িগোয়ালিনী। এখানে অবস্থিত নীলডুমুর ফরেষ্ট অফিস। এখানে দেখতে পেলাম বনবিভাগের পোষা হরিণ ও বানর। এই অফিস থেকে ভ্রমণ পাস সংগ্রহ করে চলে গেলাম ইঞ্জিনচালিত নৌকার ঘাটে। ইঞ্জিনচালিত নৌকা বা ট্রলার যোগে শুরু হলো সুন্দরবন ভ্রমণ। এই ইঞ্জিনচালিত নৌকার ভাড়া প্রতি ঘণ্টায় ৩০০ টাকা। বড় নৌকার ভাড়া আরও একটু বেশি।

Sundorbon_Featured

সুন্দরবন সমুদ্র উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনভূমি। এই বন বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ জড়ে বিস্তৃত। ১০,৬০০ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে গড়ে ওঠা সুন্দরবনের ৬,০১৭ বর্গ কিলোমিটার রয়েছে বাংলাদেশে। এমন নৈসর্গিক দৃশ্যাবলি দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় আর দ্বিতীয়টি নেই। সুন্দরবন ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি পায়। বাংলাদেশ ও ভারতীয় অংশ একই নিরবচ্ছিন্ন ভূমিরূপের অংশ হলেও ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের সূচিতে ভিন্ন ভিন্ন নামে সূচিবদ্ধ হয়েছে যথাক্রমে সুন্দরবন ও সুন্দরবন জাতীয় পার্ক নামে। সুন্দরবনকে জালের মত জড়িয়ে রয়েছে সামুদ্রিক স্রোতধারা, কাদা চর এবং ম্যানগ্রোভ বনভূমির লবণাক্ততাসহ ছোট ছোট দ্বীপ। মোট বনভূমির ৩১.১ শতাংশ, অর্থাৎ ১,৭৫৬ বর্গকিলোমিটার জুড়ে রয়েছে নদী, খাল ও খাড়ি, এলাকা। বনভূমিটিতে রয়েছে বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার ছাড়াও চিত্রা হরিণ, কুমির কামট ও সাপ সহ ৪২ প্রজাতির বন্যপ্রাণী। রয়েছে মদনটাক ও ধনেশ সহ ৩৫ প্রজাতির পাখি। সুন্দরবনে রয়েছে ৪০ ধরনের ম্যানগ্রোভ বৃক্ষ। বনের অভ্যন্তরের নদ নদীতে বাস করে প্রায় ৪০০ প্রজাতির মাছ। এই ম্যানগ্রোভ বন ১৯৯২ সালের ২১ মে রামসার সাইট হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে ভট ভট শব্দ করে এগিয়ে চলেছে আমাদের ট্রলার। চোখের সামনে ভেসে উঠছে একের পর এক সুন্দরী, গেওয়া, পশুর, কেওড়া, বাইন, কাকড়া, ধুন্দুল, গরান, ভোলা গর্জন, খইলসা, আমুর, ঝানা, করমজা আর ঝাউয়ের সারি। পানির ওপর মাথা ভাসিয়ে আছে গোলপাতা, হেন্তাল, ছন, নল খাগড়া, ধানসি ঘাস, কেওয়াকাটা আর হেদো। সে এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। বনভূমির পাশাপাশি সুন্দরবনের বিশাল এলাকা জুড়ে রয়েছে নোনতা ও মিঠা পানির জলাধার, পলিভূমি, বালুচর, বালিয়াড়ি, বেলেমাটিতে উন্মুক্ত তৃণভূমি এবং গাছ ও গুল্মো। তাই সুন্দরবনের মনোমুগ্ধকর এই দৃশ্য দেখে উপন্যাসিকরাও তাদের উপন্যাসে এর বর্ণনা করেছেন। ২০০৪ সালে প্রকাশিত পুরস্কার বিজয়ী নৃতাত্ত্বিক অমিতাভ ঘোষের “দ্যা হাঙ্গরি টাইড” উপন্যাসের অধিকাংশ কাহিনী সুন্দরবনকেন্দ্রিক এবং সালমান রুশদির বুকার পুরস্কার বিজয়ী উপন্যাস “মিডনাইটস চিলড্রেন” এর কাহিনীর অংশ বিশেষও সুন্দরবনকে ঘিরে।

নৌকা চলতে শুরু করলো মাঝারি আকৃতির নদী মালঞ্চ দিয়ে। দুপাশে শুধু সবুজ আর সবুজ। বানর দেখতে পেলেও বাঘ, হরিণ, বনমোরগ প্রভৃতি প্রাণী দেখতে পেলাম না। দেখা পাওয়াও নাকি ভাগ্যের ব্যাপার। একথা জানালো নৌকোর মাঝি। নৌকা চলছে তো চলছে। বেশ কিছুক্ষণ চলার পর নৌকা ঢুকলো ছোট শাখা নদীতে।এবার আমাদের গায়ে কাটা দিতে শুরু করলো। এই বুঝি বাঘ এসে পড়ল আপনার গায়ের উপর। আর গাঢ় সবুজ অন্ধকারের মাঝে শীতল হাওয়া ভয়টা আরও একটু বাড়িয়ে দিলো।

বাংলাদেশের ৬টি জেলা জুড়ে সুন্দরবন বিস্তৃত হলেও একমাত্র সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ থেকে সরাসরি দেখা যায় সুন্দরবনের সবুজ সমারোহ। ঢাকা থেকে রওনা হলে সরাসরি মুন্সিগঞ্জ গিয়ে গাড়ি থেকে নেমে যতদূর আপনার চোখ যাবে, শুধু দেখবেন সবুজ সীমানা। মংলা, পটুয়াখালী, বাগেরহাট যেদিক দিয়েই সুন্দরবন যান না কেন, বন দেখার জন্য নদীপথে ছুটতে হবে অনেকটা দূর।

Sundorbon_Featured2

একমাত্র সাতক্ষীরার কোলঘেঁষা সুন্দরবন ব্যতিক্রম। বন যেন বধূ বেশে সেজে বসে আছে তার আমাদের প্রতীক্ষায়। সাতক্ষীরার মালঞ্চ, কালিন্দী, রায়মঙ্গল, খোলপেটুয়া, বুড়িগোয়ালিনী নদীর তীর ছুঁয়ে গড়ে ওঠা সুন্দরবনে ঘোরার জন্য পর্যাপ্ত বোট থাকলেও বন দেখে এসে থাকা খাওয়ার যৎসামান্য ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘সুশীলন’ মালঞ্চ নদীর তীর ঘেঁষে নির্মাণ করেছে ‘টাইগার পয়েন্ট’ নামে একটি যথেষ্ট মানসম্পন্ন রেস্ট হাউস। এছাড়া আরও একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘বরসা’ও নির্মাণ করেছে একটি বিনোদন কেন্দ্র। সুতরাং, থাকা কিংবা গাড়ি থেকে নেমে একটু ফ্রেশ হয়ে বন দেখতে বেরিয়ে পরার কোনো সমস্যা নেই এখন আর । থাকার জন্য সুশীলনের টাইগার পয়েন্ট এবং বরসার রেস্ট হাউসই ভরসা। টাইগার পয়েন্টে রুমপ্রতি ভাড়া ৫০০-১৭০০ টাকা। তবে ডরমেটরি টাইপের কিছু রুমে প্রতি বেডের ভাড়া পড়বে ২০০টাকা। এখানে ৩টি আধুনিক সুবিধাসহ কনফারেন্স রুমও আছে। এছাড়া, একসঙ্গে ১০০ জন মানুষ এখানে থাকতে ও খেতে পারবে। এখানে আরও একটি স্পেশাল সুযোগ পাবেন। সেটা হলো, ছাদে বসে বাডর্স আই ভিউ থেকে সুন্দরবন দেখা। আর চাঁদনি রাত যদি পেয়ে যান, তাহলে তো কথাই নেই।এই এলাকার খাওয়া-দাওয়াটা কিন্তু সেরে নিতে পারেন স্পেশালভাবে। বিশেষ করে এখানে এমন কিছু মাছ পাওয়া যায় যা দেশের অন্য কোথাও দেখা পাওয়া যায়না বললেই চলে। মাছগুলোও অনেক সুস্বাদু। তবে পছন্দের খাবারের জন্য একমাত্র ভরসা টাইগার পয়েন্টের ক্যান্টিন। এই ক্যান্টিনে দুপুর এবং রাতের খাবার পাবেন ১০০-১২০টাকায়। এর সাথে কিছু অতিরিক্ত টাকা যোগ করে চিংড়ি, ভেটকি, পাসসে, কাইন, বাঁশপাতা, খয়রা, তপস্বে, দাঁতনেসহ বিভিন্ন প্রজাতির নদীর মাছ খাওয়ার সুযোগ তো থাকছেই। তবে ভুল করে হরিণের মাংস খাওয়ার কথা না বলাই ভালো। কারণ এটা একবারেই নিষিদ্ধ।সারাদিন ঘুরে রাত্রিতে আমরা আশ্রয় নিলাম সুশীলনের টাইগার পয়েন্টে।

যাতায়াত

ঢাকার মতিঝিল, কল্যাণপুর, মালিবাগ ও গাবতলী বাসস্ট্যান্ড থেকে সোহাগ, সাতক্ষীরা এক্সপ্রেস, কে লাইন, একে ট্রাভেলস, এম আর, ঈগল, এসপি গোল্ডেন লাইন, ইয়োলো লাইন, সায়রা, সংগ্রাম, মামুন, পরিবহনসহ প্রায় ১৫টি পরিবহনে সাতক্ষীরা যেতে হবে। একে ট্রাভেলস এবং এম আর পরিবহনে সরাসরি যাওয়া যায় সাতক্ষীরা শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জে। ভাড়া ৫০০ টাকা। তবে এসি পরিবহনে যেতে পারবেন সাতক্ষীরা সদর পর্যন্ত। ভাড়া ৮০০-১২০০ টাকা। সকাল, দুপুর ও রাতের বেলায় তিনটি নির্দিষ্ট সময়ে গাড়িগুলো ঢাকা ছেড়ে যায়।

সম্পর্কিত সংবাদ
নিজস্ব প্রতিবেদক